পাইপের ভেতর থেকেই শিশু জিহাদকে উদ্ধার করা হল

পাইপের ভেতর থেকেই স্থানীয়দের পদক্ষেপ বের করে আনা হল চার বছরের শিশুটিকে। পরিত্যক্ত যে পাইপে জিহাদের থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়নি দাবি করে উদ্ধার কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছিল ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা। ২৭ ডিসেম্বর শনিবার বেলা ৩টার দিকে রাজধানীর শাহজাহানপুর রেল কলোনির পরিত্যক্ত গভীর নলকূপের পাইপের নিচ থেকে জিহাদকে অচেতন অবস্থায় বের করে আনা হয়। উদ্ধারের পর পরই জিহাদকে নিয়ে যাওয়া হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। সেখানে জরুরি বিভাগের চিকিৎসক রিয়াজ মোরশেদ বলেন, শিশুটিকে মৃত অবস্থায়ই পেয়েছিলেন তারা। তার আগে রেল কলোনির মসজিদের মাইকে জিহাদকে মৃত অবস্থায় উদ্ধারের ঘোষণা দেওয়া হয়। সাড়ে ৩টায় শিশুটিকে আনার পর ২০ মিনিট ধরে তাকে পরীক্ষা করেন চিকিৎসকরা। ডা. রিয়াজ মোরশেদ বলেন, “শিশুটি বেশ কয়েক ঘণ্টা আগেই মারা গেছে। আমাদের কাছে এসেছে মৃত অবস্থায়ই। শরীরের কয়েকটি স্থানে ছিলে যাওয়ার রয়েছে বলে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে জানান তিনি। তিনি আরও বলেন, পানি পড়ে যাওয়ার লক্ষণও তারা পেয়েছেন।
জিহাদকে উদ্ধারের কয়েক মিনিট আগেই ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহমেদ খান ঘটনাস্থলে এক সংবাদ সম্মেলনে উদ্ধার অভিযান স্থগিতের ঘোষণা দেন।
তিনি বলেন, পাইপের ভেতরে ক্যামেরা ঢুকিয়ে যে ছবি তোলা হয়েছে, তাদে কোনো মানবদেহের অস্তিত্ব থাকার প্রমাণ পাওয়া যায়নি।  পড়ে যাওয়ার ২৩ ঘণ্টা পর ফায়ার সার্ভিস হাল ছেড়ে দেওয়ার পরও স্থানীয় কয়েকজন তরুণ পাইপের ভেতর থেকে জিহাদের সন্ধানে কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। আর তাতেই সফল হন তারা।   ওই তরুণদের অন্যতম শাহ মোহাম্মদ আব্দুল মুন বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, তারা লোহার তার দিয়ে তৈরি একটি জালের সঙ্গে কেবল টিভির ম্যানুয়েল ক্যামেরা বেঁধে পাইপের ভেতরে পাঠিয়ে শিশু জিহাদকে উদ্ধার করেছেন।
চার বছর বয়সী জিহাদের শুক্রবার বিকালে ওই পাইপে পড়ে যাওয়ার খবর পেয়ে উদ্ধার অভিযানে নামে ফায়ার সার্ভিস, সেই সঙ্গে উদ্ধার অভিযানে যোগ দেয় অন্যরাও।
ফায়ার সার্ভিস জানায়, রশিতে বেঁধে অনেকদূর পর্যন্ত ক্যামেরা নিয়ে ১৪ ইঞ্চি ব্যাসের ওই পাইপের নিচের যে ছবি তোলা হয়েছে, তাতে কোনো মানবদেহের অস্তিত্ব ধরা পড়েনি; তবে ছবি এসেছে কাপড়, স্যান্ডেলের মতো আবর্জনার।
এরপর শুক্রবার ভোররাতে ঘটনাস্থলে থাকা স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল সাংবাদিকদের বলেন, উদ্ধারকর্মী দলের সঙ্গে কথা বলে তার ধারণা হয়েছে যে পাইপের ভেতরে শিশুটি নেই।
তবে তারপর বিষয়টি নিশ্চিত হতে কাজ চালিয়ে যাচ্ছিলেন ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধার কর্মীরা।
শনিবার বেলা আড়াইটায় ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালকের সংবাদ সম্মেলনের আগে সকাল ১০টায় ফায়ার সার্ভিসের ডিএডি মো. হালিম সাংবাদিকদের বলেন, ভেতরে কোনো ভিকটিম নেই।
