নতুন বিমানবন্দরের কতটা প্রয়োজন? by আলমগীর সাত্তার

কয়েক দিন আগে বিমানের কয়েকজন অবসরপ্রাপ্ত পাইলট একসঙ্গে বসেছিলাম। আমরা প্রায়ই একসঙ্গে বসি। পিআইএ এবং বিমানের চাকরি মিলিয়ে আমাদের একেকজনের অভিজ্ঞতা সময়ের হিসাবে প্রায় ৪০ বছর। ফ্লাইং অভিজ্ঞতা ঘণ্টা হিসাবে ২০ থেকে ২৫ হাজার। পৃথিবীর প্রায় সব বিখ্যাত বিমানবন্দর আমাদের দেখার সুযোগ হয়েছে।


বেশির ভাগ বিমানবন্দরের সুযোগ-সুবিধাসহ অন্যান্য পরিসংখ্যান আমাদের জানা আছে। আমরা যাঁরা একসঙ্গে বসি, তাঁরা প্রায় সবাই বঙ্গবন্ধুর স্নেহাশীর্বাদপুষ্ট ছিলাম। আমাদের মধ্যে দুজন মুক্তিযুদ্ধে বীরউত্তম খেতাবপ্রাপ্ত, আর আমি বীরপ্রতীক। ৩০ জানুয়ারি একটি দৈনিকে 'নতুন বিমানবন্দর কেন' শিরোনামে যে প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়, তা পড়ার পর আমরা বিস্তারিত আলোচনা করেছি। এরপর আমার এ লেখাটি লিখতে শুরু করি। 'নতুন বিমানবন্দরের পক্ষে যুক্তি' ও 'পাল্টা যুক্তি'গুলো খুব মনোযোগ দিয়েই পড়লাম।
আমার এক আত্মীয় একাত্তর সালে খুলনা জেলা শান্তি কমিটির সদস্য ছিলেন। বাহাত্তর-তিয়াত্তর সালে তিনি বঙ্গবন্ধুর প্রশস্তি গেয়ে কিছু কবিতা লেখেন এবং তা পত্রপত্রিকায়ও প্রকাশিত হয়। ফলে তিনি বৃদ্ধ বয়সে সায়েন্স ল্যাবরেটরিতে স্পেশাল অফিসার হিসেবে একটি লোভনীয় চাকরিও লাভ করেছিলেন। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট বিকেলে তিনি আমার বাসায় আসেন ও বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে এমন সব কটূক্তি করেন, যা এখানে উল্লেখ করা উচিত হবে না। বিমান মন্ত্রণালয়ের সচিবও নাকি কবিতা লেখেন। তিনি নাকি একখানা কবিতার বই বঙ্গবন্ধুর নামে উৎসর্গও করেছেন।
পাঠকদের অবগতির জন্য জানাচ্ছি, কুর্মিটোলা বিমানবন্দরের রানওয়েতে এর ক্ষমতার মাত্র ৩৭ শতাংশ ব্যবহৃত হচ্ছে বর্তমানে এরোপ্লেন অবতরণ ও উড্ডয়নের জন্য। রানওয়ে থেকে পার্কিং এরিয়ায় আসার জন্য তিনটি ট্যাঙ্ওিয়ে আছে। ওই ট্যাঙ্ওিয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হলে প্লেনগুলো রানওয়ের ওপর কম সময় থাকবে বলে এরোপ্লেনের উড্ডয়ন ও অবতরণের সংখ্যা আরো বাড়ানো যাবে। কুর্মিটোলা বিমানবন্দরের অরিজিন্যাল প্ল্যানেই দুটি রানওয়ে তৈরি করার পরিকল্পনা করে পর্যাপ্ত জায়গা রাখা হয়েছে। ওই পরিকল্পনা অনুযায়ী বর্তমান রানওয়ের সমান্তরালে প্রস্তাবিত রানওয়েটি তৈরি করলেই তো প্লেনের উড্ডয়ন ও অবতরণের ক্ষমতা দ্বিগুণ হয়ে যাবে। বর্তমানে যে টার্মিনাল বিল্ডিং আছে, সেটার তো দ্বিগুণেরও বেশি সম্প্রসারণ করার জায়গা আছে। তবে সমস্যাটা কোথায়?
