সরকারের ভুলের মাশুল কেন গ্রাহকেরা দেবেন?- বিদ্যুতের তুঘলকি বিল

জনজীবনে বিদ্যুৎ বিলের অপর নাম মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা। এই সরকারের আমলে বিদ্যুতের দাম বেড়েছে চার দফা। কিন্তু বিদ্যুতের বিল-কাঠামোর তুঘলকি পরিবর্তনের জন্য মাসিক বিল বেড়েছে অস্বাভাবিক রকম। মূল্যবৃদ্ধি না সইলেও সওয়াতে হচ্ছে, কিন্তু হঠকারী বিল-কাঠামোর আর্থিক যন্ত্রণা অসহনীয়।


সরকারকে অবশ্যই বিদ্যুতের বিল-কাঠামোকে আগের জায়গায় নিয়ে আসতে হবে। এই খামখেয়ালের মাশুল সাধারণ গ্রাহকেরা কেন দেবেন?
গত মার্চ মাসে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন বিল-কাঠামোও ঘোষণা করে সরকার। আগের নিয়মে সব গ্রাহক যে পরিমাণ বিদ্যুৎই ব্যবহার করুন না কেন, ন্যূনতম ১০০ ইউনিট (কিলোওয়াট ঘণ্টা) জন্য সাধারণ একটি বিলের ব্যবস্থা ছিল। এর বেশি ব্যবহার করলে অর্থাৎ ১০০-২০০ এবং ২০০-৪০০ এবং তার ওপরে ব্যবহূত বিদ্যুতের জন্য আলাদা মূল্য ধার্য করা ছিল। সেই নিয়মে কেবল বেশিটুকুর জন্য বর্ধিত হারে বিল দিতে হতো। নতুন নিয়মে ১০০ পর্যন্ত নিম্নতম স্তর; ১০১ থেকে ৪০০ পর্যন্ত দ্বিতীয় স্তর এবং এর ঊর্ধ্বে তৃতীয় স্তর করা হয়। সমস্যা হলো, এখানে কারও বিদ্যুৎ ব্যবহার দ্বিতীয়, তৃতীয় বা চতুর্থ স্তরে পৌঁছালে ব্যবহূত পুরো বিদ্যুতের দামই শীর্ষ স্তরের বিদ্যুতের মূল্য অনুসারে ধরা হচ্ছে। অর্থাৎ নিম্নতম মূল্যস্তরের (স্লাব) সুবিধা পাওয়ার বিধান আর প্রযোজ্য হচ্ছে না। শুভংকরের ফাঁকিটা ঘটছে এখানেই। এতে বিদ্যুতের বিল বেড়ে যাচ্ছে কয়েক গুণ বেশি। বিদ্যুতের বর্ধিত দামের বাড়তি এই তুঘলকি বিল দেওয়া অধিকাংশ গ্রাহকের পক্ষেই সম্ভব নয়। বিশেষত, যখন বাজারে সবকিছুর দাম আকাশছোঁয়া, সেখানে বিদ্যুতের বিল মানুষকে তড়িতাহত করে ছাড়ছে।
সরকার এখন এই হঠকারী পদ্ধতি বাতিল করে পুরোনো পদ্ধতিতে ফেরার চিন্তা করছে বলে প্রথম আলোর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাহলে কেন বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) বারবার নতুন পদ্ধতিকে সঠিক বলে দাবি করে আসছিল? বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েও যে ভর্তুকি মেটানো যাচ্ছিল না, এ রকম শুভংকরের ফাঁকি দিয়ে সেটা পুষিয়ে নেওয়া অনৈতিক ও বেআইনি। বিদ্যুৎ খাতের নৈরাজ্য, অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি বন্ধ করেই আয় বাড়াতে হবে, গ্রাহকদের ঠকিয়ে নয়।
বিদ্যুতের বিপুল ভর্তুকির জন্য দায়ী কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র। পুরোনো বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো সংস্কার না করে, পুরোনো গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অনর্জিত রেখে, নতুন গ্যাসক্ষেত্র উন্নয়নের ব্যাপারে অবহেলা করে তড়িঘড়ি করে কুইক রেন্টালে ঝুঁকে পড়াকে অর্থমন্ত্রী নিজেই ভুল সিদ্ধান্ত বলে অভিহিত করেছেন। এই ভুলের খেসারত কেন বিদ্যুতের সাধারণ গ্রাহকদের দিতে হবে?
বিইআরসি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল বিদ্যুতের উৎপাদক ও গ্রাহকদের মধ্যে দূরত্ব কমিয়ে আনতে। অথচ প্রতিষ্ঠানটি বেসরকারি বিদ্যুৎ ব্যবসায়ীদের স্বার্থে বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েই চলছে, গ্রাহকদের দুর্দশা কমানোয় তাদের নজর নেই।

No comments

Powered by Blogger.