জাস্টিস ডেলেইড ইজ জাস্টিস ডিনাইড by ড. আবদুল লতিফ মাসুম

বিচারব্যবস্থা সম্পর্কে প্রাচীনকাল থেকে কথিত প্রবাদ বাক্যটি এ রকম- ‘জাস্টিস ডেলেইড ইজ জাস্টিস ডিনাইড’। প্রথমবার কে অভিধাটি ব্যবহার করেছিলেন তা নিয়ে মতভেদ আছে। তবে উদ্ধৃতির অভিধানে উইলিয়াম ইয়াওয়াট গ্লাডস্টোনের নামে এটা লেখা আছে। আধুনিক সময়ে প্রবাদটি এভাবে ব্যবহার করেছেন ‘টু ডিলে জাস্টিস ইজ ইন জাস্টিস’। বাংলায় প্রবাদটির জুতসই প্রতিবাক্য তৈরি হয়নি। তবে আমরা ‘বিলম্বিত বিচার, বিচার অস্বীকারেরই নামন্তর’- এ রকম অনুবাদ করতে পারি। বাক্যটির ব্যাখ্যা করলে এ রকম বলা যায়, কোনো দল বা পক্ষ যদি তাৎক্ষণিকভাবে তার প্রতিকার না পায়, তাহলে তা তার জন্য কোনো প্রতিকার, প্রতিবাদ এবং প্রতিরোধ সৃষ্টি করে না।
বরং সময়ান্তরে প্রতিকার, ইচ্ছা, প্রতিবেদন আলামত এবং পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটায়। প্রতিপক্ষ এ অবস্থাকে নানা কায়দাকৌশল, ঘুষ-দুর্নীতি এবং তদবিরের মাধ্যমে বিষয়টি বিরূপ ব্যাখ্যা করেন। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, অবশেষে কোনো বিচার বা প্রতিকার করা হয় না। বিশেষ করে জুলুমকারী শোষক শ্রেণী মুজলুম যাতে বিচার না পেতে পারে বা না চাইতে পারে সে অবস্থার সৃষ্টি করে। আমাদের দেশে বংশানুক্রমে মামলা পরিচালনার ইতিহাস রয়েছে। সে জন্য পৃথিবীব্যাপী যাতে দ্রুততার সাথে মানুষ বিচার পেতে পারে সে ধরনের আইনি সংস্কার ঘটেছে। দুটি কারণে বিচার বিলম্বিত হয়ে থাকে। প্রথমত, বিচারব্যবস্থাটি যদি জটিল এবং ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত হয়। দ্বিতীয়ত, ক্ষমতাসীন ব্যক্তি, দল এবং গোষ্ঠী যদি বিচারকে তাদের স্বার্থ ও সুবিধার পক্ষে নিয়ে যেতে চায়। বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় প্রবাদটির প্রয়োগ একটি বাস্তব সত্য। বেগম খালেদা জিয়ার দ্রুত মুক্তি তথা জামিন লাভে সরকারের কার্যব্যবস্থা দেখে ওই প্রবাদ বাক্যটি মনে পড়ে যায়। প্রায় এক মাস ধরে সাবেক প্রধানমন্ত্রী কারাগারে থাকলেও তার জামিন ও মুক্তি নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি হাইকোর্ট বেঞ্চ বলেছেন, বিচারিক আদালতের নথি এলে তা দেখে আদেশ দেবেন। বেগম খালেদা জিয়া পক্ষ আশা করেছিলেন নথি দ্রুত আসবে। কিন্তু এ নিবন্ধ লেখা পর্যন্ত (০১ মার্চ ২০১৮) অবধি নথি এসে পৌঁছেনি। উচ্চ আদালতের আদেশ অনুযায়ী মূল নথি ১৫ দিনের মধ্যে পাঠিয়ে দেয়ার কথা। সুতরাং সরকার পক্ষ যদি ১৪ দিন পর মূল নথি উচ্চ আদালতে পাঠায় তাহলে আইনের ব্যতিক্রম ঘটছে না। বিলম্বিত করার কৌশলগত সুবিধা তারা নিচ্ছে, যাতে বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি বিলম্বিত হয়। এর আগে তারা হাইকোর্টের আবেদনের জন্য প্রয়োজনীয় নিম্ন আদালতের রায়ের কপি দিতে বিলম্ব ঘটায়। পাঁচ দিনের মধ্যে রায়ের কপি দেয়ার কথা থাকলেও সেখানে তারা ১২ থেকে ১৪ দিন লাগিয়েছে। জামিন শুনানিতে সরকারপক্ষের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা ‘পল্টনী বক্তৃতা’ দিয়েছেন। তিনি নিশ্চয়ই আদিষ্ট হয়ে কথা বলেছেন। এ বিষয় নিয়ে সরকার ও বিরোধী পক্ষে বক্তৃতা বিবৃতি অব্যাহত রয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও খালেদা জিয়ার আইনজীবী আশা প্রকাশ করেছেন সরকার বিঘ্ন সৃষ্টি না করলে দ্রুত নিম্ন আদালতের নথি আসবে এবং খালেদা জিয়া জামিন পাবেন। অপর দিকে, আইনমন্ত্রী বলেছেন, নিজের আইনজীবীর ভুলের কারণে খালেদা জিয়া জেলে আছেন। বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, খালেদা জিয়াকে দীর্ঘ দিন কারারুদ্ধ করে রাখতে সরকার ষড়যন্ত্র করছে।
