গল্প- 'ঊনচলিস্নশ বছর আগে' by জামাল উদ্দীন

মেয়েটি হঠাৎ খিলখিল করে হেসে উঠলো। তারপর চুপ। এক ঘণ্টা ধরে বকাঝকার পরও কোন প্রতিক্রিয়া নেই। সে কি সব কথা শুনেছে? নাকি রিসিভারটা কান থেকে নামিয়ে রেখেছিল।

এমন দুর্ব্যবহার অহেতুক- ভাবে মহসিন। নাও শুনতে পারে। অযথা এরকমটি করার মানে হয় না। তাহলে কি খুব রাগ করে মহসিন এমনটি করেছিল? নাকি অভিমান? নাঃ, রাগ করার বিষয়তো নয় এটি। অভিমান করার মত সম্পর্কও হয়নি।
মহসিন উত্তর খোঁজার চেষ্টা করে। তার ভেতরটা পুড়ে যাচ্ছে। কারো সঙ্গে দুর্ব্যবহার করার মত লোক সে নয়। দু'দিন গেল। মেয়েটিও ফোন করেনি। কেন করবে? বরং মেয়েটি যে চুপচাপ সব সয়ে গেছে, সেইতো বেশি। নাঃ, কাজটি ঠিক হয়নি। মাপ চাইতে হবে ওর কাছে।
টেলিফোন সেটের দিকে এগিয়ে যায় মহসিন। আবার পিছিয়ে আসে। ক্ষমা চাইলেতো সব শেষ হয়ে যাবে। ইংরেজি এই 'সরি' শব্দটি খুবই সস্তা। মহসিন সরি বলবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত পুরো বিষয় জানতে না পারে।
ওই ঘটনার পর থেকে মহসিন স্বস্তি পাচ্ছে না। তুষের আগুনের মত তাকে জ্বালাচ্ছে। কারো সঙ্গে শেয়ার করে হালকা হবে- সে অবস্থাও নেই। মনোযোগ নেই অফিসের কাজে। ঘুমুতে পারছে না। ঘরেও সাবধানে থাকতে হচ্ছে। মৌমিতা যেন টের না পায়। এক কঠিন যন্ত্রণার মুখোমুখি মহসিন।
স্মৃতি হাতড়িয়ে সে ভাবছিল। তেমন কিছু মনে পড়ছে না। তবু ভাবতে মানা নেই। ভাবনা মহসিনকে বাস্তবতা থেকে সরিয়ে এক অন্য পারিপাশ্বর্িকতার মধ্যে নিয়ে আসে। যেন ধ্যানস্ত হয়ে পড়ে সে। খুঁজতে থাকে তার প্রশ্নের উত্তর। মেয়েটি, মানে জোছনার প্রতি কেন তার এত অভিমান।
হঠাৎ করেই পরিচয় হয়েছিল জোছনার সঙ্গে। বছর খানেক আগে। গত বৈশাখে। এমএ পাস করে চাকরি খুঁজছিল।
দ্বিতীয়বার দেখা হয় সিয়া মসজিদের পাশে। জোছনা অপেক্ষা করছিল রিক্সার। সেন্ট্রাল কলেজে ওর চাকরি হয়েছে। মহসিনকে হঠাৎ পেয়ে দারুণ খুশি। ভাল খবরটা দেয়া গেল। মহসিনও খুশি। এরপর থেকেই নিয়মিত যোগাযোগ হতে থাকে।
মহসিনের ধ্যানের গভীরতা আরো বাড়তে থাকে। তার সামনে জোছনার চেহারাটাই ভেসে উঠছে বারবার। জোছনা তার মনের ভেতরটায় জোছনার মত আলোকিত করে রাখে। সেই আলোয় নিজেকে এক অন্য মানুষ বলে বোধ হতে থাকে মহসিনের। ক্রমাগত পিছিয়ে যেতে থাকে- দিন, মাস করে করে ঊনচলিস্নশ বছর পিছিয়ে যায় সে। নিজেকে ফেরত পায় অদম্য এক যুবক হিসাবে।
