বইয়ের মেলা প্রাণের মেলা-পথের মেলায় নিয়ন্ত্রণ নেই by আশীষ-উর-রহমান

বিক্রির মন্দা কাটতে শুরু করেছে অমর একুশের গ্রন্থমেলায়। গতকাল শনিবারও ভিড় ছিল প্রচুর। আগের দিন শুক্রবারের তুলনায় এদিন বেচাকেনাও ঢের বেড়েছে। তবে বাংলা একাডেমীর প্রাঙ্গণের বাইরের মেলাটি একেবারেই বারোয়ারি মেলায় পরিণত হয়েছে। সেখানে নিম্নমানের ছাপার নকল ভারতীয় বই থেকে শুরু করে জুতা-স্যান্ডেল, বাজারের ব্যাগ, খুন্তি-বঁটির পসরা বসে গেছে। বই কিনতে এসে সাংসারিক কাজের জিনিসপত্রও কিনছেন অনেকে হাতের কাছে পেয়ে।


টিএসসি এবং দোয়েল চত্বর মোড়ে এসব বারোয়ারি পণ্যের পসরা এমন করে বসেছে যে ছুটির দিনে লোকসমাগম বাড়ায় প্রচণ্ড জটলা হচ্ছে এই দুই প্রবেশমুখে। নিরাপত্তাকর্মীরা আছেন বটে, তবে এসব অবাঞ্ছিত পসরা অপসারণে তাঁদের কোনো গরজ আছে বলে দৃশ্যমান হয়নি।
পথের মেলায় একাডেমীর নিয়ন্ত্রণ নেই: গতকাল সন্ধ্যায় প্রেস ব্রিফিংয়ে একাডেমীর মহাপরিচালক শামসুজ্জামান খান রাখঢাক না করে স্বীকার করলেন, পথের বারোয়ারি মেলায় একাডেমীর কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। তাঁদের এমন কোনো লোকবল নেই, যা দিয়ে তাঁরা পথের মেলা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। এ কারণেই মেলার পরিসর সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন। স্থানাভাবে অনেককেই পথে স্টল দিতে হয়েছে। তাঁরা সেসব স্টলে অন্য প্রকাশকের বইসহ অন্যান্য সামগ্রীও বিক্রি করছেন। প্রাঙ্গণের ভেতরে স্টলগুলো থাকলে নিয়ন্ত্রণ করতে পারতেন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
মহাপরিচালক বলেন, এই মেলায় যদি প্রকাশকেরা আর্থিক সাহায্য করতেন, অর্থের জন্য অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে হাত পাততে না হতো, তাহলে প্রকাশকেরাই মেলার নিয়ন্ত্রণ করতে পারতেন। যেমন কলকাতা বইমেলায় হয়ে থাকে। একাডেমীর সভাকক্ষের সামনে এই প্রেস ব্রিফিংয়ে একাডেমীর সচিব আলতাফ হোসেন, মেলা কমিটির সদস্যসচিব শাহিদা খাতুন ও জনসংযোগ কর্মকর্তা মুর্শিদ আনোয়ার উপস্থিত ছিলেন।
কর্তৃপক্ষকেই ভালো বইয়ের পৃষ্ঠপোষকতা করতে হবে: হাজার হাজার বই প্রকাশ হচ্ছে প্রতিবছর। এর মধ্যে অধিকাংশ বই মানসম্মত নয়। কিন্তু সাধারণ পাঠকের পক্ষে চট করে এই ভিড়ের মধ্যে এসে ভালো বইটি খুঁজে পাওয়া কঠিন। এ জন্য বাংলা একাডেমীর একটি বিশেষ উদ্যোগ থাকা দরকার। প্রতিদিন যেসব বইয়ের তালিকা তাদের কাছে যায়, তার মধ্য থেকে মানসম্মত বইগুলো আলাদা করে একটি তালিকা মেলার প্রবেশপথ এবং যে ১০টি চত্বর করা হয়েছে সেখানে বোর্ডে টাঙিয়ে দেওয়া উচিত। তাহলে তালিকা দেখে পাঠকেরা তাঁদের পছন্দমতো সৃজনশীল বা মননশীল মানসম্মত বইটি সংগ্রহ করতে পারবেন। পরামর্শটি দিলেন ছড়াকার আমিরুল ইসলাম।
শিশুতোষ বই আর অনুবাদ নিয়ে তাঁর ভাষায় ‘স্বেচ্ছাচার চলছে’। বিশেষ করে ভূতের বই নিয়ে চলে রীতিমতো ভৌতিক কাণ্ড। ভূতের গল্পের শত শত বই প্রকাশিত হচ্ছে। কেউ জানে না কার গল্প। যে যার খুশিমতো নাম দিয়ে ছাপিয়ে দিচ্ছে। বাচ্চাদের কাছে ভূত একটি মজার বিষয়। বিক্রিও হচ্ছে এসব বই। অনুবাদের ক্ষেত্রও অনেকটা এমন অবস্থা। কে কার বই অনুবাদ করছে, কোনো ঠিক নেই। একাডেমী এদিকটায় নজর দিতে পারে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
