রম্যকথা-'দৌদ্দে, গা-বাঁচা' by আসিফ ইফতেখার পিয়াস

সৌভাগ্য আমাদের, যারা নিজ চোখে স্বাধীনতা যুদ্ধ দেখেছেন, নিজ হাতে যুদ্ধ করেছেন, তারা আজও আমাদের মাঝে আছেন। কিন্তু তারা যখন একসময় থাকবেন না, তখন ইতিহাসের সঠিক তথ্যের জন্য আমরা কার কাছে যাব? আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেই-বা আমরা কতটুকু জানাতে পারব, যখন আমাদের প্রজন্মই ইতিহাস নিয়ে বিচলিত?


কিছুদিন আগে হঠাৎ করেই আমার এক বন্ধুর একটা ফেসবুক স্ট্যাটাস চোখে A donkey with a load of books is still a donkey (একটা গাধার পিঠে যত খুশি বই চাপিয়ে দেওয়া হোক না কেন, গাধা... গাধাই)। স্ট্যাটাসটা এতটাই ভালো লাগল যে, মনে হলো... 'অনেক কথা যাও যে বলে, কোনো কথা না বলে' গানটা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যেন শুধু আমারই জন্য লিখেছিলেন। কিন্তু আমি যেহেতু গাধা, তাই ধন্দে পড়ে গেলাম। এটা কি প্রশংসা ছিল? নাকি সমালোচনা? আর ধন্দে না পড়েই-বা কী করব বলুন? স্বয়ং সংসদেও যে আজকাল প্রাঞ্জল ভাষার কথাবার্তা অসভ্য বলে মনে হতে শুরু করেছে। কিন্তু শান্তিটা ওখানেই, কারণ এমন কথা যদি একটা গাধার কাছেও 'ইয়ে' শোনায়, বুঝতে হবে, গাধার কথায় কান দিতে নেই। তাই আমার কথায় কান না দিলেও চলবে। আর এখন যদি প্রশ্ন ওঠে, তাহলে আপনাদের সময় নষ্ট করতে আমি কেন লিখছি? তাহলে বলব, কারণ একটাই, গাধা হলেও আমার যে একটা জাত আছে, সেটা প্রমাণ করে তা অক্ষুণ্ন রাখার জন্য।
'দেশপ্রেমিক' শব্দটা একমাত্র মানুষের সঙ্গেই যায়, গাধার সঙ্গে যেতে পারে না। যাওয়া উচিতও নয়। কিন্তু হঠাৎ করে কী যে এক প্রেম আমার মনে জাগল, আমি ভাবলাম একটা স্বাধীন দেশের স্বাধীন মানুষেরা কীভাবে স্বাধীনতা উদযাপন করে, সেটা গাধা হলেও, আমার জানা উচিত। তো যেমন চিন্তা তেমন কাজ! এসে গেল ২৬ মার্চ, মহান স্বাধীনতা দিবস! খুব ভোরেই বেরিয়ে পড়লাম। উদ্দেশ জাতীয় স্মৃতিসৌধ। প্রথমে একটু ভয়ই পেলাম, এত মানুষের ভিড়ে একটা গাধা হেঁটে যাচ্ছে, ভাবলাম এমন দৃশ্য সহ্য না করতে পেরে আবার কেউ কামড়ে না দেয়? কিন্তু নাহ, এ দেশের মানুষ যে মননশীল প্রাণী, আমি তারই পরিচয় পেলাম। বরং দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে তারা ফুল নিয়ে ছুটে চলল স্মৃতিসৌধের দিকে। চারদিকে লাল-সবুজের সমারোহ; এ যেন এক অন্যরকম অনুভূতি। কিন্তু কিছুদূর এগোতেই সবকিছু কেমন যেন বেমানান লাগতে শুরু করল। অনেকেই বিভিন্ন দল ও বিভিন্নজনের নামে স্লোগান দিতে দিতে ক্ষিপ্রগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। প্রথমে