কল্পকথার গল্প-অন্ধকার ও অ্যালান পোর গল্প by আলী হাবিব

আবহাওয়া ভালো যাচ্ছে না। সকালে মেঘে ঢাকা আকাশ, দুপুরে বৃষ্টি। আবার দুপুরে বৃষ্টি তো রাতে গরম! গরমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে লোডশেডিং। এই আসে, এই যায়। লোডশেডিং নামের ব্যাপারটি নাকি রুটিন মেনে ঘটে। তেমনটি কিন্তু ঘটছে না। রেন্টাল, কুইক রেন্টাল- কোনো কিছুতেই কাজ হচ্ছে না।


উৎপাদন বেড়েছে, সেটা নাকি চোখে দেখা যাচ্ছে না। আবার এমনও তো হতে পারে, দেখার যে চোখ দরকার, সেটা আমাদের নেই। আমরা কি তাহলে অন্ধ হয়ে গেলাম?
তবে আবহাওয়ার পূর্বাভাস না জেনেও বলে দেওয়া যায়, গরম আরো বাড়বে। অন্তত মে মাসজুড়েই আবহাওয়া গরম থাকবে। আবহাওয়াবিদদের হিসাবের খাতায় নানা ধরনের বায়ু আছে। একেক বায়ুর সঙ্গে একেক ধরনের আবহাওয়ার যোগ। ওই যে গানে আছে না, 'এক ফালি মেঘ ভেসে এলো আকাশে...', সে রকম কোনো মেঘে ঝড়, কোনো মেঘে বৃষ্টি আসে। কোনো বাতাসে ভেসে আসে শীত। শীতের তীব্রতা বাড়ে এই বাতাসে ভর করেই। আবহাওয়াবিদরা বলেন শৈত্যপ্রবাহ। তাপপ্রবাহে বাড়ে গরম। এই প্রবাহের সঙ্গে নতুন আরেক প্রবাহ রাজধানীতে শুরু হয়ে গেছে। তার প্রভাবে গরম বাড়বে। এটুকুতেই থেমে থাকলে চলবে না। গরমের সঙ্গে আরো অনেক কিছুই বাড়বে এই প্রবাহের কারণে। এই নতুন হাওয়া কিংবা বাতাস, এটা হচ্ছে ভোটের হাওয়া। রাজধানীতে বিভক্ত সিটি করপোরেশনের নির্বাচনী হাওয়া বইতে শুরু করেছে। কাজেই রাজধানীর আবহাওয়া নির্বাচন শেষ না হওয়া পর্যন্ত গরমই থাকবে।
ভোট যখন আসে তখন প্রার্থীদের নানা উপলক্ষ লাগে। জনগণকে সালাম ও শুভেচ্ছা জানানোর জন্য উপলক্ষ খুঁজে বের করতে হয়। সিটি করপোরেশন নির্বাচন সামনে রেখে সেই মওকা হাতের মুঠোয় এনে দিল বাংলা নববর্ষ। বলা চলে নির্বাচনী প্রচারের হালখাতা হয়ে গেল। যাঁর যেমন সাধ্য, তিনি সেভাবে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। এত দিন পোস্টার-ফেস্টুন শোভা পাচ্ছিল রাজধানীজুড়ে। নির্বাচন কমিশন একেবারেই বেরসিক। বলে দিয়েছে, এসব নাকি বিধিসম্মত নয়। কাউকে কাউকে এসব সরিয়ে ফেলতে হয়েছে।
নতুন বছরের প্রথম দিন চলে গেল। প্রচণ্ড গরম উপেক্ষা করে মানুষ বাড়ির বাইরে এসেছে। বরণ করে নিয়েছে নতুন বছরকে। বৈশাখের প্রথম দিনে লোডশেডিংয়েরও হালখাতা হয়ে গেছে। তো, এই লোডশেডিংয়ের মধ্যেও বিড়াল খোঁজা হচ্ছে। সেই বিড়াল আবার কালো। বিড়ালকে আমরা নিরীহ প্রাণী হিসেবেই জানি। গৃহপালিত এই প্রাণীটি ইঁদুর ধরে আমাদের উপকার করে। মাছ-ভাত-দুধ- যা দেওয়া যায়, খায়। খেয়েদেয়ে চুপচাপ বসে থাকে। এই বিড়াল, তা সে সাদা কিংবা কালো, যে রঙেরই হোক না কেন- সে কি ক্ষতির কারণ হতে পারে? এ নিয়ে এডগার অ্যালান পোর একটা গল্প আছে। গল্পের নাম 'দ্য ব্ল্যাক ক্যাট'।
এক ভদ্রলোকের একটা কালো রঙের বিড়াল ছিল। ভদ্রলোক বিড়ালটিকে ভালোবাসতেন। কোলে নিতেন, আদর করতেন। প্লুটো নামের এই বিড়ালটিই পরে তাঁর জন্য কাল হয়ে দেখা দিল। এই ভদ্রলোক এক সময় নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়লে বিড়ালটি ভদ্রলোককে এড়িয়ে চলতে শুরু করে। ভদ্রলোক রাতে বাড়িতে ফিরে বিড়ালটিকে কোলে নিতে গেলে সে আর কাছে ভিড়তে চায় না। দূরে দূরে থাকে। ভদ্রলোক এক রাতে বাড়িতে ফিরে জোর করে কোলে তুলে নিতেই বিড়ালটি আঁচড়ে-কামড়ে একসা করে দিল। ভীষণ রাগ হলো