বাংলাদেশ কোন পথে?

সংসদীয় রাজনৈতিক দলগুলো যেভাবে নিজেরাই নিজেদের চরিত্র উন্মোচন করতে থাকে এটা এক কৌতুকেরও ব্যাপার। গত ১১ মার্চ শনিবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঢাকার খামারবাড়ীর কৃষিবিদ ইন্সটিটিউটে যুব মহিলা লীগের সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে বক্তৃতা দেন। তার যে কোনো বক্তৃতার একটি প্রিয় বিষয় হল, বিএনপি এবং খালেদা জিয়া সম্পর্কে সমালোচনামূলক কিছু না কিছু বলা। তার এই বক্তৃতাও এদিক দিয়ে ব্যতিক্রম নয়। এতে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদের জন্য ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ এবং আমেরিকা জোট বেঁধে ২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে হারিয়েছিল। ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে আমেরিকান কোম্পানি আমাদের গ্যাস বিক্রি করতে চাইল ভারতের কাছে। ভারতের কাছে গ্যাস বিক্রির মুচলেকা দিয়েছিল খালেদা জিয়া। দিয়েই তো সে ক্ষমতায় এসেছিল। আমি তা দেইনি।
আমি চেয়েছিলাম আগে আমার দেশের মানুষের কাজে লাগবে, ৫০ বছরের রিজার্ভ থাকবে। তারপর আমরা ভেবে দেখব, বিক্রি করব কী করব না’ (যুগান্তর ১২.০৩.২০১৭)। বিএনপি যে সে সময় বাংলাদেশের গ্যাস রফতানি করতে আগ্রহী ছিল এটা ঠিক। কারণ নির্বাচনে জেতার পর বিএনপির অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান প্রথম চোটেই মাত্র দুই দিনের মাথায় বলেছিলেন, ইলিশ মাছ যদি রফতানি করা যায়, তাহলে গ্যাস রফতানি করা যাবে না কেন? সে সময় ‘তেল গ্যাস রক্ষা জাতীয় কমিটি’সহ অনেক রাজনৈতিক দল ও বুদ্ধিজীবী গ্যাস রফতানির বিরুদ্ধে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ায় ও বিরোধিতার কারণে ২০০৩ সালে প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া গ্যাস রফতানি করা যাবে কিনা এ বিষয়ে পর্যালোচনার জন্য একটি কমিটি করেন যাতে ছিলেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ইঞ্জিনিয়ার, দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য প্রমুখ। তারা মত দিয়েছিলেন, গ্যাসের রিজার্ভের অবস্থা এবং বাংলাদেশে গ্যাসের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে গ্যাস রফতানি করা সমীচীন হবে না। এরপর গ্যাস রফতানির বিষয়ে বিএনপি সরকার আর কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। এখানে শেখ হাসিনার বক্তব্য থেকে এ বিষয়টি বেশ পরিষ্কার যে, বাংলাদেশে নির্বাচনের মাধ্যমে বা অন্যভাবে কোন্ দল বা কারা ক্ষমতায় বসবে, এ ক্ষেত্রে নানা ধরনের নির্বাচনী কারচুপি ও কারসাজির আগে ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন হল খুব গুরুত্বপূর্ণ, এমনকি এক নির্ধারক ব্যাপার। এটা বিএনপির ক্ষেত্রে যেমন প্রযোজ্য, তেমনি প্রযোজ্য আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রেও।
২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ যে ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন ও কারসাজির মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছিল এটা সবারই জানা। নির্বাচন জয়ের পর ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার কিছুদিন পর ড. ইউনূসকে নিয়ে আমেরিকার সঙ্গে শেখ হাসিনা সরকারের সম্পর্কের কিছুটা অবনতির সময় এক টেলিফোন কথাবার্তায় তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটন শেখ হাসিনাকে বলেছিলেন, তিনি যেন ভুলে না যান যে, আমেরিকার সমর্থনের কারণেই নির্বাচনে তার জয় হয়েছিল! এই কথাবার্তার কথা সংবাদমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়েছিল। আওয়ামী লীগ সরকার হিলারি ক্লিনটনের এই বক্তব্যের কোনো প্রতিবাদ করেনি। কাজেই এ নিয়ে দ্বিমত হওয়ার কিছু নেই। ভারত যে ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের নির্বাচন জয়ের ক্ষেত্রে সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল এটা নিয়েও কোনো বিতর্কের অবকাশ নেই। তাছাড়া নির্বাচন-পরবর্তী সময়ে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে ২০০৯ সাল থেকে আজ পর্যন্ত শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ সরকার ভারতকে গ্যাস না দিলেও তার থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা যে তাদেরকে একতরফাভাবে দিয়ে আসছে এটা সবারই জানা। এমনকি অনেক ভারতীয় পত্রপত্রিকাতেও এ নিয়ে লেখালেখি হয়েছে। বাংলাদেশের সমুদ্র ও নৌবন্দর ব্যবহারের সুবিধা তারা ভারতকে দিয়েছেন উদারভাবে, ভারতকে শেষ পর্যন্ত করিডোর তারা দিয়েছেন, যার বিরুদ্ধে বাংলাদেশে অনেক আন্দোলন হয়েছে। বাংলাদেশের প্রশাসনে ভারতের হস্তক্ষেপের সুযোগ-সুবিধাও তারা দিয়েছেন।
