দশ ট্রাক অস্ত্র মামলা : যে দিনটির জন্য অধীর আগ্রহ by শহিদুল ইসলাম

এক. অবশেষে বহুল আলোচিত বাংলাদেশের বৃহত্তম দশ ট্রাক অস্ত্র মামলার সম্পূরক চার্জশিট ২৬ জুন, ২০১১ রবিবার জমা দেওয়া হলো_এটি তৃতীয় দফা অভিযোগপত্র। দ্বিতীয় দফার অভিযোগপত্রে আরো ১১ জন আসামি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তাঁদের মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর আমির ও সাবেক বিএনপি-জামায়াত চারদলীয় জোট সরকারের শিল্পমন্ত্রী মতিউর রহমান নিজামী,
বিএনপি নেতা ও জোট সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ও ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন 'উলফার' সামরিক শাখার প্রধান পরেশ বড়ুয়াও আছেন। ২৭ জুন সোমবার বাংলাদেশের প্রায় সব দৈনিক পত্রিকাই বিস্তারিতভাবে ওই সম্পূরক চার্জশিটের খবর ছেপেছে। নতুন ১১ জনের অন্য আটজনের নাম সেখানেই পাবেন সবাই। আমার মনে হয়, বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ দশ ট্রাক অস্ত্র মামলার খুঁটিনাটি ইতিমধ্যে জেনেছেন। ওই খবরটিই তারপর থেকে বাংলাদেশের আনাচে-কানাচে প্রতিটি মানুষের মুখে মুখে ঘুরছে। তার খুঁটিনাটি নিয়ে আজ আর নতুন করে কিছু লেখার আছে বলে আমার মনে হয় না। ২০০৪ সালের ১ এপ্রিল রাতে অস্ত্রভাণ্ডারটি ধরা পড়ার পর যে দুটি মামলা করা হয়েছিল, সে সময় জোট সরকারই ক্ষমতায় ছিল। তাই সে দুটি মামলা সম্পর্কে একটু খোঁজ নেওয়া যাক। ধরা পড়ার চার দিন পর ৪ এপ্রিল কর্ণফুলী থানার ওসি আহাদুর রহমান দুটি মামলা দায়ের করেছিলেন। একটি অস্ত্র ও অপরটি চোরাচালান মামলা। আসামি করা হয় প্রথম মামলায় ৪৩ জনকে এবং দ্বিতীয় মামলায় ৪৫ জনকে। সেদিনের আসামিদের নামও সব পত্রিকায় এসেছে। দেখা যায় তাঁদের অধিকাংশই সিইউএফএল ঘাটের ঠিকাদার, ঘাটশ্রমিক ও নৌকার মাঝিমাল্লা। প্রাথমিক তদন্তের পর ২০০৪ সালের ১১ জুন তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির এএসপি কবীর উদ্দিন অভিযোগপত্র জমা দেন। এবারের অস্ত্র মামলায় ৪২ এবং চোরাচালান মামলায় ৪৪ জনকে আসামি করা হয়। একই বছর ২৮ আগস্ট সিআইডির এএসপি নওশের আলী আবার আরেকটি অভিযোগপত্র জমা দেন। এতে দুটি মামলায় আসামির সংখ্যা একজন করে বাড়ে। এ হলো বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে গৃহীত পদক্ষেপগুলো।

