আইনমন্ত্রীর ওপর আক্রমণ-সরকারকে কঠোর হতেই হবে

দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যে দ্রুত অবনতির দিকে যাচ্ছে, সে কথা বোধ হয় নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। অন্যভাবে বলা যায়, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতিশীল করার জোর চেষ্টা চলছে।


ফলে গত কয়েক দিনের ঘটনায় যেকোনো নাগরিকের আতঙ্কিত বোধ করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। কেরানীগঞ্জে শিশু পরাগের অপহরণ ও মুক্তিপণের বিনিময়ে মুক্তি, সদরঘাটে ড্রামের ভেতর থেকে যুবকের খণ্ডিত লাশ উদ্ধার এবং রাজধানীর প্রাণকেন্দ্রে আইনমন্ত্রীর গাড়িবহরে হামলার পর সাম্প্রতিক কোনো ঘটনাকেই এখন আর বিচ্ছিন্ন বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। বিচ্ছিন্ন ঘটনা অভিহিত করে সরকারের দায়িত্বশীল কোনো ব্যক্তির দায় এড়ানোর চেষ্টা প্রকৃত অবস্থার আরো অবনতি ঘটাবে মাত্র। সংশ্লিষ্ট সবাইকে এখন কঠোর হাতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সাম্প্রতিক এই অবনতি এক দিনে হয়নি। রাজনৈতিক অস্থিরতা বৃদ্ধি এবং মানবিক মূল্যবোধ হারিয়ে যাওয়ার কারণে নৃশংসতা আর নির্মমতাই যেন এ সমাজে স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়াচ্ছে। মূল্যবোধের অবক্ষয়ে পারিবারিক বন্ধন শিথিল হয়ে যাওয়ায় বাড়ছে অপরাধপ্রবণতা। চিহ্নিত অপরাধী চক্র থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি চলে যাচ্ছে নিয়ন্ত্রণের বাইরে। কাজেই কোনো ঘটনাকেই এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলা যাবে না।
এমনও প্রশ্ন দেখা দিচ্ছে, নেপথ্যের কোনো মহল তাদের অশুভ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে এসব নৃশংস কার্যকলাপ একের পর এক চালিয়ে যাচ্ছে না তো? মুক্তিপণ দিয়ে হলেও অপহৃত শিশু পরাগকে খুঁজে পাওয়া গেছে। ড্রামে লাশ হয়ে থাকা যুবকের পরিচয় অজ্ঞাতই রয়েছে। ওদিকে রাজধানীতে আক্রমণের শিকার হয়েছে আইনমন্ত্রীর গাড়িবহর। মন্ত্রী বলেছেন, তিনিই ছিলেন আক্রমণকারীদের টার্গেট।
রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, অতীতেও সরকারের শেষ সময়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। বেড়েছে রাজনৈতিক অস্থিরতা। সেই অবনতিশীল পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে দেশে অরাজকতা বেড়ে যাওয়ায় মনে হচ্ছে চিহ্নিত মহল দেশের মধ্যে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চাইছে। শিশু পরাগ অপহরণের ঘটনাকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী 'বিচ্ছিন্ন ঘটনা' বললেও আইনমন্ত্রীর গাড়িবহরে হামলার পর কোনো কিছুই আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা থাকছে না। আইনশৃঙ্খলাব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলে যেন দেশে চূড়ান্ত অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সার্বিক অবনতির ধারাবাহিকতার ফল হিসেবেই আক্রান্ত হয়েছেন আইনমন্ত্রী। এই হামলা একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনারই অংশ হতে পারে। দেশে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারপ্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত ও বানচাল করার ষড়যন্ত্র এখন সবার কাছেই 'দিবালোকের মতো স্পষ্ট'। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর থেকে জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতারা কারাগারে। বিচারপ্রক্রিয়া যখন শেষ পর্যায়ে এবং কয়েকজন যুদ্ধাপরাধীর বিচারের রায় ডিসেম্বরেই দেওয়া হতে পারে- এমন জল্পনা চলছে, তখন জামায়াত ও এর ছাত্রসংগঠন দেশের বিভিন্ন স্থানে পরিকল্পিত হামলা চালাচ্ছে। তারই ধারাবাহিকতায় আইনমন্ত্রী আক্রান্ত হয়েছেন। কারণ আইন মন্ত্রণালয় যুদ্ধাপরাধীদের বিচারপ্রক্রিয়া নিশ্চিত করেছে। পুলিশের ওপর হামলা চালিয়ে জামায়াত এই সুশৃঙ্খল বাহিনীর মনোবল ভেঙে দিতে চাইছে। সরকারকে এ ব্যাপারে সজাগ হতে হবে।
রাষ্ট্রের দায়িত্ব নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে যেমন কঠোর হতেই হবে, তেমনি রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির সব অপচেষ্টা দমন করতে হবে কঠোর হাতে। আমরা চাই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি রোধকল্পে সরকার কঠোর হবে, দৃঢ় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

No comments

Powered by Blogger.