ভুল ছবির ভয়ানক কাণ্ড

‘২০০৯ সালের ২১ জুন। সকালে অফিসে গিয়ে আমার ফেসবুক অ্যাকাউন্ট খুলি। এতে ৬৭টি ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট ছিল। পরবর্তী কয়েক ঘণ্টার মধ্যে আরও ৩০০ রিকোয়েস্ট আসে। তখনো আমি জানি না যে আমার নাম ও ছবি ওয়েবসাইটগুলোতে ঘুরছে। টিভির সংবাদ পাঠকদের মুখে ফিরছে খবর।’


বিড়ম্বনা ও দুর্ভোগে পড়ার সেই ব্যতিক্রমী ঘটনার কথা বলতে গিয়ে এভাবেই শুরু করেন ইরানি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক নেদা সুলতানি।
সন্ধ্যার দিকে অজানা এক ব্যক্তির কাছ থেকে আসা এক ই-মেইল বার্তার মাধ্যমে নেদা জানতে পারেন তাঁকে চমকে দেওয়া সেই খবর। খবরটি হচ্ছে, ‘আগের দিন তেহরানে বিক্ষোভ চলাকালে আমার নামের সঙ্গে মিল থাকা নেদা আগা সুলতানা নামের এক নারী নিহত হয়েছেন।’ আরও পরে তিনি জানতে পারেন, ওই মৃত নারীর ছবির স্থলে বিভিন্ন গণমাধ্যমে তাঁর ছবি দেখানো হচ্ছে।
তেহরানে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যের শিক্ষক ছিলেন নেদা সুলতানি। ছিল মর্যাদাপূর্ণ এক জীবন। কিন্তু একজন নিহত নারীর ছবির স্থলে তাঁর ছবি প্রকাশিত হওয়ায় সে জীবন রাতারাতি দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। ১২ দিনের মধ্যে দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন তিনি।
বাড়ি ফিরে নেদা শিক্ষার্থী, সহকর্মী, বন্ধু ও স্বজনদের কাছ থেকে অনেক ফোন কল পান। তাঁরা জানান, সিএনএন, ফক্স নিউজ, ফার্সি ও ইরানি অনেক টিভি চ্যানেলে নিহত আগা সুলতানার খবরের সঙ্গে তাঁর ছবি প্রচার করা হচ্ছে। ফেসবুক থেকে নেওয়া হয় তাঁর এই ছবি।
বিষয়টি জানার পর নেদা ফেসবুকে তাঁর বন্ধুদের জানান, নিহত ওই নারীর খবরের সঙ্গে ভুল করে তাঁর ছবি দেওয়া হয়েছে। তাঁর বন্ধুর তালিকায় থাকা অনেক ব্লগার বিষয়টি আপডেট করলেও অনেক বিদেশি সাংবাদিক তা আমল দেননি। উল্টো তাঁর ছবি ব্যবহার করে গেছেন।
এ ঘটনায় কঠোর নিন্দায় ভরা অনেক বার্তা আসে নেদার কাছে। এসব বার্তায় তাঁকে ইরানি চর হিসেবে তিরস্কার করা হয়। বলা হয়, প্রকৃত বীরাঙ্গনার ছবি বিকৃত করতে তিনি ইরানি কর্তৃপক্ষের হয়ে এই কৌশল বেছে নিয়েছেন।
পরে অবশ্য আগা সুলতানার পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁর আসল ছবি প্রকাশ করা হয়। কিন্তু ততক্ষণে নেদার ছবিই আগার ছবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়।
এদিকে আগা সুলতানা বিরোধীদের কাছে বীরাঙ্গনার মর্যাদায় অধিষ্ঠিত হন। এতে সরকারবিরোধীদের বিক্ষোভে নেদার ছবি আগার ছবি হিসেবে ব্যবহূত হতে থাকে। ফেসবুক থেকে নেওয়া সাধারণ একটি ছবি যে কীভাবে এত বড় এক বিড়ম্বনা ডেকে আনল, তা ভাবতে গিয়ে ভিরমি খাওয়ার জোগাড় নেদার।
বিক্ষোভকারীরা যখন আগার জায়গায় নেদার ছবিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করত, ঘরে বসে তা দেখে নেদার মনে হতো যেন নিজের মৃত্যু-পরবর্তী ধর্মীয় অনুষ্ঠান দেখছেন তিনি।
এদিকে আগা সুলতানার মৃত্যু নিয়ে সারা বিশ্বে বিতর্কের মুখে পড়ে ইরান। তাই ঘটনার তিন দিন পর গোয়েন্দা মন্ত্রণালয় থেকে নেদার সঙ্গে যোগাযোগ করে তাঁকে দেখা করতে বলা হয়। গোয়েন্দা বিভাগ তাঁকে আগা সুলতানা হিসেবে হাজির করে দেখাতে চায় তিনি জীবিত।
কিন্তু নেদা এতে রাজি না হওয়ায় একজন এজেন্ট বলেন, ‘তুমি আমাদের জন্য কাজ করতে রাজি না হলে দেশের নিরাপত্তা প্রশ্নের সম্মুখীন হতে পারে।’
এ পরিস্থিতিতে বিপদে পড়ার আশঙ্কায় নেদার সঙ্গে তাঁর অনেক বন্ধু ও সহকর্মী যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। এমনকি তাঁর প্রেমিকও। তবে কয়েকজন বন্ধু তাঁকে সহযোগিতা করার চেষ্টা করলেও নেদা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। একপর্যায়ে দেশ ছেড়ে পালানোর কথা ভাবেন তিনি।
বন্ধুদের সহায়তায় নেদা সুলতানি বিমানবন্দরের এক কর্মকর্তাকে ১১ হাজার ইউরো ঘুষ দিয়ে দেশ থেকে পালিয়ে যান। প্রথমে তিনি তুরস্কে গিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় প্রার্থনা করেন। এরপর তিনি গ্রিস ও পরে জর্জিয়ায় আশ্রয় নেন।
জর্জিয়ায় আশ্রয় শিবিরে থাকা নেদা সুলতানি বলেন, আশ্রয়শিবিরে থাকা হলো বাতাসে উড়ে বেড়ানো পাতার মতো।
পশ্চিমা গণমাধ্যমের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করে নেদা সুলতানি বলেন, ‘পশ্চিমা গণমাধ্যম সত্যি ঘটনা জানার পরও আমার ছবি ব্যবহার করেছে। তারা জেনেশুনে আমাকে এমন বিপদে ফেলেছে।’
এর পরও অবশ্য দমে যাননি নেদা। স্বাভাবিক জীবনে আবার ফিরে যাওয়ার স্বপ্ন দেখছেন তিনি। বিবিসি অনলাইন।

No comments

Powered by Blogger.