স্মরণ-আমার পিতার মুখ by মোমতাজুল করিম এন আহমদ

মোজাফ্ফর আহমদ। একজন শিক্ষক। একজন গবেষক। একজন সংগঠক। একজন সচেতন নাগরিক। আমার বাবা। সর্বশেষ পরিচয়টা আমার জ্ঞান-বুদ্ধির সময়ই জানতাম। অন্যান্য পরিচয় বুঝতে শিখেছি আমার জীবনের একেকটি পর্যায়ে। কখনো কখনো বিশেষ মুহূর্তে।


কনিষ্ঠ সন্তান হিসেবে সুবিধা অনেক। মা-বাবাকে কাছে পাওয়া যায় বেশি। অনেক কিছু নিয়ে আলাপের সুযোগ থাকে।
আমার বাবা ছিলেন মা-অন্তঃপ্রাণ। তাঁকে দেখেছি, হাজারো কাজের মধ্যেও আমার দাদির খবরাখবর নিতে ভুলতেন না। দাদির খাওয়া, ঘুমানোর সময় উপস্থিত থাকতে না পারলে তিনি কষ্ট পেতেন। তাই বলে নিজের পরিবারের ব্যাপারে তিনি উদাসীন ছিলেন, তা নয়। তবে আমার মায়ের (রওশন জাহান) মতো সমমনা সহধর্মিণীর ওপর তিনি নির্ভরশীল ছিলেন অনেক ক্ষেত্রে।
বাবার কাজের নিজস্ব সময় ছিল। একবার কাজে ঢুকে গেলে তিনি সময়-জ্ঞান হারিয়ে ফেলতেন। আশির দশকের এমনই এক দিনে তিনি আমাকে স্কুল থেকে আনতে ভুলে গিয়েছিলেন। দুপুরের সেই স্কুল ছুটির কথা তাঁর মনে পড়েছিল সন্ধ্যাবেলায়। স্কুলের শিক্ষকেরা অবশ্য তার আগেই আমাকে বাসায় পৌঁছে দিয়েছিলেন। তাই বিপদ হয়নি।
লেখাপড়ার ব্যাপারে বাবার উৎসাহ ছিল অপরিসীম। শুধু বাসাতেই ছিল হাজারো বই। মনে পড়ে ইংরেজি একটু সড়গড় হওয়ার পর তিনি ব্যক্তিগত লাইব্রেরিতে সংরক্ষিত ক্ল্যাসিক বইগুলো পড়তে দিয়েছিলেন। তিনি খুব আনন্দিত ছিলেন আমার বড় ভাইয়ের (সেরাজুল আমিন আহমদ) জ্ঞানস্পৃহায়। তিনি আমার শিক্ষক-গবেষক দুলাভাইয়ের সঙ্গেও নতুন বই পড়া হলে সেটা নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলাপ করতেন। আশির দশকের শুরুতে তিনি বুঝেছিলেন, লেখাপড়ার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে কম্পিউটার প্রযুক্তির হাত ধরেই। সেই চিন্তা থেকে তিনি ‘ডস’ কম্পিউটার কিনেছিলেন আমাদের লেখাপড়ার জন্য। আমাদের বাসায় তখন আধুনিক কম্পিউটার থাকলেও ছিল না কোনো টেলিভিশন!
এখনো কানে বাজে বিবিসি রেডিওর উদ্বোধনী সংগীত। বাংলাদেশ বেতারের সকালের খবর প্রকাশিত হওয়ার সংকেত। ছোটবেলায় এই দুটো শব্দ ছিল আমার ঘুম থেকে ওঠার অ্যালার্ম। উঠে দেখতাম, রেডিও হাতে বাবা নাশতার টেবিলে। সময়ানুবর্তিতার ওপর বাবা বরাবর জোর দিতেন। খুব রাত করে বাড়ি ফেরা এবং অগোছালো জীবনযাপন তাঁর অপছন্দ ছিল। এইচএসসি ফল আশানুরূপ না হওয়ার পেছনে তিনি আমার সময়ানুবর্তিতার অভাবেই তুলে ধরেছিলেন। পরবর্তী সময় যখন ২০০২ সালে জন হপকিন্সে যাই, তখন বিমানবন্দরে বিদায়বেলায় বলেছিলেন, সময়ের কাজ সময়মতো করলে ভালো করবে। আমার রেজাল্টের পর তিনি খুশি হয়ে চিঠি লিখেছিলেন।
বাবা সব সময় নিজে যা খুব বিশ্বাস করতেন সরাসরি বলে ফেলতেন। এ নিয়ে বিভিন্ন সরকারের আমলে সমস্যা যে হয়নি তা নয়, কিন্তু তিনি তাঁর কথায় অবিচল। দেশের প্রতি বাবার ভালোবাসা ছোটবেলায় বুঝিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ে জানতে পারি আশির দশকে কয়েকবার তিনি বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরির প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছেন। আমেরিকায় স্নাতকোত্তর ডিগ্রির পর এমন সুযোগ আমারও এসেছিল। তাঁর সঙ্গে আলোচনার সময়ে তিনি বলেছিলেন, সিদ্ধান্তটা আমার ব্যক্তিগত। তবে দুটো জিনিস বিবেচনা করতে হবে। এক. জীবনে অর্থই সব নয়। দুই. দেশের প্রতি সব নাগরিকের কর্তব্য আছে।