দুই.
সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৮ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম মহানগর দায়রা জজ এ এন এম বশিরুল্লাহ এ মামলায় আরো তদন্তের নির্দেশ দেন। পুলিশ কর্তৃপক্ষ এ তদন্তের দায়িত্ব দেয় সিআইডির এএসপি ইসমাইল হোসেনকে। ২০০৯ সালের ১৮ জানুয়ারি রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আবার সাতটি পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে অধিকতর তদন্তের আইও পরিবর্তনের আদেশ দেন। মুনিরুজ্জামান আইও হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে ওই বছর ১৩ মে আরো বেশি তদন্তের জন্য সময়সীমা বৃদ্ধির আবেদন করেন। আদালত সাতটি পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে অধিকতর তদন্তের আদেশ দেন। সাতটির মধ্যে ছয়টি বিষয়ে তদন্ত শেষ করে সিআইডি ৫২ জনকে আসামি করে সম্পূরক চার্জশিট দিয়েছে। সেই চার্জশিটে জোট সরকারের ওই দুই প্রভাবশালী মন্ত্রী ছাড়াও সচিব, মেজর জেনারেল, ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ ১১ জন বাঘা-বাঘা আসামি জালে ধরা পড়েছে। এমন বিশাল পরিমাণ অবৈধ অস্ত্রের অনুপ্রবেশের সঙ্গে দেশের মন্ত্রী ও সচিব, জেনারেল পর্যায়ের মানুষ জড়িত থাকে, এটা ভাবাই যায় না। জোট সরকারের সময় গঠিত তদন্ত কমিটির তদন্তে আটক অস্ত্রগুলো কোথাকার, কারা এনেছিল, কী জন্য এনেছিল, কাদের নির্দেশে এনেছিল_এ সব কিছুই জানা যায় না। আসামি করা হয়েছিল ঘাটের কুলি-মজুর অথবা মাথায় করে মালগুলো মাটিতে নামিয়েছিল কিংবা দূরে নোঙর করা জাহাজ থেকে নৌকা বা ট্রলারে মালগুলো ঘাটে বহন করে এনেছিল যারা; তাঁরা হয়তো জানতেনই না ওসব বাঙ্ েকী আছে। সর্বশেষ গত রবিবার ২৬ জুনের চার্জশিটে সবকিছু পরিষ্কার করে বলা হয়েছে। ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী উলফার জন্য অস্ত্রগুলো চীনের রাজধানী বেইজিংয়ের নওরিনকো কারখানায় তৈরি। কেবল জানা যায় না কোন জাহাজে অস্ত্রগুলো আনা হয়েছিল। কাজেই ওই অবৈধ অস্ত্রের চালান বাংলাদেশে ঢোকা ভয়ানক বিষয়। বাংলাদেশ কোনো বিদেশি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর অস্ত্র সরবরাহের রুট হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে কি না, সেটা ভাবার বিষয়। যদি তা-ই হয়, তাহলে তা হবে ভয়ানক বিপজ্জনক। আসামি হিসেবে বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রী, সচিব, মেজর, ব্যবস্থাপকদের নাম উঠে আসায় প্রমাণ হয় যে রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ ওই ঘটনার সঙ্গে জড়িত। যদিও দেশের মানুষ তা জানে না।

তিন.
কিভাবে দুজন মন্ত্রীসহ এসব গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি আসামির তালিকাভুক্ত হলেন, তার বিবরণ কাগজে সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, যেন দেশের মানুষ মনে করতে না পারে যে বর্তমান সরকার রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার জন্য তাঁদের আসামিভুক্ত করেছে। কাগজের রিপোর্ট খুবই বস্তুনিষ্ঠ। তবুও মানুষের সন্দেহ হতেই পারে। তাই কোনোরকম কালক্ষেপণ না করে অবিলম্বে বিচারকাজ শুরু করা দরকার এবং আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার মতো প্রতিদিনের মামলার বিবরণ জাতীয় প্রচারমাধ্যমে প্রচার করা দরকার, যেন দেশের মানুষের মনে বিন্দুমাত্র সন্দেহ না থাকে। যদি সরকার সত্যি সত্যি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে তাঁদের ফাঁসিয়ে থাকে, তাহলে আদালতে তা যেন প্রমাণিত হয়, সেটাও নিশ্চিত করতে হবে। তবে সাধারণভাবে মানুষের বিশ্বাস জন্মেছে যে ঊর্ধ্বতন মহলের হাত না থাকলে কিংবা কোনোরকম ইঙ্গিত না থাকলে এত বড় অস্ত্রের চালান খালাস করার সাহস কারো হওয়ার কথা নয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওপর দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব ন্যস্ত। এত বড় অস্ত্র চোরাচালান যে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পরিপন্থী, এটা বোঝার মতো বিদ্যাবুদ্ধি স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর থাকার কথা।
তা ছাড়া স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর নাম উঠে এসেছে। তাঁর ওপরও ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। এ বিষয়ে তাঁর ভূমিকা কী ছিল, তা এখনো জানা যায়নি। তিনি যদি আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ইচ্ছায় বা আদেশে তিনি এই অস্ত্রগুলো আমদানি ও খালাসের সঙ্গে যুক্ত হতে বাধ্য হয়েছিলেন, তখন কী হবে?
যেমন_নিজামী ও শিল্পসচিবের নাম উঠে আসে তৎকালীন শিল্পসচিব ড. সোয়েব আহমদের জবানবন্দিতে। নিজামী বলেছিলেন, 'দেশের হাইয়েস্ট অথরিটি পুরো বিষয় জানে। এতে নতুন করে কিছু করতে হবে না।'
হাইয়েস্ট অথরিটি কে? তৎকালীন স্বরাষ্ট্রসচিব সব দোষ লুৎফুজ্জামান বাবরের ওপর চাপিয়েছেন। উইং কমান্ডার সাহাবুদ্দিনের সাক্ষ্যে রেজ্জাকুল হায়দার, আবদুর রহিম ও লিয়াকতের নাম এসেছে। এমনকি কিভাবে আসামির খাতায় উঠলেন, তার বিস্তারিত বিবরণ কালের কণ্ঠের ১৫ পৃষ্ঠায় (২৭ জুন) বর্ণনা করা হয়েছে।

