দুর্যোগ মৌসুমের দুর্ভাবনা by নূরুননবী শান্ত

শীত বিদায় নিয়েছে। বাংলাদেশে আসছে প্রাকৃতিক দুর্যোগের মৌসুম। এ রকম একটা সময়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিশ্বব্যাপী কর্মরত আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর নেটওয়ার্ক ইমার্জেন্সি ক্যাপাসিটি বিল্ডিংয়ের বাংলাদেশ কনসর্টিয়ামের আয়োজনে গত ২৮ ও ২৯ ফেব্রুয়ারি ঢাকার একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত হলো আন্তর্জাতিক শিখন বিনিময় কর্মশালা।

কর্মশালায় অংশগ্রহণকারীরা দুর্যোগ মোকাবেলায় বাংলাদেশের গণমানুষের দক্ষতা ও মনোবলের প্রশংসা করেন। বাংলাদেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ব্যুরোর মহাব্যবস্থাপক আহসান জাকির এ ক্ষেত্রে দুটি রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের ইতিবাচক ভূমিকা তুলে ধরলেন। একটি হলো, ১৯৭৩ সালে শুরু হওয়া ঘূর্ণিঝড় মোকাবেলায় পূর্বপ্রস্তুতিমূলক কর্মসূচি, যার মূল পুঁজি জনগণের স্বেচ্ছাশ্রম এবং আরেকটি হলো বিভিন্ন সময়ের দুর্যোগ পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারের স্ট্যান্ডিং আদেশগুলো।
বাংলাদেশ ভূখণ্ডের ৬১% অঞ্চলই বন্যাপ্রবণ। এর মধ্যে ২৩% এলাকা প্রতি বছরই বন্যাক্রান্ত হয়। অন্যদিকে ৪৬% ভূমি শুকনো মৌসুমে খরায় আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা থাকে এবং বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলসহ ৩২% অঞ্চলই সাইক্লোনে আক্রান্ত হয়। এ সত্ত্বেও বাংলাদেশের পক্ষে এত দূর এগিয়ে আসা সম্ভব হয়েছে দুর্যোগ মোকাবেলায় সরকারের পাশাপাশি স্বতঃস্ফূর্ত বেসরকারি উদ্যোগ এবং সবচেয়ে বড় কথা স্থানীয় জনসমাজের প্রত্যক্ষ ও সাহসী ভূমিকার কারণে।
কিন্তু আমাদের প্রচেষ্টাপথে বাধার অন্ত নেই। সমন্বিত দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মসূচির অতিরিক্ত সচিব ও জাতীয় প্রকল্প পরিচালক মোহাম্মদ আবদুল কাইয়ুম মনে করেন, বাংলাদেশের মানুষের সামাজিক মূল্যবোধ ও ধর্মীয় অনুভূতি প্রকৃতিগতভাবেই মানবিক পরিস্থিতি মোকাবেলার অনুকূল। তবে জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলায় গৃহীত পরিকল্পনাগুলোতে আক্রান্ত জনগোষ্ঠীর মতামত বিবেচনার সুযোগ এখনও সীমিত। তাছাড়া সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয়েরও অভাব রয়েছে। অধিকন্তু ভাটির দেশ হিসেবে নদী জালবেষ্টিত বন্যাপ্রবণ বাংলাদেশের প্রতি প্রতিবেশী দেশ, বিশেষ করে ভারতের অধিকতর মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রত্যাশিত। কেননা বাংলাদেশের ৫৪টি গুরুত্বপূর্ণ নদীই ভারত থেকে এসেছে। সেগুলো বিষয়ে দুই দেশের সমঝোতার অভাবও আমাদের অধিকতর দুর্যোগের ঝুঁকির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। ভাটির সমস্যা উজানে সঞ্চারিত না হলেও উজানের সমস্যা বর্ধিত আকারে বাংলাদেশে জরুরি পরিস্থিতি সৃষ্টি করে। তার ওপর নদী ও জলাশয়গুলোকে আমরা দূষণের হাত থেকে, দখলদারদের খপ্পর থেকে মুক্ত রাখতে ব্যর্থ হচ্ছি। সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ বিভাগের সচিব ড. আসলাম আলম বলেন, এরপরও যে বিশ্ব বাংলাদেশের দুর্যোগ মোকাবেলার দক্ষতা থেকে শিক্ষা নিতে আগ্রহী, তার একমাত্র কারণ এ দেশের সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা ও দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকার মনোবল। দুর্যোগের আঘাতে আঘাতে ক্ষতবিক্ষত মানুষ নিজেদের অস্তিত্বের প্রয়োজনেই আয়ত্ত করেছে দুর্যোগ মোকাবেলার কৌশল।
