টর্ট আইন ক্ষতিপূরণের ফাঁপা আশ্বাস by এম এম খালেকুজ্জামান

২০১০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানা অঙ্গরাজ্যের উপকূলে ডিপওয়াটার হরাইজন নামে অফশোর অয়েল রিগে বিস্ফোরণ হয় এবং এতে ১১ জন মারা যায়। বিস্ফোরণের পর সাগরের বিশাল এলাকায় তেল নিঃসরণের কারণে মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয়ের আশঙ্কা দেখা যায়।
ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম (বিপি) অপারেটর হিসেবে এই প্ল্যান্টের কাজ করছিল। এই ঘটনায় দায়ী করে বিপিকে ইউএস জাস্টিস ডিপার্টমেন্ট সাড়ে চার বিলিয়ন ডলার অর্থদণ্ড ও ১১ জনকে হত্যার কারণে ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত করে। লক্ষ করার বিষয় হলো, দেওয়ানি মামলার সঙ্গে ফৌজদারি অপরাধের মামলাও চলছে।
যেকোনো মানদণ্ডের বিচারে শুধু বাংলাদেশেই নয়, বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম ভয়াবহ শিল্প দুর্ঘটনার প্রেক্ষাপটে পশ্চিমা পোশাক আমদানিকারক থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ধর্মীয় গুরু পোপ ফ্রান্সিসকেও বিচলিত ও ক্ষুব্ধ করেছে। ক্ষুব্ধতা সংক্ষুব্ধতায় শেষ হলেও হতো, কিন্তু সাভার ট্র্যাজেডির পর কিছু আন্তর্জাতিক পোশাক ব্র্যান্ডের বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক চুকানোর ঘোষণা পুরো শিল্পটিকেই হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।
নিয়মিত বিরতি দিয়ে দুর্ঘটনা যেন আমাদের ভবিতব্য হয়ে গেছে। শত শত প্রাণ চলে গেলেও প্রতিটি দুর্ঘটনার পর দোষী ব্যক্তিরা পর্দার আড়ালেই রয়ে যায়। সরকার ও মালিকপক্ষ শ্রমিকদের ও অন্যদের ওপর দায়ভার চাপিয়ে দায়মুক্ত থাকতে ব্যস্ত।
এই প্রসঙ্গে আইন বিশেষজ্ঞরা বলেন, পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশে যদি টর্ট আইনে মামলা (অসাবধানতার জন্য ক্ষতি হলে) হতো, তাহলে দোষী ব্যক্তিদের বড় অঙ্কের ক্ষতিপূরণ দিতে হতো। এ বিষয়ে বিশিষ্ট আইনজীবী আমীর-উল ইসলাম বলেন, অবশ্যই এখন আদালতে গিয়ে টর্ট আইনে মামলা করতে হবে। এটা করতে হবে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের, সরকারের নয়। মামলা না হওয়ার কারণে বারবার দোষী ব্যক্তিরা পার পেয়ে যাচ্ছে। সর্বশেষ রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির (অবহেলাজনিত কারণে এত প্রাণ হারানোর পর এটাকে কী এখন আর দুর্ঘটনা বলে ভাবার কোনো কারণ আছে?) ঘটনার ভয়াবহতার কারণে বিভিন্ন মহল থেকে বিপুল অর্থসাহায্যের তহবিল সংগ্রহ করা হচ্ছে, যা কোনো আইনি কাঠামোর বাধ্যবাধকতার কারণে নয়, মূলত মানবিক দায়ে।
অসাবধানতার জন্য ক্ষতি হলে অবৈধ মৃত্যুর ক্ষতিপূরণ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী একটি গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি হলো সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ উপার্জনের বর্তমান মূল্য (ডিসকাউন্টেড ভ্যালু অব ফিউচার ফ্লো অব আর্নিংস) পদ্ধতি। এতে মৃত ব্যক্তি বেঁচে থাকলে বাকি কর্মক্ষম জীবনে যে আয় করতে পারতেন, তার বর্তমান বাজারমূল্যই ক্ষতিপূরণের পরিমাণ হিসেবে নির্ধারণ করা হয়।
