এখনো কি বলা যাবে অপরাধ নিয়ন্ত্রণের মধ্যেই আছে by এ এম এম শওকত আলী

একটি বাংলা দৈনিকে প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী অপরাধ বৃদ্ধির ৩০টি কারণ সিআইডি চিহ্নিত করেছে। এ উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কয়েক সপ্তাহ আগে গুরুতর অপরাধের সংখ্যাসহ মাত্রা বৃদ্ধির বিষয়ে যে চিত্র মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়েছে, তা সরকারের পক্ষ থেকে অস্বীকার করা হয়েছিল।


অবশ্য অস্বীকার করার কয়েক দিন পর সরকারি নীতিনির্ধারকরা স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিলেন এই বলে যে এ পরিস্থিতির কিছুটা বা সামান্য অবনতি হয়েছে। এ বক্তব্য নাগরিকরা কতটা বিশ্বাস করেছে তা জানা নেই। সিআইডি তথ্য অনুযায়ী ২০১০ সালে অপরাধের মাত্রা ছিল অনেক বেশি।
সিআইডি গত পাঁচ বছরের সংঘটিত অপরাধের তথ্য বিশ্লেষণ করেছে। এর ভিত্তিতে ২০০৯ সালের অপরাধ বৃদ্ধির কারণ চিহ্নিত করা হয়। তবে অপরাধের মাত্রা বৃদ্ধির বিষয়টি এ বছরের জানুয়ারি মাসের প্রথমার্ধেই মিডিয়ায় বহুল প্রচলিত ছিল, যা নীতিনির্ধারকরা প্রাথমিকভাবে অস্বীকার করেন। সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্তৃপক্ষ অবশ্য স্বীকার করেছেন যে চিহ্নিত ৩০টি কারণের বাইরেও আরো কারণ থাকতে পারে। ৩০টি চিহ্নিত কারণের ভিত্তি মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের প্রদত্ত তথ্য। এ থেকে অনুমান করা সম্ভব যে চিহ্নিত কারণগুলো অনেকাংশে অসম্পূর্ণ। এর সঙ্গে সাধারণ ভুক্তভোগী জনগোষ্ঠীসহ সংশ্লিষ্ট অন্যদের মতামত গ্রহণ করলে প্রতিবেদনটির গুণগতমান আরো ভালো হতো।
প্রতিবেদকের প্রতিবেদনে মোট চারটি গুরুতর অপরাধের বিষয়ে পর্যালোচনামূলক মন্তব্য দেওয়া হয়েছে। এগুলোসহ ২০১০ সালে সব ধরনের অপরাধের সংখ্যা এক লাখ ৬১ হাজার ১৭টি। যে চারটি গুরুতর অপরাধের কথা বলা হয়েছে তার মধ্যে রয়েছে_খুন, ডাকাতি, নারী নির্যাতন ও অপহরণ। এসব অপরাধের সংখ্যা হলো যথাক্রমে তিন হাজার ৭৭৮টি, এক হাজার ৫০০, ডাকাতি দেড় হাজার এবং ১৬ হাজার ৮৮০টি। মোট অপহরণসংক্রান্ত কোনো সংখ্যা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি। ধারণা করা যায়, সিআইডির মূল প্রতিবেদনে হয়তো এটা উল্লেখ করা হয়েছে।
খুনের মামলা আধিক্যের কারণ হিসেবে কয়েকটি বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। এক. পুলিশের তদন্তকারী কর্মকর্তারা প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন করতে পারে না। দুই. ঘটনার পর অপরাধী চিহ্নিত না হওয়া। তিন. বস্তুনিষ্ঠ সাক্ষ্য-প্রমাণ চিহ্নিত করায় ব্যর্থতা। চার. বিচারের দীর্ঘসূত্রতা ইত্যাদি। এর মধ্যে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনে পুলিশের ব্যর্থতা প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রথমটির