গড়াপেটার ম্যাচ জেতার চেষ্টা মানুষের মানায় না

পাঠকদের সঙ্গে নানারকম কথাবার্তা হয়েই থাকে আমার। বেশ কয়েক বছর ধরে লক্ষ করছি, আমাদের ইয়াং জেনারেশন, বিশেষত বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের ছাত্রছাত্রীরা চিন্তাশক্তিতে বেশ পাকা। এদের কোনো কোনো পাকনামি হিউমারাসও। যেমন, একটি প্রাইভেট ইউনিভার্সিটির এক ছাত্র একদিন বলল- বস্ জীবনটা পার্ট বাই পার্ট খুলে দেখলাম, কিচ্ছু নাই, ভ্যাকিউম! কথাটা অনেকটা এমন মনে হল যে, পাঁচ বছরের এক শিশু বলছে, সে নস্টালজিয়ায় ভুগছে! ২৩-২৪ বছরের এক কাঁঠাল কত কিল খেল যে, এত পাকল! তো সেদিন কয়েক যুবক নিজেরা নিজেরা ফেসবুকের মাধ্যমে জড়ো হয়ে সোজা চলে এল যুগান্তর কার্যালয়ে। তারা এত পাকা যে, মিডিয়ার কাউকে, তা তিনি যত বয়স্কই হোন, আঙ্কল বলে না। ‘স্যার’ সম্বোধনে লাঞ্চ করাবে বলে তারা নিয়ে যেতে চাইল আমাকে ফিউচার পার্কের ফুড কোর্টে। বেশ বুঝতে পারি, এটা হল লাঞ্চের ছলে গল্প করা। আমারও আপত্তি নেই। এরা তো ডলি সায়ন্তনীর সেই গানের ‘রঙচটা জিন্সের প্যান্ট পরা, জ্বলন্ত সিগারেট ঠোঁটে ধরা’ যুবক নয়, আমার পাঠক।
তাছাড়া আমি নিশ্চয়ই সুরঞ্জনা নই যে, জীবনানন্দ বারণ করেছেন, ‘ওইখানে যেয়োনাকো তুমি, বোলোনাকো কথা ওই যুবকের সাথে।’ লাঞ্চের টেবিলে প্রথমেই আমি এদের দৃষ্টিভঙ্গিটা একটু যাচাই করতে চাই। এ ব্যাপারে অনেক পদ্ধতি আছে। একটা এমন- মানবেতিহাসের শুরু থেকে এ পর্যন্ত পছন্দের পাঁচ ব্যক্তির নাম করতে বলা। এরকম একবার এক সুন্দরী নামগুলো সাজিয়েছিল এভাবে- কবি নজরুল ইসলাম, কবি জসীম উদ্দীন, হুমায়ূন আহমেদ, ডেল কার্নেগি ও একজন ধর্মীয় গুরু (নামটা বললাম না)। মেয়েটি নিশ্চয়ই রেলস্টেশন কিংবা বাস টার্মিনালে বই বিক্রেতার বাস্কেটে ডেল কার্নেগির কোনো একটি বই দেখতে পেয়েছিল। আর সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে একজন ইংরেজি ভাষাভাষীর নাম যুক্ত করে সে নিজেকে আলাদা ভেবেছিল। আমি ওই মেয়ের সঙ্গে আর কথাই বলিনি, বলি না। আবার এমনও দেখেছি, বিজ্ঞান থেকে নিউটনকে নেবে না আইনস্টাইন কিংবা ডারউইনকে, সাহিত্য থেকে শেকসপিয়র না রবীন্দ্রনাথ অথবা টলস্টয়, সমাজবিজ্ঞান থেকে কার্ল মার্কস না মরগ্যান, দর্শনে অ্যারিস্টটল না ভলতেয়ার, রাজনীতি থেকে নেলসন ম্যান্ডেলা, না চার্চিল- দ্বিধায় পড়েছে। ওরা চিরসঙ্গী হয়ে থাকল। আমার এই যুবকদের ক্ষেত্রে আমি অন্য পদ্ধতির আশ্রয় নিই। বলি, ব্রিটিশ মিউজিয়াম ঘুরে দেখার পর আমি ট্রাভেল ডায়েরিতে লিখেছিলাম- Man is never born in time. He is either too early or too late- মানুষ আসলে কখনই সঠিক সময়ে জন্মায় না, আর তাই তার যত আক্ষেপ সে আগে জন্মেছে বলে মঙ্গলগ্রহে তার ফ্ল্যাট হল না; আর সে মোহাম্মদ (সা.), যিশুকে দেখতে পায়নি, কারণ সে পরে জন্মেছে। তোমরাও নিশ্চয়ই বয়স্ক কোনো আকর্ষণীয়াকে দেখলে ভাবো, আহা আরেকটু আগে পৃথিবীতে এলে তো প্রেম করতে পারতাম! তো ধরো,
