ডিসিসি নির্বাচন তিন মাসের জন্য স্থগিত

ঢাকা সিটি করপোরেশনের (ডিসিসি) নির্বাচনী কার্যক্রম তিন মাসের জন্য স্থগিত করেছেন হাইকোর্ট। একই সঙ্গে নির্বাচনের তিন মাস আগে ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা এবং আইনানুযায়ী এ সময়ের মধ্যে কাউন্সিলরের সংখ্যা ও ওয়ার্ডের সংখ্যা নির্ধারণ করতে নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।


বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী ও বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন সেলিমের বেঞ্চ গতকাল সোমবার এ আদেশ দেন। এ ছাড়া আইনের কয়েকটি ধারার যথাযথ বিধান অনুসরণ করে নির্বাচন অনুষ্ঠানের নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না- জানতে চেয়ে রুল জারি করা হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও স্থানীয় সরকার সচিবসহ আটজনকে দুই সপ্তাহের মধ্যে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।
আদেশের পর রিটকারীর আইনজীবী মনজিল মোরসেদ বলেন, আদালত নির্বাচনী সব কাজ স্থগিত ও রুল জারি করেছেন। এখন ডিসিসি নির্বাচন করতে হলে ইসিকে আইন অনুসরণ করে নতুন তফসিল ঘোষণা করতে হবে।
আদেশের পর নির্বাচন কমিশনের (ইসি) আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বলেন, ইসির সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, 'এই মুহূর্তে নির্বাচন যাতে বন্ধ না হয়, তার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছি। কিন্তু আদালত রিটকারীর আবেদন মঞ্জুর করে রুল জারি করেছেন এবং স্থগিতাদেশ দিয়েছেন। আদালতে বলেছি, যেহেতু নোটিফিকেশন করে সীমানা নির্ধারণ করা হয়েছে, সেহেতু সীমানা-নির্ধারণী কর্মকর্তা নিয়োগ না দিলেও হবে। ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা একটি চলমান প্রক্রিয়া। এ জন্য ভোট বন্ধ হতে পারে না।'
আইনে প্রশাসক নিয়োগের পর ১৮০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করার বাধ্যবাধকতা আছে। অতএব এ পরিস্থিতিতে করণীয় কী জানতে চাইলে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, যেহেতু বিষয়টি আদালতে চলে এসেছে। তাই ওটা মান্য করার বাধ্যবাধকতা নেই। বিষয়টি আদালত দেখবে।
গতকাল দুপুর ১২টা ৪২ মিনিটে রিট আবেদনের ওপর শুনানি শুরু হয়। শুরুতেই নির্বাচন কমিশনের আইনজীবী ড. শাহদীন মালিক বলেন, স্থানীয় সরকারকে এ রিটে পক্ষভুক্ত করা হয়নি। এ পর্যায়ে মনজিল মোরসেদ আবেদন সংশোধন করে দেওয়ার কথা জানান। শাহদীন মালিক বলেন, স্থানীয় সরকার পরিষদের সীমানা নির্ধারণের বিষয়ে ইসির দায়িত্ব নেই। ইসির দায়িত্ব হচ্ছে সংসদ নির্বাচন করা। স্থানীয় সরকার বিষয়ে সীমানা নির্ধারণের ক্ষমতা ইসিকে দেওয়া হয়নি।
এ পর্যায়ে আদালত বলেন, 'ইসি একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। সংবিধান ইসিকে নির্বাচনের বিষয়ে সব দায়িত্ব দিয়েছে। সীমানা পুনর্নির্ধারণ হচ্ছে নির্বাচনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমরা মনে করি, নির্বাচনের ক্ষেত্রে সরকারের চেয়ে ইসির দায়িত্ব অনেক বেশি। সীমানা পুনর্নির্ধারণ করা হয়নি। এ বিষয়ে আপনাদের বক্তব্য কী?'
জবাবে শাহদীন মালিক বলেন, স্থানীয় সরকার একটি গেজেট করেছে। এতে কোন এলাকা কোথায়, বলা আছে। আইনে বলা হয়েছে, সরকার সীমানা পুনর্নির্ধারণ করবে। তিনি বলেন, সংবিধান ইসিকে সংসদ ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ক্ষমতা দিয়েছে।
আদালত বলেন, সীমানা পুনর্নির্ধারণের ক্ষমতা দেওয়া হলো সরকারকে। আর নির্বাচন করার ক্ষমতা ইসির- এটা কি পরস্পরবিরোধী নয়? কারণ সীমানা পুনর্নির্ধারণ নির্বাচনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে পারে।
একপর্যায়ে আদালত অ্যাটর্নি জেনারেলকে উদ্দেশ করে বলেন, 'সীমানা পুনর্নির্ধারণ আপনার সমস্যা। ইসির নয়। আপনার বক্তব্য কী?
জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন আইনের মাধ্যমে সৃষ্ট দুটি সিটি করপোরেশন। আইনেই সরকারকে বিভক্তীকরণের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এ কাজ ইসির নয়, সরকারের। রিট আবেদনকারী যে বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন তা নতুন সিটি করপোরেশনের জন্য প্রযোজ্য। নতুন সিটি করপোরেশন ঘোষিত হলে কিভাবে সীমানা নির্ধারণ করতে হয়, তা আইনে বলা আছে।'
আদালত বলেন, উত্তর ও দক্ষিণ দুটি সিটি করপোরেশন গঠন করা হয়েছে, সেটা কি নতুন নয়?
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, উত্তর ও দক্ষিণ নতুন হলেও এটি বিদ্যমান সিটি করপোরেশনের অংশ। বিষয়টি সেভাবেই বিবেচনা করতে হবে।
আদালত আরো বলেন, শুধুই দুটি নতুন সিটি করপোরেশন হয়েছে তাই নয়, কাউন্সিলরদের সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়নি। এ কথার কোনো জবাব দেননি অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম।
অতঃপর আদালত রিটকারীর আইনজীবী মনজিল মোরসেদকে উদ্দেশ করে বলেন, অ্যাটর্নি জেনারেল বলেছেন, এটা তো নতুন সিটি করপোরেশন নয়। আপনার বক্তব্য কী?
মনজিল মোরসেদ বলেন, 'অ্যাটর্নি জেনারেল আদালতকে ভুল ব্যাখ্যা দিচ্ছেন। এটা তাঁর ব্যাখ্যা। সরকারের পক্ষে তাঁকে বলতেই হবে। আমি নির্বাচন বন্ধের পক্ষে নই। কিন্তু যা করতে হবে তা আইন মেনেই করতে হবে।'
এরপর ড. শাহদীন মালিক বলেন, সংশোধিত আইনের মাধ্যমে সিটি করপোরেশন বিভক্ত করা হয়েছে। আদালত বলেন, সংশোধিত আইনে বলা হয়নি যে, আগের আইন বাতিল করা হলো। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় দেখতে হবে। সংবাদপত্রে রিপোর্ট হয়েছে, নতুন প্রজন্মের পাঁচ লাখ ভোটার অন্তর্ভুক্ত হতে পারেনি। কেন ভোটার তালিকা হালনাগাদ করেননি?
জবাবে শাহদীন মালিক বলেন, এটা সংবাদপত্রের প্রতিবেদন। রিট আবেদনের বিষয় নয়।
আদালত বলেন, 'বাংলাদেশের বিশ্বাসযোগ্য শীর্ষস্থানীয় একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকার (ইত্তেফাক) প্রতিবেদন। আপনি (শাহদীন) ইসিকে মোবাইল ফোনে জিজ্ঞাসা করুন, সর্বশেষ কবে হালনাগাদ করা হয়েছে।'
শাহদীন মালিক তখন আদালত থেকে বেরিয়ে যান। কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে বলেন, প্রতিবেদনটি সঠিক। যিনি লিখেছেন, তিনি আদালতেই আছেন। এরপর আদালত ইত্তেফাকের আইন, সংবিধান ও নির্বাচন কমিশনবিষয়ক সম্পাদক সালেহউদ্দিনের বক্তব্য শোনেন।
এরপর অ্যাটর্নি জেনারেলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে আদালত বলেন, তফসিল ঘোষণার পর আদালত ইসির কার্যক্রমের ওপর হস্তক্ষেপ করে না। কিন্তু এখানে অনেকগুলো প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। যেমন সীমানা নির্ধারণ কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়নি, ভোটার তালিকা হালনাগাদ করা হয়নি, কাউন্সিলরির সংখ্যা নির্ধারণ করা হয়নি, যথাযথভাবে ওয়ার্ড বিভক্তীকরণ হয়নি। আপনি (মাহবুবে আলম) কি মনে করেন না যে, এটা নতুন সিটি করপোরশেন? জবাবে মাহবুবে আলম হ্যাঁ সুচক জবাব দিয়ে বলেন, দুটি সিটি করপোরেশন করায় এটি নতুন বলেই ধরে নেওয়া যায়। আদালত বলেন, যদি তাই হয়, তাহলে আইনের এই গুরুত্বপূর্ণ বিধান যে মান্য করা হয়নি, তা আদালত হালকাভাবে দেখতে পারেন না। এটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়- প্রায় আট ভাগের এক ভাগ ভোটার বাদ রেখে কিভাবে নির্বাচন হয়?
এরপর আদালত আদেশ দেন।
সিইসির প্রতিক্রিয়া : রায়ের বিষয়ে সিইসি কাজী রকিবউদ্দীন তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় বলেন, 'আদালতের নির্দেশনা পাওয়ার পর কমিশন এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে। দেখতে হবে রায়ে কী বলা আছে, আর আইনে কী আছে।'
সীমানা বিন্যাস না হওয়ার দায় কার- এ প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, 'আপনারা আইন পড়ে বুঝে নিন, দায়টা কার। ভোটার তালিকা হালনাগাদ সম্পর্কে তিনি বলেন, 'সে বিষয়েও আদালতের নির্দেশনা আমাদের দেখতে হবে।'
৩৩তম বিসিএস পরীক্ষার কার্যক্রম
তিন সপ্তাহ স্থগিত

No comments

Powered by Blogger.