অর্থাৎ প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনে তদন্ত কর্মকর্তার ব্যর্থতার জন্য কী কী কারণ রয়েছে, সে বিষয়ে কোনো তথ্য প্রদান করা হয়নি। করলে ভালো হতো। অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে কিছু কারণ অবশ্যই চিহ্নিত করা সম্ভব। এর মধ্যে রয়েছে_(ক) তদন্তে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার অদক্ষতা, (খ) কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাব, (গ) ঘুষের বিনিময়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা তদন্ত ঝুলিয়ে রাখেন, (ঘ) তদন্তের নজরদারির দুর্বলতা, (ঙ) কর্মকর্তাদের ঘনঘন বদলি, (চ) পদোন্নতির সঠিক মাপকাঠির অভাব এবং (ছ) জবাবদিহিতার অভাব।
ঘটনার পর অপরাধী চিহ্নিত না হওয়ার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্যাদির প্রয়োজন। আপাতদৃষ্টিতে এ কারণটি ওপরে বর্ণিত কারণের সঙ্গে জড়িত। এর সঙ্গে অবশ্যই যোগ করা যায় অপরাধীদের প্রভাব। ঘটনা সম্পর্কে অবহিত হওয়া সত্ত্বেও প্রত্যক্ষদর্শীরা ভয়ে কোনো কথা পুলিশের গোচরে আনতে ইচ্ছুক নন। এ ভীতির কারণ ভবিষ্যতে তাদের নিরাপত্তার অভাব। এ সমস্যার সমাধানের জন্য উন্নত দেশে সাক্ষীদের নিরাপত্তা বিধান ব্যবস্থা (ডরঃহবংং চৎড়ঃবপঃরড়হ) তদন্ত কার্যাবলিরই অন্যতম অংশ। এ ব্যবস্থা এ দেশে এখনো চালু করা হয়নি। পরীক্ষামূলকভাবে হলেও এটা চালু করা প্রয়োজন। অন্য একটি কারণও এ বিষয়ে উল্লেখ করতে হয়। সেটা হলো, গুরুতর অপরাধের সঙ্গে জড়িত চক্র বা অপরাধীর সঙ্গে পুলিশের অনভিপ্রেত সম্পর্ক। এ ধরনের সম্পর্কের কারণেও প্রকৃত অপরাধী চিহ্নিত করা সম্ভব হয় না।
বস্তুনিষ্ঠ সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবের বিষয়ে বলা যায় যেসব কারণ ইতিমধ্যে বলা হয়েছে, সে কারণেও তথ্যনির্ভর ও গ্রহণযোগ্য সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া যায় না। বিচার নিষ্পত্তিতে বিলম্বের যে কথা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সে কথা সর্বজনবিদিত। তবে সঠিক কারণ চিহ্নিত করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে কয়েকটি কারণ চিহ্নিত করা সম্ভব। বিচারকাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শুরু না করা। যেসব সাক্ষীরা সাক্ষ্য দিতে যাবে তাঁদের সরকারিভাবে আসা-যাওয়া বাবদ যে অর্থ দেওয়ার বিধান রয়েছে, তা সঠিক সময়ে এবং সঠিক পরিমাণে না দেওয়ার বাস্তবতা। আদালতে সাক্ষ্য দেওয়ার বিষয়ে অনীহা এবং ভীতি। আদালত প্রাঙ্গণে অস্বস্তিকর প্রভাব। দালাল-বাটপারদের দৌরাত্ম্য। সময়মতো সাক্ষী উপস্থিত হওয়া সত্ত্বেও নির্ধারিত দিনে সাক্ষী গ্রহণ না করে তাঁদের ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া, যা তাঁদের দৈনন্দিন কাজের বিষয়ে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে। আসামির ন্যায় সাক্ষীকেও কাঠগড়ায় দণ্ডায়মান করে রাখার বাধ্যবাধকতা, যার জন্য অনেকেই সাক্ষী হতে নিরুৎসাহ বোধ করেন।