তোমাদের আলাদা আলাদাভাবে টাইম মেশিনে চড়িয়ে দেয়া হল। একটাই অপশন, হয় অতীতে যেতে পারবে, না হয় ভবিষ্যতে। বেশিদূর অ্যালাও করব না, টাইম-লিমিট তিন হাজার বছর। কোন্দিকে যাবে? সবাই একসঙ্গে বলে ওঠে, ওরা অতীতে যাবে। একেকজনের একেক কারণ। কেউ বলল, দুই-এক বছরে থাকতে মা তাকে মারত কিনা, সেটা দেখার সুযোগ হবে; কেউ বলে হজরত মোহাম্মদ (সা.)-এর বিদায় হজের ভাষণ লাইভ দেখতে পারবে, যিশুরও দেখা মিলবে; এক অতি পাকা যুবকের বক্তব্য- সে গ্রিক দার্শনিকদের দেখতে পারবে, আরও পারবে দেখতে রোমান সাম্রাজ্যের পতনের দিনগুলো। আমি বললাম, আমি কিন্তু ভবিষ্যতে যাব। কারণটা হচ্ছে, দূর অতীতের ঘটনাগুলো আমরা প্রত্যক্ষ করিনি ঠিকই; কিন্তু সেগুলো সম্পর্কে আমাদের মোটামুটি একটা ধারণা আছে। অতীতে ফিরলে তাই আমরা বিস্মিত হব হয়তো, তবে বিস্ময়াভিভূত হব না। কিন্তু তিন হাজার বছর পর এই পৃথিবী, এই মহাবিশ্ব কী রূপ ধারণ করবে, কে জানে। বিস্ময়ের মহা ঘোরের মধ্যে হয়তো আমি তখন। অথবা দেখা গেল, একটা মহাপ্রলয়ের পর এই বিশ্ব-ব্রহ্মাণ্ড বিশালাকার ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে এবং তারই ওপর ল্যান্ড করল আমার টাইম মেশিন। হয়তো সেটা এমন এক সময়, যা ব্যাখ্যা করার ক্ষমতা নেই আমার। সুতরাং ভবিষ্যতের পানে ধাবিত হওয়াটাই আমার কাছে বেশি এক্সসাইটিং, মোর থ্রিলিং।
যুবক সম্প্রদায়কে সাইডলাইনে রেখে আজকের মূল প্রতিপাদ্যে ফিরছি এখন। আমরা যখন কোনো পাহাড়ের পাদদেশে দাঁড়াই, অথবা বিমানে ভ্রমণ করি, তখন টের পাই আমাদের ক্ষুদ্রত্ব। সেই আমরাই যদি মহাকাল ও মহাবিশ্বের বিপরীতে নিজেদের কথা চিন্তা করি, তখন সেটা কত ক্ষুদ্র? ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বললেও কম বলা হবে। ’৭৫ কী ’৭৬ সালে একদিন মধুর ক্যান্টিনে গিয়ে দেখি, ছাত্রলীগের কয়েকজন, যারা আমার ‘তুই তোকারি’র বন্ধুও বটে, ধুমসে তর্ক-বিতর্ক করছে। উল্টিয়ে ফেলছে সব। আমি একটা চেয়ার টেনে বসতে বসতে বললাম- ক’ দেখি, কয়টা বাঘ-ভাল্লুক মারলি? শোন্ এই ইউনিভার্সে বিলিয়ন বিলিয়ন সিস্টেম ওয়ার্ক করছে। সেগুলোর একটি হল সোলার সিস্টেম। এই সিস্টেমের একটা অতি ক্ষুদ্র পার্ট হচ্ছে পৃথিবী নামের এই গ্রহ। এটার আবার তিন ভাগ পানি, এক ভাগ মাটি। এই মাটি ৭টি মহাদেশে বিভক্ত, তার একটা এশিয়া। এশিয়ার একটি ভাগ হল দক্ষিণ এশিয়া, বাংলাদেশ তারই একটি দেশ। এই দেশের রাজধানী হল ঢাকা, সেই ঢাকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছোট্ট এই ক্যান্টিন। নিজেরে খুব