কুর্মিটোলা বিমানবন্দরের উন্নতি সাধন করার অনেক সুযোগ আছে। তা করা হলে এরোপ্লেনের উড্ডয়ন, অবতরণ, ক্ষমতা, পার্কিং স্পেস, টার্মিনাল বিল্ডিং দিয়ে যাত্রী গমনাগমন ক্ষমতা_সব কিছু দ্বিগুণেরও বেশি বাড়ানো যাবে। বর্তমানে যে হারে যাত্রী গমনাগমন বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাতে আগামী ৩০ বছরেও কুর্মিটোলা বিমানবন্দরের ধারণক্ষমতা অতিক্রম করবে না। ওই বিমানবন্দরে শুধু সমান্তরাল আরেকটি রানওয়েই নয়, বর্তমানের ১০ হাজার ৫০০ ফুট রানওয়েকে ১২ হাজার ফুট দৈর্ঘ্য পর্যন্ত সম্প্রসারণ করার জায়গাও আছে। ১২ হাজার ফুট দৈর্ঘ্যের রানওয়েতে বর্তমান যুগের সর্ববৃহৎ এরোপ্লেনও সহজেই উড্ডয়ন ও অবতরণ করতে পারে।
এ বিমানবন্দরের উত্তর প্রান্তে যে আইএলএস (ওখঝ=ওঘঝঞজটগঊঘঞ খঅঘউওঘ েঝণঝঞঊগ) আছে, তা অনেক পুরনো ও ক্যাটাগরিওয়ান শ্রেণীভুক্ত। ওটাকে বদলে ক্যাটাগরি টু বা ক্যাটাগরি থ্রি আইএলএস বসালে, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায়ও নিরাপদে এরোপ্লেন অবতরণ করতে পারবে ও প্লেনগুলোকে অন্যত্র ডাইভার্সন করে যেতে হবে না। রানওয়ের দক্ষিণ প্রান্তেও তিন-চার বছর আগে আইএলএস বসানো হয়েছে। কিন্তু অর্থাভাবে নাকি সেটা অপারেশনাল করা যাচ্ছে না। শীতকালে আমাদের দেশে সাধারণত প্লেনগুলোকে উত্তরমুখো হয়ে উড্ডয়ন ও অবতরণ করতে হয়। তাই দক্ষিণ প্রান্তের আইএলএস কার্যকর করা খুবই জরুরি। কুর্মিটোলা বিমানবন্দরের রানওয়ের পিসিএন (চঈঘ=চঅঠঊগঊঘঞ ঈখঅঝঝওঋওঈঅঞওঙঘ ঘটগইঊজ) হলো ৭০। অর্থাৎ রানওয়ে যথেষ্ট লোড গ্রহণে সক্ষম ও বৃহদাকারের প্লেনগুলো নিরাপদে অবতরণ করতে পারছে। কিন্তু বিমানবন্দরের রানওয়ে থেকে পার্কিং এরিয়ায় আসার ট্যাঙ্ওিয়ের পিসিএন মাত্র ৪০। ফলে বৃহদাকারের প্লেনগুলো অতিরিক্ত কার্গো নিয়ে পার্কিং এরিয়ায় আসতে পারে না। তাই ট্যাঙ্ওিয়েগুলোর সংস্কার সাধন করে পিসিএন বাড়াতে হবে।
প্যারালাল রানওয়ে তৈরি করা, রানওয়ের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধি করা, আইএলএস বদলে ক্যাটাগরি টু বা থ্রিতে উন্নীত করা, ট্যাঙ্ওিয়ের সংখ্যা বাড়ানো এবং পিসিএন বৃদ্ধি করা নাকি অর্থাভাবে সম্ভব হচ্ছে না। তাহলে ৭০ থেকে ৮০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করে আড়িয়াল বিলে নতুন বিমানবন্দর কেমন করে নির্মাণ করা হবে? আড়িয়াল বিলে বিমানবন্দর তৈরি করার প্রস্তাবনা বুকলেট আমি দেখেছি। সেখানে অনেক মিথ্যা তথ্য পরিবেশন করে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী যদি সত্যিকারের সব তথ্য জানতেন, যদি জানতেন কুর্মিটোলা বিমানবন্দরের ধারণাক্ষমতাকে এমন পর্যায়ে বৃদ্ধি করা যায় যে আগামী ৩০ বছর ওই বিমানবন্দর স্বচ্ছন্দে ব্যবহার করা যাবে, তবে প্রধানমন্ত্রী নতুন বিমানবন্দর তৈরি করার অনুমতি দিতেন না। গতকাল ৩১ জানুয়ারি শ্রীনগরে বিষয়টিকে কেন্দ্র করে ত্রিমুখী সংঘর্ষে হতাহতের মর্মন্তুদ ঘটনা ঘটেছে। এই সংঘাত সরকারের জন্য মঙ্গলজনক হলো না। অতিউৎসাহী যারা এ ব্যাপারে উৎসাহ যোগাচ্ছেন তারা ভুল পথে ঠেলে দিচ্ছেন।
