দেখা থেকে লেখা কেমন আছে বার্ন ইউনিট by মশিউল আলম

জুন মাসের তৃতীয় দিবসটি দুই বছর ধরে স্মরণ করছে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যম। ২০১০ সালের ৩ জুন রাতে পুরান ঢাকার নিমতলীতে যে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটেছিল, সেটির কথা আসলেই ভোলা যায় না।
জীবন্ত পুড়ে ভস্মীভূত হয়েছিল ১১৭ জন মানুষ। আগুনের সূত্রপাত ঘটেছিল যে বিয়েবাড়িতে, সেখানে সমবেত ১৫ জনের পোড়া লাশ আলাদা করে চেনার উপায় ছিল না। আরও সাতটি বাড়ির ২১ জন বাসিন্দার একজনও বাঁচেনি। স্মরণকালের সবচেয়ে প্রাণঘাতী ওই অগ্নিকাণ্ডের পর ৫ জুন সরকার জাতীয় শোক দিবস ঘোষণা করেছিল।
৩ জুন মধ্যরাতে পোড়া মানুষের আর্তচিৎকার ও গোঙানিতে ভরে ওঠে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইউনিট। মাত্র ৫০ শয্যার চিকিৎসাকেন্দ্রটিতে সে মুহূর্তে ছিল ২১০ জন রোগী। নিমতলী থেকে আসে আরও ১৬৩ জন। তাদের মধ্যে গুরুতর ৪৫ জনকে ভর্তি করা হয়, বাকি লোকজন প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে চলে যায়। অত্যন্ত সীমিত লোকবল ও মান্ধাতা আমলের যন্ত্রপাতি নিয়ে বার্ন ইউনিট সে সময় এ গুরুতর পরিস্থিতি সামাল দিয়েছিল, তা অবিশ্বাস্য। ভর্তি হওয়া রোগীদের মধ্যে অন্তত কুড়িজনের অবস্থা ছিল অত্যন্ত গুরুতর। কিন্তু বার্ন ইউনিট তাদের অধিকাংশের প্রাণ রক্ষা করতে সক্ষম হয়। চিকিৎসারত অবস্থায় সেখানে মৃত্যু ঘটে সাতজনের। এ নিয়ে নিমতলী অগ্নিকাণ্ডে মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ১২৪।
নিমতলী অগ্নিকাণ্ডের পর বার্ন ইউনিটের চিকিৎসাসেবা এমন প্রশংসা কুড়িয়েছিল যে জাতীয় সংসদে এ বিষয়ে ধন্যবাদ প্রস্তাব গৃহীত হয়েছিল। সরকারের পক্ষ থেকে বার্ন ইউনিট উন্নয়নের জন্য অনেক প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। তারপর পেরিয়ে গেছে তিন বছর। সেসব প্রতিশ্রুতির কতটা কীভাবে পূরণ করা হয়েছে এবং বার্ন ইউনিট এখন কেমন চলছে, তা দেখার জন্য গিয়েছিলাম ২ জুন, নিমতলী ট্র্যাজেডি দিবসের ঠিক আগের দিন। সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষের জন্য কোনো হাসপাতালই স্বস্তির জায়গা নয়; কিন্তু বার্ন ইউনিট সম্ভবত অন্য সব ধরনের হাসপাতালের চেয়ে বেশি বিভীষিকাময়। এর ভেতরের কক্ষ ও করিডরগুলোর বাতাস ভারী হয়ে থাকে মানুষের পোড়া চামড়া, বাষ্পায়িত ঘাম, রাসায়নিক জীবাণুনাশকের তীব্র গন্ধে, সবে হাঁটতে শেখা শিশু থেকে শুরু করে চলনশক্তি হারিয়ে ফেলা বৃদ্ধ পর্যন্ত দগ্ধ রোগীদের গোঙানির শব্দে। আর যেসব দৃশ্য দেখি, তার বিবরণ লেখা যায় না: হরর চলচ্চিত্রে দেখা জম্বিদের ছবি চোখে ভেসে ওঠে। পুড়ে-ঝলসে ছাইয়ের মতো কালো হয়ে যাওয়া মানুষ সাদা সাদা ব্যান্ডেজে মোড়া: কত বিচিত্র ধ্বনি ও লয়ের গোঙানি। তাদের কেউ পুড়েছে আগুনে, কেউ বিদ্যুতে, কেউ অ্যাসিডে। কেরোসিনের স্টোভ ও প্রদীপ, চুলায় ফুটন্ত পানি, গরম তেল, ডাল, আগুনঢাকা ছাই, বিদ্যুৎবাহী তার কিংবা খুঁটি—রোগী ও তাদের আত্মীয়স্বজনের মুখে তাদের দগ্ধ হওয়ার কাহিনিগুলো শুনতে শুনতে অসুস্থ বোধ হয়। কর্তব্যরত একজন চিকিৎসক যখন গরম তেলে পোড়া একটি শিশুকে দেখিয়ে বলেন, এর পোড়া ৩৫ শতাংশ এবং বলেন যে শিশুদের ক্ষেত্রে ২০ শতাংশ পোড়াই প্রাণঘাতী হতে পারে, তখন সেখানে আর এক মুহূর্তও দাঁড়াতে ইচ্ছা করে না।