গলা উঁচু করে সামনে তাকিয়ে আছে মহসিন। যতদূর চোখ যায় মনে হয় ধূসর লুক। প্রকৃতির সৌন্দর্যে যেন ভাটা পড়েছে। গাছগুলো আছে ঠায় দাঁড়িয়ে। প্রাণ নেই। শকুনেরা সব সুন্দর মলিন করে দিচ্ছে। ওরা মানুষের রক্ত চুষে নিচ্ছে। পুড়িয়ে দিচ্ছে ঘরবাড়ি। ডালপালাহীন গাছগুলো ধ্বংসযজ্ঞের সাক্ষী হয়ে আছে। আশপাশ কাঁদছে। মানুষ পশুপাখি সবাই। শুধু কান্না আর ছুটে চলা। এক শিবির থেকে আরেক শিবিরে। কেউ দৌড়াচ্ছে, কেউ হাঁটতে গিয়েও পড়ে যাচ্ছে। চোখ নামিয়ে আনতেই মহসিনের চোখে পড়ে ঠাকুরমা লাঠি হাতে নিয়েও পারছে না। দলের অন্য সবাই এগিয়ে গেছে খানিক পথ। ঠাকুরমাকে দ্রুত টেনে নিতে পিছিয়ে এসেছে তার নাতনি। ঠাকুরমা'র এক হাত ধরে টানছে সে। অন্য হাতে লাঠি মেরে জোর পায়ে চলার চেষ্টা করছে ঠাকুরমা। বয়স হয়েছে সত্তরের কাছাকাছি। মনের জোরে বেঁচে থাকা। হঠাৎ দূরে কোথাও বোমা ফাটার শব্দ। সবাই ভীত হয়ে পড়লো। রসুলপুর হাইস্কুল এখনো অনেক দূর। সেখানে শরণাথর্ী শিবির। পাশেই গলস্নামারি নদী। নৌকা করে নদী পার হয়ে আরো মাইলখানেকের রাস্তা। তারপর আছে আরেকটি শিবির। ওখানে আশ্রয় নেবে জোছনার পরিবার। পাচুরাম দাস ওর বাবা। দুই মেয়ে, স্ত্রী আর মা'কে নিয়ে পাচুরাম চালের আড়তের ব্যবসা করে ভালভাবেই সংসার চালিয়ে আসছে। মহসিন অনেকটা উৎপাত হিসাবেই এসেছে তার সংসারে। যুদ্ধের এই সময়ে পাচুরাম তাকে আশ্রয় না দিয়েও পারে না। রাজাকাররা পেলে মহসিনকে মেরে ফেলবে।
শুরুতে ঠাকুরমা'র বড় আপত্তি ছিল। মহসিনকে আশ্রয় দিয়েছে জানতে পারলে তাদের অবস্থাও খারাপ হবে। মহসিনের অপরাধ সে পালিয়ে এসেছে সেনাক্যাম্প থেকে। মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করার কাজ করছে। পাইকগাছায় বেশ কয়েকটি মুখোমুখি সংঘর্ষেও সে অংশ নিয়েছিল। এখন গলস্নামারি এলাকাকে শত্রুমুক্ত করতে হবে। এমনিতেই নিচু জলাভূমি হওয়াতে বিপদ কিছুটা কম ছিল। বিহারি মতিউল্যাহর নেতৃত্বে আলবদর বাহিনী গড়ে তোলার পর ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে এলাকাটি। মতিউল্যাহর দোসরেরা ইঞ্জিন বোটে করে হানাদারদের গ্রামের ভেতরে নিয়ে এসেছে। ওরা গ্রামের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে। ওদের প্রতিরোধ করতেই মহসিনের নেতৃত্বে একটি দল মুক্তিযুুদ্ধে লড়তে রাজি হল। মহসিন ওদেরকে পাঠিয়ে দিল সীমান্তের ওপারে ট্রেনিং নিতে। নিজে থেকে গেল পাচুরামের বাড়িতে। পাচুরামের মা ব্যাপারটাকে ভালভাবে নিতে পারেননি। মুক্তিবহিনীর সদস্যদের ঘরে আশ্রয় দিলে বিপদ আসবে এমনটি তিনি জানতেন। অবসরে পাচুরামের মেয়ের সঙ্গে গল্প করার বিষয়টিও ঠাকুরমার ক্ষেপে যাওয়ার অন্যতম কারণ। ব্যাপারটি অাঁচ করতে পেরে মহসিন পাচুরামকে বলেছিল আমি বরং কটকা স্কুলের শিবিরে চলে যাই। আপনাদের অযথা কষ্ট দিয়ে লাভ কী।
