মৌলবাদ বনাম গণতান্ত্রিক চেতনা by হায়দার আকবর খান রনো

হঠাৎ করে ধর্মব্যবসায়ী মৌলবাদী গোষ্ঠীর আস্ফালন খুব বেশি মাত্রায় বেড়ে গেছে। হঠাৎ করেই বা বলি কী করে, এরা বরাবরই যত রকম পশ্চাৎপদ ধারণা, নারীবিদ্বেষী মনোভাব ও বাঙালি সংস্কৃতিবিরোধী মতবাদ প্রচারে বেশ তৎপর ছিল। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষ সাধারণভাবে ধর্মভীরু হলেও গণতান্ত্রিক চেতনাসম্পন্ন।


সে জন্য এই কট্টর মৌলবাদীরা কখনো হালে পানি পায়নি। এদেরই একটি অংশ 'আল্লাহর আইন' প্রতিষ্ঠার নামে বাংলাদেশের সংবিধান, বিচারব্যবস্থা_সব কিছুর বিরুদ্ধে তথাকথিত 'জিহাদ' ঘোষণা করে বিচারক, আইনজীবী ইত্যাদি নিরীহ মানুষকে হত্যা করে বর্বরতার চরম নিদর্শন তৈরি করেছিল। এখন তাদের আস্ফালনের বিষয়বস্তু হচ্ছে তিনটি। ১. ফতোয়ার অধিকার; ২. নারীনীতি বাতিল এবং ৩. শিক্ষানীত বাতিল।
শিক্ষানীতিতে যেটুকু অসাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মনিরপেক্ষতার ছোঁয়া আছে সেটুকুতেই তাদের আপত্তি। এই শিক্ষানীতি আমার বিবেচনায় তুলনামূলকভাবে কিছুটা ভালো হলেও এবং শিক্ষামন্ত্রীর দৃষ্টিভঙ্গির প্রশংসা করলেও আমাদের সমালোচনাও আছে। সমালোচনার বিষয় তিনটি। এক. শিক্ষামন্ত্রী ও কমিশন শেষ পর্যন্ত বেশ কিছু ক্ষেত্রে ধর্মীয় মৌলবাদের সঙ্গে আপস করেছেন; দুই. একমুখী শিক্ষানীতি অনুসরণ করা হয়নি এবং তিন. শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ ও শ্রেণীবৈষম্য এখনো বহাল আছে।
মৌলবাদীদের আপত্তির কারণ সম্পূর্ণ ভিন্ন। শিক্ষানীতির মধ্যে যে অসাম্প্রদায়িক ও ধর্মনিরপেক্ষ বিষয় আছে, তাতেই তাদের আপত্তি। এই আপত্তিকে একেবারেই গুরুত্ব না দিয়ে তাদের ভালো করে বুঝিয়ে দেওয়া দরকার যে বর্তমান সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা হচ্ছে অন্যতম রাষ্ট্রীয় মূলনীতি। পাকিস্তান আমলে ইসলামী মৌলবাদ ও পাকিস্তানি ভাবধারার বিরুদ্ধে অনেক সংগ্রাম করেই গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ চেতনা বিজয় লাভ করেছিল। সেই চেতনার ভিত্তিতে স্বাধীনতা অর্জনের জন্য এই দেশের মানুষকে এক মহান বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধ পর্যন্ত করতে হয়েছিল। মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে যে সংবিধান রচিত হয়েছিল, তাতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনারই প্রতিফলন ঘটেছিল। পরবর্তী সময়ে সেই সংবিধানে অনেক কাটাছেঁড়া করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় মূলনীতির জায়গা থেকে ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রের ধারণা বাতিল করা হয়। এই বাতিলের কাজটিই ছিল অসাংবিধানিক। তাই হাইকোর্টের রায়ের মধ্য দিয়ে আবার যে রাষ্ট্রীয় মূলনীতি ফিরে এসেছে, তাতে ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্র ফিরে এসেছে। এমনকি সংবিধান অনুসারে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল এবং সংগঠনও নিষিদ্ধ। সরকার সমাজতন্ত্রের নীতি তো মানছেই না, এমনকি ধর্মনিরপেক্ষতার প্রশ্নে অনেক দোদুল্যমানতা দেখাচ্ছে। এখনো সংবিধানে লেখা আছে যে ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম। এটা কি সংবিধানের মূলনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক ও এর পরিপন্থী নয়? কিভাবে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম হতে পারে? সরকার যদি কিছু মৌলবাদীর আস্ফালনের কারণে মূল আদর্শ থেকে পিছু হটে আসে তাহলে সরকারও একই অপরাধে অপরাধী বলে চিহ্নিত হবে।