মনে হলো, মানুষগুলো বোধহয় তাদের বীর মুক্তিযোদ্ধাদের নামে স্লোগান দিচ্ছে। কিন্তু পরে বুঝলাম ব্যাপারটা তা নয়। কারণ, আরেক দল মানুষ অন্য একজনের নামে আরও জোরে জোরে স্লোগান দিতে দিতে এগিয়ে গেল। এরই মধ্যে কয়েকজন আমার দিকে বেশ বিরক্তির চোখেও তাকাল। আমি বুঝলাম, মানুষের ভিড়ে একটা গাধা হেঁটে যাচ্ছে, এটা অনেকের জন্যই অপমানজনক। তাই আমি নিজ বুদ্ধিতেই রাস্তা ছেড়ে ফুটপাতে উঠে পড়লাম। কিন্তু পানিতে ভেজা স্যাঁতসেঁতে ফুটপাতে পা রাখতেই নাকে যে ঝাঁঝালো গন্ধ পেলাম, বুঝলাম এটা নিশ্চয়ই কোনো গাধারই নির্লজ্জময় জল-বিয়োগের ফলাফল। লজ্জায় আমার মাথা হেঁট হয়ে গেল। বনে-জঙ্গলে করিস ভালো কথা, তাই বলে রাজধানীর ফুটপাতে? এ সময় হঠাৎ দেখি, সেই দুই দলের মানুষ একজন আরেকজনের দিকে হুংকার দিয়ে ফুল ছুড়ে মারছে। প্রথমে মনে করলাম তারা বোধহয় একে অপরকে সম্মান প্রদর্শন করছে। কিন্তু একি, তারা একজন আরেকজনকে লাঠি দিয়ে প্রহার করছে! কোথায় যেন শুনেছিলাম_ জ্ঞানই আলো; কে জানে এটা বোধহয় সেই আলোই হবে। আমি বুঝলাম, লাঠি দিয়ে মানুষ শুধু আমাদেরই না, তারা একে অপরকেও প্রহার করে। এটা একটা খুবই ভালো দিক, তারা পশু ও মানুষের মধ্যে কোনো বিভেদ রাখেনি। বাবার কাছে শুনেছি, পৃথিবীর অন্য বন-জঙ্গলে এখনও কিছু মানুষ বসবাস করে, যাদের বনমানুষ বলা হয়। তারা দেখতে এই মানুষগুলোর মতো কি-না জানি না, তবে বাবার বলা গল্পের সঙ্গে আমি তাদের অনেক মিল পেলাম। তারাও নাকি দলবদ্ধ হয়ে একসঙ্গে চলাফেরা করে। একসঙ্গে শিকার করে। আবার শিকার নিয়ে অন্যদের সঙ্গে যুদ্ধও হয়। কিন্তু এটা তো বন-জঙ্গলের গল্প, মানুষের বেলায় কেন এত মিল থাকবে? আমি গাধা হলেও বুঝতে পারলাম, এটা স্বাধীনতা উদযাপন হতে পারে না। যে যেদিকে পারছে ছুটে পালাচ্ছে। গাড়ি ভাংচুর করছে! আগুন ধরাচ্ছে! আমার মনে শুধু ভয়, স্মৃতিসৌধটা কি দেখতে পাব না? হঠাৎ পাশ দিয়ে ছুটে যাওয়া এক লোককে থামিয়ে গাধার মতোই জিজ্ঞেস করলাম_ ভাই, আপনারা কি এভাবেই স্বাধীনতা উদযাপন করেন? স্মৃতিসৌধে যাবেন না? এবং আমি অবাক হয়ে দেখলাম তিনি আমাকে চেনেন এবং উত্তর দিলেন_ 'গাধা! আগে জান বাঁচা।' আমাদের বনে গাধার পালে বাঘ-ভাল্লুক তাড়া করলে ঠিক এমন কথাই শুনি... 'দৌদ্দে, গা-বাঁচা'। আহ, আমাদের জীবনচক্রের সঙ্গে মানুষকুলেরও যে এত মিল, ভেবেই বুকটা গর্বে ভরে গেল।