পাচুরাম সোজাসুজি কোন উত্তর না দিয়ে বলল- আমাদেরও নিরাপদ আশ্রয় খোঁজা উচিত। বাজারে শুনেছি পাকবাহিনী যেকোন সময় গ্রামে হানা দেবে। তোমাদের বাহিনী তো এখনো সুসংগঠিত হতে পারেনি।
মহসিন কিছু না বলে যে পাশটায় তার থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল, সেখানে গিয়ে বসল। আর চিন্তা করতে লাগলো কি করা যায়। মুক্তিযোদ্ধাদের দলটি না আসা পর্যন্ত এখানে আক্রমণ চালানো সম্ভব নয়। আবার পাচুরাম চলে গেলে মহসিনের থাকার ব্যবস্থাও নেই। কিন্তু মহসিনের জন্যে পাচুরাম কেন জীবনের ঝুঁকি নেবে? বরং পাচুরাম চলে গেলে যাক। আর সামান্য কয়টা দিন। ওরা ফেরত এলেই এলাকাটি শত্রুমুক্ত হবে।
মহসিনকে বসে থাকতে দেখে এগিয়ে এল জোছনা। কি ভাবছেন?
- ভাবছি আমার জন্য তোমাদের খুব অসুবিধে হচ্ছে।
- আমি শুনেছি সব। কাল রাতে ঠাকুরমা বাবাকে কড়া ভাষায় বকাঝকা করেছিল।
- আমিও শুনতে পেরেছি। তাই ভাবছি রসুলপুরে চলে যাব। ওরা ট্রেনিং আর অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আসা পর্যন্ত রসুলপুর শিবিরেই থাকবো।
জোছনা মহসিনের দিকে তাকিয়ে কথাগুলো শুনছে। যেন নিষ্প্রভ এক যুবকের সঙ্গে কথা বলছে সে। মহসিনের চলে যাওয়ার কথা শুনে তার অন্তরাত্মা কেঁপে উঠলো। জোছনা শুনেছে রাজাকাররা উঠতি বয়সী মেয়েদের ধরে পাকিস্তানি ক্যাম্পে নিয়ে যায়। মহসিন চলে গেলে যদি রাজাকাররা বাড়িতে আসে। ভয়ে গা শিহরিত হয়ে উঠে জোছনার। মহসিনের ওপর কেন জানি তার নির্ভরতা তৈরি হয়। এমন তরতাজা যুবক পাশে থাকলে যেকোন বিপদ মোকাবেলা সম্ভব। মহসিনের বাহুবল যেমন আছে, তেমনি প্রশিক্ষণও। শুধু অস্ত্র না থাকায় তার অপেক্ষা। ওপার থেকে অস্ত্র আসবে। তারপর চলবে অপারেশন। শত্রু নিধন করে তবেই ক্ষান্ত হবে সে।
দেশের প্রতি মহসিনের এত টান দেখে মায়া হয় জোছনার। ভয়ও জাগে। যদি যুদ্ধক্ষেত্র থেকে আর ফেরত আসতে না পারে সে!
ছিঃ, এ ধরনের অলক্ষুণে কথা বলতে নেই। নিজেকে নিজে শোধরায়। মহসিনকে নিয়ে এত ভাবনা কিসের? তাহলে কি ঠাকুরমা'র সন্দেহ সত্যি? জোছনা কি ক্রমেই মহসিনের প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ছে?
