বৃত্তের ভেতরে বৃত্ত-ঘটনাগুলো শুধু উদ্বেগজনকই নয়... by দেবব্রত চক্রবর্তী বিষ্ণু

নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যার জলে শেষ পর্যন্ত অপহৃত জিহাদের লাশ মিলল গত ২৯ জুন সকালে। ২৬ জুন সন্ধ্যায় জিহাদকে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লা থানার ধর্মগঞ্জ থেকে অপহরণ করা হয়। প্রথমে তাকে খাবারের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে অচেতন করা হয়। এরপর নিয়ে রাখা হয় ফতুল্লা থানার ভুঁইগড় এলাকায়, লাকি আক্তারের বাসায়।


পরদিন রাত ৩টায় হঠাৎ করে জিহাদের ঘুম ভেঙে যায়। তখন সে কান্নাকাটি শুরু করে এবং অপহরণকারীদের মধ্যে ওয়াসিম নামের একজনকে উদ্দেশ করে বলতে থাকে, 'মামা, আমাকে আমার মায়ের কাছে নিয়ে যাও।' ক্রমেই তার কান্নাকাটি বাড়তে থাকে। তবে শিশু জিহাদের কোনোভাবেই বোঝার কথা ছিল না, ওই আর্তনাদই তার জীবনে কাল হয়ে দাঁড়াবে। কান্নাকাটি থামাতে পুনর্বার জিহাদকে অতিরিক্ত মাত্রার ঘুমের ওষুধ খাইয়ে ঘুম পাড়ানো হয়। ওয়াসিমকে শিশু জিহাদ চিনে ফেলেছিল বিধায়ই 'মামা' বলে সম্বোধন করেছিল; এবং এরপরই ওয়াসিম তাকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয়। গত ৩০ জুন কালের কণ্ঠে 'শীতলক্ষ্যা থেকে শিশু জিহাদের লাশ উদ্ধার, ঘাতকের স্বীকারোক্তি' শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে ওয়াসিমের জবানিতে যেসব তথ্য মিলেছে, তারই প্রতিফলন ঘটেছে সেখানে। গত ২৭ জুন বিকেলে অপহরণকারী ওয়াসিম এবং অন্য কয়েকজন একটি সিএনজি স্কুটারে করে ঘুমন্ত জিহাদকে নিয়ে বুড়িগঙ্গার ওপর নির্মিত কাঁচপুর ব্রিজে যায়। সন্ধ্যার পর সেখান থেকেই অচেতন জিহাদকে তোয়ালে পেঁচিয়ে অপহরণকারীরা শীতলক্ষ্যায়
নিক্ষেপ করে।
২৮ জুন লাশের সন্ধানে র‌্যাবের তত্ত্বাবধানে ডুবুরিরা দিনভর চেষ্টা চালিয়ে জিহাদের লাশ উদ্ধার করতে ব্যর্থ হয় এবং রাত হয়ে যাওয়ায় উদ্ধারকাজ স্থগিত ঘোষণা করা হয়। পরদিন ২৯ জুন শীতলক্ষ্যায় জিহাদের অর্ধগলিত লাশের সন্ধান মেলে। জিহাদকে ছুড়ে ফেলার আগে অপহরণকারীরা মুক্তিপণের টাকার অঙ্ক নিয়ে দরকষাকষি করে এবং জিহাদের মা বিষয়টি র‌্যাবকে জানান। ২৮ জুন সকালে নির্দিষ্ট স্থানে (নারায়ণগঞ্জের শিবু মার্কেট এলাকা) টাকা নিতে এলে র‌্যাব তিন অপহরণকারীকে গ্রেপ্তার করে এবং তাদের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী এক মহিলাসহ ছয় অপহরণকারীকে গ্রেপ্তার করে উদ্ধার অভিযানে নামে। শেষ পর্যন্ত জিহাদকে পাওয়া গেল বটে, কিন্তু ততক্ষণে ফুটফুটে শিশু জিহাদ অর্ধগলিত লাশ। এ রকম নৃশংসতা-বর্বরতা-পৈশাচিকতা এর আগেও আমাদের প্রত্যক্ষ করতে হয়েছে। কিন্তু বিস্ময়কর হলো, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থার লোকজন এই সমাজকে বর্বর-পাষণ্ডদের হাত থেকে মুক্ত করতে এবং মানুষকে নিরাপত্তা দিতে পারছেন না। সমস্যাসংকুল এই দেশটিতে সামাজিক ও মানবিক অবক্ষয় এমন পর্যায়ে পেঁৗছেছে যে, ফুলের মতো নিষ্পাপ শিশুদেরও কীট-পতঙ্গের মতো হত্যা করতে পাশব শক্তি দ্বিধা করছে না। জিহাদদের তালিকা ক্রমেই দীর্ঘ হয়ে চলার পেছনে যে বিষয়গুলো মুখ্য কিংবা এগুলোর কারণ অনুসন্ধানক্রমে দ্রুত কঠোর প্রতিকারের ক্ষেত্রে ব্যর্থতার যে প্রকট চিত্র পরিলক্ষিত হচ্ছে, এর শেষ কোথায়, আমরা তাও জানি না। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ক্রমেই কতটা খারাপ হচ্ছে, উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মাত্রা কিভাবে সীমাহীনতার সীমাও অতিক্রম করে চলেছে; এবং এর বিপরীতে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীলদের 'সব কিছু ঠিকঠাক আছে' কিংবা 'পরিস্থিতি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন অনেক উন্নত'_এমন আত্মতৃপ্তিমূলক স্ববিরোধী উচ্চারণও অবনতির চিত্র পুষ্ট করে চলেছে। সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা প্রকট করে তুলছে। সম্প্রতি আবারও ঢাকায় দিনেদুপুরে বাসাবাড়ি-মার্কেটে ডাকাতি বেড়েছে এবং গত এক সপ্তাহে পরপর কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। রাজধানী ঢাকা ছাড়াও বিভিন্ন বিভাগ, জেলা, এমনকি উপজেলায় পর্যন্ত সমাজবিরোধীদের আস্ফালন ক্রমেই বেড়ে চলেছে। আমরা এও জানি না, জানমালের নিরাপত্তাহীনতা আর কতটা প্রকট হলে দায়িত্বশীলরা বাস্তবতা স্বীকার করে নিজেদের ব্যর্থতা মেনে নিয়ে সত্যিকার অর্থেই 'কঠোর প্রতিকার' শব্দ যুগলের যথাযথ বাস্তবায়ন করতে পারবেন। ভুলে যাওয়া অনুচিত, তাঁদের বাস্তবতা অস্বীকার করার এই অপপ্রবণতাও কিন্তু অপশক্তিকে উৎসাহিত করছে এবং তারা আরো পরিকল্পিত উপায়ে অপকর্মে লিপ্ত হচ্ছে। গত ৩০ জুন 'দেশজুড়ে মুক্তিপণ আতঙ্ক' শিরোনামে প্রকাশিত দৈনিক সকালের খবরের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত পাঁচ বছরে অপহরণের চার হাজার ঘটনা ঘটেছে; এবং চলতি বছরের প্রথম পাঁচ মাসে এ সংখ্যা তিন শতাধিক ছাড়িয়ে গেছে। মুক্তিপণ না পেয়ে অনেককে হত্যাও করা হয়েছে।
গত ৩০ জুন কালের কণ্ঠসহ একাধিক দৈনিকে সংগত কারণেই অধিক গুরুত্বসহকারে স্থান পেয়েছে_র‌্যাব, পুলিশ কিংবা গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য পরিচয় দিয়ে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় কিভাবে সমাজবিরোধী দুষ্কর্মে একটি সংঘবদ্ধ চক্র জড়িত রয়েছে। এই চক্রেরই ১৬ সদস্য গ্রেপ্তার হলো বগুড়ায়। ওদের হাতে থাকত ওয়ারেন্ট, হ্যান্ডকাফ ইত্যাদি। গত এক মাসে বগুড়ায় তারা বড় ধরনের তিনটি ঘটনা ঘটানোর পর পুলিশের টনক নড়ে। কেউ ব্যাংক থেকে বড় অঙ্কের টাকা তুললেই ওরা গাড়ি নিয়ে পুলিশ কিংবা গোয়েন্দা পরিচয়ে ব্যারিকেড দিত, একপর্যায়ে সর্বস্ব লুটে নিত। তারা কখনো অভিযোগ আনত, ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলনকারী জাল টাকা বহন করছে কিংবা অবৈধ কোনো কাজের মাধ্যমে এই টাকা পেয়েছে। আরো নানা রকম অভিনব কৌশল অবলম্বন করত তারা। আইনি সংস্থার লোক পরিচয়ে যে ডাকাতচক্র বিভিন্ন জেলায় সক্রিয়, তারা প্রকৃত আইনি সংস্থার লোকজনের চোখে ধুলো দিয়ে কিভাবে এমন দুষ্কর্ম চালাচ্ছে, এই প্রশ্নের জবাব মেলা বিদ্যমান বাস্তবতায় ভার। তাদের ব্যবহৃত গাড়িগুলোও বিপুল অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ভাড়া করা এবং তাদের চালচলনসহ সব কিছু প্রশিক্ষিত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মতো।
অপরাধ কিংবা নানাবিধ দুষ্কর্মমূলক কর্মকাণ্ড অব্যাহত গতিতে বেড়ে চলেছে, অথচ দায়িত্বশীলরা বলছেন, সব 'ঠিকঠাক' আছে! নিশ্চয়ই বিষয়টি বিস্ময়কর। প্রায়ই পরিলক্ষিত হচ্ছে, অনেক গুরুতর অপরাধের মামলার আসামিরা মুক্ত হয়ে যাচ্ছে আইনি সংস্থার সদস্যদের মামলা সাজানোর ক্ষেত্রে পাহাড়সম ব্যর্থতার কারণে। তাদের অনেকেরই অদক্ষতা, অযোগ্যতা, অদূরদর্শিতা, অস্বচ্ছতা, দায়বদ্ধহীনতা এবং ক্ষেত্রবিশেষে স্বেচ্ছাচারিতার কারণে সাধারণ মানুষকে চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্য দিয়ে দিনাতিপাত করতে হচ্ছে। অথচ তারা সাধারণ মানুষের করের অর্থে প্রতিপালিত। সম্প্রতি কালের কণ্ঠে এস এম আজাদ এবং রাব্বী রহমানের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে রাজধানীর একেকটি থানার যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তা শুধু উদ্বেগজনকই নয়, তারও অধিক কিছু। শুধু রাজধানীর থানাগুলো কেন, দেশের সিংহভাগ থানার চিত্রই এ থেকে বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। একেকটি থানার টেবিল-চেয়ার পর্যন্ত যেন ঘুষের জন্য হা করে থাকে। অনেক কর্মকর্তা থেকে শুরু করে সাধারণ সদস্য পর্যন্ত অন্যায়ের স্রোতে গা ভাসিয়েছেন। স্বীকার করি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোতে এখনো নিষ্ঠাবান, দায়িত্ববান, যোগ্য ও কর্তব্যপরায়ণ কর্মকর্তা-কর্মচারী আছেন। কিন্তু পাশাপাশি এই প্রশ্নও দাঁড়ায়, সেই সংখ্যাটি কত? নিশ্চয়ই জবাব প্রীতিকর নয়। তাঁদের সীমাবদ্ধতার কথাও আমরা জানি। জনবল, অস্ত্রবল এবং পরিবহন সংকটসহ চাকরি ক্ষেত্রে নানা রকম সমস্যা-সংকটে রয়েছেন তাঁরা। কিন্তু তার মানে তো এই নয়, স্বেচ্ছাচারিতা অথবা দায়িত্ব-কর্তব্য পালনে ব্যর্থতা প্রদর্শন করবেন, পেশাগত দায়িত্ব পালনে অদক্ষতার পরিচয় দেবেন। দারিদ্র্যপীড়িত জনগোষ্ঠী তাদের কষ্টার্জিত অর্থে যেহেতু এসব সংস্থার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রতিপালন করে থাকে, সেহেতু তাঁরা শত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দায়বদ্ধ। এ ক্ষেত্রে কারোই কোনো অজুহাত দাঁড় করানোর অবকাশ নেই। উপায় তাঁদের করতেই হবে। তাঁদের মনে রাখা দরকার, উপায়ের এক হাত, আর অজুহাতের দশ হাত। কাজেই অজুহাত দাঁড় করিয়ে তাঁদের পার পাওয়ার উপায় নেই।
নিজেদের হীনস্বার্থ চরিতার্থকরণের লক্ষ্যে দেশের রাজনৈতিক-অরাজনৈতিক প্রায় প্রতিটি সরকারই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোর, বিশেষ করে পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের কমবেশি ব্যবহার করে আসছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, তাদের নিয়োগ থেকে পোস্টিং, সেই দৃষ্টিকোণ থেকে, সেই দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েই হয়ে থাকে। এই আত্মঘাতী প্রবণতা জিইয়ে রেখেই প্রায় প্রতিটি সরকার জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার অঙ্গীকার-প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করে আসছে! তাদের যে এই স্ববিরোধিতা, তা সর্বনাশকেই ক্রমপুষ্ট করছে এবং নিয়মশৃঙ্খলার সব চেইন ছিঁড়ে ফেলছে। কিন্তু মনে রাখা উচিত, রাষ্ট্রের নাগরিকরা শুধুই প্রাণী কিংবা ভোটার নয়, তারা মানুষ; এবং সব কিছুর শেষ আছে, কিন্তু মানুষের অধিকারের কোনো শেষ নেই। এই বক্তব্য অতীত থেকে শুরু করে বর্তমান-ভবিষ্যতের সব রাষ্ট্র পরিচালকের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। রাষ্ট্র পরিচালকরা যদি দায়বদ্ধ থাকেন, জবাবদিহির পাট চুকিয়ে না ফেলেন, তাহলেই রাষ্ট্র মনুষ্য বসবাসের উপযোগী হয়ে উঠবে। রাজনীতিবিবর্জিত সমাজ কিংবা রাষ্ট্র কখনোই আলোকিত হতে পারে না। বরং গঠনমূলক, গণমুখী রাজনীতিই রাষ্ট্র পরিচালকসহ গোটা রাষ্ট্রযন্ত্রকে মানুষের কল্যাণে দায়বদ্ধ রাখতে পারে। মূল ক্ষেত্র ঠিক হলে শাখা-প্রশাখা এমনিতেই কণ্টকমুক্ত হতে বাধ্য। একই সঙ্গে সর্বাগ্রে রাজনীতিকদের এবং পাশাপাশি সমাজ সচেতনদের সামাজিক অবক্ষয় ও মূল্যবোধের ক্ষয়রোধে নতুনভাবে সংকল্পবদ্ধ হতে হবে। রাষ্ট্রের জন্য মানুষ নয়, মানুষের জন্য রাষ্ট্র_এটাই চূড়ান্ত সত্য।
লেখক : সাংবাদিক
deba_bishnu@yahoo.com

No comments

Powered by Blogger.