বড় ভাবতেছোস, না? এইসব বাঘ-ভাল্লুক মারা বাদ দে। পারোস যদি, ইউনিভার্সের মতো বড় অ্যাসাইনমেন্ট দিলাম না, অন্যরকম একটা পৃথিবী বানা। আর না পারলে শুধু চা খা। রবীন্দ্রনাথও লিখেছেন- আকাশভরা, সূর্য-তারা, বিশ্বভরা প্রাণ, তাহারি মাঝখানে আমি পেয়েছি মোর স্থান! অথচ এই জীবন নিয়ে কত আয়োজন, ক্ষুদ্রত্বের বিশাল আকার দেয়ার কত প্রাণান্ত ব্যর্থ চেষ্টা! যদি রবীন্দ্রনাথ বা বঙ্গবন্ধু হওয়া যেত, কথা ছিল না। মেধা সাধারণ, তাই একটা স্বাভাবিক জীবনই হতে পারত চাওয়া; কিন্তু না, গড়াপেটা করে ম্যাচ জেতার কত ফন্দি! টাকা চাই, আরও টাকা, আর তাই ফিক্সিং করে নিচ্ছি ঘুষ, কমিশন; ফিক্সিং করে জিততে চাইছি নির্বাচনী ম্যাচও। টাকা ও ক্ষমতা- এই দুই পরম আরাধ্য ঠেলে দিচ্ছে হত্যা করতেও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টিকারীকে।
ফিক্সিং আজ ক্রিকেট ছাড়িয়ে ব্যাপ্ত হয়েছে নির্বাচনে, ঘুষ বাণিজ্যে, প্রকল্পের টেন্ডারে, যে কোনো ফাইল চলাচলে, প্রতিপক্ষ চিহ্নিতকরণে, অনুগ্রহভাজনদের লিস্টি তৈরিতে, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নির্ধারণে, এমনকি দুস্থ মাতার গমের কার্ড বিতরণের মতো অতি সাধারণ ব্যাপারেও। দারিদ্র্য অভিশাপ বটে, তবে অন্যের দারিদ্র্যের রূপান্তর ঘটিয়ে তাকে নিজের জীবনে আশীর্বাদ বানানো- এই মানসিক দারিদ্র্যের কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। ‘অভিশাপ-টার্নড-আশীর্বাদে’ পুষ্ট হয়ে দুস্থ মাতার চেয়েও দরিদ্ররা সমাজে সাজতে চাইছে বিশিষ্ট। চাইবেই বা না কেন? এই ক্ষুদ্র তো বিশাল মহাকাল-মহাবিশ্বের দিকে তাকায় না! কেন বুঝতে পারি না, আলটিমেট বিচারে মানুষ বড় একা। যে জীবন দেখিয়ে বেড়াচ্ছি সমাজে, সে তো আমার নয়। আমার জীবন বন্দি হয়ে আছে একাকিত্বের প্রাচীরে। এই প্রাচীর স্পষ্ট হয়ে ওঠে জেলজীবনে, পরাক্রমশালী শাসক যখন ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দাঁড়ায় কাঠগড়ায়, তখন; কিংবা পঙ্গু জীবনের একটা পর্যায়ে যখন আসে না কোনো দর্শনার্থী। বিষণ্ণতায় কখনও কখনও যে ছেয়ে যায় মন, সে তো একাকিত্বেরই ধর্ম। মানুষ একা নয়? তবে কেন কয়েক পুরুষ আগে জীবনপ্রবাহের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল যে মনুষ্যকুল, তাদের কোনো স্মৃতি নেই, নামটি পর্যন্ত জানে না বর্তমানের কেউ, এমনকি বংশলতিকার বর্তমান প্রজন্মেরও কোনো উত্তরাধিকারী! তবে কেন অতি ঘনিষ্ঠ কারও মৃত্যুর পর কয়েকদিন না যেতেই হঠাৎই নিজের সঙ্গে মিলে যায় যখন তার স্মৃতি, কেবল তখনই মনে পড়ে তাকে? সে-ও তো আবার মুহূর্তেরই ভাবনা! বঙ্গবন্ধু? অথবা তার সমমানের ভিন্ন জাতির কেউ? তারা তো ‘লাখো মে এক’ (একটি পাকিস্তানি চলচ্চিত্রের নাম)। একটা বিষয় কিছুতেই