ডাক পড়ে জোছনার। ভাবনায় ছেদ ঘটে। দৌড়ে ঠাকুরমার কাছে চলে যায়।
রাতেই সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে পাচুরাম। আড়তে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছে। ঘরের সব মালপত্র নিয়ে তৈরি। ভোরবেলা রওনা দিল রসুলপুরের উদ্দেশে নিজের বসতবাড়ি ছেড়ে। এলাকাটা আর নিরাপদ নয়। বিষয়টি মুক্তিসেনা হিসাবে মহসিনের জন্য অস্বস্তিকর। অপেক্ষার প্রহর যেন কাটছে না। সারারাতে এক ফোঁটা ঘুম আসেনি। তাই পাচুরামের প্রথম ডাকেই উঠে বসল সে। আপাতত রসুলপুর হাইস্কুল। পথ চলতে চলতে তাদের সঙ্গে যোগ হল আরো অনেক পরিবার। সবার পিছনে মহসিন। এক পা সামনে এগুচ্ছে তো পেছনে তাকাচ্ছে কয়েকবার। নিজের বসতভিটে ছেড়ে সবাই ছুটছে। ফিরে এসে এরা কি অক্ষত পাবে তাদের মাথা গাঁজার ঠাঁই।
ঠাকুরমার কষ্ট দেখে মহসিন সামনে এগিয়ে যায়। জোছনারও কষ্ট হচ্ছে ঠাকুরমাকে টেনে নিতে। কিন্তু সে জানে ঠাকুরমা তার হাতের স্পর্শ সহ্য করবে না। তাই নিরাপদ দূরত্বে থেকেই বলে- আরেকটু পথ, এসে গেছি প্রায়। জোছনার দিকে তাকায়। লিকলিকে শরীরে লতার মত পেঁচিয়ে আছে একটি লাল পাড়ের সাদা শাড়ি। পায়ের গোড়ালি থেকে কিছুটা উপরে। পায়ের পাতার ভাঁজে দুর্বাঘাসের সবুজাভ ডগা চিকচিক করছে। যেন তরবারির আগার মত ধারালো। সেটাকে পদদলিত করেই এগিয়ে চলছে জোছনা, ঠাকুরমা, বাংলার জায়া জননীরা। মহসিনের কাছে মনে হচ্ছে এরা সবাই শত্রুকে পদদলিত করে এগিয়ে চলছে। বাংলা এবার স্বাধীন হবেই।
ততক্ষণে কয়েকগজ এগিয়ে গেছে জোছনা। পেছন ফিরে মহসিনের দিকে তাকিয়ে যেন কিছু একটা বলতে চাইল। মহসিন সামনে এগিয়েছে, কিন্তু জোছনার কথা যেন হারিয়ে গেছে। দূরে কোথাও বোমা ফাটার আওয়াজ। মুহূর্ত খানেকের মত থমকে গেছে সবাই। তারপর আবার ছুটে চলা। আকাশে একঝাঁক পাখির কান্না, স্বদেশের মায়া ছেড়ে কোথায় যাবে ওরা? দ্রুত উড়ে যাচ্ছে, দূরে কোথাও বিলের ধারে আশ্রয় নেবে হয়তো।
রসুলপুর হাইস্কুলে পেঁৗছার পরও স্বস্তি মিললো না। এখান থেকে সবাই চলে গেছে। পাচুরামের মত আরো দু'চার গেরস্থঘর এসেছে। খাবার-দাবার ফুরিয়ে যাওয়ায় সবাই গলস্নামারি নদী পার হয়ে গেছে ওপারে যাওয়ার জন্য। খারাপ খবরও আছে। একটি কোষা নৌকায় বেশি মানুষ উঠায় সেটা পানিতে ডুবে গেছে। তাতে দুই শিশুর খোঁজ মেলেনি। বাকীরা সাঁতরে কোনমতে জীবন বাঁচিয়েছে। খবরটি শুনে বেদনাহত সবাই। এতো ছোটাছুটির মধ্যে রসুলপুর হাইস্কুলে পাওয়া গেল গোফরান মিয়াকে। স্কুলের কেয়ারটেকার। বয়স হয়েছে তাই জীবনের মায়া ত্যাগ করে রয়ে গেছে। গোফরান মিয়া বলল, এখানে থাকাটা আর নিরাপদ নয়। রাজাকাররা খবর পেয়ে গেছে। মহসিন বলল- মুক্তিবাহিনীর সদস্যরা নেই এখানে?