আমার বোন (সোহেলা নাজনীন) খুব সিরিয়াস ধরনের। পিএইচডি শেষ করে ও যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেয়, বাবা খুব খুশি হয়েছিলেন। যেদিন আমার বোনের প্রথম গবেষণার লেখা প্রকাশিত হয়, সেদিন বাবার আনন্দ ছিল দেখার মতো। জীবনে ন্যায়-অন্যায় নিয়ে তিনি ভাবতেন। এখনো চোখের সামনে ভাসে ১৯৯৮ সালের সেই ঘটনা। প্ল্যাকার্ড হাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র শিক্ষক আমার বাবা প্রতিবাদ করছেন অন্য বিভাগের এক ছাত্রীর যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে। ঘটনার আগের দিন রাতে (বাসায়) ব্যাপক আলোচনা হয়েছিল। যদি অন্য কোনো শিক্ষক তাঁর পাশে না থাকেন, এমন কথায় তাঁর জবাব ছিল স্পষ্ট। অন্যায়ের প্রতিবাদ করা উচিত, অসহিংসভাবে, নিয়মের মধ্যে। শিক্ষক এবং সচেতন নাগরিক হিসেবে এগিয়ে আসার তাড়নাই তাঁর হাতে প্ল্যাকার্ড তুলে দিয়েছিল। মৃদু কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘কাউকে তো শুরু করতে হবে, তাই না?’
ব্যক্তিগত জীবনে কিছু বিশেষ দিন বাবা পালন করতেন। এর মধ্যে বিবাহবার্ষিকী এবং আমার মায়ের জন্মদিন অন্যতম। একবার আমি ছাত্র অবস্থায় তাঁর অনুরোধে সন্ধ্যায় তাঁকে নিয়ে শাড়ি কিনতে গিয়েছিলাম। বিবাহবার্ষিকীতে আমার মায়ের জন্য উপহার কিনবেন। আমার বোন কাছে নেই। তাই শাড়ি পছন্দের কঠিন কাজে আমাকে সঙ্গে নিয়েছিলেন। সীমিত আয়ের মানুষটি সেদিন তাঁর বাজেট কত এমন প্রশ্নে দ্বিধাহীন কণ্ঠে বলেছিলেন, ‘তোমার মায়ের জন্য কোনো বাজেট নেই। তুমি পছন্দ করো।’ পরবর্তী সময় অবশ্য ছেলেদের বিয়ের পর মায়ের জন্মদিনের আগে দুই ডাক্তার ছেলের বউয়ের সঙ্গে পরামর্শ করতেন। তাদের নিয়েই পরিকল্পনা করতেন জন্মদিন উদ্যাপনের। তিনি চাপা স্বভাবের ছিলেন। নিজের আবেগ খুব প্রকাশ করতেন না। বাচ্চাদের তিনি গল্প বলতে পারতেন না। পারতেন না ছবি আঁকতে। কিন্তু তিন নাতির সঙ্গে তাঁর সখ্য ছিল।
তাঁকে শিক্ষক হিসেবে পাইনি। সেই গুরুদায়িত্ব ছিল আমার মায়ের। বাবার কাছ থেকে অবশ্য শেখার চেষ্টা করেছি। অদ্ভুত লাগত তাঁর ‘পরের কারণে স্বার্থ দিয়া বলি...’ মন্ত্রে উদ্বুদ্ধ হয়ে কাজ করা দেখে। দেশের হাজারো লোক দেখেছি। কিন্তু এমন মন্ত্রে বিশ্বাসী লোকের সংখ্যা খুব বেশি চোখে পড়েনি।
বাবার সঙ্গে বিভিন্ন জায়গায় যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। কথা বলার সুযোগ হয়েছে। লিখতে লিখতেই মনে পড়ছে বেদনাদায়ক শেষ স্মৃতির কথা—বাসা থেকে গাড়িতে চড়ে হাসপাতালে যাচ্ছি, গন্তব্য ল্যাবএইড, কিছুক্ষণ পর পর নাড়ি পরীক্ষা করেছি, বাবার মাথা আমার কোলে। নাড়ির স্পন্দন ক্ষীণ হয়ে আসছে। মনে ভাসছে হাজারো স্মৃতি। ঝড়ের বেগে মনে পড়ছে কত কথা। সবচেয়ে বেশি বার মনে পড়ছে, প্রতিদিন দুপুরে আর মোবাইল বাজবে না। রাতে ফিরতে দেরি হলে আমার মুঠোফোনের ডিসপ্লেতে ‘আব্বা’ লেখাটা আর ভেসে উঠবে না। শুনব না ওপারের সেই উদ্বিগ্ন কণ্ঠস্বর, ‘বাবা, কখন আসবে তুমি? রাতে খাবে না?’
মোমতাজুল করিম এন আহমদ
প্রয়াত অধ্যাপক মোজাফ্ফর আহমদের কনিষ্ঠ পুত্র

No comments

Powered by Blogger.