ডিসকাউন্টিং পদ্ধতিতে নির্ধারিত ক্ষতিপূরণ নির্ভর করে তিনটি বিষয়ের ওপর। মৃত ব্যক্তির বয়স, তাঁর ভবিষ্যৎ উপার্জনের ক্ষমতা এবং সুদের হার বা ডিসকাউন্ট রেট। মৃত ব্যক্তির অল্প বয়স হলে তাঁদের বেশি দিন বেঁচে থাকার এবং উপার্জন করার সম্ভাবনা থাকে। সে ক্ষেত্রে শিক্ষাগত যোগ্যতা, সংশ্লিষ্ট কাজের দক্ষতা ও যোগ্যতার ওপর আয়ক্ষমতা নির্ভর করে। সুদের হার বেশি হলে সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ আয়ের বর্তমান মূল্য কম হবে। সুদের হার কম হলে ভবিষ্যৎ আয়ের বর্তমান মূল্য বেশি হবে। সুজনের সাধারণ সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার তাজরীন ফ্যাশনসের অগ্নিকাণ্ডের পর ডিসকাউন্টিং পদ্ধতিতে ক্ষতিপূরণ নিরূপণের হিসাব এক নিবন্ধে দেখিয়েছেন।
মৃত শ্রমিকেরা সবাই অল্প বয়সের। বেঁচে থাকলে তাঁরা অনেক দিন কাজ করতে পারতেন। তাই হিসাবে বিনিয়োগের মেয়াদ ৩০ থেকে ৪৫ বছর ধরা হয়েছে। ভবিষ্যৎ কর্মজীবন ৩০ বছর ধরে শতকরা ১০ শতাংশ সুদের হারে ছয় লাখ টাকা বিনিয়োগ করলে বিনিয়োগকারী বার্ষিক ৫৭ হাজার ৮৬১ টাকা বা মাসে আনুমানিক চার হাজার ৮২২ টাকা উপার্জন করতে সক্ষম হবেন। এ ধরনের বিনিয়োগকে ‘অ্যানুইটি’ বলা হয়। পশ্চিমা দেশে বিমা কোম্পানিগুলো সাধারণত এ ধরনের অ্যানুইটি বিক্রি করে থাকে। অর্থাৎ একজন মৃত শ্রমিক, যে বেঁচে থাকলে আরও ৩০ বছর কাজ করতে পারতেন, তাঁর পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণের পরিমাণ দাঁড়াবে বার্ষিক ৫৭ হাজার ৮৬১ টাকা, মাসিক প্রায় চার হাজার ৮২২ টাকা। অন্যভাবে দেখতে গেলে, একজন শ্রমিক আগামী ৩০ বছর বার্ষিক ৫৭ হাজার ৮৬১ টাকা বা মাসিক চার হাজার ৮২২ টাকা আয় করলে ১০ শতাংশ সুদের হারে তার বর্তমান মূল্য হবে ছয় লাখ টাকা। তাই যে শ্রমিক মাসিক মাত্র চার হাজার ৮২২ টাকা হারে আগামী ৩০ বছর আয় করতে পারতেন, বাজারে ১০ শতাংশ সুদের হার বিরাজ করলে তাঁকে ছয় লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া যথার্থ হবে।
তাজরীন ফ্যাশনসে অগ্নিকাণ্ডের পর টর্ট আইনের প্রয়োগ-সংক্রান্ত এক প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী শফিক আহমেদ বলেন, ‘আশুলিয়া ও চট্টগ্রামের সাম্প্রতিক ঘটনায় কেউ টর্ট মামলা করলে সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদেরই এ মামলা করতে হবে।’ তাজরীন ফ্যাশনস অগ্নিকাণ্ডে যার অবহেলার কারণেই হতাহতের ঘটনা ঘটুক না কেন, এখানে মালিককে ‘পরার্থে দায়ী’ করে টর্ট মামলা করা যাবে। পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, না ক্ষতিগ্রস্ত, না সরকার—কোনো পক্ষকেই এই আইনের আশ্রয় নিতে খুব দেখা যায় না।
ল্যাটিন Tortum থেকে এসেছে Tort শব্দটি। Tortum শব্দের অর্থ বাঁকা। যদিও বাংলায় এর কোনো যথার্থ আইনি প্রতিশব্দ ব্যবহার হতে দেখা যায় না। সাধারণত একে ‘দেওয়ানি ক্ষতি’ বা ‘নিমচুক্তি’ কখনো ব্যক্তিগত অপকার হিসেবে অভিহিত করা হয়ে থাকে। তবে বাংলাতেও টর্ট হিসেবেই বেশি প্রচলিত।
টর্টের কোনো বিধিবদ্ধ আইন নেই। তথাপি পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে এ আইনের প্রয়োগ ও বিস্তার বেশ ব্যাপক। যদিও আমাদের দেশে এ আইনের প্রয়োগ নেই বললেই চলে।
এম এম খালেকুজ্জামান: আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট।
khaliik@yahoo.com

No comments

Powered by Blogger.