উৎসব-জগন্নাথ দেবের রথযাত্রার প্রাচীনত্ব by তারাপদ আচার্য্য

রথযাত্রা বা রথদ্বিতীয়া একটি আষাঢ় মাসে আয়োজিত অন্যতম প্রধান সনাতন ধর্মীয় উৎসব। কিন্তু আমাদের দেশে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই এ উৎসবের ভাগীদার। তবে ভারতের উড়িষ্যা ও পশ্চিমবঙ্গে এই উৎসব বিশেষ উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হয়। এ দেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন শহরে রথযাত্রা শুরু হয়। লন্ডন, মন্ট্রিয়ল, প্যারিস, নিউ ইয়র্ক, টরন্টো, ভেনিস প্রভৃতি শহরে রথযাত্রা উৎসবের জনপ্রিয়তা পেয়েছে।


দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর কৃষ্ণের বৃন্দাবন প্রত্যাবর্তনের স্মরণে এই উৎসব আয়োজিত হয়ে থাকে। জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা মনে ভেসে উঠতেই যে চিত্র চিত্রিত হয় সেটা হলো, পুরীর জগন্নাথ দেবের রথের ছবি। প্রাচীন ভারতীয় গ্রন্থ 'ব্রহ্মাণ্ডপুরাণ' ও 'পদ্মপুরাণে'ও এই রথযাত্রার কথা বলা হয়েছে। পদ্মপুরাণে বলা হয়েছে, আষাঢ় মাসের শুক্লা দ্বিতীয়া তিথিতে রথযাত্রা অনুষ্ঠান শুরু করে শুক্লা একাদশীর দিন পুণ্যযাত্রা বা উল্টো রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। পুরীর জগন্নাথ দেবের রথযাত্রাও প্রতিবছর আষাঢ় মাসের শুক্লা দ্বিতীয়া তিথিতেই অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। যদিও আষাঢ় মাসের পুষ্যানক্ষত্রযুক্ত শুক্লা দ্বিতীয়া তিথিতেই রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হওয়ার নিয়ম। কিন্তু প্রতিবছর আর পুষ্যানক্ষত্রের সঙ্গে আষাঢ় মাসের শুক্লা দ্বিতীয়া তিথির যোগ হয় না, তাই কেবল ওই শুক্লা দ্বিতীয়া তিথিতেই রথযাত্রা শুরু হয়। তবে কখনো এই তিথির সঙ্গে পুষ্যানক্ষত্রের যোগ হলে সেটি হয় একটি বিশেষ যোগসম্পন্ন রথযাত্রা। পদ্মপুরাণে উলি্লখিত রথযাত্রায় শ্রীবিষ্ণুর মূর্তিকে রথারোহণ করানোর কথা বলা হয়েছে। আর পুরীর জগন্নাথ দেবের মূর্তি যে শ্রীকৃষ্ণ তথা শ্রীবিষ্ণুরই আরেকটি রূপ, তা সবাই স্বীকার করেন।
পুরীর রথযাত্রা উৎসব হচ্ছে বড় ভাই বলরাম বা বলভদ্র ও বোন সুভদ্রাকে সঙ্গে নিয়ে শ্রীকৃষ্ণের বৃন্দাবন যাত্রার স্মারক। তিনজনের জন্য আলাদা আলাদা তিনটি রথ। রথযাত্রা উৎসবের মূল দর্শনীয় হলো এই রথ তিনটি। প্রথমে যাত্রা শুরু করে বড় ভাই বলভদ্রের রথ। এই রথের নাম তালধ্বজ। রথটির ১৪টি চাকা। উচ্চতা ৪৪ ফুট। রথের আবরণের রং নীল। তারপর যাত্রা করে সুভদ্রার রথ। রথের নাম দর্পদলন। উচ্চতা প্রায় ৪৩ ফুট। এই রথের মোট ১২টি চাকা। যেহেতু রথটির ধ্বজা বা পতাকায় পদ্মচিহ্ন আঁকা রয়েছে, তাই রথটিকে পদ্মধ্বজও বলা হয়ে থাকে। রথের আবরণের রং লাল। সবশেষে থাকে জগন্নাথ দেবের রথ। রথটির নাম নন্দীঘোষ। পতাকায় কপিরাজ হনুমানের মূর্তি আঁকা রয়েছে, তাই এই রথের আরেকটি নাম কপিধ্বজ। রথটির উচ্চতা ৪৫ ফুট। এতে ১৬টি চাকা আছে। প্রতিটি চাকার ব্যাস সাত ফুট। রথটির আবরণের রং হলুদ। তিনটি রথের আবরণীর রং আলাদা হলেও প্রতিটি রথের উপরিভাগের রং লাল। এভাবে রথ তিনটি সমুদ্র উপকূলবর্তী জগন্নাথ মন্দির থেকে প্রায় দুই মাইল দূরে গুণ্ডিচা মন্দিরের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে। সেখানে সাত দিন থাকার পর আবার উল্টোরথ অর্থাৎ জগন্নাথ মন্দিরে ফিরে আসে। এখন তিনটি রথ ব্যবহৃত হলেও আজ থেকে ৭০০ বছর আগে রথযাত্রার যাত্রাপথ দুটি ভাগে বিভক্ত ছিল। আর সেই দুটি ভাগে তিন-তিনটি করে মোট ছয়টি রথ ব্যবহৃত হতো। পুরীর রথযাত্রায় তিনটি রথ। জগন্নাথ দেবের স্নানযাত্রা এবং রথযাত্রা সূর্যের অয়ন পথপরিক্রমার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট। সূর্যের দক্ষিণায়ন যাত্রার সঙ্গে বর্ষাগমনের সম্পর্ক স্বতঃসিদ্ধ। আর বর্ষারম্ভেরই উৎসব জগন্নাথ দেবের স্নানযাত্রা। সূর্য সপ্তাশ্ব বাহিত রথে আকাশলোক পরিক্রমণ করেন। জগন্নাথ দেবও রথে আরোহণ করে গুণ্ডিচা যাত্রা করেন। অয়নপথে সূর্যের দক্ষিণ দিকে যাত্রা ও উত্তরে প্রত্যামন জগন্নাথ দেবের রথযাত্রার ইতিবৃত্ত। বলরাম ও সুভদ্রা জগন্নাথ দেবের সঙ্গী। স্কন্দপুরাণ মতে, জগন্নাথ দেবের সঙ্গী বলরাম বিষ্ণুর অনন্ত শয্যার অংশীদার।
তারাপদ আচার্য্য

No comments

Powered by Blogger.