অভিযান শেষ পর্যায়ে জানিয়ে তিনি বলেছিলেন, এখন আমাদের আর কোনো কাজ নেই। দেশীয় পদ্ধতিতে স্থানীয় মানুষ যে চেষ্টা করছে, আমরা তাতে সহায়তা করছি।
জিহাদ ভেতরে নেই বলে এখন দাবি করলেও শুক্রবার বিকালে ও সন্ধ্যায় তার কণ্ঠ শুনতে পাওয়ার কথা উদ্ধারকর্মীরা জানিয়েছিলেন। তাকে অক্সিজেন ও খাবার দেওয়ার কথাও বলেছিলেন তারা।
জিহাদ পাইপের ভেতরে পড়েছে- এই ধারণার ভিত্তি কী জানতে চাইলে তার মামা মনির বলেন, “আসলে আমরা নিশ্চিত নই। আশে-পাশের লোকজন তাকে পড়তে দেখেছে বলেছিল। আর ফায়ার সার্ভিসও তো বলেছে- ও চারবার ওঠার চেষ্টা করেছিল, জুস খেয়েছে, অক্সিজেন পাঠানো হয়েছে।
এ বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে আলী আহমেদ হালিম বলেন,যারা বলেছেন, তাদের কারোই খারাপ কোনো ইনটেনশন ছিল না।
যারা বলেছিলেন, তারা খাবার-অক্সিজেন সরবরাহ করার কথা বলেছিলেন। আর বাইরে থেকে কথা ছোড়া হচ্ছিল, যা পাইপের ভেতরের বিভিন্ন ইকো হয়ে ফিরে আসতে পারে।
জিহাদকে উদ্ধারের পর তিনি সাংবাদিকদের বলেন,আমরা আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযান স্থগিত করলেও আমাদের কর্মীরা সেখানে ছিল। সবাই এখানে ছিল, সবার সহযোগিতায়ই শিশুটিকে উদ্ধার করা হয়েছে।
তবে ফায়ার সার্ভিসের উচ্চ পদস্থ এক কর্মকর্তা বলেন, এই ঘটনায় আমরা চরমভাবে বিব্রত।
এদিকে জিহাদের বাবা মতিঝিল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের নৈশ প্রহরী নাসিরউদ্দিনকে শুক্রবার ভোররাতেই পুলিশ আটক করে নিয়ে যায়। সকাল পর্যন্ত তাকে ছাড়া হয়নি।
এই বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের মতিঝিল বিভাগের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার আনোয়ার হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, নিরাপত্তার স্বার্থেই তাকে আমাদের হেফাজতে রাখা হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়া পর্যন্ত তিনি আমাদের কাছে থাকবেন।
শনিবার সকালে শিশুটির মামা মনির বলেন, তারাই জিহাদের বাবাকে নিরাপদে রাখতে পুলিশকে বলেছিলেন।আত্মীয়-স্বজনের বাড়ি না রেখে পুলিশ হেফাজতে কেন- জানতে চাওয়া হলে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।
পুলিশ নিয়ে গেছে, না কি পুলিশের কাছে যাওয়া হয়েছিল- জানতে চাইলে মনির বলেন, পুলিশই নিয়ে গেছে। আমরা এখন জানি না তিনি কোথায় আছেন। দুই ছেলে এক মেয়ের মধ্যে সবার ছোট জিহাদকে নিয়ে শঙ্কায় তার মা খাদিজা বেগম প্রায় বাকরুদ্ধ। সকালেও প্রতিবেশীরা তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন।যে স্থানে গভীর নলকূপে জিহাদ পড়ে গিয়েছিল, সেই শাহজাহানপুর রেল কলোনির ৪১ নম্বর বিল্ডিংয়ে নাসিরের বাসা। নাসির রাতে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, বিকাল সাড়ে ৩টার দিকে বন্ধুদের সঙ্গে খেলতে খেলতে জিহাদ ওই গর্তে পড়ে যায় বলে এক প্রতিবেশী তাদের জানিয়েছিলেন।
স্থানীয় গৃহবধূ রাহেলা ও আরিফ নামের এক কিশোরও সাংবাদিকদের একই কথা বলেন। তাদের দুজনকেও জিজ্ঞাসাবাদের জন্য শনিবার সকালে হেফাজতে নিয়েছে পুলিশ।

No comments

Powered by Blogger.