ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক : কতটা বন্ধুপ্রতিম? by শাহনেওয়াজ বিপ্লব

পৃথিবীর মানচিত্রে এশিয়ার একটি ছোট দেশ, আমাদের বাংলাদেশ। অনেকটা চারদিক থেকে ঘিরে থাকা ভারত আমাদের অন্যতম প্রতিবেশী। ভারত ছাড়াও কাছের এবং দূরের আমাদের আরো কয়েকটি প্রতিবেশী দেশ রয়েছে। মিয়ানমার, ভুটান ও নেপাল আমাদের খুব কাছের, আর শ্রীলঙ্কা বা পাকিস্তান আমাদের দূরের প্রতিবেশী। প্রতিবেশী দেশ হলেও মিয়ানমার-ভুটান-নেপাল নিয়ে বাংলাদেশের মানুষ অতটা আবেগ বোধ করে না।


এমনকি শ্রীলঙ্কা বা পাকিস্তানও আমাদের ততটা আকর্ষণ করে না, যতটা আকর্ষণ এবং প্রভাবিত করে ভারত। সাংস্কৃতিক ঐক্য ছাড়াও বাংলাদেশের মানুষ ভারতের মানুষকে খুব আপন করে ভাবে সব সময়। এর মূল কারণ, ভারতের সমর্থন এবং সাহায্য-সহযোগিতা ছাড়া আজকের বাংলাদেশ রাষ্ট্রটির অভ্যুদয় হতো না। বাংলাদেশের আজকের এই স্বাধীন অস্তিত্ব ভারতেরই অবদান। ভারতকে তাই বাংলাদেশ অস্বীকার করতে পারে না। তা ছাড়া ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তা-চেতনার জন্য ভারত বাংলাদেশের খুব কাছের। ১৯৪৮ সালে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্তান ভাগ হয়ে গেলেও ঘুরেফিরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক চিন্তায় সব সময় গভীর প্রভাব ফেলেছে ভারত।
কিন্তু কথা হচ্ছে, ভারত আমাদের কেমন প্রতিবেশী? কতটা বন্ধুপ্রতিম? কিছুদিন আগে ভারতের পররাষ্ট্রসচিব নিরুপমা রাও এসেছেন, এসেছেন ভারতের সেনাপ্রধান। তাঁরা সবাই বলেছেন, বাংলাদেশ ভারতের বন্ধুপ্রতিম প্রতিবেশী। ঘটনা কি আসলে তা-ই? ভারতের ব্যাপারে বাংলাদেশের মানুষের মনোভাবে এই চিত্র ফুটে ওঠে না। পত্রপত্রিকায় লেখালেখি এবং জনমত জরিপগুলোতে দেখা যায়, ভারতকে আর আগের মতো সুপ্রতিবেশী ভাবছে না বাংলাদেশ। যে ভারতের অবদানে বাংলাদেশ রাষ্ট্রটির জন্ম, সেই ভারতের প্রতি বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষের আজ আর কোনো বন্ধুসুলভ মনোভাব নেই। ভারতের সঙ্গে সীমান্ত রয়েছে আমাদের বাংলাদেশ, মিয়ানমার, ভুটান, নেপাল, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা ও চীনের। কিন্তু বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে বিএসএফের গুলিতে অসংখ্য বাংলাদেশি প্রতিবছর নিহত হন, অথচ মিয়ানমার-নেপাল-ভুটান সীমান্তে নির্বিচারে কোনো হত্যাযজ্ঞ নেই। গত ৮ জানুয়ারি ভারত-বাংলাদেশের অনন্তপুর সীমান্তে ভারতের বিএসএফ কর্তৃক বাংলাদেশি কিশোরী ফেলানি হত্যার পর তার লাশ দীর্ঘক্ষণ কাঁটাতারে ঝুলিয়ে রাখা তার একটি বড় উদাহরণ।
পৃথিবীর অন্য দেশের ভিসার জন্য ব্যবসায়ীদের এত দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয় না। নদীর পানি বণ্টন নিয়ে ভারতের নজিরবিহীন গোঁয়ার্তুমি এ ক্ষেত্রে একটি বড় উদাহরণ। ফারাক্কা বাঁধ, তিস্তার পানিপ্রবাহ এবং টিপাই নদীতে বাঁধসহ নানা ইস্যুতে ভারত বাংলাদেশের সম্মতি আদায় করে নিয়েছে ছলচাতুরী করে। এর পরও কোনো সরকারের সময়ই পানির ন্যায্য হিস্যা বাংলাদেশ বুঝে পায়নি। এমনকি নদীর পানি বণ্টনে ভারত আন্তর্জাতিক আইনকানুনের কোনো তোয়াক্কা করেনি এবং করছে না।
ভারত এর মধ্যেই বাংলাদেশের সঙ্গে সমঝোতা করে তামাবিল সীমান্তে শুরু করেছে সীমানা জরিপের কাজ। দেশভাগ হয়েছে আজ ৬৩ বছর প্রায়। অথচ এত দিন পর নতুন করে সীমানা জরিপ ভারতের অসৎ উদ্দেশ্যকেই সামনে নিয়ে আসে। কুড়িগ্রাম সীমান্তে ফেলানি হত্যার ঘটনার পর এই নৃশংস ঘটনার প্রতিবাদে বাংলাদেশের মানুষ প্রতিবাদমুখর হয়ে উঠলে ভারত কিছুটা রক্ষণাত্মক অবস্থান গ্রহণ করেছে বলে মনে হয়েছে। ভারতের সঙ্গে রাজনৈতিক সুসম্পর্ক বজায় রেখে এ রকম আন্তর্জাতিক চাপ বাড়াতে হবে এবং আমাদের প্রাপ্য হিস্যা বুঝে নিতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, বাংলাদেশে বর্তমানে ক্ষমতায় আছে শেখ হাসিনা সরকার। ভারত বিএনপির চেয়ে বরং আওয়ামী লীগকেই কাছের বলে মনে করে রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনার ঐক্যের কারণে। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের আজকের যে বিশাল প্রভাব, বাংলাদেশ তা কোনোভাবেই অস্বীকার করতে পারে না। ভারতের সঙ্গে সংঘাতে বাংলাদেশের লাভের কোনো সম্ভাবনা নেই। তাই ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বের মাধ্যমে আমাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন করে নিতে হবে। ভারত আমাদের বন্ধু না হলেও নিজেদের স্বার্থেই ভারতের সঙ্গে আমাদের সুসম্পর্ক বজায় রাখতে হবে।

লেখক : গবেষক, তুলনামূলক সাহিত্য বিভাগ, ভিয়েনা আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়, অস্ট্রিয়া

No comments

Powered by Blogger.