ভদ্রলোকের। তিনি ভালোবেসে কোলে নিতে গেছেন, সেই বিড়াল কি না এমন কাণ্ড ঘটাল! তাঁর পকেটে ছিল একটা ছোট ছুরি। তিনি ছুরি দিয়ে বিড়ালটির চোখ তুলে নিলেন। মনিবের এই আচরণ বিড়ালটিকে একেবারে বদলে দিল। সে আর মনিবের ছায়াও মাড়ায় না। এতে ভদ্রলোকের রাগ আরো বেড়ে গেল। তিনি এক সকালে বিড়ালটি ধরলেন। নিয়ে গেলেন বাগানে। সেখানে বিড়ালটির গলায় দড়ি বেঁধে একটি গাছে ঝুলিয়ে দিয়ে ঘরে ফিরে এলেন। ভাবখানা এমন, আপদ বিদায় করে দিয়েছেন। কী কাণ্ড, সে রাতেই ভদ্রলোকের বাড়িতে আগুন লেগে গেল। ভদ্রলোক তখন গভীর ঘুমে। কেউ যেন তাঁকে জোর করে ঠেলে ঘুম ভাঙিয়ে দিল। তিনি ঘুম থেকে উঠে স্ত্রী ও বাড়ির কাজের লোকদের ডেকে তুললেন। নিরাপদ জায়গায় চলে গেলেন। গল্পটা ১৮৪৩ সালের ১৯ আগস্ট 'স্যাটারডে ইভনিং পোস্ট' কাগজে ছাপা হয়েছিল। সে সময় নিশ্চয় অগি্ননির্বাপণ ব্যবস্থার এত উন্নতি হয়নি। বাড়িটি আগুনে পুড়ে গেল।
পরদিন সকালে ভদ্রলোক বাড়িতে ফিরলেন। দেখলেন পুরো বাড়ি আগুনে পুড়ে গেছে। শুধু একটা দেয়ালে আগুন লাগেনি। বিস্ময়ের সঙ্গে তিনি লক্ষ করলেন, সেই দেয়ালে একটি ছবি। একটি বড় ধরনের কালো বিড়াল, যার গলায় দড়ি দিয়ে বাঁধা। ছবি দেখলে মনে হবে, দড়িতে বিড়ালটা ঝুলছে। তাঁর মনে হলো, বাগানের বিড়ালটিকে কেউ ঠেলে বাড়ির ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়েছে। ভদ্রলোক বাড়িটা নতুন করে তৈরি করলেন। নতুন বাড়িতে উঠতেই তিনি দেখতে পেলেন, এখানেও কোত্থেকে একটি কালো বিড়াল এসে হাজির হয়েছে। বিড়ালটি ঠিক সেই আগের কালো বিড়ালটির মতো। সেই একই রং, একই আকৃতি। আগের বিড়ালটির মতোই সে ভদ্রলোকের দিকে এগিয়ে গেল। ভদ্রলোক প্রথমে একটু ভয় পেলেও দেখলেন, বিড়ালটি তাঁর পায়ের কাছে চলে এসেছে। এটা দেখে তাঁর মনে একটু মায়ার উদ্রেক হলো। তিনি বিড়ালটিকে কোলে তুলে নিতে যাবেন, অমনি বিড়ালটি তাঁর পায়ে ধাক্কা দিয়ে বেরিয়ে গেল। ভদ্রলোক গেলেন রেগে। তিনি একটি কুড়াল হাতে তুলে নিলেন। বিড়ালটিকে মারতে যাবেন, পারলেন না। ভদ্রলোকের স্ত্রী বাধা দিলেন। এতে ভদ্রলোকের ক্রোধ আরো বেড়ে গেল। তিনি স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়া শুরু করে দিলেন। একপর্যায়ে ভদ্রলোক কুড়ালের আঘাতে নিজের স্ত্রীকে খুন করে ফেললেন। ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর তাঁর খেয়াল হলো, এটা তিনি কী করেছেন! তাড়াতাড়ি কিছু ইট কিনে তিনি বাড়িতে গেলেন। দেয়ালে একটি গর্ত করে সেই গর্তে স্ত্রীর মৃতদেহ ঢুকিয়ে দিয়ে বাইরে থেকে ইট গেঁথে দিলেন। পুলিশকে জানালেন, তিনি তাঁর স্ত্রীকে খুঁজে পাচ্ছেন না। পুলিশ এলো, যথাবিহিত তদন্ত শেষ করে ফিরে গেল। কী আশ্চর্য, সেই থেকে নতুন বিড়ালটিও উধাও! সমস্যা দেখা দিল রাতে। ভদ্রলোক ঘুমাতে পারেন না। রাতে কেবলই তাঁর মনে হয়, কোথাও চিৎকার হচ্ছে। তিনি পুলিশকে ডেকে ঘটনা বললেন। পুলিশ জানতে চাইল, কোত্থেকে চিৎকার আসছে। তিনি দেয়ালের জায়গাটা দেখিয়ে দিতেই দেয়াল ভাঙল পুলিশ। বেরিয়ে এলো স্ত্রীর মৃতদেহ।
অতঃপর? যা ঘটার তা-ই ঘটল। অ্যালান পোর কালো বিড়ালের গল্প এখানেই শেষ। আমাদের গল্পের শুরু। গরম বাড়ছে। লোডশেডিং ঠেকানো যাচ্ছে না। যখন-তখন আলো বন্ধ। আমরা কি অন্ধকারের দিকে যাচ্ছি?
লেখক : সাংবাদিক
habib.alihabib@yahoo.com

No comments

Powered by Blogger.