বিচারকদের বিচারকাজ সকাল ১০টায় নির্ধারিত থাকলেও প্রায়ই এ বিষয়ে অভিযোগ রয়েছে যে কাজ শুরু হয় দেরিতে। বিচার বিভাগ নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক হওয়ার আগে এ দৃশ্যই ছিল বাস্তবতা। কারণও ছিল। মহকুমা অফিসার বা এসডিওসহ ম্যাজিস্ট্রেটদের অনেক নির্বাহী কাজ করতে হতো। বর্তমানে এ অবস্থা থাকার কথা নয়। তবে অভিযোগ এখনো রয়েছে। অন্যদিকে সাক্ষীদের হাজির করার দায়িত্ব পুলিশের। সে দায়িত্বও ঠিকমতো পালিত হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে।
প্রতিবেদনে আলোচ্য সময়ে খুন-সংক্রান্ত অপরাধের আধিক্যের বিষয়ে গাজীপুর, চট্টগ্রাম, নওগাঁ, রাঙামাটি ও মৌলভীবাজার জেলাকেই চিহ্নিত করা হয়েছে। বলা হয়েছে, একই সময় অর্থাৎ ২০১০ সালে রাজধানীতে গড়ে প্রতিদিন একজন করে খুন হয়েছে। অর্থাৎ অন্তত ৩৬৫ জন খুন হয়েছে। সারা দেশে খুনের সংখ্যা ছিল মোট তিন হাজার ৭৭৮ জন। একমাত্র রাজধানীতেই গড়ে প্রতিদিন একজন করে খুন হওয়া নিশ্চয়ই অতীতের সব রেকর্ড অতিক্রম করেছে। এ ক্ষেত্রে জননিরাপত্তাহীনতা নিশ্চয়ই আশঙ্কাজনক বলে আখ্যায়িত করা সম্ভব।
প্রতিবেদনে বলা হয় যে গত বছর সারা দেশে ডাকাতি ও দস্যুতার দেড় হাজার মামলা হয়েছে। এর জন্য পুলিশের উদাসীনতাকেই প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এতে মনে হয়, সিআইডি এ প্রতিবেদনে পুলিশের বিভিন্ন সমস্যা নয়, বরং বাস্তবতাই প্রতিফলিত হয়েছে। জানুয়ারি মাসেই যখন মিডিয়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির চিত্র তুলে ধরে, তখন পুলিশের পক্ষ থেকে একাধিক সমস্যার কথা বলা হয়েছিল। আলোচ্য প্রতিবেদনে ওইসব বিষয় ততটা প্রাধান্য পায়নি। এ ধরনের অপরাধের মাত্রা বৃদ্ধির কারণ হিসেবে পুলিশের উদাসীনতাসহ তদারকির অভাবের কারণটিও উল্লেখ করা হয়েছে, যে কারণে ক্ষমতাসীন নীতিনির্ধারকসহ পুলিশের কর্তাব্যক্তিরা অতীতে স্পষ্টভাবে স্বীকার করেননি। এ বিষয়ে খুনের আসামিদের জামিনে মুক্তি পাওয়ার বিষয়টিও বলা হয়েছে।
জানুয়ারি মাসে পুলিশের পক্ষ থেকে যেসব কারণ উল্লেখ করা হয়েছিল, এর মধ্যে জামিনের বিষয়টিও ছিল। এ সমস্যাটা কত প্রকট সে বিষয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে অতীতে দু-একটি ক্ষেত্রে এ-সংক্রান্ত কিছু সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছিল। সার্বিক বিষয়টি নিবিড়ভাবে অনুসন্ধানযোগ্য। এ বিষয়ে করণীয় কী? নিম্ন আদালতে জামিন হলে তাৎক্ষণিকভাবে উপযুক্ত তথ্য-প্রমাণসহ পরবর্তী সময় উচ্চ আদালতে জামিনের আদেশ বাতিল করা সম্পর্কে কি কোনো কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছিল?