অ্যাটর্নি জেনারেলের উত্তর বিএনপি তাদের ব্যর্থতার দায় রাষ্ট্রপক্ষের ওপর চাপাতে চাইছে। তার আরো অভিযোগ, বিএনপির আইনজীবীদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। আবার তারা এতিমের টাকা আত্মসাতের কথা শুনলে ক্ষেপে যান। এটা পেশাদারিত্ব নয়। এসবের প্রভাব পড়েছে জামিনের বিষয় আদেশে। অ্যার্টনি জেনারেল আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করেছেন, ‘সাজা হওয়ার সাথে সাথে জামিন পাওয়া কল্পনা ঠিক না, আপিলেও সাজা বহাল থাকবে। তার কথা থেকে সরকারের পরিকল্পনার আভাস পাওয়া যায়। মির্জা ফখরুল অভিযোগ করেছেন, বিচারব্যবস্থাকে প্রহসনে পরিণত করেছে সরকার। মির্জা ফখরুল আরো অভিযোগ করেন, ‘আমাদের আইনজীবীরা প্রথিতযশা। তারা দীর্ঘ দিন ধরে দক্ষতা ও যোগ্যতা নিয়ে মামলা পরিচালনা করছেন। সমস্যাটি সেই জায়গায় নয়, সমস্যাটি হচ্ছে (সরকার) ছক করে নিয়েছে। সেই ছক অনুযায়ী তারা মামলা করেছে। বিচার কী হবে, রায় কী হবে- সব কিছুই পূর্বনির্ধারিত।’ সরকারের কার্যব্যবস্থা এবং ঘটনাপ্রবাহ বিএনপির অভিযোগের সত্যতা বহন করে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল আশঙ্কা করছেন, ছলে-বলে, কলে-কৌশলে সরকার খালেদা জিয়াকে দীর্ঘ দিন কারাগারে রাখার, এমনকি নির্বাচন পর্যন্ত তাকে আটক রাখার পরিকল্পনা আঁটছে। বেগম খালেদা জিয়া যদি ‘জিয়া অরফেনেজ ট্রাস্ট’ দুর্নীতির মামলায় হাইকোর্ট থেকে জামিনও পান তার পরেও তিনি কারাগার থেকে শিগগিরই মুক্তি পাবেন কিনা বলা দুরূহ। উল্লেখ্য, একই আদালতে আরেকটি মামলা ‘জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট’ মামলা চলছে। এর শুনানি শেষ হয়েছে। খুব অল্প সময়ের মধ্যে এ মামলার রায় ঘোষিত হতে পারে। সরকার ওই মামলার রায় ঘোষণা পর্যন্ত জামিনের আবেদনের শুনানি টেনে নিয়ে যেতে পারে। এক দিকে হাইকোর্ট জামিন দেবে আবার তখনই অপর মামলাটির রায় ঘোষিত হবেÑ এরকম আশঙ্কা করছে তারা, যারা আওয়ামী লীগের রণকৌশল সম্পর্কে কিছুটা ধারণা রাখেন। ওই মামলা ছাড়াও আরো ৩৫টি মামলা রয়েছে বেগম জিয়ার বিরুদ্ধে। কুমিল্লায় খালেদা জিয়াসহ ৭৮ জনের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার কার্যক্রমে স্থগিতাদেশ উঠিয়ে দিয়েছেন চেম্বার জজ। একই সাথে মামলাটি শুনানির জন্য প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগে পাঠানো হয়েছে। তার অর্থ হলো বেগম জিয়ার বিরুদ্ধে অচিরেই সে মামলাটির প্রক্রিয়া শুরু হবে। সরকার শুধু বেগম জিয়াকে কারাগারে পাঠিয়েই ক্ষান্ত হয়নি, বিএনপিকে বিভক্ত করার, অকার্যকর করার দুরভিসন্ধি আঁটছে। এমনকি তারা খালেদা জিয়ার আইনজীবীদের মধ্যে বিভক্তি, বিভেদ এবং বিদ্বেষ সৃষ্টির চেষ্টা করছে। যে কোনোভাবেই হোক খালেদা জিয়াকে জনসম্মুখে হেয় করার চেষ্টা করছে। যেমন ড. কামাল হোসেন বেগম জিয়ার আইনজীবী হওয়ার অনুরোধ ফিরিয়ে দিয়েছেনÑ এই মর্মে গুজব রটনা করানো হয়। প্রকৃত সত্য হচ্ছে ড. কামাল বিষয়টির প্রতি সহানুভূতিশীল। মির্জা ফখরুলের তথ্য মোতাবেক রায়ের কপি পড়ে তিনি পরামর্শ দেবেন। বেগম জিয়ার রায়ের পরে সরকারের শীর্ষ ব্যক্তি থেকে চুনোপুঁটি পর্যন্ত একটি কথা বলছেন, ‘এতিমের আমানত খেয়ানত করা হয়েছে।’ অথচ মামলার রায় সেরকম নয়। রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কার্যক্রমে অবৈধ হস্তক্ষেপের কথা বলা হয়েছে। সবাই জানে টাকা খরচ হয়নি বরং ব্যাংকে সঞ্চিত এ অর্থ দ্বিগুণ হয়েছে। তাদের অন্যায় উচ্চারণকে আদালতের রায়ের মোড়কে বেগম জিয়ার বিরুদ্ধে জনবিদ্বেষ সৃষ্টি করতে চায় এরা। বিচারব্যবস্থাকে দীর্ঘায়িত করা, প্রভাবিত করা এবং এর সপক্ষে জনমত সৃষ্টির অপচেষ্টা করছেন তারা। বেগম জিয়ার বিরুদ্ধে মামলার প্রতিবাদে জণগণ ভেতরে ভেতরে দারুণ ক্ষুব্ধ হয়ে আছে। যখনই বিএনপি কোনো কর্মসূচি দিচ্ছে তখনই দেখা যাচ্ছে যে সেখানে মানুষের ঢল নামছে।
কালো পতাকা প্রদর্শনের মতো শান্তিপূর্ণ ন্যূনতম কর্মসূচির ওপর সরকার যে তাণ্ডব ঘটিয়েছে তা যেকোনো মানদণ্ডে বেআইনি এবং অগণতান্ত্রিক। সংবাদপত্রে প্রকাশিত একটি ছবি বলে দেয় সরকারের চরিত্র। একজন বিক্ষোভকারীর গলা যেভাবে পুলিশ চেপে ধরেছে তা প্রতীকী অর্থে সমগ্র জনগণের গলাচেপে ধরার শামিল। এভাবে সরকার দমনপীড়নের মাধ্যমে খালেদা জিয়ার মুক্তি আন্দোলনকে স্তব্ধ করে দিতে চায়। আবার তারাই ফোরন কেটে মুক্তি আন্দোলনে জনতার স্রোতও দেখতে চায়। একজন সচেতন নাগরিক সেদিন ব্যক্তিগত আলোচনায় বলছিলেন, আন্দোলন প্রতিহতকরণে যদি পুলিশের আক্রমণ না থাকে তাহলে সরকার সেই চিত্রই দেখতে পাবেন। যত দিন তারা বেগম জিয়াকে কারাগারে রাখতে পারবেন তত দিনই তাদের মেয়াদ। পৃথিবীর ইতিহাস প্রমাণ করে যে জেল-জুলুম, অন্যায়-অত্যাচার দিয়ে ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে পারে না। অত্যাচার নিপীড়ন যতই বাড়বে স্বৈরাচারের পতনকাল ততই ঘনিয়ে আসবে। এ দেশে তার প্রমাণ আছে। মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র ১৯৬৩ সালে জেলে থাকাকালে চিরায়ত প্রবাদ বাক্যটি এভাবে উচ্চারণ করেছিলেন, ‘জাস্টিস টু লং ডিলেইড ইজ জাস্টিস ডিনাইড’। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান বিচারপতি ওয়ারেন ই বার্গার ১৯৬৯ সালে মার্কিন বার সমিতিকে দেয়া এক অভিভাষণে বলেছিলেন, ‘অদক্ষতা এবং দীর্ঘায়িতকরণ বিচারব্যবস্থার যথার্থ মূল্যবোধকে নষ্ট করে। জনগণ বিশ^াস করে কোর্ট তাদের আইনানুগ অধিকারকে প্রতারণা এবং উপর মহলের চাপ থেকে রক্ষা করতে সক্ষম। তারা যদি প্রাথমিক অধিকারগুলোকে সংরক্ষণে ব্যর্থ হয় তাহলে জনগণ তাদের কাজ ছেড়ে রাস্তায় নেমে পড়ে।’ এ দেশের জনগণের সবচেয়ে প্রিয় ব্যক্তিত্ব সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কারাবাস দীর্ঘাায়িত করার মাধ্যমে যদি বিচারকে অন্যায় ও অবিচারে পরিণত করা হয় তাহলে জনগণের জন্য একটি সুযোগই খোলা থাকবে, আর তা হলো রাজপথে নেমে আসা এবং গণবিপ্লবকে সার্থক করে তোলা।
লেখক : অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
Mal55ju@yahoo.com

No comments

Powered by Blogger.