ধর্মব্যবসায়ী মৌলবাদীদের আরেক দাবি হলো, ফতোয়ার অধিকার চাই। এ ব্যাপারে অনেক আগেই বিচারপতি গোলাম রব্বানী ও বিচারপতি নাজমুন নাহারের এক হাইকোর্ট বেঞ্চ সুয়োমোটোভাবে একটি ফতোয়ার মামলা গ্রহণ করে রায় দিয়েছিলেন যে সেই ধরনের ফতোয়া দেওয়া নিষিদ্ধ, যা বিচারের রায়ের মতো কার্যকর হবে। এটা প্রায় এক দশকের পুরনো ঘটনা। এখন সেই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে মামলা চলছে। বিষয়টি বিচারাধীন হলেও সহজ বুদ্ধিতে যেটা বুঝি তা হলো, ফতোয়া মানে যদি ধর্মবিষয়ক কোনো মতামতের ব্যাপার হয়, তাহলে সে স্বাধীনতা সবারই থাকতে পারে। কিন্তু যে ফতোয়া কার্যকর হবে, অর্থাৎ বিশেষ অপরাধের জন্য বিশেষ ব্যক্তিকে বিশেষ শাস্তি প্রদান ইত্যাদি, তা কি রাষ্ট্র কর্তৃক নির্দিষ্ট বিচারব্যবস্থার বাইরে হতে পারে? আমরা দেখেছি, সিলেটের এক গ্রামে জনৈক মৌলভীর ফতোয়ার পরিপ্রেক্ষিতে নূরজাহানকে অর্ধেক মাটিতে পুঁতে পাথর নিক্ষেপ করে তাকে হত্যা করা হয়েছিল। এরপর কত হতভাগ্য নারীর শরীরে চাবুক মারা, দোরবা মারার ঘোষণা এসেছে। এর সঠিক পরিসংখ্যান দেওয়া সহজ নয়। রাষ্ট্রের কোন আইনের বলে বিচারের দায়িত্ব তুলে নিতে পারে প্রতিষ্ঠিত কোর্টের বাইরে কোনো ব্যক্তি? গ্রাম্য সালিস বলে একটা কথা অবশ্য আছে। তা হলো, দুই প্রতিপক্ষের মধ্যে সমঝোতার প্রচেষ্টা। কিন্তু তা মান্য করা বাধ্যতামূলক নয়। অথচ ফতোয়া হচ্ছে প্রতিষ্ঠিত আইন ও বিচারব্যবস্থার বাইরে ধর্মের নামে আইন খাটিয়ে কোনো ব্যক্তিবিশেষ দ্বারা রায় প্রদান এবং তা কার্যকর করা। আর এটা যদি চলতে থাকে, তাহলে আমরা কি মধ্যযুগীয় বর্বরতার যুগে অথবা তালেবানীয় শাসনব্যবস্থায় চলে যাব না? এমনকি মধ্যযুগেও একটি বিধিসম্মত বিচারব্যবস্থা ছিল। ছিল কাজির বিচার। এখন অনেক দোষত্রুটি সত্ত্বেও একটি বিচারব্যবস্থা আছে। বিচারপদ্ধতির বিধান লিপিবদ্ধ আছে। বিচারকরা রাষ্ট্র কর্তৃক নিযুক্ত এবং সব বিষয়ের ওপর আইনও আছে। আইন জাতীয় সংসদে পাস এবং সংবিধানের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হতে হবে। যে কেউ, তিনি ধর্ম সম্পর্কে যতই পণ্ডিত হোন না কেন, তাঁর অধিকার নেই স্বহস্তে বিচার তুলে নেওয়ার। আর সে ধরনের রায় বা ফতোয়া যারা কার্যকর করবে তারা রাষ্ট্রীয় আইনের চোখে অপরাধী বলে গণ্য হবে।
এটি খুবই সাধারণ কথা। তবু ফতোয়াবাজদের দৌরাত্ম্য বেড়েই চলেছে। এটা দুর্ভাগ্যজনক যে ২০০৬ সালের ডিসেম্বর মাসে শেখ হাসিনার পক্ষ হয়ে তদানীন্তন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল একটি মৌলবাদী সংস্থার সঙ্গে যে পাঁচ দফা চুক্তি করেছিলেন, তার মধ্যে একটি ছিল ফতোয়া দেওয়ার অধিকার-সংক্রান্ত। অবশ্য পরে শেখ হাসিনা ওই চুক্তিকে বাতিল বলে ঘোষণা করেছিলেন। যা-ই হোক, বড় দল আওয়ামী লীগের তরফ থেকে মৌলবাদীদের সঙ্গে এ রকম আপস এবং বিএনপির মতো আরেকটি বড় দলের মৌলবাদীদের সঙ্গে জোট বাঁধা_এসব কারণে পশ্চাৎপদ, সভ্যতাবিরোধী, নারীবিদ্বেষী শক্তি এতটা আশকারা পেয়ে আসছে। সাময়িক রাজনৈতিক ফায়দা লাভের জন্য বড় রাজনৈতিক দলগুলো যদি এমন আচরণ করে, তাহলে এর পরিণাম হবে ভয়াবহ।