- ছিল। বিশজনের একটি টিম এখানে কাজ করছিল। সবাই চলে গেছে নড়িয়ায়। দু'একদিনের মধ্যে সেখানে বড় অপারেশন হবে।
পরিস্থিতি দেখে পাচুরামের মুখে কথা নেই। পারলে এখনি ওপারে চলে যায় সেটা যদিও সম্ভব নয়। আজ রাতটা রসুলপুরে থাকতে হবে।
মহসিন বলল- ভয় নেই। রাতটা এখানেই থাকুন।অগত্যা রসুলপুর হাইস্কুলেই থাকতে হল। মহসিন মনস্থির করলো সকালে জেলা সদরে যাবে। এলাকা শত্রুমুক্ত করতে হলে মুক্তি সদস্য দরকার।
রাতে ভাল ঘুম হয়নি কারো। পাহারাবিহীন শিবিরে যে কোন সময় শত্রুদের হামলা হতে পারে। বাইরে শুধু গোফরান মিয়া একটি টর্চ হাতে টহল দিয়েছিল। মহসিনও অধিক রাত পর্যন্ত জেগেছিল। জোছনা সারারাত ছটফট করে। এ-কাৎ ও-কাৎ হয়ে জোড়া লাগা বেঞ্চিতে অস্থির কাটে তার। মহসিনকে ছেড়ে যেতে হবে। সকাল হলেই দু'জনের গন্তব্য দু'দিকে। মন মানছে না কিছুতেই। মহসিনকে ছেড়ে যেতে মন চাইছে না তার। ভোর না হতেই গোফরান মিয়ার বাঁশি বেজে উঠলো। এই বুঝি রাজাকাররা আসছে গোফরান মিয়া বললো সবাই পেছনের পাটক্ষেতের দিকে চলে যান। পাচুরামসহ অন্যরা স্কুলের পেছনের দিকে ছুটছে। পাচুরামের স্ত্রী সুলেখা শাশুড়িকে একরকম কোলে করেই যেন নিয়ে যাচ্ছে। আর জোছনা খুঁজছে মহসিনকে। এক কোণায় কখন যে মহসিনের দু'চোখে ঘুম নেমে এসেছে। জোছনা দেখছে সবাই ছুটছে অথচ মহসিন শুয়ে আছে। দৌড়ে গিয়ে একরকম টেনেহিঁচড়ে মহসিনকে তুলল সে। মহসিনের হাত ধরে টানতে টানতে স্কুলঘরের বাইরে নিয়ে এল। গোফরান মিয়া বলল- সবাই চলে আসুন। বিপদ নেই।
মহসিন জানে এ ধরনের পরিস্থিতিতে সুযোগের অপেক্ষায় থাকে কিছু লোক। রাজাকার আসছে বললে সবাই দৌড়ে পালানোর সময় মালপত্র ফেলে যায়। সেগুলো কুড়িয়ে নেয়া ঐসব সুবিধাবাদীদের কাজ। সে ধরনের কিছু না তো? গোফরান মিয়া বলল- ঐদিকে টর্চের আলো দেখে আমার ডর করছিল।
সবাই গিয়ে আবার শুয়ে পড়ল। তবে কারো চোখেই ঘুম নেই। একটু পরেই ভোর হবে। সামান্য আলোর ছটা দেখা দিলে সবাই রওনা দেবে গলস্নামারির উদ্দেশে। শুধু যাবে না মহসিন। বেঞ্চিতে বসে দেয়ালে ঠেস দিয়ে মহসিন এখন শুধু জোছনার কথাই ভাবছে। জোছনা তাকে যেভাবে টেনে তুলেছে তা অতি আপনজনই করে। মহসিনের কাছে তা নতুন কোন বার্তা পেঁৗছায়। মহসিন তাকিয়ে থাকে সামান্য দূরে, সেখানে জোছনা আর ঠাকুরমা বসে আছে। আঁধারে তাদের অবয়ব স্পষ্ট না হলেও মহসিনকে যেন জোছনার চোখের দিকে চেয়ে আছে। যে চোখে নির্ভরতার এক স্বপ্ন উঁকি দিয়ে যাচ্ছে।