চার.
অস্ত্র ধরা পড়ার পর সাতটি বছর পার হয়ে গেছে। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার যদি সত্যি এই অপরাধের সঙ্গে যুক্ত থাকে, তাহলে এটা স্বাভাবিক যে তারা সেটা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করবে। সেটা যে তারা করেছে, আজ তা প্রমাণিত হলো। প্রমাণিত হলো বলা ঠিক হলো না। অভিযোগ উঠল। প্রখর সূর্যালোকে উন্মুক্ত আদালত প্রাঙ্গণে হাজার হাজার মানুষ ও সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে এর বিচারকাজ অবিলম্বে শুরু হওয়া দরকার। প্রকৃত সত্য জানার জন্য। নতুন যে ১১ জন অভিযুক্ত হয়েছেন, তাঁরা সবাই হয়তো নিজেকে বাঁচানোর জন্য অন্যের নাম করছেন। আদালতের কাঠগড়ায় তাঁদের সে কথা বলতে দিন। যথাসম্ভব দ্রুত বিচারকাজ সম্পন্ন করা এবং প্রকৃত অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক সাজা দেওয়া দেশের স্বার্থে প্রয়োজন। তার পরও কিছু কথা থাকে, ধরুন, তাঁরা সবাই দোষী প্রমাণিত হলো। তখন তাঁদের বিরুদ্ধে আর একটা অপরাধের মামলা হতে পারে। তা হলো জোট সরকার যেসব নিরীহ ঘাটকুলি, মাঝি-মাল্লাসহ সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষকে আসামি করেছিল, সেটা তখন মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে পরিণত হবে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী যখন নিজের অপরাধ গোপন করে ওই সব নিরীহ মানুষকে ঝুলিয়েছিলেন, তার জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বর্ধিত সাজা পাওয়া দরকার। যদি দশ ট্রাক অস্ত্র মামলায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর যোগসাজশ প্রমাণিত হয়, তাহলে সে সময়ের জোট সরকারের বিরুদ্ধে মামলা হতে পারে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করার জন্য। কারণ ভারত আমাদের নিকটতম প্রতিবেশী। সে দেশের রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হবে। এটা আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী। তৎকালীন সরকার সেই আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে যুক্ত ছিল। দেশবাসী এটা চায় না। যেমন_পাকিস্তানের মাটিতে লাদেন নিহত হওয়ার পর পাকিস্তানের কোনো অজুহাতই আজ গ্রহণযোগ্য হচ্ছে না, তেমনি বাংলাদেশ যে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে কোনোভাবেই যুক্ত নয়_তখন কোনোভাবেই আমাদের এই দাবি আন্তর্জাতিক সমাজের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার আমাদের এই জায়গায় দাঁড় করিয়েছে। তাই অত্যন্ত দ্রুতগতিতে ও স্বচ্ছতার সঙ্গে বিচারকাজ শেষ করে দোষী ব্যক্তিদের শাস্তি দিয়ে আমাদের প্রমাণ করতে হবে যে আমরা কোনোভাবেই সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে যুক্ত নই। দেশবাসী সে দিনটির জন্য অধীর আগ্রহে চেয়ে আছে।

লেখক : শিক্ষাবিদ ও সমাজবিশ্লেষক

No comments

Powered by Blogger.