সব ধর্মের মৌলবাদী মতাদর্শ হচ্ছে চরমভাবে নারীবিদ্বেষী। ইসলামী মৌলবাদ, হিন্দু মৌলবাদ ও খ্রিস্টীয় মৌলবাদ_সবই গণতান্ত্রিক চেতনাবিরোধী এবং নারীবিদ্বেষী। যখন এই দেশে রাজা রামমোহন রায় সতীদাহের মতো বর্বরব্যবস্থা রোধের জন্য সচেষ্ট ছিলেন, তখনো কিন্তু গোঁড়া হিন্দু মৌলবাদীরা এর বিরোধিতা করেছিল। ঊনবিংশ শতাব্দীতে ব্রিটিশ আমলে কলকাতা হাইকোর্ট এক রায়ে এক বিধবা নারীকে স্বামীর সম্পত্তিতে অধিকার দিয়েছিলেন। সেই বিধবার সতীত্ব নাকি প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। তখন হিন্দু সমাজপতিরা হায় হায় করে উঠেছিল। ভগবান শঙ্করাচার্য নাকি বলেছিলেন, নরকের দ্বার নারী।
বাইবেলে বলা হয়েছে, নারী হচ্ছে ৎড়ড়ঃ ড়ভ ধষষ বারষ. মহান সাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, '... যে ধর্মের বুনিয়াদ গড়িয়াছে আদিম জননী ইভের পাপের উপর, যে ধর্ম সংসারের সমস্ত অধঃপতনের মূলে নারীকে বসাইয়া দিয়াছে, সে ধর্মকে সত্য বলিয়া যে কেহ অন্তরের মধ্যে বিশ্বাস করিয়াছে, তাহার সাধ্য নয় নারী জাতিকে শ্রদ্ধার চোখে দেখে।'
বেগম রোকেয়া যখন মুসলিম মেয়েদের জন্য শিক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন, তখনো ইসলামী মৌলবাদীরা 'ইসলাম গেল' বলে চিৎকার করেছিল। ফতোয়া যে শুধু নারীর বিরুদ্ধে হয় তা-ই নয়, রাজনৈতিকভাবেও ব্যবহৃত হয়। ১৯৫৪ সালে নির্বাচনের সময় তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের প্রায় সব পীর সাহেব যৌথভাবে ঘোষণা দিয়েছিলেন যে মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে ভোট দিলে নাকি আপনা থেকেই বিবি তালাক হয়ে যাবে। সেটাও কি এক ধরনের ফতোয়া নয়? ইসলামী মৌলবাদ নারীর প্রতি কী পরিমাণ অবিচার ও অত্যাচার করে, তা আফগানিস্তানে তালেবান শাসনের উদাহরণ থেকেই জানা যায়।
ইসলাম ধর্মে পুরুষের চার বিয়ের বিধান আছে, কিন্তু নারীর কাছ থেকে বিবাহিত স্বামীর প্রতি পরিপূর্ণ আনুগত্য দাবি করা হচ্ছে। এটা কি আজকের যুগে গণতান্ত্রিক চেতনার বিরোধী নয়? এখন যদি মৌলবাদীরা চার বিয়ের দাবি করে পুরুষের লালসার প্রতি সম্মতি দেয় এবং নারীকে বাধ্য করে অপমানিত জীবন বেছে নিতে, তাহলে আর যা-ই হোক তাকে সভ্য বলে গণ্য করা যাবে না। তাই বহু মুসলিম দেশেও এখন এক স্বামী এক স্ত্রীর বিধান চালু হয়েছে। আইয়ুব খানের অনেক দোষ থাকলেও ইসলামিক পারিবারিক আইনের সংশোধন করে যতটুকু আধুনিক করেছিলেন, তা অভিনন্দনযোগ্য ছিল। খেয়াল করবেন, তখনো মওদুদীর নেতৃত্বাধীন জামায়াতে ইসলামী এর বিরোধিতা করেছিল। অর্থাৎ চার বিয়ের অধিকার চাই।
এই তো হলো মৌলবাদীদের দাবি। এখন তারা নারীনীতির এবং সম্পত্তিতে পুত্র-কন্যার সম-অধিকারের বিরুদ্ধে কোমর বেঁধে নেমেছে। নারী-পুরুষের সমতার পক্ষে যেকোনো পদক্ষেপের তারা বিরোধিতা করবেই। পরবর্তী সংখ্যায় নারীনীতি প্রসঙ্গে আলোচনার ইচ্ছা রাখি। এখানে এটুকু বলে রাখি যে মৌলবাদীদের ধর্মের নামে প্রতারণা, পশ্চাৎপদতা, অন্যায় আবদার ও আস্ফালনের মুখে আমরা যেন গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের জায়গা থেকে সরে না আসি।
লেখক : রাজনীতিক ও কলামিস্ট

No comments

Powered by Blogger.