স্মরণ- 'জননেতা দেওয়ান ফরিদ গাজী' by এম মুহিবুর রহমান

দেওয়ান ফরিদ গাজী। দেশের অন্যতম প্রবীণ রাজনীতিবিদ, আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সহচর, মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ৪ ও ৫ নম্বর সেক্টরের বেসামরিক উপদেষ্টা ছিলেন তিনি। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভায় স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন এই জনপ্রিয় রাজনীতিক। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠনে ফরিদ গাজীর অবদানও অপরিসীম।
বিশেষ করে, ওয়েজ আর্নার্স স্কিম চালু ছিল তাঁরই চিন্তার ফসল। যদিও পরবর্তী সময়ে সামরিক সরকার এর কৃতিত্ব দাবি করেছে। তিনি বহুবার জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। বর্তমান সংসদে দেওয়ান ফরিদ গাজী প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়সংক্রান্ত সংসদের স্থায়ী কমিটির সভাপতি ছিলেন।
প্রবীণ রাজনীতিক ফরিদ গাজী দীর্ঘদিন শ্বাসকষ্টে ভোগার পর গত ১৯ নভেম্বর ৮৬ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। দলমত-নির্বিশেষে দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তি ও লাখো জনতা শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় শেষ বিদায় জানায় তাঁকে। এর মাধ্যমে উপলব্ধি করা যায়, তিনি কোন মাপের নেতা ছিলেন। আজীবন আওয়ামী লীগ করলেও অন্যান্য দলের নেতা-কর্মীদের কাছে তিনি অত্যন্ত প্রিয় ছিলেন।
বৃহত্তর সিলেটের কিংবদন্তি রাজনীতিবিদ দেওয়ান ফরিদ গাজী ছাত্রজীবন থেকে রাজনীতি শুরু করেন। তখন ভারতে চলছিল মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে কুইট ইন্ডিয়া আন্দোলন। যেসব আন্দোলন-সংগ্রামে দেওয়ান ফরিদ গাজী অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছেন সেগুলো হলো: আসামের বাঙ্গাল খেদা বন্ধ আন্দোলন, লাইন প্রথা বিলোপ, ১৯৪৭ সালের ঐতিহাসিক গণভোট। এই গণভোটের ফলাফলের ভিত্তিতেই বৃহত্তর সিলেট তৎকালীন পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়।
এ ছাড়া ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন দেওয়ান ফরিদ গাজী। ১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক যে গণ-অভ্যুত্থানে আইয়ুুব খানের পতন ঘটে, তাতেও অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন তিনি। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে বিপুল ভোটের ব্যবধানে তিনি জয়ী হন।
এরপর আসে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ। সে সময় দেওয়ান ফরিদ গাজী ৪ ও ৫ নম্বর সেক্টরে বেসামরিক উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করার পাশাপাশি তিনি শরণার্থীদের সহায়তা করেন। পঁচাত্তরের পর সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনেও তিনি সক্রিয় ছিলেন। ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনসহ দেশের সব কটি আন্দোলনে দেওয়ান ফরিদ গাজী ছিলেন প্রথম কাতারে।
১৯৪২ সালের ‘কুইট ইন্ডিয়া’ বা ব্রিটিশ খেদাও আন্দোলনে যোগ দিয়ে তিনি ছাত্রাবস্থায় রাজনীতি শুরু করেন। আসামের রাজনীতিতে মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নেতৃত্বে অনেক আন্দোলনের অগ্রণী সেপাই ছিলেন দেওয়ান ফরিদ গাজী।
হজরত শাহজালালের অন্যতম সঙ্গী হজরত তাজউদ্দিন কোরেশী (রহ.)-এর ১৬তম বংশধর এবং দিনাজপুরের এক জমিদারপুত্র দেওয়ান ফরিদ গাজী আজীবন গণমানুষের স্বার্থে রাজনীতি করেছেন। তাঁর মতো সজ্জন, সর্বজনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব খুবই বিরল। তিনি শিক্ষকতা করেছেন, পত্রিকা সম্পাদনা করেছেন, ব্যবসা-বাণিজ্যও কিছুটা করেছেন। দেওয়ান ফরিদ গাজীর মৃত্যুতে বৃহত্তর সিলেট, তথা বাংলাদেশে নেতৃত্বের যে শূন্যতা হয়েছে, তা সহজে পূরণ হওয়ার নয়।
আলাপ প্রসঙ্গে সিলেটের এক সাংসদ বলেছেন, ‘বৃহত্তর সিলেটজুড়ে আমরা এখন যাঁরাই রাজনীতি করছি, তাঁরা সবাই ফরিদ গাজীর শিষ্য। এই জনপদে তাঁর হাত ধরে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।’
