আলোচনা- শিক্ষা ছাড়া অর্থনৈতিক মুক্তি অসম্ভব by শেখ জাকিয়া নূর

মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যই যে শুধু শিক্ষা দরকার বিষয়টি এমন নয়। হিউম্যান ক্যাপিটাল বা মানব সম্পদ গড়ে তোলা এবং মানুষের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের জন্যও শিক্ষার রয়েছে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। ১৯৯০ সালে থাইল্যান্ডের জমটিএ্যানে 'সবার জন্য শিক্ষা' বিষয়ক যে বিশ্ব সম্মেলন হয়, তাতে বলা হয়েছিল যে, সকল দেশের সকল শিশুর কম করে হলেও প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ পাবার অধিকার রয়েছে।
মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোলস বা সহস্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় সকলের প্রাথমিক শিক্ষা পাবার অধিকার এবং শিক্ষার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে লৈঙ্গিক ন্যায়পরতা (এবহফবৎ ঊয়ঁরঃু) প্রতিষ্ঠার কথা জোরেশোরে বলা হয়েছে। বিশ্বখ্যাত অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন বলেছেন, শিক্ষা মানুষের সক্ষমতা গড়ে তোলে। তার মতে, শিক্ষা মানুষকে অর্থনৈতিকভাবে সক্ষম করে তোলে। এতে সে সমাজে তার নিজস্ব মতামত তুলে ধরতে পারে, পছন্দ করার সক্ষমতা অর্জন করে এবং উন্নত জীবনের অধিকার পায়। অমর্ত্য সেনের কথার সূত্র ধরে বলতে পারি, শিক্ষা হচ্ছে মানব সম্পদ গড়ে তোলার সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার। একটি দেশ তার প্রাথমিক, মাধ্যমিক, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার ওপর যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে দক্ষ মানব সম্পদ গড়ে তুলতে পারে। ঐ মানব সম্পদ তখন দেশের উন্নয়নে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করে।
শিক্ষার অধিক ন্যায়পর বন্টন কম দারিদ্র্য, কম অসমতা ও দ্রুতগতির অর্থনেতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। বিশ্বব্যাংক ২০০১ সালে তাদের শিক্ষাবিষয়ক রিপোর্টে বলেছে, মেয়েদের জন্য অধিক শিক্ষা, শিশুদের স্বাস্থ্য, পরিবারের পুষ্টি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বিদ্যালয়ে উপস্থিতির ক্ষেত্রে ইতিবাচক ফলাফল নিয়ে আসে।
বাংলাদেশের সংবিধানে শিক্ষাবিষয়ক যে ক'টি অনুচ্ছেদ রয়েছে তার দিকে লক্ষ্য করলেও দেখা যাবে যে, শিক্ষার মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন ও মানুষকে ক্ষমতায়িত করার কথা বলা হয়েছে। সংবিধানের ১৭ অনুচ্ছেদে একই পদ্ধতির গণমুখী ও সার্বজনীন শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে যার উদ্দেশ্য হচ্ছে সমাজের প্রয়োজনের সাথে শিক্ষাকে সঙ্গতিপূর্ণ করে তোলা এবং সেই প্রয়োজন সিদ্ধ করার জন্য যথাযথ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও সদিচ্ছা প্রণোদিত নাগরিক সৃষ্টি করা।