নারী নির্যাতনের বিষয়ে সিআইডির পর্যালোচনায় মোট সাতটি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে, পারিবারিক অশান্তি নিয়ে মামলা রুজু করার প্রবণতা, স্বামীর মাদকসেবনের জন্য স্ত্রীর ওপর নির্যাতন ও যৌতুকের দাবি। এ বিষয়ে একটি তাৎপর্যপূর্ণ তথ্যও বলা হয়েছে। তথ্যটি হলো, অযথা মামলা রুজু করা হয়। এ ধরনের ভিত্তিহীন মামলা রুজু করার জন্য পুলিশ তদন্তসাপেক্ষে সংশ্লিষ্ট আদালতে আইন অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে। এতে কোনো বাধা নেই। এ বিষয়ে অন্য একটি বিষয় প্রাসঙ্গিক। কিছু দিন আগে নারীর অধিকার সম্পর্কিত কিছু প্রতিষ্ঠান এ ধরনের অপরাধের বিষয়ে তদন্ত ও বিচারকাজের দুর্বলতা চিহ্নিত করেছিল। এ প্রতিষ্ঠানগুলোর মতামতও পুলিশকে বিশ্লেষণ করে পরবর্তী কৌশল নির্ধারণ করতে হবে।
অপহরণ-সংক্রান্ত মামলার প্রধান কারণ হিসেবে প্রতিবেদনে দুটি কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। এক. সম্পত্তিবিষয়ক সত্যতা অস্বীকার করা যাবে না। যেটা বলা সম্ভব তা হলো, সাম্প্রতিককালেই এ কারণের মাত্রা বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রশ্ন হলো, কেন বিষয়টি অনুসন্ধানযোগ্য। এ ক্ষেত্রে সমাজ গবেষকরা কিছু বলতে পারবেন।
সিআইডির প্রতিবেদনে বিশ্লেষণের ভিত্তিতে কিছু সুপারিশও করা হয়েছে। এক. তদন্তকাজ পরিচালনা বিধি প্রণয়ন। দুই. পৃথক তদন্ত সংস্থা গঠন। তিন. প্রস্তাবিত সংস্থার মাধ্যমে সব ধরনের মামলার তদন্তের তদারকি। চার. সিআইডির মামলা তদন্তের জন্য একটি বিশেষায়িত ইউনিট।
প্রথম সুপারিশটির যুক্তি বোধগম্য নয়। পুলিশ বিধিতে (১৯৪৩) এ বিষয়ে বিস্তারিত ও অনুসরণীয় নির্দেশনা দেওয়া আছে। বর্তমান পরিস্থিতির আলোকে বিধি পরিমার্জন ও পরিবর্ধন করা সম্ভব। পৃথক সংস্থা গঠন কেন? পত্রিকান্তরে এ প্রসঙ্গে একটি প্রস্তাব প্রকাশ করা হয়েছিল। বলা হয়েছিল, পুলিশ ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো গঠনের জন্য। তাহলে সিআইডির প্রয়োজনীয়তা কেন?
জনপ্রশাসনে একটি নীতির কথা বলা হয়। প্রচলিত সংস্থার অদক্ষতার বিষয় চাপা দিয়ে নতুন সংস্থা গড়া বাঞ্ছনীয় নয়। ফলে অদক্ষ সংস্থার সংখ্যা বৃদ্ধি হবে। যতদূর জানা যায়, পুলিশ অধিদপ্তর ইতিমধ্যেই অভ্যন্তরীণ আদেশের বলে তদন্তকাজের জন্য পৃথক জনবল থানাওয়ারি দিয়েছে। এ ক্ষেত্রে যে বিষয়টির প্রয়োজন তা হলো, তদারকির মাত্রা ও গুণগতমান বৃদ্ধি করা। আরো বলা যায় যে ইতিমধ্যে সোয়াত (ঝডঅঞ) নামে একটি ইউনিটও গঠন কর হয়েছে। এর উদ্দেশ্য বিশেষ ধরনের অপরাধ দমন করা।
সিআইডি পুলিশের প্রায় জন্মলগ্ন থেকেই একটি বিশেষ তদন্ত সংস্থা হিসেবে কাজ করছে। সাম্প্রতিককালে এর অতিরিক্ত ডিটেকটিভ শাখাও কাজ করছে। অপরাধ দমনের জন্য র‌্যাবও কাজ করছে। যে বিষয়টির অভাব তা হলো, বিভিন্ন সংস্থার কার্যাবলির সুষম সমন্বয়। সমন্বিত ব্যবস্থাপনা পরিস্থিতি উন্নতি নিশ্চিত করতে পারে।

লেখক : তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা

No comments

Powered by Blogger.