নাহ্, সেদিন আর স্মৃতিসৌধে আমার যাওয়া হয়নি। নিজের জীবনটা বাঁচিয়ে কোনো মতে ফিরে এসেছি। বারবার মনে হচ্ছিল, কেন গেলাম? ্তুস্বাধীনতা' কি আর গাধাদের জন্য? আর সে জন্যই হয়তো বুঝতে পারলাম না, যারা নিঃস্বার্থভাবে শুধু একটা স্বাধীন দেশের কথা চিন্তা করে প্রাণ দিতে পারে, সে দেশের মানুষ তাদেরই সম্মান জানাতে গিয়ে তাদের ত্যাগকে এভাবে অপমান করে কেমন করে? এমন একটা দিনে সবার পরিচয় তো একটাই_ বাংলাদেশি; তাহলে সবার ফুলের মালা আর ব্যানারে কেন বিভিন্ন দল আর মানুষের নাম লেখা থাকবে? ৪১ বছর আগে পুরো বাংলাদেশের মানুষ যদি শুধু এক পরিচয়, একসঙ্গে যুদ্ধ করে দেশটা স্বাধীন করতে পারে, তাহলে স্বাধীনতার একচলি্লশ বছর পরও কেন শুধু একটা দিনের জন্যও... সবাই এক পরিচয়ে, একসঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে স্মৃতিসৌধে যেতে পারে না? কেন এতদিন পরও স্বাধীনতার ইতিহাস নিয়ে এ দেশের বর্তমান প্রজন্মকে দেশের দুই রাজনৈতিক দলের কাছ থেকে ভিন্ন সময়ে ভিন্ন ধারণা পেতে হয়? সৌভাগ্য আমাদের, যারা নিজ চোখে স্বাধীনতা যুদ্ধ দেখেছেন, নিজ হাতে যুদ্ধ করেছেন, তারা আজও আমাদের মাঝে আছেন। কিন্তু তারা যখন একসময় থাকবেন না, তখন ইতিহাসের সঠিক তথ্যের জন্য আমরা কার কাছে যাব? আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেই-বা আমরা কতটুকু জানাতে পারব, যখন আমাদের প্রজন্মই ইতিহাস নিয়ে বিচলিত? ইতিহাস যদি একটা জাতির আসল পরিচয় বহন করে, তাহলে আমাদের পরিচয় কি বারবার ইতিহাস গবেষণা করেই নির্ধারণ
করতে হবে?
কিন্তু আমি গাধা বলেই এসব বোঝার ক্ষমতা আমার নেই। আর সেটা আরও একবার প্রমাণিত হলো যখন একজন সাংবাদিক আমার কাছে স্বাধীনতা দিবসের অনুভূতি জানতে চাইলেন। আমি তাকে এ প্রশ্নগুলোই করেছিলাম। কিন্তু নাহ, কোনো উত্তর পাইনি, বরং আমার চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোকে আমাকে নিয়ে হাসাহাসিই করতে দেখলাম। আমি নিজেকে সান্ত্বনা দিলাম, গাধার কথায় মানুষ হাসতেই পারে। অথচ এরপরও বিশ্বাস ছিল, উত্তরগুলো হয়তো তারাই দেবে। কিন্তু এবার আমাকে আর ভুল না প্রমাণিত করে, ওই সাংবাদিকের করা 'আচ্ছা বলুন তো, আজকের দিনটা এত বিশেষ কেন?' এমন প্রশ্নের উত্তরে আমার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একজন মানুষ যখন চকচকে সাদা দাঁতগুলো বের করে বললেন, 'আজকে শোক দিবস!' ঠিক তখনই নিজের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলাম, নিজের 'গাধাবোধক' কম বুদ্ধিসম্পন্ন প্রাণী হওয়ার কারণেই বোধহয় আমার মতো এ দেশের অগণিত গাধার জন্যই আমার সেই বন্ধু, এত যথার্থ আর পরিপূর্ণ একটি স্ট্যাটাস দিয়েছিল_ অ ফড়হশবু রিঃয ধ ষড়ধফ ড়ভ নড়ড়শং রং ংঃরষষ ধ ফড়হশবু.

আসিফ ইফতেখার পিয়াস :কলাম লেখক

No comments

Powered by Blogger.