উল্লেখ্য, ১৯৭১ সালে তিনি উত্তর-পূর্ব রণাঙ্গনের আঞ্চলিক প্রশাসনিক কাউন্সিলের চেয়ারম্যান হিসেবে যুদ্ধ পরিচালনা করেন এবং ১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর সিলেট জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে প্রথম জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন। মহামান্য রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান তাঁর শোকবার্তায় বলেছেন, ‘দেওয়ান ফরিদ গাজী আজীবন আমার একজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ বন্ধু ছিলেন।’
দেওয়ান ফরিদ গাজী ছিলেন বড় মাপের নেতা। তিনি অত্যন্ত সাদাসিধে জীবন যাপন করতেন। সাধারণ মানুষের দুঃখ-কষ্টে সহায়তার হাত বাড়াতেন। এ ব্যাপারে কখনো তিনি দলীয় দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করতেন না। তিনি ছিলেন পুরোপুরি গণতান্ত্রিক। সবার কথা শুনে সিদ্ধান্ত নিতেন। নিজের মতামত কারও ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করতেন না। ব্যক্তিগতভাবে কমপক্ষে ৪৫ বছর তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল। তাঁর কাছ থেকে শিখেছি দলমত-নির্বিশেষে মানুষকে ভালোবাসতে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকেও আপন করতে পারতেন তিনি। তিনি ছিলেন নিরহংকার ও অত্যন্ত সজ্জন ব্যক্তি। উদার হূদয়ের মানুষ ফরিদ গাজী দেশ ও দেশের মানুষের কল্যাণে আজীবন কাজ করে গেছেন।
এই ত্যাগী ও নিবেদিতপ্রাণ জননেতা ৬০-৭০ বছর জাতীয় রাজনীতিতে অবদান রেখে গেছেন। তিনি বেঁচে থাকবেন তাঁর কর্মে, আদর্শে সমুজ্জ্বল হয়ে। আমি তাঁকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি।
=========================
আলোচনা- 'প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নতুন পর্যায়'  আলোচনা- 'কর্মপরিবেশঃ স্বর্গে তৈরি'  গল্পালোচনা- ‘দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া...’  আন্তর্জাতিক- উইকিলিকসঃ হাটে হাঁড়ি ভাঙা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ  গল্পসল্প- ওরা ধান কুড়ানির দল  শিক্ষা- আদিবাসী পাহাড়ে বিশ্ববিদ্যালয় চাই  জঙ্গি ও সন্ত্রাসীদের অর্থের মূল উৎস সৌদি আরব  রাজনৈতিক আলোচনা- এমন বন্ধু থাকলে...  শিল্প-অর্থনীতি শেয়ারবাজারের সুন্দরী প্রতিযোগিতা-তত্ত্ব  সাক্ষাৎকার- খাদ্যনিরাপত্তার জন্য বিকল্প উপায় খুঁজতা হবে  খবর, প্রথম আলোর-  দলীয় স্বার্থ বড় করে দেখবেন না  মার্কিন কূটনীতিকদের গোপন তারবার্তাঃ পাকিস্তানে জঙ্গি নির্মূলে ১০-১৫ বছর লাগবে  অধ্যাপক ইউনূসের অর্থ স্থানান্তর : গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যাখ্যা  শিল্প-অর্থনীতি 'সময় এসেছে মাথা তুলে দাঁড়াবার'  প্রকৃতি- 'কিয়োটো প্রটোকল ভেস্তে যাচ্ছে, কানকুনে কী হবে?  আলোচনা- 'মেয়েদের লাঞ্ছনা বন্ধ করতে কঠোর হতে হবে'  যুক্তি তর্ক গল্পালোচনা- 'আগ্নেয়গিরির ওপরে পিকনিক'  আলোচনা- 'হিমালয়ের কোলে এক টুকরো দক্ষিণ এশিয়া'  স্মরণ- 'মানুষের জন্য যিনি জেগে থাকতেন'  রাজনৈতিক আলোচনা- 'আবার আসিব ফিরে!'  আলোচনা- 'রাজকীয় সম্মেলন'  যুক্তি তর্ক গল্পালোচনা- 'অসারের তর্জন-গর্জন'  আলোচনা- 'একজন নোবেল বিজয়ী, বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ও ক্ষুদ্রঋণের ফাঁদ'  স্মৃতি ও গল্প- সেই আমি এই আমি  গল্প- 'ঘুঁটি'  আন্তর্জাতিক- অং সান সু চির মুক্তি : মিয়ানমারে কি কি গণতন্ত্র আসছে?  শিল্পি- শিল্পগুরু সফিউদ্দীন আহমেদের সৃষ্টিসমগ্র  সাহিত্যালোচনা- তান তুয়ান এঙের উপন্যাস দ্য গিফট গিফট অব রেইন  খবর- বন্ধ তাবানীতে লোক নিয়োগ  ইতিহাস- আমাদের ভাববিশ্ব ও বৌদ্ধবিহার  স্মৃতি ও ইতিহাস- ঢাকায় আমার প্রথম তিন দিনের স্মৃতিরোমন্থন  আলোচনা- একমাত্র প্রবাল দ্বীপটি কি হারিয়ে যাবে  আলোচনা- বাংলাদেশের সমাজ : মধ্যবিত্ত সমাচার  গল্প- দূর গাঁয়ের গল্প


দৈনিক প্রথম আলোর সৌজন্যর
লেখকঃ এম মুহিবুর রহমান


এই আলোচনা'টি পড়া হয়েছে...
free counters

No comments

Powered by Blogger.