স্মরণ-সমাজসংস্কারক স্বামী বিবেকানন্দ by তামান্না ইসলাম অলি

তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের সেবাই সর্বোৎকৃষ্ট। ঈশ্বরের উপাসনা ও ধর্মই সত্য। তিনি ছিলেন বেদ, যোগশাস্ত্র ও হিন্দু ধর্মকে বিশ্বসভায় পরিচিত করে তোলার প্রতিনিধি। রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের প্রধান শিষ্য তিনি। জীবসেবার উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠা করেন রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন। বাংলা সাহিত্যে কথ্য ভাষাকে তিনি জনপ্রিয় করেছেন। ভারতের ইতিহাসে এক নতুন অধ্যায়েরও সূচনা করেন তিনি। হিন্দু ধর্মকে করেছেন সর্বজনীন।


তিনি স্বামী বিবেকানন্দ। আজ ৪ জুলাই এই মহামনীষীর প্রয়াণ দিবস। স্বামী বিবেকানন্দ ১৮৬৩ সালের ১২ জানুয়ারি কলকাতার শিমুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। মা-বাবা নাম দেন নরেন্দ্রনাথ। বাবা বিশ্বনাথ দত্ত ছিলেন কলকাতা হাইকোর্টের নামকরা আইনজীবী। বিশ্বনাথ দত্ত যেমন ছিলেন দানশীল, তেমনি সংস্কৃতিমনা। আর মা ভুবনেশ্বরীদেবী ছিলেন ধর্মপরায়ণ গৃহিণী। বাবার যুক্তিবাদী মন আর মায়ের ধর্মীয় চেতনা নরেন্দ্রনাথের ব্যক্তিত্বকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। এ কারণে উপযুক্ত প্রমাণ এবং ব্যবহারিক পরীক্ষা ছাড়া কোনো বক্তব্যকে তিনি গ্রহণ করতেন না। ছোটবেলা থেকেই তাঁর মধ্যে লক্ষ করা গিয়েছিল আধ্যাত্মিক পিপাসা এবং ঈশ্বরের প্রতি প্রবল ভক্তি। নরেনের বাল্যশিক্ষা শুরু বাড়িতেই। ১৮৭১ সালে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মেট্রোপলিটন ইনস্টিটিউশনে ভর্তি হন। ১৮৭৯ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। দর্শন, ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান, শিল্পকলা ও সাহিত্যে তাঁর ব্যাপক পাণ্ডিত্য লক্ষ করা যায়। বেদ, উপনিষদ, ভগবদ্গীতা, রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণসহ অনেক ধর্মগ্রন্থের প্রতিও ছিল তাঁর প্রবল আগ্রহ।
এ ছাড়া সংগীত, যন্ত্রসংগীত ও শাস্ত্রীয় সংগীতের সব শাখায়ই ছিল তাঁর বিশেষ আগ্রহ। সেই ছেলেবেলা থেকেই খেলাধুলা, ব্যায়ামচর্চা এবং নানা সাংগঠনিক কাজে যুক্ত থাকতেন তিনি। ১৮৮০ সালে কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজে ভর্তি হন। পরের বছর চলে যান স্কটিশ চার্চ কলেজে। এ সময় তিনি পাশ্চাত্য যুক্তিবিজ্ঞান ও দর্শন এবং ইউরোপীয় ইতিহাস নিয়ে পড়াশোনা করেন। ১৮৮১ সালে এখান থেকে এফএ পাস করেন। ১৮৮৪ সালে পাস করেন বিএ। নরেন্দ্রনাথের স্মৃতিশক্তি ছিল প্রখর। তাঁর আধ্যাত্মিক বিকাশে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল মায়ের। মা বলতেন, 'সারা জীবন পবিত্র থেকো, নিজের সম্মান রক্ষা কোরো, অন্যের সম্মানে আঘাত কোরো না। কোমল হও। কিন্তু প্রয়োজনে নিজের হৃদয়কে শক্ত রেখো।' ১৮৮৭ সালে নরেন্দ্রনাথ ও তাঁর আট গুরুভাই আনুষ্ঠানিকভাবে সন্ন্যাস নেন। এরপর নরেন্দ্রনাথ দত্ত নাম পরিবর্তন করে হয়ে যান বিবেকানন্দ। কিছুদিনের মধ্যেই তিনি শুরু করেন বিশ্বভ্রমণ। ১৮৯৩ সালে তিনি যান আমেরিকায়। শিকাগোতে যোগ দেন এক মহাধর্মসভায়। এরপর আমন্ত্রণ পান যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন ফোরাম, বিশ্ববিদ্যালয় ও সংঘ থেকে। এ সময় তিনি সারা বিশ্বে বেদ, যোগশাস্ত্র ও হিন্দু ধর্মকে পরিচিত করেন। ইংল্যান্ড ও আমেরিকায় প্রতিষ্ঠা করেন বেদান্ত সোসাইটি। ১৯০০ সালে ফিরে আসেন ভারতে। ওই বছরই মানবকল্যাণে প্রতিষ্ঠা করেন রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশন। এই সংগঠনটি ছড়িয়ে আছে বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে; এমনকি আমাদের দেশের বিভিন্ন জেলায় রয়েছে এর বিস্তৃতি। মোদ্দাকথা, স্বামী বিবেকানন্দ ছিলেন ভারতীয়দের অন্যতম পথপ্রদর্শক। মাত্র ৩৯ বছর বয়স হয়েছিল স্বামীজির। ১৯০২ সালের ৪ জুলাই বেলুড় মঠে দেহত্যাগ করেন তিনি। জীবনের শেষ কয়টি বছরে অমানুষিক পরিশ্রম করেছেন। কাজ তাঁর দর্শন প্রচার। যেন বুঝে গিয়েছিলেন, 'হাতে সময় নেই, যত দ্রুত যত বেশি কাজ করা যায়'। শিষ্যদের অনেককে বলেছিলেনও সে কথা। অ্যাজমায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। শরীর ভেঙে গিয়েছিল। তার পরও কাজ করতেন। মৃত্যুর পর চিকিৎসকরা ধারণা করেছিলেন, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত কারণে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু নিশ্চিত হতে পারেননি কেন তাঁর এই অকালপ্রয়াণ।
তামান্না ইসলাম অলি

No comments

Powered by Blogger.