১২তম আন্তর্জাতিক স্বল্প দৈর্ঘ্য ও মুক্ত চলচ্চিত্র উৎসব- মুক্ত চলচ্চিত্রের আলো

তখন আশির দশক। নতুন ধারার চলচ্চিত্র নির্মাণে উৎসাহী একদল তরুণের উদ্যোগে গঠিত হলো বাংলাদেশ শর্ট ফিল্ম ফোরাম। পরে এই সংগঠনের আয়োজনে ১৯৮৮ সালে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হলো আন্তর্জাতিক স্বল্প দৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র উৎসব।


বিকল্প ধারার মুক্ত সিনেমার বাতাবরণটি নতুনভাবে বেগবান হলো যেন। সেই সময় ওই উৎসবের কর্ণধার ছিলেন প্রথিতযশা চলচ্চিত্রনির্মাতা আলমগীর কবির। তাঁর সহযোগী ছিলেন সেদিনের তরুণ চলচ্চিত্রকর্মী মোরশেদুল ইসলাম, তানভীর মোকাম্মেল ও তারেক মাসুদ। প্রথম আয়োজনের পর থেকে এক বছর পর পর নিয়মিতভাবেই চলেছে উৎসবটি। আর এর ধারাবাহিকতায় শর্ট ফিল্ম ফোরামের উদ্যোগে এ বছরও শুরু হতে যাচ্ছে ১২তম আন্তর্জাতিক স্বল্প দৈর্ঘ্য ও মুক্ত চলচ্চিত্র উৎসব, যেখানে শারীরিকভাবে অনুপস্থিত থেকেও প্রয়াত চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ ও মিশুক মুনীর যেন-বা এই পুরো আয়োজনের অন্যতম অঙ্গ হয়ে থাকছেন। কেননা, এবারের উৎসবটি উৎসর্গ করা হয়েছে একসময়ের নতুন ধারার চলচ্চিত্র নির্মাণ আন্দোলনের কর্মী, প্রয়াত চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ ও চিত্রগ্রাহক মিশুক মুনীরকে। তা ছাড়া এই উৎসবে তারেক মাসুদ নির্মিত চলচ্চিত্রগুলোর রেট্রোস্পেকটিভের পাশাপাশি তাঁর নামে একটি পুরস্কার প্রবর্তন করা হচ্ছে। চলচ্চিত্রে বিশেষ অবদানের জন্য একজন ব্যক্তিকে এই পুরস্কার দেওয়া হবে বলে জানা গেছে।
‘ফ্রি সিনেমা, ফ্রি এক্সপ্রেশন’ শিরোনামে উৎসবটি আগামী ১৩ ডিসেম্বর শুরু হয়ে চলবে ১৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত। ফলে সাত দিনব্যাপী উৎসবে ৩০টি দেশের ২০০ চলচ্চিত্র দেখার জন্য অধির আগ্রহে অপেক্ষা করছেন চলচ্চিত্রকর্মীরা। ওদিকে উৎসব ঘিরে উৎসাহী চলচ্চিত্রবোদ্ধাদের মধ্যেও চলছে সাজ সাজ রব।
মুক্ত চলচ্চিত্র ও মুক্ত প্রকাশের এই উৎসব অন্যবারের চেয়ে এবার আরও বর্ণিল হয়ে উঠেছে নানা বৈচিত্র্যময়তায়। এশিয়ার ১০-১২টি দেশের সাম্প্রতিকতম চলচ্চিত্র প্রদর্শনের মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো এটি যেমন মুক্ত ও বিকল্প ধারার এশীয় সিনেমার সর্ববৃহৎ প্রদর্শনীর আয়োজন, তেমনই আফ্রিকান সিনেমার বিশেষ প্রদর্শনী ‘ফোকাস অন আফ্রিকান সিনেমা’, সম্প্রতি প্রয়াত ফরাসি চলচ্চিত্রকার ক্রিস মার্কারের পাঁচটি চলচ্চিত্রের প্রদর্শনী, নেপালের ফিল্ম সাউথ এশিয়া প্রামাণ্যচিত্র উৎসবের সর্বশেষ আয়োজনের নির্বাচিত চলচ্চিত্রের বিশেষ প্রদর্শনী, সেমিনারসহ নানা কারণেই এবারের উৎসবটি বৈচিত্র্যময়।
১২তম উৎসব আয়োজনে এ বছর কেন্দ্রীয় গণগ্রন্থাগার, জাতীয় জাদুঘর ছাড়াও বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমীকেও ভেন্যু হিসেবে নির্বাচন করা হয়েছে। এ ছাড়া ব্রিটিশ কাউন্সিল, রাশিয়ান কালচারাল সেন্টার ও আলিয়ঁস ফ্রঁসেজেও চলচ্চিত্র প্রদর্শনী এবং বিভিন্ন আয়োজন থাকবে।
প্রথমবারের মতো শিল্পকলা একাডেমীকে উৎসবকেন্দ্র হিসেবে নির্বাচন করা প্রসঙ্গে আয়োজকেরা বলেন, ‘আমরা আয়োজনকে ঢাকার বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে দিতে চাই। শিল্পকলা একাডেমী আমাদের সংস্কৃতিচর্চার একটা বড় মঞ্চ। এই উৎসবের সঙ্গে শিল্পকলা একাডেমীর সংযুক্তির মাধ্যমে উৎসবটি নতুন ব্যাপ্তি পাবে।’
এদিকে এই উৎসবে চলচ্চিত্র প্রদর্শনীর সঙ্গে সঙ্গে থাকছে বেশ কয়েকটি সেমিনার। এবার আলমগীর কবির স্মারক বক্তৃতায় ‘এশিয়ান ইনডিপেনডেন্ট সিনেমার সাম্প্রতিক প্রবণতা’ বিষয়ে আলোচনা করবেন ফিলিপাইন সিনেমালয়া চলচ্চিত্র উৎসবের পরিচালক নেস্টর জার্ডিন। তা ছাড়া ‘দক্ষিণ এশীয় সিনেমায় নারীর উপস্থাপন’ শীর্ষক বিশেষ সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন দিল্লির জামিয়া মিলিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা সোহানি ঘোষ।
অন্যদিকে উৎসব উপলক্ষে ফ্রান্স, রাশিয়া, ইংল্যান্ড, ফিলিপাইন, কানাডা ও ভারত থেকে চলচ্চিত্র নির্মাতা এবং চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্বরা ঢাকায় আসবেন বলে জানা গেছে।
এবারের উৎসব-পরিচালক এন রাশেদ চৌধুরী উৎসব প্রসঙ্গে বলেন, ‘মুক্ত এবং নতুন ধারার চলচ্চিত্র নির্মাণের অভিপ্রায়েই একদিন আমরা এই উৎসব শুরু করেছিলাম। এবারের উৎসবের বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে সেই ধারা এবং বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্প আরও শক্তিশালী হবে আশা করি।’
বিভিন্ন দেশের চলচ্চিত্র প্রদর্শনীসহ নানা আয়োজনে ১২তম আন্তর্জাতিক স্বল্প দৈর্ঘ্য ও মুক্ত চলচ্চিত্র উৎসবে মুক্ত সিনেমার আবহ-আমেজে আর অল্প কয়েক দিনের মধ্যে ঝলমলিয়ে উঠবে ঢাকা। এখন শুধুই অপেক্ষা...। উৎসব সম্পর্কে আরও জানতে ভিজিট করুন http://isiff-bd.org/

No comments

Powered by Blogger.