এবার মেলায় ছেলেবেলার ছেলেখেলা নামে তাঁর একটি আত্মজৈবনিক কিশোর কাহিনি প্রকাশিত হয়েছে বাংলা প্রকাশ থেকে। এ ছ০াড়া অনন্যা থেকে আসছে চারটি ছড়ার বই। মেলায় কোনো স্টল কোথায় তার একটি বড় সচিত্র নির্দেশিকাও মেলার মাঠে রাখা প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
নতুন বই: গতকাল সকাল থেকেই মেলা খুলেছিল। বইও এসেছে প্রচুর। তথ্যকেন্দ্রে জমা পড়েছে ১৩৩টি নতুন বইয়ের নাম। এর মধ্যে প্রথমা থেকে এসেছে মার্কিন গবেষক ক্লিন্ট বি সিলির অনন্য জীবনানন্দ: জীবনানন্দ দাশের সাহিত্যিক জীবনী। সেলিনা হোসেনের কিশোর উপন্যাস নদীটির ঘুম ভেঙেছে। স্টলের বিক্রয় প্রতিনিধিরা জানিয়েছেন, এবারের মেলাতেও পুরোনো বইয়ের মধ্যে একাত্তরের চিঠির বিক্রি যথেষ্ট। এ ছাড়া হরিশংকর জলদাশের উপন্যাস রামগোলাম এবং রেজাউর রহমানের বিজ্ঞানবিষয়ক বই টিকটিকি থেকে ডাইনোসর গতকাল ভালো চলেছে।
অন্য বইগুলোর মধ্যে আছে: আগামী থেকে হাসনাত আবদুল হাইয়ের উপন্যাস বৃষ্টিতে কিংবা কুয়াশায়। বিজয় প্রকাশ থেকে সরদার জয়েন উদ্দীনের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক অনেক সূর্যের আশা। মুক্তধারা থেকে তিতাস চৌধুরীর সাহিত্য সমালোচনা জসীম উদ্দীনের রাখালী ও নক্সীকাঁথার মাঠ। বিভাস থেকে সৌমিত্র শেখরের প্রবন্ধ ভাষার প্রাণ ভাষার বিতর্ক। বাংলা প্রকাশ থেকে ড. সফিউদ্দিন আহমেদের প্রবন্ধ রবীন্দ্রনাথ যেখানে নিজেই মল্লিনাথ। অবসর থেকে সৈয়দ লুৎফুল হকের চিত্রকলাবিষয়ক হাজার বছরের ঢাকার চিত্রকলা ঢাকাই মসলিন, আহসান হাবীবের রম্য সমগ্র, ড. মাযহারুল ইসলাম অনূদিত অ্যান্থনী ম্যাসকারেনহাসের প্রবন্ধ বাংলাদেশ লাঞ্ছিতার নতুন সংস্করণ। পার্ল থেকে আনিসুল হকের রম্য প্রিয় পাঠক একটু হাসুন ও বিপ্রদাস বড়ুয়ার উপন্যাস আমি এক টাকা দিয়ে একটি স্বপ্ন কিনেছিলাম। ঐতিহ্য থেকে রিজিয়া রহমানের একত্রে তিনটি উপন্যাস বান্ধবী প্রিয়দর্শিনী ও অন্যান্য। সৈয়দ শামসুল হকের কবিতা ভালবাসার পদাবলী, শেখ আবদুল হাকিমের থ্রিলার টেকনাফ ফর্মুলা, অনু ইসলামের স্মৃতিকথা মুক্তিযুদ্ধ ফিরে দেখা। মিজান পাবলিশার্স থেকে এসেছে হালিম আজাদের উপন্যাস মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক লড়াই।
তিন তরুণের প্রথম উপন্যাস: অ্যাডর্ন পাবলিকেশন গত বছর দেশের তরুণ লেখকদের প্রথম উপন্যাস প্রকাশের উদ্যোগ নেয়। এ লক্ষ্যে পাণ্ডুলিপি আহ্বান করা হয়। অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের নেতৃত্বে একটি বাছাই কমিটি সেই পাণ্ডুলিপির মধ্যে থেকে নির্বাচন করেছে তিনটি উপন্যাস। গতকাল মেলায় এসেছে বই তিনটি। মোস্তাক শরীফের সেদিন অনন্ত মধ্যরাতে, শুভাশিস সিনহার কুলিমানুর ঘুম এবং পরিতোষ হালদারের গাঙপরান। এ ছাড়া এদিন অ্যাডর্ন থেকে এসেছে রেজাউর রহমানের উপন্যাস ফিরে আসা ফিরে যাওয়া।
অন্যান্য বইয়ের মধ্যে আছে বিদ্যা প্রকাশ থেকে মোহিত কামালের উপন্যাস অহনা এবং গল্প পৃথিবীতে কে কাহার, আগামী থেকে সলিমুল্লাহ খানের প্রবন্ধ স্বাধীনতা ব্যবসায়, সন্তোষ গুপ্তের অনিরুদ্ধের কলাম। অন্য প্রকাশ থেকে জ্যোতিপ্রকাশ দত্তের সময় অসময়ের মুক্তিযুদ্ধ, রাবেয়া খাতুনের উপন্যাস দারুচিনি দ্বীপ, মুস্তাফা জামান আব্বাসীর পুড়িব একাকী।
ছুটির দুই দিন পেরিয়ে আজ থেকে আবার মেলার দ্বার খুলবে বিকেল তিনটায়। ভিড় হয়তো কিছুটা কমবে, তবে কেনাকাটার ধারা অব্যাহত থাকলেই হয়।

No comments

Powered by Blogger.