মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন-অতীতমুখিতা নাকি ভবিষ্যতের আবাহন by হ্যারল্ড মেয়ার্সন

২০১২ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন মূলত আমাদের ভবিষ্যৎ এবং অতীতের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা। বারাক ওবামার আমেরিকা আসলে ভবিষ্যৎ আমেরিকারই রূপকল্প। অন্যদিকে, রমনির আমেরিকা কেবল অতীতেই সেঁটে আছে।


এই দু'জন প্রতিদ্বন্দ্বীর মধ্যে পার্থক্যটা বিরাট। শীতলযুদ্ধ অবসানের পর থেকে এ পর্যন্ত যতগুলো মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, তার মধ্যে এবারের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট এবং রিপাবলিকান প্রার্থীদ্বয়ের মধ্যে পার্থক্যটা যথেষ্ট।
জনসমর্থনের দিক থেকে অবশ্য দুই প্রতিদ্বন্দ্বীর সমর্থন ভিত্তিটা তেমন এগোনো-পেছানো নয়। পিউরিসার্স সেন্টারের সোমবারের জরিপের ফলে দেখা যাচ্ছে, ওবামা ৩০ বছরের কম বয়সী অপেক্ষাকৃত তরুণ ভোটারদের মধ্যে রমনির চেয়ে অনেক এগিয়ে রয়েছেন। ওবামা এ ক্ষেত্রে রমনির চেয়ে ২১ শতাংশ ভোটে এগিয়ে রয়েছেন। ওবামা অনেকটা পিছিয়ে রয়েছেন ৩০ থেকে ৪৪ বছর বয়সী ভোটারদের মধ্যে। এখানে তিনি রমনির চেয়ে ৬ শতাংশ ভোটে পিছিয়ে রয়েছেন। আবার ৪৪ থেকে ৬৪ বছর পর্যন্ত বয়সী ভোটারদের মধ্যে ওবামা ও রমনির অবস্থান সমান সমান। রমনির নৌকাকে যারা এখনও ঠেলে চলেছে, তারা হলো বুড়ো-বুড়িরা। এই ৬৫ বছর থেকে আরও বেশি যাদের বয়স, তাদের সমর্থনের পাল্লাটা ওবামার তুলনায় রমনির প্রতি বেজায় বেশি। এখানে রমনি তার প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে ১৯ শতাংশ বেশি ভোটে এগিয়ে রয়েছেন।
বয়সের বিষয়টি যদিও নির্বাচনী ফলাফলের ব্যাপারে একেবারে নির্ধারক_ এটা এখনই বলা যাচ্ছে না। তবে গে, লেসবিয়ান রাইট; পুঁজিবাদের মেরিট নিয়ে সন্দেহ ইত্যাদি বিষয়ে বয়স্কদের চেয়ে অপেক্ষাকৃত তরুণদের অব্যাহতভাবে অনেক বেশি সহনশীল দেখানো হয়েছে জরিপে। এসব ব্যাপারে বাম পন্থায় তরুণ-যুবাদের আকর্ষণ।
আমাদের অতীত থেকে ভবিষ্যৎকে পৃথক করে দেখানোর ক্ষেত্রে বয়স একমাত্র নির্ণায়ক নয়। এ ক্ষেত্রে বর্ণ বিষয়টি উল্লেখ করা যায়। মার্কিন জাতি প্রতি বছরই বর্ণগতভাবে বেশি বেশি মিশ্র রূপ ধারণ করছে। পুরোপুরি শ্বেতাঙ্গ রূপ কমছে। ২০০০ সালের লোকগণনা রিপোর্টে যেখানে মার্কিন জনসংখ্যার ৬৯ দশমিক ১ শতাংশকে শ্বেতাঙ্গ দেখানো হয়, সেখানে ২০১০ সালে এই হার ৬৩ দশমিক ৭ শতাংশে নেমে আসে বলে জরিপে দেখানো হয়েছে। হিসপ্যানিক জাতিগোষ্ঠীর মানুষের হার এই একই সময় ১২ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৬ দশমিক ৩ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। গড়পড়তা হিসাব করতে গেলে, মোট শ্বেতাঙ্গ মানুষের সংখ্যা উক্ত এক দশকে যেখানে ১ দশমিক ২ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, সেখানে কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের মোট সংখ্যা ১২ দশমিক ৩ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। আর হিসপ্যানিকরা বেড়েছে মোট সংখ্যার দিক দিয়ে সর্বোচ্চ ৪৩ শতাংশ। জনসংখ্যাবিদরা বলেছেন, ২০৫০ সাল নাগাদ যুক্তরাষ্ট্রে শ্বেতাঙ্গ জনসংখ্যা ৫০ শতাংশের নিচে নেমে আসবে। আমেরিকা ক্রমবর্ধমান সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে অ্যাড্রেস না করে রমনি এবং তার দল রিপাবলিকান পার্টি শ্বেতাঙ্গদেরই পায়রোবি করছে। যেমন, যারা সন্তান হিসেবে এসে এখন আনডকুমেন্টেড অভিবাসীরূপে রয়েছে, তাদের বৈধ নাগরিকত্ব দেওয়ার বিরোধিতা করছেন রমনি ও তার দল। তারা এ ব্যাপারে আইন করাকে সমর্থন দিতে অস্বীকার করেছেন। এটা হিসপ্যানিক জনগোষ্ঠীর একটি প্রধান দাবি। অথচ এই আইনটা হলে তারা কাগজপত্র নিয়ে বিভিন্ন রাজ্যে বৈধ অভিবাসনের জন্য আবেদন করতে পারত। রিপাবলিকানরা এখনও যুক্তরাষ্ট্রে সাদাদের প্রাধান্যকে তাদের ধ্যানজ্ঞান করেছে। কারণ তারা মনে করছে, শ্বেতাঙ্গদের খুশি করতে পারলেই তাদের চলবে। তারা শ্ব্বেতাঙ্গ ভোটে জিতে হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসের আসনখানিতে বসতে চায়। গত সপ্তাহে এই বর্ণ পার্থক্যের ওপর ওয়াশিংটন পোস্টের এক জরিপে দেখা গেছে, দুই প্রেসিডেন্ট প্রতিদ্বন্দ্বীর সমর্থনের বেলায় বর্ণগত বিরাট পার্থক্য রয়েছে। রমনিকে শ্বেতাঙ্গদের ৬০ শতাংশ যেখানে সমর্থন করছে, সেখানে সংখ্যালঘু ভোটারদের ৮০ শতাংশ ওবামাকে সমর্থন দিচ্ছে। বস্তুত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী সমর্থনের বেলায় ১৯৮৮ সালের নির্বাচন থেকেই এ ধরনের বর্ণ পার্থক্য চলে আসছে। এবার দেখা যাচ্ছে, শেষ পর্যন্ত তিন-চতুর্থাংশ হিসপ্যানিক ভোটার ওবামার পক্ষে চলে গেলে আশ্চর্যান্বিত হওয়ার কিছুই থাকবে না। রিপাবলিকানদের সমস্যাটা হলো, ২৪ বছর আগে যেমনটা ছিল এখন কিন্তু সংখ্যালঘু ভোটের হার একই অবস্থায় নেই। দ্রুত সংখ্যালঘু ভোটের হার বেড়ে চলেছে এবং অনেকটা জয়-পরাজয়ে নির্ধারক ব্যারোমিটার হয়ে দেখা দিচ্ছে।
সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াকার বুশ অবশ্য রিপাবলিকানদের এ ধরনের সংখ্যালঘুবিরোধী মনোভাব পরিবর্তনের চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু কে শোনে কার কথা! রক্ষণশীলতাই যেখানে রিপাবলিকানদের আদর্শ, সেখানে তারা সংখ্যালঘুর স্বার্থের পক্ষে যেতে পারে কী করে! তারা বরং আরও বেশি করে পরদেশিরা তাদের সভ্যতাকে গ্রাস করে নিচ্ছে_ এ ধরনের প্রচারণাকে আঁকড়ে ধরে আছে। রক্ষণশীলদের প্রচারযন্ত্র নামে কথিত ফক্স নিউজে সংখ্যালঘুদের খাটো করে দেখানোসহ নানা উপায়ে বিষোদ্গার এখনও অব্যাহত আছে। বহিরাগতদের শত্রু হিসেবে দেখানো হয় এবং সেইমতো চরিত্রও সৃজন করা হয়।
রিপাবলিকানরা এবার সত্যি সত্যি যদি ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য ব্যগ্র হয়ে থাকে, তাহলে তাদের অবশ্যই কিছু ইতিবাচক কাজ করতে হবে। যেমন, রমনিকে অভিবাসন সংক্রান্ত তার দলের অবস্থান পুরোপুরি পরিবর্তনের জন্য আহ্বান জানাতে হবে। এর অর্থ দাঁড়ায় ভবিষ্যৎকে অ্যাড্রেস করা।
বৈচিত্র্য ও আধুনিকতাকে বরণ করে নেওয়া অবশ্য রিপাবলিকানদের ধাতে নেই। এখনকার রিপাবলিকানরা বৃহদাংশে নিজেদের ধর্মীয় রক্ষণশীলতার গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ করে ফেলেছে। রিপাবলিকানদের পক্ষে বিজ্ঞানীদের সমর্থনও অনেক কমে গেছে। ২০০৯ সালের পিউ জরিপে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠিত বিজ্ঞানীদের মাত্র ৬ শতাংশ রিপাবলিকানদের সমর্থন করে। বিজ্ঞানীদের ৫৫ শতাংশ ডেমোক্রেটিক পার্টিকে সমর্থন করে। রিপাবলিকান পার্টিকে যারা চাঁদা দেয়, তাদের মধ্যে অনেক কমসংখ্যক ব্যবসায়ী রয়েছেন, যাদের উৎপাদনশীল সেক্টরের প্রবৃদ্ধিতে প্রত্যক্ষ অবদান রয়েছে। তাদের অনেকেই ক্যাসিনো জুয়া, ওয়ালস্ট্রিটে জড়িত। সিলিকন ভ্যালি ডেমোক্র্যাটদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। সম্ভবত এ কারণেই রিপাবলিকান সিইওরা ওবামা বিজয়ী হলে এবার কারখানায় তালা পড়বে বলে মিছে ভয় দেখাতে পারছেন ভোটারদের। রমনি জিতলে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাবে_ এ প্রতিশ্রুতি কি একজন রিপাবলিকানও দিতে পারবেন? আগামী সপ্তাহের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দুই আমেরিকা মুখোমুখি হবে। এর একদিকে থাকবে ভবিষ্যৎকে আবাহন করতে আগুয়ান ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ওবামা; অন্যদিকে থাকবেন অতীতমুখী রিপাবলিকান প্রার্থী রমনি।

ওয়াশিংটন পোস্ট থেকে ভাষান্তর
সুভাষ সাহা

No comments

Powered by Blogger.