তিস্তা সেতু-আর কতবার উদ্যোগ নিতে হবে? by তুহিন ওয়াদুদ

প্রান্তিক দুই জেলা কুড়িগ্রাম এবং লালমনিরহাটের সঙ্গে সারাদেশের সড়কপথের যোগাযোগ উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রথমবারের মতো ২০০১ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেতুটির কাজ উদ্বোধন করেন। সরকার পরিবর্তনের ফলে চারদলীয় জোট সরকার ক্ষমতায় এসে সেতুর নির্মাণকাজ বন্ধ করে দেয়।


চারদলীয় জোট সরকার সেতুর কাজ বন্ধ করলেও রাজনৈতিক সুবিধা পাওয়ার লক্ষ্যে ২০০৬ সালে দ্বিতীয়বারের মতো সেতুটির কাজ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া নতুন করে উদ্বোধন করেন।
কুয়েত ফান্ড ফর আরব ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে ৮৭ কোটি ৬ লাখ ৪ হাজার ৩৬ টাকা তিস্তা সেতু নির্মাণ ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল। এর মধ্যে কুয়েতের রয়েছে ৮৫ শতাংশ এবং বাংলাদেশের ১৫ শতাংশ। এ পর্যন্ত সেতুটির প্রায় ৭৮ ভাগ কাজ হয়েছে। বর্তমানে সেতুটি শেষ করতে আরও প্রায় ৩৫ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। অতিরিক্ত টাকার অংশ কুয়েত বহন করবে কিনা তা অনিশ্চিত।
অবশেষে সেতুর কাজ শুরু হয়েছিল ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বরে। কথা ছিল ২০০৯ সালের সেপ্টেম্বরে কাজ শেষ হবে। কিন্তু কাজ শেষ হয়নি। ২০১০ সালের জুন পর্যন্ত মেয়াদ বাড়িয়ে তৃতীয়বারের মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়। তাতেও কাজ শেষ হয়নি। চতুর্থবারের মতো মে ২০১১-এর মধ্যে কাজ শেষ করার জন্য সময় বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। এই সময়েও তিস্তা সেতুর কাজ শেষ হচ্ছে না। ঠিকাদার ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় বাড়ানোর জন্য আবেদন করেছে। এ নিয়ে তিস্তা সড়ক সেতুর কাজ শেষ করার জন্য পাঁচবার উদ্যোগ নেওয়া হলো। জনগুরুত্বপূর্ণ একটি সেতুর কাজ বারবার করে পিছিয়ে যাবে এ ঘটনা খুবই হতাশাব্যঞ্জক। এ সেতুটি না হওয়ার কারণে প্রতিদিন লাখ লাখ মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রেল সেতুর ওপর দিয়ে যাতায়াত করে। তিস্তা রেল সেতুটি নির্মাণের ১০০ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। মেয়াদোত্তীর্ণ সেতুটি নির্মিত হয়েছিল শুধুই রেল যোগাযোগের জন্য। কিন্তু রেললাইনের পাশে কাঠের স্লিপার বসিয়ে বাস যোগাযোগের একটি পথ নির্মাণ করারও প্রায় চার দশক হয়েছে। পথটিতে একসঙ্গে দু'দিক থেকে কোনো যানবাহন যাওয়া-আসা করতে পারে না। সেতুর একদিক বন্ধ করে দিয়ে আর একদিকের গাড়ি যাওয়া-আসা করে। যখন ট্রেন আসে তখন দু'দিকের বাস চলাচল বন্ধ হয়। তৈরি হয় বাস, ট্রাকসহ সড়কপথের শত শত গাড়ির দীর্ঘ লাইন। কখনও আধঘণ্টা থেকে দেড় ঘণ্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় ছোট সেতুটি পাড়ি দেওয়ার জন্য। ট্রেনজনিত কারণ ছাড়াও যেহেতু একদিকের পথ বন্ধ করে আর একদিকের পথ খুলে দেওয়া হয়, ফলে কোনো অবস্থাতেই আধঘণ্টার কম সময়ে সেতুটি পার হওয়া দুরূহ ব্যাপার। রেললাইনের পাশে যে কাঠের স্লিপার বসানো থাকে সেগুলো নতুন করে বসানোর দিন কয়েকের মধ্যে নষ্ট হতে