সংসদে প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাব-নতুন সংকটের আশঙ্কা

নবম সংসদের চতুর্দশ অধিবেশনের সমাপনী দিনে আগামী সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে প্রধানমন্ত্রী এবার নতুন এক প্রস্তাব দিয়েছেন। আগামী সংসদ নির্বাচনের আগে সরকার পদ্ধতি কী হবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলে নানা আলোচনা চলছে।


একদিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা নতুন করে প্রবর্তনের জন্য বিরোধী দল অনড়, অন্যদিকে সরকারি দল তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি মানতে রাজি নয়। প্রধানমন্ত্রী নিজেও এর আগে নির্বাচনকালীন একটি অন্তর্বর্তী সরকার ব্যবস্থা নিয়ে কথা বলেছেন। চতুর্দশ সংসদ অধিবেশনের সমাপনী দিনে প্রধানমন্ত্রী যে প্রস্তাবটি রেখেছেন, তা অবশ্যই আলোচনার দাবি রাখে।
বিরোধী দল মনে করে, এখন পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের সময় আসেনি। অন্যদিকে সরকার মনে করে, আদালতের রায়ের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু রাখার কোনো সুযোগ নেই। এ ক্ষেত্রে সরকার ও বিরোধী দলের অবস্থা অনেকটাই মুখোমুখি হয়ে পড়ে। সরকার ও বিরোধী দলের এই পরস্পরবিরোধী অবস্থানের কারণে আমাদের দেশের রাজনীতিতে বিদেশিদের তৎপরতাও লক্ষ করা যায়। দেশের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলের পাশাপাশি বিদেশি কূটনীতিকরাও একটি গ্রহণযোগ্য সমঝোতার ব্যাপারে গুরুত্বারোপ করেছেন। সমঝোতায় পেঁৗছানোর প্রথম ও প্রধান শর্ত হচ্ছে সংলাপ। সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে আনুষ্ঠানিক কোনো সংলাপ অনুষ্ঠান না হলেও বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বিরোধী দলের পাশাপাশি রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল মনে করে, যেকোনো সংলাপ অনুষ্ঠানের আগে সংলাপের উদ্দেশ্য কী, বর্তমান সমস্যা কী_এটা স্পষ্ট হতে হবে। সংলাপের একটা ফ্রেমওয়ার্ক দরকার। সেই ফ্রেমওয়ার্কের মধ্যে সিরিয়াস আলাপ হবে। নির্বাচনকালীন সরকার তত্ত্বাবধায়ক নাকি অন্তর্বর্তী_সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সংলাপের মাধ্যমে সমঝোতা, এটাই যখন প্রধান আলোচ্য বিষয়, তখন প্রধানমন্ত্রীর নতুন প্রস্তাব দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে কোন দিকে চালিত করে, সেটাই দেখার বিষয়।
প্রধানমন্ত্রী সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে বলেছেন, সংসদ রেখে নির্বাচন হবে না। ওয়েস্ট মিনস্টার টাইপ অব গভর্নমেন্টে সরকারপ্রধান সম্ভাব্য তারিখ জানিয়ে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রস্তাব দেবেন। রাষ্ট্রপতিই ঠিক করবেন, সংসদ কবে ভেঙে দেবেন, কতজনের মন্ত্রিসভা থাকবে। তিনি যে নির্দেশ দেবেন, সে অনুযায়ী নির্বাচন হবে। নির্বাচন কমিশন ভোটের দিন-তারিখ ঠিক করবে। অন্যদিকে সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংসদের পাঁচ বছরের মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তবে সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে সংসদ ভেঙে গেলে, ভেঙে যাওয়ার পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করতে হবে। ৪৮ অনুচ্ছেদে বলা আছে, রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শে কাজ করবেন। আবার সংবিধানের ১১ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, প্রশাসনের সব পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে সরকার পরিচালনায় জনগণের অংশগ্রহণের বিধান নিশ্চিত করতে হবে। সংসদে প্রধানমন্ত্রী যে প্রস্তাব দিয়েছেন, তাতে এটা স্পষ্ট হলো যে তিনি আগের প্রস্তাব থেকে সরে এসেছেন। কিন্তু সংসদ অধিবেশন শেষ হয়ে যাওয়ায় এখন এ বিষয়ে সংসদে আলোচনারও কোনো সুযোগ আপাতত থাকছে না। তাঁর এই নতুন প্রস্তাব কি নতুন কোনো রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি করতে যাচ্ছে_স্বাভাবিকভাবে এটাই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে। বিরোধী দল যদি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের দাবিতে অনড় অবস্থান নেয়, তাহলে দেশ নতুন এক সংকটের দিকেই যাচ্ছে।
সাংবিধানিক কিংবা রাজনৈতিক সংকট নয়, আমরা চাই গণতান্ত্রিক পরিবেশ। গণতন্ত্র সমুন্নত রেখে পরিচালিত হবে দেশ। তার জন্য সরকার ও বিরোধী দলকে প্রয়োজনীয় ছাড় দিতে হবে। নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসতে হবে। সরকার ও বিরোধী দল দেশ, জনগণ ও গণতন্ত্রের স্বার্থে গঠনমূলক ভূমিকা রাখবে বলে মনে করি আমরা।

No comments

Powered by Blogger.