কেউ যদি বাংলাদেশ সংবিধানের ১৫, ১৬ ও ১৭ নম্বর অনুচ্ছেদ গভীরভাবে অধ্যয়ন করেন তাহলে দেখতে পাবেন যে, সংবিধান রাষ্ট্রকে এমন একটি শিক্ষানীতি গ্রহণ করতে বলেছে যার লক্ষ্য হবে জনগণ ও দেশের উন্নয়ন ও কল্যাণ। প্রথমতঃ রাষ্ট্রের দায়িত্ব হবে শিক্ষার মাধ্যমে উৎপাদন শক্তির ক্রমবৃদ্ধি সাধন এবং জনগণের জীবনযাত্রার বস্তুগত ও সংস্কৃতিগত মানের দৃঢ় উন্নতি সাধন। দ্বিতীয়তঃ শিক্ষার প্রসারের মাধ্যমে গ্রামীণ জীবনের আমূল রূপান্তর সাধন। তৃতীয়তঃ শিক্ষার মাধ্যমে যথাযথ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ও সদিচ্ছা প্রণোদিত নাগরিক সৃষ্টি। এভাবে শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর জীবনে আসবে বস্তুগত উন্নয়ন, চিন্তা হবে গতিশীল এবং ব্যবহার হবে পরিশীলিত। সামগ্রিকভাবে, শিক্ষানীতির উদ্দেশ্য হবে জনগণের জীবনমানে পরিবর্তন ঘটিয়ে ন্যায়পর সমাজ প্রতিষ্ঠা ও বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করা।
শিক্ষার বিষয়টি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে, যার ইতিবাচক ফলাফল ব্যক্তি, মানুষ, প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রের সকল পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়ে। সেজন্যে শিক্ষার অন্যতম প্রধান মৌলিক মানবাধিকার। শিক্ষার জন্য রাষ্ট্র প্রচুর পরিমাণে ভতর্ুকি দেয়। এতে করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সদস্যরাও শিক্ষা গ্রহণ করার অধিকার পায়। শুধু প্রান্তিক জনগোষ্ঠীই নয়, সমাজের সকল পর্যায়ের মানুষের কাছে শিক্ষা সহজলভ্য হওয়া উচিত। এতে শিক্ষিত ও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মানবসম্পদ গড়ে তোলা সম্ভব হয়। এই প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত জনগোষ্ঠীই রাষ্ট্রের পাবলিক ও প্রাইভেট সেক্টরে উৎপাদনশীল শ্রমশক্তি হিসেবে কাজ করে।
উলেস্নখ করা প্রয়োজন যে, ১৯৯০ সালের পর শিক্ষাক্ষেত্রে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেয়া হয়। ফলে শিক্ষার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে উলেস্নখযোগ্য কিছু অর্জন সম্ভব হয়েছে। পদক্ষেপগুলোর মধ্যে রয়েছেঃ প্রাথমিক শিক্ষা (বাধ্যতামূলক) আইন, ১৯৯০ জারি যা ৬ থেকে ১০ বছরের বাচ্চাদের জন্য প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করে দেয়, পাঠ্যপুস্তকের প্রয়োজনীয় সংশোধন, এনজিও ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন কর্তৃক দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে শিক্ষার প্রসার, ইউনিসেফের সহযোগিতায় প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে নানা পদক্ষেপ গ্রহণ, গ্রাম এলাকায় খাদ্যের বিনিময়ে শিক্ষা কর্মসূচী গ্রহণ, মাধ্যমিক ও তার উধর্্ব পর্যায়ে পড়াশুনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য মেয়েদের আর্থিক সহযোগিতা প্রদান ইত্যাদি।
উপরের পদক্ষেপগুলো গ্রহণের কারণে শিক্ষার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে বাংলাদেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অর্জন করতে সক্ষম হয়। ৬ থেকে ১০ বছর বয়সী বাচ্চাদের মধ্যে এখন শতকরা ৮৭ জন শিক্ষা গ্রহণের জন্য বিদ্যালয়ে যাচ্ছে। ১৯৯০ সালে ৬ থেকে ১০ বছর বয়সী বাচ্চাদের বিদ্যালয়ে যাবার হার ছিল শতকরা ৬০ ভাগ। গত ৭ বছরে উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তির হার দ্বিগুণ হয়েছে। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ঝরে পড়ার হার আগের চেয়ে কমে এসেছে। যারা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয় তাদের মধ্যে তিন-চতুর্থাংশই শিক্ষা সমাপ্ত করছে। শিক্ষার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে ছেলে ও মেয়েদের ভর্তির হার সমান। দক্ষিণ এশিয়ায় শ্রীলংকার পর বাংলাদেশ দ্বিতীয় দেশ হিসেবে এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান বু্যরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০০১ সালে প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষার হার বৃদ্ধি পেয়ে শতকরা ৪৭.৫ ভাগে দাঁড়ায়। পূর্বে এ হার ছিল ২৫.৮ ভাগ। শিক্ষার প্রতি সকল শ্রেণীর মানুষের আগ্রহ আগের চেয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। একটি জাতির জীবনে এ এক শুভলক্ষণ। সচেতনতার এই উন্মেষকে সঠিক পরিকল্পনা দিয়ে এগিয়ে নেয়া গেলে তা মানুষের বস্তুগত জীবনকে যেমন উন্নত করবে, প্রান্তিক মানুষকে যেমন ক্ষমতায়িত করবে, তেমনি ত্বরান্বিত করবে বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়ন।
========================
ভালবাসা নিভিয়ে দেয় হিংসার আগুন  মহান মুক্তিযুদ্ধঃ প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি  রহস্যের পর্দা সরিয়ে দ্যুতিময় এমিলি ডিকিনসন  বেগম রোকেয়াঃ নারী জাগরণের বিস্ময়কর প্রতিভা  শিক্ষারমান ও সমকালীন প্রেক্ষাপট  বিজয় দিবসঃ অর্জন ও সম্ভাবনা  একটি ট্রেন জার্নির ছবি ও মাইকেলের জীবন দর্শন  ডক্টর ইউনূসকে নিয়ে বিতর্ক  উচ্চশিক্ষায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্ভাবনা  বাংলাদেশ ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন  ক্ষুদ্রঋণ ও বাংলাদেশের দারিদ্র্য  শেয়ারবাজারে লঙ্কাকাণ্ড  মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার  শক্ত ভিত ছাড়া উঁচু ভবন হয় না  ট্রেন টু বেনাপোল  বনের নাম দুধপুকুরিয়া  নথি প্রকাশ অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার অ্যাসাঞ্জের  ছিটমহলবাসীর নাগরিক অধিকার  শিক্ষা আসলে কোনটা  জীবন ব্যাকরণঃ হিরালি  ন্যাটো ও রাশিয়ার সমঝোতা ইরানের ওপর কি প্রভাব ফেলবে  জার্নি বাই ট্রেন  পারিষদদলে বলেঃ  চরাঞ্চলের ভূমি ব্যবস্থাপনা  সচেতন হলে শিশু প্রতিবন্ধী হয় না  স্মৃতির জানালায় বিজয়ের মাস  বিচারপতিদের সামনে যখন ‘ঘুষ’  কয়লানীতিঃ প্রথম থেকে দশম খসড়ার পূর্বাপর  শ্বাপদসংকুল পথ  মুক্তিযুদ্ধে গ্রাম  ১২ বছর আগে বিষয়টি নিষ্পত্তি হয়েছে  চট্টগ্রাম ইপিজেডে সংঘর্ষে নিহত ৪  ড. ইউনূস : প্রতিটি বাংলাদেশির গৌরব  জলাভূমিবাসীদের দুনিয়ায় আবার..  আসুন, আমরা গর্বিত নাগরিক হই  স্মৃতির শহীদ মির্জা লেন  ইয়াংওয়ান গ্রুপের পোশাক কারখানা বন্ধ  ট্রানজিটে ১১ খাতের লাভ-ক্ষতির হিসাব শুরু  চট্টগ্রামের বনাঞ্চল ছাড়ছে হাতি  ট্রেন  স্বপ্নের সিঁড়ি বেয়ে জাতীয় শিক্ষানীতি


দৈনিক ইত্তেফাক এর সৌজন্যে
লেখকঃ শেখ জাকিয়া নূর
সহকারী অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, নারায়ণগঞ্জ সরকারি মহিলা কলেজ


এই আলোচনা'টি পড়া হয়েছে...
free counters

No comments

Powered by Blogger.