আমাদের পূর্তমন্ত্রী আড়িয়াল বিলে নতুন বিমানবন্দর তৈরি করার ব্যাপারে নাকি জোরেশোরে সমর্থন করছেন। সব তথ্য জানা থাকলে তিনি এমনভাবে সমর্থন করতেন না। নতুন বিমানবন্দর তৈরি করতে বিলের ২৫ হাজার একর নিচু জমি অধিগ্রহণ করে ভরাট করতে হবে। প্রধানমন্ত্রী বারবার বলেছেন, নিচু জমি ভরাট করা যাবে না। তবে ২৫ হাজার একরের মতো বিশাল এলাকা কেন অহেতুক ভরাট করা হবে? পূর্তমন্ত্রী 'ভূমিদস্যু' বলে একটি জনপ্রিয় কথা চালু করেছেন। এবার আড়িয়াল বিলের ২৫ হাজার একর নিচু জমি ভরাট করে সরকারই ভূমিদস্যুর ভূমিকায় নেমে পড়েছে। এত জমি অধিগ্রহণ করলে কত লাখ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে? আমাদের প্রধানমন্ত্রীর মানুষের প্রতি দয়ামায়া আছে, তা দেশবাসী ভালো করেই জানে। যেখানে কুর্মিটোলা বিমানবন্দর দিয়ে আগামী ৩০ বছর স্বচ্ছন্দে চলতে পারবে, সেখানে লাখ লাখ লোককে ক্ষতিগ্রস্ত করতে তিনি অবশ্যই চাইবেন না বলেই আমার বিশ্বাস। এমন বিশ্বাসের কারণ, আমি তো তাঁকে ঘনিষ্ঠভাবেই জানি। আবার পূর্তমন্ত্রীর কথায় ফিরে আসা যাক। তিনিও নির্লোভী একজন ভালো মানুষ। তিনি সম্ভবত মনে করেছেন, নতুন একটি বিমানবন্দর যখন তৈরি করতেই হবে, তবে সেটা নিজ এলাকায় হলে এর সুফল ভোগ করবে তাঁরই এলাকাবাসী। অথচ তিনি জানেনই না যে নতুন বিমানবন্দর তৈরি করার প্রয়োজন অদূর ভবিষ্যতে অবশ্যই নেই।
কয়েক দিন আগে ঘোরতর আওয়ামীপন্থী বলে পরিচিত ১০ থেকে ১২ জন বিশিষ্ট ব্যক্তির এক ঘরোয়া আসরে আমার উপস্থিত থাকার সুযোগ হয়েছিল। সেখানে উপস্থিত ছিলেন সাবেক সচিব, রাষ্ট্রদূত, সাংবাদিক, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পর্যায়ের মানুষ। দেখলাম, এমন প্রজ্ঞাবান সব ব্যক্তিই নতুন বিমানবন্দর নির্মাণের উদ্যোগের প্রতি বেশ কঠোর ভাষায় সমালোচনা করছেন। একজন তো রসিকতা করে বললেন, 'বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনো দশহাতি শাড়ির মতো। একদিকে টেনে শরীর ঢাকতে গেলে, শরীরের অন্য অংশ উদোম হয়ে যায়। আমাদের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে দাস-শ্রমিকদের পর্যায়ের অদক্ষ শ্রমিকদের বিদেশে পাঠানোর জন্য ডা. দীপু মনি ও ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন বিভিন্ন দেশে ছোটাছুটি করে বেড়াচ্ছেন।'
সব শেষে প্রধানমন্ত্রীকে অনুরোধ করব, নতুন বিমানবন্দর তৈরি করা কতটা জরুরি_তা জানার জন্য আপনার পরিচিত ও আপনার প্রতি একান্ত বিশ্বস্ত পাইলটদের ডেকে পাঠান। আপনার ওপর আমাদের আস্থা আছে। সব কিছু জানতে পারলে নতুন বিমানবন্দর নির্মাণে আপনার দেওয়া অনুমোদন আপনি নিজেই প্রত্যাহার করবেন। পাঁচ বছর পরও আপনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকারকে আমরা ক্ষমতাসীন দেখতে চাই।

লেখক : অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন, সাবেক বৈমানিক ও কথাসাহিত্যিক

No comments

Powered by Blogger.