কোন প্রভাবে তালিকার বাইরে থাকলেন তারা? by ড. আর এম দেবনাথ

ব্যাংকিং খাতের খবর এখন বড় খবর। প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো ব্যাংকের ওপর খবর ছাপা হয়। গত বৃহস্পতিবার সংবাদপত্রে শীর্ষ ঋণখেলাপিদের ওপর একটি উদ্বেগজনক খবর ছাপা হয়েছে। এতে দেখা যাচ্ছে ২৫ জন শীর্ষ ঋণখেলাপির হাতে আটকা পড়েছে ১০ হাজার ৬৩৫ কোটি টাকা। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সরকারি ও বেসরকারি উভয় ধরনের ব্যাংকই। তবে আশ্চর্যজনক ঘটনা হচ্ছে, এ তালিকায় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কোনো নাম নেই। রিপোর্টে বলা হয়েছে, প্রভাবশালীরা তাদের ঋণ পুনর্গঠন অথবা পুনঃতফসিল করে নিয়েছেন। তাই তারা খেলাপি ঋণগ্রহীতার আলোচনায় নেই। অথচ আশঙ্কা, প্রভাবশালী ব্যবসায়ীরাও খেলাপি ঋণের আওতায় অচিরেই আসতে পারেন। কারণ তারা শর্ত মোতাবেক টাকা ফেরত দিতে পারছেন না বলে খবর আসছে। আর এটি ঘটলে ব্যাংকিং খাতের সমূহ বিপদ ঘটবে। এদিকে গত মঙ্গলবার যুগান্তর একটি খবর ছেপেছে যার শিরোনাম : ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন : চার চ্যালেঞ্জের মুখে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক’।
উপশিরোনামে বলা হয়েছে, মোট খেলাপি ঋণ ৮০ হাজার ৩০৭ কোটি টাকা। রাষ্ট্রায়ত্ত ও বিশেষায়িত ব্যাংকেই ৪৪ হাজার ৩৬ কোটি টাকা। মূলধন ও প্রভিশন ঘাটতি বাড়ছে। ব্যবস্থা নিতে অর্থ মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন দাখিল। রিপোর্টটি পড়ে ভাবছিলাম এর ওপর কী লেখা যায়। দেখা যাচ্ছে, এখানে দৃশ্যত তিনটি পক্ষ। একটি পক্ষ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক, দ্বিতীয় পক্ষ বাংলাদেশ ব্যাংক এবং তৃতীয় পক্ষ সরকার- ব্যাংকিং বিভাগ ও অর্থ মন্ত্রণালয়। একজন ব্যবসা করছে, আরেকজন আইনি নিয়ন্ত্রক (রেগুলেটর), শেষেরজন মালিক। আমার বিবেচনামতে পক্ষ তিনটি হলেও আসলে তারা এক ও অভিন্ন। একজনের সঙ্গে আরেকজন ব্যবসা, নিয়ন্ত্রণ ও মালিকানা সূত্রে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। চ্যালেঞ্জ ও তা মোকাবেলার প্রশ্ন যদি ওঠে তাহলে তা তিনজনেরই। এখানে দায়-দায়িত্ব বড় বেশি ভাগাভাগি করে নেয়ার সুযোগ আছে বলে মনে করি না, যদিও মাঝে মাঝে মনে হয় দায়িত্ব এড়ানোর চেষ্টা নিয়ন্ত্রকের মধ্যে যেমন আছে, তেমনি আছে মালিকের মধ্যেও। অথচ দায়িত্ব এড়ানোর সুযোগ নেই। ব্যাংকিং খাতের আজকের সব সমস্যা, বিশেষত সরকারি ব্যাংকের সমস্যার জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যাংক যেমন দায়ী, তেমনি দায়ী কেন্দ্রীয় ব্যাংক এবং সরকার অথবা অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংকিং বিভাগ। আমার এই ধারণার পক্ষে যুক্তি কী, কী কারণে আমি বলছি যে, সমস্যা ও সমাধানের দায়-দায়িত্ব তিন পক্ষেরই এবং তা করা দরকার জরুরি ভিত্তিতে- সেসবই তুলে ধরছি এ লেখায়। প্রথমেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কথায় আসি। কেন তারা তাদের দায়িত্ব এড়াতে পারে না তার কথাই বলি। ব্যাংক ব্যবসার নিয়ম-নীতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। তাদের বিধিমালা পালন করেই ব্যাংকগুলো ব্যবসা করে। এ নীতিমালার মধ্যে বহু ভুল কেন্দ্রীয় ব্যাংক করেছে, যার মাশুল ব্যাংকগুলো দিচ্ছে। আমি দুটোর কথা এখানে উল্লেখ করছি। শেয়ারবাজারে ব্যাংকের বিনিয়োগ কত হবে? বলা হল, আমানতের ১০ শতাংশ। অথচ এটা হওয়া উচিত ছিল মূলধনের ১০ শতাংশ (পরে তা করা হয়েছে)। এই ভুল নীতির কারণে ব্যাংকগুলো সমস্যায় পড়েছে, শেয়ারবাজার অতিরিক্ত তারল্যের কারণে ধ্বংস হয়েছে ২০০৯-১০ সালের দিকে। আসে ঋণ পুনঃতফসিলের কথা। বলা হল, যতবার ইচ্ছা ততবার পুনঃতফসিল করো। কোনো সীমা নেই (পরে তিনবারে সীমিত করা হয়)। এই বিধি ব্যাংকিং খাতকে অস্থিতিশীল করেছে। ব্যাংকিং শৃঙ্খলা, ঋণ পরিশোধের শৃঙ্খলা ধ্বংস করেছে। গ্রাহকদের এই বিধি উচ্ছৃঙ্খল করেছে। ব্যাংকগুলোকে বাজে গ্রাহকের খপ্পরে ফেলা হয়েছে।
এর মাশুল রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক দিচ্ছে। আসি ব্যবস্থাপনা পরিচালকের নিয়োগ ও অপসারণের প্রশ্নে। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন ব্যতিরেকে কেউ প্রধান নির্বাহী হতে পারেন না। তাদের অনুমোদন ছাড়া তাকে অপসারণও করা যায় না। ব্যাংক পরিচালকদের ক্ষেত্রেও তা-ই। কারা পরিচালক হতে পারবেন, তারা কী কাজ করবেন, চেয়ারম্যানের দায়িত্ব কী, অডিট কমিটি, রিস্ক ম্যানেজমেন্ট কমিটির দায়িত্ব কী, প্রধান নির্বাহী কী করবেন- সব কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিধি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এর ব্যতিক্রম হওয়ার সুযোগ নেই। বোর্ডে ‘মেমো’ কীভাবে নিতে হবে, মেমো করে পরিচালকদের কাছে পাঠাতে হবে তা-ও বলা আছে। প্রতিটি বোর্ডসভার সিদ্ধান্তের কপি (মিনিটস) কেন্দ্রীয় ব্যাংকে যায় সঙ্গে সঙ্গে, যায় মন্ত্রণালয়ে যাতে তারা দেখতে পারেন বোর্ডে কী হচ্ছে। বোর্ডের কাজকে বাতি দিয়ে তারা এভাবেই ‘মনিটর’ করেন। সময় সময় সতর্কবাণী জারি করেন। ঋণ কোথায় বিতরণ করতে হবে, কত ঋণ বিতরণ করতে হবে, কোন অঞ্চলে, কোন খাতে তা-ও বিধি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের সঙ্গে মেমোরেন্ডাম অব আন্ডারস্ট্যান্ডিং (এমওইউ)। নিয়োগ ও পদোন্নতির কমিটিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিনিধিত্ব থাকে। এ বিষয়ে আর আলোচনা বাড়ালাম না। আসা যাক হিসাব ও নিরীক্ষা ক্ষেত্রে। বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতিবছর রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো নিরীক্ষণ করে। বড় বড় শাখা নিবিড়ভাবে নিরীক্ষণ করে। তার ওপর বিশেষ নিরীক্ষাও হয়। যে কোনো শাখা যে কোনো সময় তারা নিরীক্ষণ করে। এর রিপোর্ট নিয়ে ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা করে। আবার রয়েছে ‘অডিটর ফার্ম’ নিয়োগ। ‘এক্সটারনাল অডিটর’ প্রতিবছর ব্যাংকের হিসাব নিরীক্ষা করে। এই ‘অডিটর’ বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক নির্ধারিত। তিন বছরের বেশি তারা একটি ব্যাংক অডিট করতে পারে না। দুই-তিনজন ‘অডিটর’ সরকারি ব্যাংকের হিসাব নিরীক্ষা করে। রিপোর্ট জমা দেয়। ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ সেই রিপোর্ট ও হিসাব দেখে। নিরীক্ষিত হিসাব কেন্দ্রীয় ব্যাংকে যায়। এর মধ্যে থাকে পুঁজির হিসাব, শ্রেণীবিন্যাসিত ঋণের হিসাব, বড় বড় গ্রাহকের হিসাব, প্রভিশনিংয়ের হিসাব, নিট মুনাফার হিসাব।
বিস্তারিত রিপোর্ট হিসাবের ওপর। একে বলা হয় পাবলিক ডিসক্লোজার। ওই হিসাব যায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকে। তারা তা পরীক্ষা করে; হিসাব ঠিক আছে কিনা তা দেখে। পছন্দ না হলে হিসাব অনুমোদন করে না। অনুমোদিত হলেই কেবল ব্যাংক তার হিসাব চূড়ান্ত করে। সেখানে পুঁজির হিসাবও থাকে। যেসব বিষয়ে মিডিয়ায় হইচই হয় তার সবকিছুই থাকে ‘বার্ষিক হিসাবে’। ওই হিসাব চূড়ান্ত হয় মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পাওয়ার পর। বলা দরকার, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের বোর্ডে সরকারের একজন অতিরিক্ত সচিব থাকেন সরকারের বক্তব্য তুলে ধরার জন্য। বস্তুত তারাই বোর্ডসভার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। উপরে সংক্ষেপে বললাম কীভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক পরিচালনায় ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এ ছাড়া রয়েছে ‘অবজারভার’। সময় সময় তারা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে তাদের প্রতিনিধিকে বসিয়ে দেন। তখন তাদের অনুমতি ছাড়া কিছুই হয় না। আমার জানামতে এই মুহূর্তে অন্তত একটি সরকারি ব্যাংকে ‘অবজারভার’ রয়েছে। এ অবস্থায় প্রশ্ন, ঋণ খেলাপি সমস্যা, পুঁজি স্বল্পতা, প্রভিশনিং ঘাটতি, অনিয়ম-দুর্নীতি ইত্যাদি যেসব বদনামে সরকারি ব্যাংক আক্রান্ত, কেন্দ্রীয় ব্যাংক তার থেকে কীভাবে মুক্ত? আসা যাক সরকারের প্রশ্নে। তারাই মালিক। সব ব্যাংকের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ, প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণের ভার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর। এটা তাদের আইনি দায়িত্ব। ১৯৯১ সালের ব্যাংক কোম্পানি আইনে এ ক্ষমতা তাদের দেয়া হয়েছে। কিন্তু বর্তমান সরকার একটা সার্কুলারের বলে ওই ক্ষমতায় ভাগ বসায়। এখন প্রতিটি কাজে মালিক হিসেবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংকিং বিভাগ হস্তক্ষেপ করে। ১০-১৫ বছর আগে প্রতিটি সরকারি ব্যাংককে ‘পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে’ পরিণত করা হয়। উদ্দেশ্য প্রথমত, শেয়ার বিক্রি করে পুঁজি আহরণ করা; দ্বিতীয়ত, সরকারি ব্যাংকগুলোকে প্রতিযোগিতার ভিত্তিতে চলার ব্যবস্থা করা। এ দুটোর একটাও আজ পর্যন্ত করা হয়নি। বরং সরকারি ব্যাংক প্রশাসনে ও পরিচালনায় নতুন নতুন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হচ্ছে।
