প্রত্যাখ্যান করলেই সমস্যার সমাধান হবে-ঘুষ-দুর্নীতিতে শীর্ষে পুলিশ

ক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের মানুষকে সবচেয়ে বেশি ঘুষ দিতে হয় বলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআই) যে জরিপ প্রতিবেদন দিয়েছে, তাতে সরকারের নীতিনির্ধারকদের কেউ কেউ গোসসা করতে পারেন; কিন্তু এটাই বাস্তব। জরিপের বিষয় ছিল ‘ডেইলি লাইফস অ্যান্ড করাপশন: পাবলিক অপিনিয়ন ইন সাউথ এশিয়া’। জরিপে অংশগ্রহণকারী বাংলাদেশিদের ৬৬ শতাংশ বলেছেন, সরকারি সেবা পেতে তাঁদের ঘুষ দিতে হয়।


ভারত, পাকিস্তান, নেপাল ও শ্রীলঙ্কায় এই হার যথাক্রমে ৫৪, ৫০, ৩২ ও ২৩ শতাংশ। বাংলাদেশের সেবাপ্রার্থীদের মধ্যে ৭৫ শতাংশ বলেছেন, পুলিশকে তাঁদের ঘুষ দিতে হয়। এরপর দ্বিতীয় অবস্থানে আছে বিচার বিভাগ। ঘুষ প্রদানকারীদের মধ্যে ৬৬ শতাংশ নিয়েই শীর্ষে আছে বাংলাদেশ। এরপর আছে ভারত (৫৪ শতাংশ) ও পাকিস্তান (৫০ শতাংশ)। জরিপকারীদের মধ্যে ৬২ শতাংশ মনে করেন দুর্নীতি বেড়েছে। টিআইয়ের এই জরিপ নতুন নয়। গত বছরের ডিসেম্বরে প্রকাশিত জরিপের সঙ্গে শ্রীলঙ্কা, মালদ্বীপ ও নেপালকে যুক্ত করে দক্ষিণ এশিয়ার ছয়টি দেশের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন টিআইয়ের জরিপ প্রত্যাখ্যান করেছেন। কিন্তু কোনো কিছু প্রত্যাখ্যান করলেই সমস্যা দূর হয়ে যায় না। দেশে ঘুষ-দুর্নীতি যে বেড়েছে, তা সরকারের কর্তাব্যক্তিরা স্বীকার না করলেও ভুক্তভোগীরা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন।
ঘুষ-দুর্নীতির বিরুদ্ধে ভারতসহ বিভিন্ন দেশে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হলেও বাংলাদেশে তেমন তৎপরতা দেখা যায় না। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আইন নিয়েও চলছে কানামাছি খেলা। তাহলে ঘুষ-দুর্নীতি বন্ধ হবে কী করে?
পুলিশ বিভাগে ঘুষ বন্ধের উপায় হলো, একে একটি সত্যিকার পেশাদার বাহিনীরূপে তৈরি করা এবং সে জন্য দলীয় রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার যেমন বন্ধ হওয়া জরুরি, তেমনি তাদের ন্যূনতম সুযোগ-সুবিধাও নিশ্চিত করতে হবে। আইনি সুবিধা পেলে পুলিশের সদস্যরা বেআইনি সুবিধা নিতে নিরুৎসাহিত হবেন। এ ব্যাপারে ইউএনডিপির সহায়তায় পুলিশ সংস্কারের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, তা-ও ফাইলবন্দী হয়ে থাকাটা দুর্ভাগ্যজনক।
কেবল বাস্তবতা অস্বীকার করলেই নাগরিক সেবা নিশ্চিত হবে না। যে দেশে সরকারের প্রায় সব ধরনের সেবা পেতে নাগরিকদের কমবেশি উৎকোচ গুনতে হয়, সে দেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই দাবির যৌক্তিকতা কতটুকু? তাঁরা বিরোধী দলে থাকতে তো এসব জরিপকে অকাট্য প্রমাণ হিসেবে সরকারের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতেন। এখন যাঁরা বিরোধী দলে আছেন, তাঁরাও তা-ই করছেন। ঘুষ-দুর্নীতির জাতীয় সমস্যাকে দলীয় দৃষ্টিতে না দেখে দলমত-নির্বিশেষে সবার উচিত এর বিরুদ্ধে সর্বাত্মক প্রতিরোধ গড়ে তোলা।
কেবল পুলিশ বিভাগ নয়, সরকারের সব বিভাগেই ঘুষ-দুর্নীতি বেড়েছে। এর বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপের পাশাপাশি সামাজিক আন্দোলনও গড়ে তুলতে হবে। ঘুষ-দুর্নীতির বিরুদ্ধে নাগরিক সচেতনতাও বাড়ানো প্রয়োজন। জরিপদাতাদের অনেকেই বলেছেন, দ্রুত সেবা পাওয়ার জন্য তাঁরা ঘুষ দিয়ে থাকেন। আবার অনেকে অবৈধ সুবিধা নিতেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রলুব্ধ করে থাকেন, যা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করা উচিত। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী টিআইয়ের প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান না করে পুলিশ বিভাগের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের প্রত্যাখ্যান করলে দুর্নীতি কিছুটা হলেও কমত।

No comments

Powered by Blogger.