বাংলাদেশের জনগণের প্রবল আপত্তি সত্ত্বেও তারা রামপালের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের জন্য ভারতের সঙ্গে চুক্তি করেছেন। তারপর তিস্তার পানির বিষয়টি তো আছেই। শেখ হাসিনা সরকার ভারতকে একতরফাভাবে অনেক কিছু দেয়া সত্ত্বেও ভারত তিস্তার পানিসহ বাংলাদেশকে কিছুই দেয়নি। ভারতকে বাংলাদেশের মহান বন্ধু হিসেবে ঢেঁড়ি পেটানো সত্ত্বেও তিস্তার পানি থেকে নিয়ে সব বিষয়ে বাংলাদেশকে ভারত সরকার যেভাবে বঞ্চিত করে রেখেছে সেটা এ দেশের জনগণের প্রতি শত্রুতা ছাড়া আর কী? তিস্তার পানি নিয়ে দুই সরকারের মধ্যে অসংখ্য বৈঠক সত্ত্বেও ভারত সরকারের কাছ থেকে আশ্বাস ছাড়া এ পর্যন্ত বাংলাদেশ কিছুই পায়নি! বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের কথা শোনা যাচ্ছে আগামী এপ্রিল মাসে। সেখানেও তিস্তার পানি নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা। কিন্তু এবার তিস্তার পানির সঙ্গে সম্পর্কিতভাবে এক ভয়াবহ চুক্তির সম্ভাবনার কথাও শোনা যাচ্ছে। কোনো কোনো সংবাদপত্রের রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে যে, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের এক সামরিক চুক্তির প্রস্তাবও তিস্তার পানির ন্যায্য হিস্যা বাংলাদেশকে দেয়ার শর্ত হিসেবে থাকবে। এর থেকে সর্বনাশা ব্যাপার আর কী হতে পারে? গ্যাস রফতানির তুলনায় এসব কথাবার্তা ও সম্ভাব্য চুক্তি যে বাংলাদেশের জন্য কত বেশি বিপজ্জনক, এটা কাউকে বুঝিয়ে বলার প্রয়োজন হয় না। এর দ্বারা যে কোনো লোকেরই বোঝার অসুবিধে নেই যে, বাংলাদেশের ওপর ভারত সরকারের যে প্রবল প্রভাব আছে তাকে নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়াই হল ভারতের দিক থেকে এই চুক্তির লক্ষ্য। এর ফলে বাংলাদেশ পুরোপুরিভাবেই ভারতের কব্জায় চলে যাবে। প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের কথা আগে থাকলেও একাধিকবার তার তারিখ পরিবর্তন করা হয়েছে। মনে হয়, এ নিয়ে দুই সরকারের মধ্যে কোনো বিষয়ে টানাপোড়েনের কারণেই এটা হয়েছে। এখন যেভাবে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সামরিক চুক্তির কথা শোনা যাচ্ছে তাতে মনে হয় এটা নিয়েই টানাপোড়েন চলছিল। এখন শেখ হাসিনার ভারত সফরের তারিখ এপ্রিল মাসে নির্ধারিত হওয়ার কারণ হতে পারে, এ নিয়ে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সহমত। এই সহমতের অর্থ কী?
তিস্তার পানি বাংলাদেশের জন্য অবশ্যই দরকার। কিন্তু তার বিনিময়ে বাংলাদেশকে যদি ভারতের সঙ্গে সামরিক চুক্তিতে আবদ্ধ হতে হয়, তাহলে এ দেশের স্বাধীনতা বলে প্রকৃতপক্ষে আর কিছু থাকবে না। পূর্ব বাংলা ১৯৪৭ সাল থেকে পাকিস্তান সরকারের (কার্যত পশ্চিম পাকিস্তানের) দ্বারা শোষিত, নির্যাতিত হতো, তাদেরই অধীনে ছিল। একই রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে থেকেই পূর্ব বাংলা বা পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ অধীনতার জীবনযাপন করতেন, শোষিত-নির্যাতিত হতেন। এখন বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত সরকারের সম্পর্ক যা দাঁড়িয়েছে এবং আরও বেশি করে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে, তাতে বাংলাদেশের জনগণকে একই বিপদের মধ্যে বসবাস করতে হবে। তফাৎ এই যে, আগে এ অবস্থা ছিল একই রাষ্ট্রকাঠামোর মধ্যে থেকে। এখন রাষ্ট্রীয় কাঠামো আলাদা হলেও ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক দাঁড়াবে একই রকম। পাকিস্তানি আমলে শোষণ-শাসনবিরোধী জনগণের সংগ্রাম, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে এখানে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর বাংলাদেশের জনগণকে যদি এই বিপদের মধ্যে ফেলা হয় তাহলে এর থেকে বড় ট্র্যাজেডি এ দেশের জনগণের জন্য আর কী হতে পারে?
১২.০৩.২০১৭
বদরুদ্দীন উমর : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল

No comments

Powered by Blogger.