‘পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি’ হিসেবে কাজ করছে দেশের সব প্রাইভেট ব্যাংকও। প্রধান নির্বাহী নিয়োগ, ডিএমডি, জিএম ইত্যাদি পদে নিয়োগ এবং ওইসব পদে পদোন্নতি ইত্যাদি বিষয় বোর্ডের ক্ষমতার মধ্যে। কিন্তু সরকারি ব্যাংকে এসবের বালাই নেই। পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি চলে ‘মেমোরেন্ডাম অব অ্যাসোসিয়েশন’ (এমএ) এবং আর্টিকেলস অব অ্যাসোসিয়েশন (এএ) মোতাবেক। সরকার এসব মানে না। কাজ হয় সব মন্ত্রণালয়ে। কেবল তার ‘সিল’ ব্যাংকের। আওয়ামী লীগ সরকারের আগের আমলে এটা ছিল না। সরকারি ব্যাংকেই সব হতো। কিন্তু এখন সব ভিন্ন। এখন বোর্ডের ক্ষমতা সীমিত। বোর্ড বদনামের ভাগীদার। অথচ প্রধান নির্বাহী, উপপ্রধান নির্বাহী, জেনারেল ম্যাজোর এবং ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজাররা নিয়ন্ত্রিত হন মন্ত্রণালয় দ্বারা। সরকারি কোনো ব্যাংকে কোনো জিএম অন্যায় করলে তার বিচার বোর্ড করতে পারে না। বিচারের ভার, পদায়ন ও পদোন্নতির ভার মন্ত্রণালয়ের। স্বাভাবিক কারণেই ব্যাংকে শৃঙ্খলা রক্ষা করা যায় না। ‘হায়ায় অ্যান্ড ফায়ার’ যদি বোর্ডের হাতে না থাকে, তাহলে অফিসাররা কেন বোর্ডকে মানবে? সবাই তাই যোগাযোগ রাখে মন্ত্রণালয়ে। সেখানকার একজন কেরানিও তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। অবস্থা এমন যে, গাড়ি ব্যাংকের, দৌড়ান মন্ত্রণালয়ের লোকেরা; কিন্তু কাগজপত্রে দৌড়ান জিএম-ডিজিএম সাহেবরা। এই সার্ভিস দেয়ার জন্য সারা ব্যাংক থাকে ব্যস্ত। এর ফলে বোর্ডের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা সীমিত। তার ওপর রয়েছে ট্রেড ইউনিয়ন নেতারা, যারা মন্ত্রীদের ভাই বলে সম্মোধন করেন এবং মন্ত্রীরা ব্যাংকে এসে তাদের মদদ দিয়ে যান। একদিকে বাংলাদেশ ব্যাংক এবং অন্যদিকে মন্ত্রণালয়- এ দুইয়ের চাপে সরকারি ব্যাংক তটস্থ। তারপর রয়েছে সরকারের ‘কমার্শিয়াল অডিট’। ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ অডিট, চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্টের অডিট (যা এক্সটারনাল অডিট নামে পরিচিত), বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়মিত অডিট, কম্প্রিহেনসিভ অডিট, আচমকা অডিট এবং সরকারের কমার্শিয়াল অডিট- এত অডিটের পর সরকারি ব্যাংকের এত সমস্যা কী করে হচ্ছে? বাংলাদেশ ব্যাংকের কত নিয়ম ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে তার হিসাব রাখা ভীষণ কঠিন। ঋণ নীতিমালা আছে। ঋণ প্রদানের ক্ষেত্রে কীভাবে তা প্রসেসিং করতে হবে, কীভাবে ডকুমেন্টেশন করতে হবে, জমির মূল্য কীভাবে নিরূপণ হবে, কোলাটেরল কী হবে- এসবের বিস্তারিত ‘গাইডলাইনস’ আছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গাইডলাইনস