আঁধার কেটে আলো ঘনিয়ে আসতেই পোঁটলা নিয়ে সবাই রওনা হয়ে যায় গলস্নামারির দিকে, পাচুরামও। সবারই লক্ষ্য সামনে। শুধু জোছনা, সবকিছু পেছনে ফেলে সামনে এগুচ্ছে। বারবার তাকাচ্ছে মহসিনের দিকে। ব্যাপারটি পাচুরামের কাছে মোটেই শোভনীয় মনে হয়নি। মেয়েকে ধমকে বলে জোরে হাঁটার জন্য। মহসিন দেখল, শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখের জল মুছতে মুছতে অন্যদের সঙ্গে তালমিলিয়ে এগিয়ে গেল জোছনা। গ্রামের বাঁকা রাস্তায় আর দেখা যাচ্ছে না জোছনাকে। মহাসিন এবার তার পথ ধরলো।
মহসিনের সামনে অনেক কাজ বাকি। আবার অপেক্ষা মুক্তিসেনার। আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই একদল মুক্তিযোদ্ধার আসার কথা। তারা এলে নতুন আরেকটি দল গঠন করে পাঠাতে হবে প্রশিক্ষণের জন্য। মোটামুটি রাইফেল চালানোর মত প্রশিক্ষণও এই সময়ে খুব জরুরী। মহসিন বেশি তাড়া অনুভব করে যে কারণে, তাহলো এলাকার লোকেরা নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যাচ্ছে। সবাই ভীত-সন্ত্রস্ত। পাকবাহিনী ও তাদের দোসরদের বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে না পারলে এলাকা পুরোপুরি জনমানবহীন হয়ে পড়বে। রাতের অন্ধকারে বুট ও বুলেটের শব্দ আর নয়।
পথ চলতে চলতে জাফরাবাদ গ্রামে এসে খবর পায় মুক্তিসেনাদের দলটি বিকেলেই পেঁৗছে যাবে। ওদিকে জেলা সদরে রাতে আক্রমণের প্রস্তুতি নেয়া হচ্ছে। এখানে তার দেখা হয় নূরুল ইসলাম মানিকের সঙ্গে। পাকিস্তান ফেরত। বাগমারা সীমান্তে মানিকই প্রথম যুদ্ধের সূচনা করেছিল। মানিককে পেয়ে যাওয়ায় মহসিনের মনোবল বাড়ে।
সে রাতে পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই চলেছিল বেশ। পালাতে গিয়েও বাঁচতে পারেনি পাকিস্তানি সেনারা।
আপাত বিজয়ের আনন্দে উদ্বেলিত সবাই। দীপ্ত শপথে অগ্রসর হয় সামনের দিকে, আশপাশের জেলায়। এরই মধ্যে কেটে গেছে দীর্ঘ নয় মাস। পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করেছে। লাল সবুজের পতাকা ছিনিয়ে আনতে পেরে গর্বিত সবাই। মুক্ত বাতাসে স্বদেশের বুকে উড়ে বেড়ানোর মত অবস্থা সবার। মুছে গেছে পরাধীনতার গস্নানি। আর নই পাকিস্তানি। আজ সবাই স্বাধীন বাঙালি। কিন্তু মুক্তির এই স্বাদ আস্বাদনে তৃপ্তি নেই কেন মহসিনের? তার চোখের সামনে ভেসে উঠে একটি মুখাবয়ব। হঁ্যা, তার মনে পড়ে জোছনার কথা। শ্বেত শুভ্র ক্ষীণকায় সেই মেয়েটির কথা। পাচুরামের সেই মেয়েটি- জোছনা কেমন আছে? নিশ্চয়ই ওরা দেশে ফিরেছে।