থাকে। কখনও কখনও সেই কাঠের স্লিপার এত খারাপ হয়ে যায় যে সড়কপথে যোগাযোগ কয়েক ঘণ্টা বন্ধ রেখে সড়কপথ উপযোগী করে তুলতে হয়। প্রায় দিনই কাঠের স্লিপার ভেঙে বাস কিংবা ট্রাকের চাকা আটকে যায়, তখন যাত্রীদের ভোগান্তির অন্ত থাকে না। রাত ১০টা কিংবা ১১টার পর প্রায় দিনই যখন যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়ে এ সেতুর সংস্কারের কাজ চলতে থাকে তখন সবচেয়ে অসুবিধা হয় রোগীদের। অ্যাম্বুলেন্সে রোগীর অপেক্ষা করতে হয় কখন সেতুটির কাজ শেষ হবে। তারপর রংপুরে পেঁৗছতে হবে। অনেক মাল নিয়ে ট্রাক যাতায়াত অসম্ভব তাই সেতুর মুখে এসে মাল নামিয়ে কম মাল নিয়ে সেতু পার হতে হয়। এতে করে পণ্যের মূল্য বেড়ে যায়। মেয়াদোত্তীর্ণ সেতুর ওপর দিয়ে যে কোনো যান চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ। বিকল্প পথ হিসেবে নৌপথে যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় বাধ্য হয়েই ঝুঁকিপূর্ণ সেতুটি ব্যবহার করতে হয়।
১৯৯৬ সালে যখন তিস্তা সেতুর কাজ শুরু হয় তখন বিশেষ করে কুড়িগ্রাম-লালমনিরহাটের মানুষ আশা করেছিল যোগযোগের করুণ অবস্থা বুঝি শেষ হওয়ার দিন এলো। রেল সেতুটির পাশে যে সড়ক সেতুটি হচ্ছে তার দিকে তাকিয়ে মানুষ যোগাযোগের দুরবস্থার মধ্যেও একটি স্বস্তির প্রহর গুনত_ খুব শিগগির হয়তো এই ভোগান্তি দূর হবে। আবার যখন দেখা যায় সেতুটির কাজ বন্ধ হয়ে আছে তখন মনোকষ্ট বাড়তে থাকে। ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বরে কাজ শুরু হওয়ার পর সবাই ভেবেছে এবার হয়তো সেতুটি নির্মিত হবে। তারপর বারবার শুরু হওয়া আর বন্ধ হওয়ার খেলা দেখে এখন আর কেউ নিশ্চিত করে ভাবে না যে কখন সেতুটির কাজ শেষ হবে। তিস্তা সেতু সীমান্তবর্তী দুটি মাত্র জেলার প্রবেশমুখ বলে মনে করার সুযোগ নেই যে সেতুটির সঙ্গে শুধু ওই দুটি জেলার মানুষের সুখ-দুঃখ জড়িত। শরীরের যে কোনো স্থানে ব্যাধি দেখা দিলে যেমন তা শরীরময় সংক্রমিত হয় তেমনি দেশের যে কোনো প্রান্তের সুবিধা-অসুবিধার সঙ্গে সারাদেশের মানুষের সুবিধা-অসুবিধা জড়িত। তা ছাড়া সীমান্তবর্তী এ দুটি জেলার সঙ্গে বুড়িমারী স্থলবন্দর ও কুড়িগ্রামের সোনাহাট সম্ভাব্য স্থলবন্দর রয়েছে। এ স্থলবন্দরের সঙ্গে পুরো দেশের যোগাযোগের প্রয়োজনেও তিস্তা সেতুর গুরুত্ব অপরিহার্য।
সেতুটির কাজ কখন শেষ হবে তা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। শম্বুকগতিতে এগিয়ে যাওয়া তিস্তা সেতুর কাজে হঠাৎ করেই কাজের গতি অস্বাভাবিক হারে বাড়িয়ে তাড়াতাড়ি করতে গিয়ে কাজ নিম্নমানের হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সেতুর কাজ শেষ হওয়ার পর যে টোল নির্ধারণ করা হবে তা যেন স্থানীয় আর্থসামাজিক অবস্থা বিবেচনায় রেখে করা হয়। বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তিস্তা সেতুর কাজের প্রথম উদ্বোধক। তার কাছে আমরা এ আশাটুকু করতেই পারি, তার বিশেষ দৃষ্টিতে দশ বছর আগে শুরু হওয়া তিস্তা সেতুর কাজ এবার সম্পন্ন হবে।

ড. তুহিন ওয়াদুদ : শিক্ষক, বাংলা বিভাগ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর
wadudtuhin@gmail.com
 

No comments

Powered by Blogger.