মোতাবেক ক্রেডিট ম্যানুয়েল, জেনারেল ব্যাংকিং ম্যানুয়েল সরকারি ব্যাংকে চালু আছে। বৈদেশিক মুদ্রার আলাদা ম্যানুয়েল নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘ফরেন এক্সচেঞ্জ ম্যানুয়েল’ই ব্যাংকে ব্যাংকে মানা হয়। এ অবস্থায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক কীভাবে তার দায় এড়ায়? আমরা জানি ব্যাংকিং ব্যবসার মতো এত রেগুলেটেড ব্যবসা আর কোনোটি নয়। পদে পদে বিধি ও নিয়ম। আইন তো আছেই, অনিয়ম ধরার শত শত পথ ও পন্থা রয়েছে ব্যাংকে ব্যাংকে। ব্যাংকের কোনো কাজ গোপন করার ব্যবস্থা নেই। আজ হোক, কাল হোক তা ধরা পড়বেই। এমন একটা আইনি ও সাংগঠনিক কাঠামো থাকা সত্ত্বেও কী করে শ্রেণীবিন্যাসিত ঋণের পরিমাণ বাড়ছে? এটাই ব্যাংকের এক নম্বর ও শেষ সমস্যা। এর থেকেই জন্ম নেয় পুঁজির স্বল্পতা, প্রভিশনিং ঘাটতি ইত্যাদি।
চুরি-দুর্নীতির কারণেও একই ফল- শ্রেণীবিন্যাসিত ঋণ বৃদ্ধি। যেসব প্রশ্ন এখানে তুললাম তার জবাব দরকার। কারণ বছরজুড়ে একই সমস্যা নিয়ে শুধু আলোচনাই করব, তা কোনো কাজের কথা নয়। আমি কলাম লিখি চার দশকের বেশি সময় ধরে। সারা জীবন শুধু ঋণখেলাপি সমস্যার ওপর লিখছি। বিপরীতে দেখতে পাচ্ছি এ সমস্যা দিন দিন বাড়ছে। বাজার অর্থনীতি, অবাধ ব্যবসা, নিয়ন্ত্রণহীন বৈদেশিক বাণিজ্যের পাশাপাশি খেলাপি ঋণের সমস্যাও বাড়ছে। শুধু আমাদের দেশে নয়, চীন, ভারত, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড থেকে শুরু করে সব দেশেই একই সমস্যা। তাহলে কী দাঁড়াল? তাহলে কি এ সমস্যা ব্যবসার মন্দার কারণে তৈরি হচ্ছে, ইচ্ছাকৃত খেলাপিদের কারণে তৈরি হচ্ছে, নাকি আইনগত জটিল সংজ্ঞার কারণে তৈরি হচ্ছে? চুরি-দুর্নীতিও কি এর কারণ? অনুপার্জিত টাকা, ব্যাংকের মারা টাকা বিদেশে নিরাপদে ‘শেল কোম্পানি’তে রাখা যায় বলেই কি খেলাপি ঋণ বাড়ছে? দেখা যাচ্ছে, ব্যাংকের টাকা মেরে প্রচুর গ্রাহক বিদেশে পালিয়ে যাচ্ছে। এর কারণ কী? দায়-দায়িত্ব নিরূপণ যেমন আজ জরুরি, তেমনি সমস্যাটিকে দেখা দরকার সামগ্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে। আবেগের দৃষ্টিতে দেখলে সমাধান আসবে বলে মনে হয় না। বাস্তবতার নিরিখে সমগ্র বিষয়টিকে দেখা দরকার। আমি চেষ্টা করলাম সরকারি ব্যাংকের সমস্যাগুলো তুলে ধরতে। এর সঙ্গে কী করে বাংলাদেশ ব্যাংক ও মন্ত্রণালয় জড়িত তা-ও দেখার চেষ্টা করলাম। বেসরকারি ব্যাংকের সমস্যা একটু ভিন্নতর। সেই আলোচনা কেউ না কেউ করবেন আশা করি। আমার মূল প্রশ্ন: সরকারি ব্যাংকের দায়-দায়িত্ব আছে, বোর্ডের ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব আছে। রেগুলেটর বা বাংলাদেশ ব্যাংক এবং মালিক মানে মন্ত্রণালয়ের কি কোনো দায়-দায়িত্ব নেই?
ড. আর এম দেবনাথ : অর্থনীতি বিশ্লেষক; সাবেক শিক্ষক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
rmdebnath@yahoo.com

No comments

Powered by Blogger.