জোছনাকে নিয়ে বিজয়ের আনন্দ ভাগাভাগি করতে মহসিন রওনা করে পাচুরামের বাড়ির উদ্দেশ্যে আর ভাবে- ঠাকুরমা বকাঝকা করবে না তো? এখন বিপদমুক্ত। তার যাওয়া অকারণ ভাবতে পারে ঠাকুরমা। তবু মহসিন পথ চলে। যে যাই ভাবুক, স্বাধীন দেশে জোছনার হাসি হাসি মুখখানি দেখা তার চাই-ই।
চাতালপুর থেকে ছেড়ে আসা বাসটি পিচঢালা রাস্তায় চলছে। পাশের সবুজ গ্রাম পেছনে সরে যাচ্ছে। এগিয়ে যাচ্ছে মহসিন। সেই উত্তাল দিনগুলোর কথা ভেবে ভেবে মহসিন জানালার ফাঁকে বাইরে তাকাচ্ছে। সবকিছুই যেন প্রাণ ফিরে পেয়েছে। নতুন উদ্যম, নতুন স্বপ্ন সবার। দেশকে এগিয়ে নিতে হবে সামনে। মহসিন ভাবে পরাধীনতার গস্নানিমুক্ত হলেও এখন স্বাধীনতা রক্ষার সংগ্রাম চালাতে হবে। তবে আর চাকরিতে ফেরত গিয়ে নয়। নিজেকেই কিছু করতে হবে। কি করা যায়? জোছনাকে আগে দেখে আসি, তারপর এসব চিন্তা করা যাবে- মহসিনের চোখের পাতা বুঁজে আসে। দেখে জোছনা ঠিক আগের মতই আছে। তাকে দেখে লাজুক ভঙ্গিতে কেমন আছেন- জিগ্যেস করেই ঠাকুরমা'র কাছে গেছে। পিছু পিছু মহসিনও। নমস্কার কেমন আছেন। তুমি আবার কি মনে করে এখানেঃ।
-আপনাদের খোঁজ নিতে এসেছি।
ঠাকুরমা সেই আগের মতই কথা বলছে। ব্যাপারটা ভালস্নাগছে না মহসিনের। এতদূর থেকে খবর নিতে এসে এমন কথা শুনতে হবে ভাবেনি সে। জোছনাকে ইশারায় কাছে আসতে বলল। জোছনা কিছুটা এগিয়ে আসতেই মহসিন হাতটা বাড়িয়ে দিল। তার হাতে ধরা একটা লাল গোলাপ। পকেটে করে এনেছে। পাপড়িগুলো অতোটা সতেজ নেই। জোছনা মুখ টিপে হাসল এবং হাতটা সামনে বাড়ালো। এমন সময় জোরে ব্রেক কষার শব্দ এবং মহসিন সিট থেকে ছিঁটকে পড়লো। অল্পের জন্যে রক্ষা। সামনে একটি কুকুর ছিল। বাসযাত্রীদের গুঞ্জন শুরু হলো। কেউ বলল- ড্রাইভার দেখে চালাও। কেউ বলল আস্তে যাও। অত তাড়াহুড়ো কিসের। মহসিন ঠিক হয়ে সিটে বসলো।
জোছনার সঙ্গে দেখা হবে। উৎফুলস্ন মহসিন। বাস থেকে নেমে পাচুরামের বাড়ি। সামান্য পথ হাঁটতে কষ্ট হয়নি তার। কিন্তু পাচুরামের বাড়ির সামনে এসে থমকে দাঁড়াতে হলো তাকে। তার বুকে কেউ যেন পাথরচাপা দিয়েছে। তাতে দম বন্ধের অবস্থা তার। পাচুরামের বাড়িতে অন্য লোক। জোছনা নেই। পাচুরামও নেই। নেই ঠাকুরমা। কোথায় গেল তারা?