কনসিভ করতে পারি না। যৌবনে যদি প্রয়োজনের অধিক অর্থ-সম্পদের মোহ থাকে কারও, তার একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করানো যায়। তার সামনে পড়ে আছে বিস্তৃত সময়, অনাগত ভবিষ্যতে ভোগে কাজে লাগবে সেই উদ্বৃত্ত। কিন্তু ইংরেজিতে যাকে বলে ‘ওয়ান লেগ ইন দ্য গ্রেভ’- এক পা মাটির নিচে- তাকে কেন আচ্ছন্ন করে রাখে বিত্তবৈভবের চিন্তা? ডাক্তার বলেছে, আর বেশিদিন নেই; কিন্তু মন বলে না- আর দরকার নেই। কীসের প্রয়োজন ওই সম্পদ? বংশধরদের জন্য রেখে যাওয়ার? সন্তান-সন্ততির জন্য জীবনাদর্শ না রেখে রাখতে হবে সম্পদ? বয়সের ভারে ন্যুব্জ বিএনপির প্রয়াত নেতা মীর্জা গোলাম হাফিজের বিরুদ্ধে যখন আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল, লিখেছিলাম- তিনি চোখে দেখেন না, কানেও শোনেন না, পারেন শুধু টাকা গুনতে! কাউকে ওঠাতে হবে না,
প্রশ্নটা এবার আমিই ওঠাই- জীবন যদি এতই তুচ্ছ, তাহলে সেই জীবন চালাই কেন? অথবা মানুষের আরাম-আয়েশের কি কোনোই প্রয়োজন নেই, যদি থাকে তাহলে কি থাকবে না তার বাড়তি টাকা? সবাই যদি অর্থহীন, তাহলে রাষ্ট্র পরিচালনা করবে কোন্ সেই যোগ্য মানুষ? আরও প্রশ্ন, মানুষ কি করবে না রাজনীতি, সভ্যতাকে কন্ট্রিবিউট করতে প্রয়োগ করবে না কি তার উদ্ভাবনী ক্ষমতা? জীবন যদি এতই নির্মূল্য, প্রেম-ভালোবাসাও কি তাহলে খেলো হয়ে যায় না? প্রশ্নটা আরেকটু গাঢ় করে আরও বলা যায়- ক্ষুদ্র মানুষের বৃহৎ হওয়ার আকাক্সক্ষায় কী এমন দোষ! এসব প্রশ্নের উত্তর দেয়ার আগে একটা ঘটনা বলতে হবে। তারও আগে বলে নিই, জীবন অর্থহীন কথাটা অনেকে ফ্যাশনও মনে করে থাকেন, গত শতাব্দীর সত্তর দশকে যুবসমাজ একটি আপ্তবাক্য আউড়িয়ে যেমন ফ্যাশন করত- আমি ফ্রাস্ট্রেশনে ভুগছি। সাইকিয়াট্রিস্টরাও নিশ্চয়ই বলবেন, জীবন অর্থহীন কথাটা মানসিক রোগেরই লক্ষণ। যা হোক, এবার আমরা দেখব জীবন কীভাবে একইসঙ্গে অর্থহীন ও অর্থপূর্ণ। পরপারে হুমায়ুন আজাদের বিচার প্রক্রিয়ার কী অবস্থা জানি না; তবে তার বিরুদ্ধে একটা অভিযোগ তো আনাই যায়- বাঙালি সমাজকে বিনোদনবঞ্চিত করে কেন এত দ্রুতই চলে গেলেন তিনি এপার থেকে। তো একদিন তিনি আমার অনুজপ্রতিম সাংবাদিক দেবদুলাল মুন্নার সঙ্গে লঞ্চে ঢাকা আসছিলেন। লঞ্চের রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে দু’জন,