খুলনার দাকোপের আসিয়া বেগম ও হরসিৎ রায় জানান, ২০০৯ সালের আইলার পর সাতক্ষীরা, খুলনার মানুষ যখন পুকুরের মাছ, গোয়ালের গরু, থাকার ঘর সব হারিয়ে নিঃস্ব, তখন তাৎক্ষণিকভাবে তাদের খোঁজ নিতে গণমাধ্যমের কর্মীরা ছাড়া আর কেউ যাননি। সরকার তো বলেই দিয়েছিল যে, আইলা আক্রান্ত এলাকায় বেসরকারি সহায়তা দরকার নেই। অবশেষে যখন এনজিওগুলো গেছে, তারা কেবল হতদরিদ্রদের খুঁজেছে। অথচ দুর্যোগে ধনী-মধ্যবিত্ত-দরিদ্র বলে কিছু থাকে না। দাকোপের মানুষ নিজেরা শ্রম দিয়ে যখন বাঁধ নির্মাণ করেছেন, তখন পানি উন্নয়ন বোর্ডের দায়িত্ব শুধু প্রশ্নবিদ্ধই হয়েছে। ওদিকে চিংড়ি ঘের মালিকরাও ১৯৬০ সালে বাঁধ সংস্কারের পক্ষে ছিলেন না, যার কারণে আইলার ক্ষয়ক্ষতি অবর্ণনীয়।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে নিকট ভবিষ্যতের বাংলাদেশে ঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও বন্যার প্রকোপ আরও বাড়বে। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক সমীক্ষা অনুযায়ী কেবল উপকূলীয় অঞ্চলেই ২০৫০ সাল নাগাদ ক্ষতিগ্রস্ত হবে এক কোটি ৩৫ লাখ মানুষ। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে ঝুঁকির মধ্যে পড়বে আরও অতিরিক্ত ৯০ লাখ মানুষ। পরিস্থিতি মোকাবেলায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও উপকূলীয় বেড়িবাঁধ উঁচুকরণ, মেরামত, পুনর্নির্মাণ, প্রয়োজনীয় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ ইত্যাদি বাবদ বাংলাদেশের প্রয়োজন হবে ৭৫০ কোটি মার্কিন ডলার। এসবের পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধিতেও ব্যাপক কর্মসূচি হাতে নেওয়া দরকার। বাংলাদেশের ঘূর্ণিঝড় পূর্বপ্রস্তুতি কর্মসূচির পরিচালক আবদুল আহাদ স্বীকার করলেন, দুর্যোগের পূর্বাভাস দেওয়ার প্রাতিষ্ঠানিক ভাষা সাধারণ মানুষ খুব কমই বোঝেন; অনেকে সতর্কসংকেত বুঝেও উপেক্ষা করেন; অনেকে অবশ্যই সতর্কসংকেতকে গুরুত্ব দেন কিন্তু সময়মতো সতর্কতা অবলম্বন করে নিজেদের জানমালের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ করেন না। এর জন্য সামাজিক শিক্ষার প্রসার ঘটাতে হবে।
কর্মশালায় ভারত, পাকিস্তান, বলিভিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার প্রতিনিধি কর্তৃক নিজ নিজ দেশে জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলার অভিজ্ঞতা তুলে ধরা হয়। সেসবের আলোকে বলা যায়, বাংলাদেশে জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলার কর্মসূচিগুলো রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে রেখে একটি সমন্বিত রূপরেখার আওতায় আনতে হবে। কেবল বন্যা, ঝড়, জলোচ্ছ্বাসই নয়, ভূমিকম্পের জন্যও আমাদের সার্বিক প্রস্তুতি থাকতে হবে। সরকার শহরাঞ্চলের জন্য ৬২ হাজার স্বেচ্ছাসেবীকে প্রশিক্ষণদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু অপরিকল্পিত নগরায়ন বন্ধ না করলে স্বেচ্ছাসেবীরা কতটাই আর সহায় হবেন। নির্মাতাদের বিল্ডিং কোড মানতে বাধ্য করার বিকল্প আপাতত নেই। প্রয়োজনীয় সংখ্যক ডাক্তার, নার্স, সাইকোলজিস্টকেও প্রস্তুত রাখতে হবে। নিরাপত্তা বাহিনীসহ সরকারি-বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার সমন্বিত সমীক্ষা, সম্ভাব্য জরুরি পরিস্থিতি মোকাবেলার পরিকল্পনা থাকা উত্তরোত্তর অধিকতর দুর্যোগপ্রবণ হয়ে ওঠা বাংলাদেশের এখন অত্যাবশ্যকীয় কাজ। সে জন্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন প্রণয়নে আর বিলম্ব করা উচিত হবে না। গত প্রায় ৩৩ বছর ধরে নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে অবশেষে গত ২৬ ডিসেম্বর আইনটি কেবিনেটের অনুমোদন লাভ করেছে। প্রধানমন্ত্রীর দফতর আশ্বাস দিয়েছে যে, মার্চের মধ্যেই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আইন জাতীয় সংসদের অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। কিন্তু কেবল দুর্যোগ মোকাবেলা নয়, কার্বন নিঃসরণের মতো দুর্যোগের কারণ নিয়ন্ত্রণ করতে এবং দরিদ্র দেশগুলোতে দুর্যোগ মোকাবেলায় ধনী দেশগুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে চাপ প্রয়োগ করার জন্য আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কগুলোয় বাংলাদেশের তৎপরতা বৃদ্ধি করতে হবে।

নূরুননবী শান্ত :গল্পকার
shantonabi@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.