বৃদ্ধ এক লোক জানালো-গলস্নামারি যেতে নদী পার হওয়ার সময় রাজাকাররা নৌকায় হানা দিয়েছিল। তাতে অনেকের সঙ্গে ঠাকুরমাও নদীতে ডুবে মারা যায়। জোছনাকে ধরে নিয়ে যায় রাজাকার ক্যাম্পে, দু'দিন আটকে রেখে পাচুরামকে ছেড়ে দিলেও জোছনাকে ফেরত দেয়নি ওরা। সব হারিয়ে পাচুরাম ওপারে চলে গেছে। আর ঘরে ফেরেনি।
ঘটনা শুনে বিমর্ষ হয়ে পড়ে মহসিন। বলে হায় স্বাধীনতা। অনেক ত্যাগের বিনিময়ে তোমাকে পেলাম। তার চোখের কোণে জল ভেসে উঠে।
বর্তমানে ফিরে মহসিনের চোখ ভিজে যায়। বুকচাপা কষ্টের ভার শরীর থেকে নেমে গেছে তার। উত্তর খুঁজে পায় সে। যে পরিযায়ী পাখিটাকে বুকে বয়ে বেড়িয়েছে এতদিন, তারই প্রতিরূপ এই জোছনা। হুবহু মিল। পাচুরামও হয়তো নিজের মেয়ে ভেবে বুকে টেনে নিত। প্রকৃতির এ কেমন খেলা। জোছনাকে 'সরি' বলতে মহসিন টেলিফোন সেটের দিকে এগিয়ে যায়।
==============================
গল্প- 'সুচ' by জাফর তালুকদার   গল্প- 'বাসস্ট্যান্ডে যে দাঁড়িয়েছিল' by ঝর্না রহমান  গল্প- 'গন্না' by তিলোত্তমা মজুমদার  গল্প- 'ঘুড়িয়াল' by শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়  গল্প- 'প্রক্ষেপণ' by মোহিত কামাল  গল্প- 'গন্তব্য বদল' by রফিকুর রশীদ  গল্প- 'ঝড়ের রাতে' by প্রচেত গুপ্ত  গল্প- 'শুধু একটি রাত' by সাইপ্রিয়েন এক্ওয়েন্সি। অনুবাদ বিপ্রদাশ বড়ুয়া  গল্প- 'পিতা ও কুকুর ছানা' by হরিপদ দত্ত  স্মরণ- 'শওকত ভাই : কিছু স্মৃতি' by কবীর চৌধুরী  সাহিত্যালোচনা- 'রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে পালাকারের নাটক  স্মরণ- 'আবদুল মান্নান সৈয়দ : কবি ও প্রাবন্ধিক' by রাজু আলাউদ্দিন  স্মরণ- 'সিদ্ধার্থ শংকর রায়: মহৎ মানুষের মহাপ্রস্থানে by ফারুক চৌধুরী  গল্প- 'ফাইভ স্টার' by সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম  গল্প- 'নূরে হাফসা কোথায় যাচ্ছে?' by আন্দালিব রাশদী  গল্প- 'হার্মাদ ও চাঁদ' by কিন্নর রায়  গল্প- 'মাটির গন্ধ' by স্বপ্নময় চক্রবর্তী  সাহিত্যালোচনা- 'কবি ওলগা ফিওদোরোভনা বার্গলজ'  গল্পিতিহাস- 'বালিয়াটি জমিদারবাড়ির রূপগল্প' by আসাদুজ্জামান  ফিচার- ‘কাপ্তাই লেক:ক্রমেই পতিত হচ্ছে মৃত্যুমুখে' by আজিজুর রহমান



দৈনিক ইত্তেফাক এর সৌজন্য
লেখকঃ জামাল উদ্দীন


এই গল্প'টি পড়া হয়েছে...
free counters

No comments

Powered by Blogger.