নদীবক্ষে প্রসারিত তাদের দৃষ্টি। ভাঙা-গড়ার ঢেউ দেখতে দেখতে আজাদ মুন্নাকে বললেন- বুঝলে মুন্না এই জীবনের কোনো অর্থ নেই, লাইফ ইজ মিনিংলেস। মুন্না বলল- যদি তা-ই হয়, আপনি তো সাঁতার জানেন না, চলুন দু’জনই ঝাঁপ দেই। আজাদ বললেন- না, এটা করা যাবে না। মুন্না যুক্তি দেখিয়েছিল- লাইফ যদি মিনিংলেসই হয়, তাহলে সেই জীবন রেখে কী লাভ? আজাদ এই যুক্তি খণ্ডন করেছিলেন- আরে বোকা, ঝাঁপ দিলে লাইফ মিনিংফুল হয়ে উঠবে! খুব উঁচু মাপের দার্শনিক উপলব্ধি ছিল বটে এটা হুমায়ুন আজাদের। হ্যাঁ, এই জীবন বাঁচিয়ে রাখতে হবে। শুধু তা-ই নয়, ফুলে-ফলে সাজাতেও হবে। এবং জীবন যেহেতু ড্যাফোডিলের মতো ক্ষণস্থায়ী, ওয়ার্ডসওয়ার্থের ভাষায়- blooms in the morning and withers away in the evening- সকালে ফুটিয়া সন্ধ্যায় ঝরিয়া যায়- তাই যতটা সম্ভব অনর্থ থেকে রক্ষা করতে হবে জীবন। আসলে জীবনে যে অনর্থ ঢুকে যায়, তার একটি বড় কারণ, ধনী ও বিখ্যাত হওয়ার মোহে শর্ট-কাট রাস্তা খুঁজতে চায় সে। অথচ পরিচ্ছন্নতার সঙ্গে এই দুই পরিচয় অর্জনের কোনো শর্ট-কাট রাস্তা খোলা নেই। শর্ট-কাট মানেই সেখানে থাকবে অসদুপায়। মানবজাতির ইতিহাস বলছে, অসদুপায় অবলম্বন করে কখনও কখনও সাফল্য অর্জিত হয় বটে, তবে সেটা নিছকই ভঙ্গুর সাফল্য। স্থায়ী কৃতিত্ব নয়। দিনের শেষে হিসাব কষলে দেখা যাবে- অসদুপায় জীবনের প্রকৃত চাহিদা পূরণ করেনি। সাধারণ নিয়মটা হল- honesty pays- সততাই শোধ করে জীবনের মূল্য। আবার এমনও হয়,
সততার মধ্যে থেকেও সাধ্যের অতীত কিছু অর্জন করতে গিয়ে তৈরি হয় অনর্থ। সেটা সময়ের অপচয় বটে। রবীন্দ্রনাথ যেমন চীন উদ্ধারের ব্যর্থ চেষ্টার বদলে রেস (জুয়া) খেলিয়া জীবন ধ্বংস করাকেই উত্তম বিবেচনা করেছিলেন। দেশের নামসর্বস্ব ছোট রাজনৈতিক দলগুলোর দিকে তাকালে কবিগুরুর এই দর্শন খুব মনে আসে। এই সময়গুলো অন্য কাজে ব্যবহার করলে হয় না? দ্বিতীয় যে কথা, দুর্নীতি মানে তা শুধু আর্থিক নয়। রাজনৈতিক ও দার্শনিক দুর্নীতি বরং আর্থিক দুর্নীতির চেয়ে বেশি বিপজ্জনক, সমাজ-রাষ্ট্রের জন্য বেশি ইনজিউরিয়াস, ক্ষতিকারক। স্বাধীনতাবিরোধীদের রাজনীতিতে পুনর্বাসনের যে রাজনৈতিক দুর্নীতি, তা যে কত বড় অনিষ্ট করেছে দেশের, তা আর বলতে! আবার নারীকে অন্তঃপুরবাসিনী করে রাখতে হবে- এই দার্শনিক দুর্নীতি মহাকালের বর্তমান পর্যায়টি মানতে রাজি নয়। সব ধরনের দুর্নীতি থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারলেই জীবনকে অর্ধেক অর্থপূর্ণ করা যায়। বাকিটা কৃতিত্ব দেখিয়ে। এই মহাবিশ্বে আমরা সবাই একেকটি ড্যাফোডিলের অধিক কিছু নই। এই স্বল্পক্ষণে যে যত সুগন্ধ ছড়াতে পারবে, তার জীবন তত অর্থপূর্ণ। অহংকারের কোনো জায়গা রাখেনি মহাকাল। বয়সকালে যেমন খোঁজ পাওয়া যায় না স্কুলজীবনের কে কোথায় হারিয়ে গেছে, প্রত্যেকের নিজস্ব সময়টাও একদিন হারিয়ে যাবে মহাকালের গর্ভে। তবু কেন এই শরীরটাকে এত শক্তিমান ভাবা, জনস্বার্থ ও মানবসভ্যতার দিকে না তাকিয়ে শুধু নিজেকে নিয়েই কেন এই ব্যস্ততা?
মাহবুব কামাল : সাংবাদিক
mahbubkamal08@yahoo.com

No comments

Powered by Blogger.