তিন অংশে বিভক্ত বার্ন ইউনিটে এখন পোড়া রোগীর সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন শ। কিন্তু এর শয্যাসংখ্যা ১০০। নিমতলী অগ্নিকাণ্ডের সময় ছিল মাত্র ৫০। ৫০টি বাড়ানো হয়েছে, এটা নিশ্চয়ই উন্নতি—এ কথা বললেন ড. সামন্ত লাল সেন, যাঁর অক্লান্ত শ্রমে গড়ে উঠেছে পোড়া রোগীদের চিকিৎসার জন্য দেশের এই একমাত্র প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু তাঁকে বিমর্ষ দেখি। পোড়া রোগীদের যাওয়ার আর কোনো জায়গা না থাকলে কী হবে, বার্ন ইউনিট ১০ বছরেও কোনো স্থায়ী প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা পায়নি। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের একটি প্রকল্পের অধীনে অস্থায়ী ভিত্তিতে চলছে এর কাজ। এর অর্থ আসে বার্ষিক উন্নয়ন বাজেট থেকে। নিমতলী অগ্নিকাণ্ডের অভিঘাতে একে ৫০ থেকে ১০০ শয্যায় উন্নীত করার প্রশাসনিক অনুমোদন দেওয়া হয়েছে, কিন্তু সে জন্য অর্থ বরাদ্দ বাড়েনি।
কথা ছিল, বার্ন ইউনিটকে রাজস্ব খাতের অন্তর্ভুক্ত করে একটি স্থায়ী প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা, যেটি একদিন হয়ে উঠবে পোড়া রোগীদের চিকিৎসা, গবেষণা ও প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে একটা সেন্টার অব এক্সেলেন্স। কিন্তু ১০ বছরেও এটিকে রাজস্ব খাতে নেওয়া হয়নি। উন্নয়ন খাত থেকে এ প্রকল্পের অর্থায়ন চলে বলে শুরুতে যাঁরা এর চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন, তাঁরা চাকরি নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভুগেছেন। সে অনিশ্চয়তার অবসান এখনো ঘটেনি। বার্ন ইউনিট প্রকল্পের শুরুতে সর্বমোট লোকবল ছিল ৭৮। তাঁদের মধ্যে কারিগরি পদ হিসেবে চিহ্নিত পদে ছিলেন ৫৯ জন। অধিকাংশই অন্যত্র চাকরি নিয়ে চলে যাওয়ায় এখন আছেন সাকল্যে ২৪ জন। যাঁরা আশায় আশায় পার করে দিয়েছেন ১০ বছর, তাঁদের এখন আর সরকারি চাকরিতে যোগ দেওয়ার বয়স নেই; তা ছাড়া এই প্রতিষ্ঠানের বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবার যে অভিজ্ঞতা তাঁরা অর্জন করেছেন, তা কাজে লাগানোর কোনো জায়গাও দেশে নেই। এমন সাতজন চিকিৎসক এখানে রয়ে গেছেন, ১০ বছর ধরে যাঁদের কোনো পদোন্নতি হয়নি, যাঁরা বেতন পান অনিয়মিত। অথচ তাঁরা এই প্রকল্পে যোগ দিয়েছিলেন সরকারি চাকরি ছেড়ে দিয়ে, কারণ এ প্রকল্পে চাকরির শর্ত ছিল সেটা। প্রকল্পের শুরুতে নার্স নিয়োগ করা হয়েছিল ৩৬ জন, তাঁদের ২৬ জনই চলে গেছেন, এখন আছেন মাত্র ১০ জন।
বার্ন ইউনিট প্রকল্পটি রাজস্ব খাতে না নেওয়ার কারণ ছিল ১৯৯৭ সালের পর গৃহীত কোনো প্রকল্প রাজস্ব খাতে নেওয়া হবে না—সরকারের এমন একটি স্পেশাল রেগুলেটরি অর্ডার (এসআরও)। কিন্তু নিমতলীর অগ্নিকাণ্ডের পর বিশেষ ধরনের চিকিৎসাকেন্দ্র হিসেবে বার্ন ইউনিটের বিশেষ গুরুত্ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সংস্থাপন মন্ত্রণালয় এটিকে রাজস্ব খাতে নেওয়ার জন্য একটি বিশেষ এসআরও জারি। ২০১১ সালের ২৮ মার্চ স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সিনিয়র সচিবের স্বাক্ষরযুক্ত একটি সারসংক্ষেপে বার্ন ইউনিট প্রকল্পে কর্মরত জনবলকে রাজস্ব খাতে স্থানান্তরের প্রস্তাব পাঠানো হয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে। তারপর দীর্ঘ দুই বছর পেরিয়ে গেছে; প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন মেলেনি।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বার্ন ইউনিটের উন্নয়নের জন্য অনেক কিছু করেছেন, যেগুলোর মধ্যে ১০ শয্যাবিশিষ্ট একটি অত্যাধুনিক ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট গড়ে তোলায় একটি বেসরকারি ব্যাংকে সংশ্লিষ্ট করা উল্লেখযোগ্য। একটি মাইক্রোল্যাবও বার্ন ইউনিটে গড়ে উঠেছে, যেখানে যুক্তরাজ্য ও সিঙ্গাপুর থেকে আসা বিশেষজ্ঞরা মাইক্রোসার্জারির প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন আমাদের সার্জনদের। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে পোড়া রোগীদের যেন ঢাকায় আসতে না হয়, সে জন্য তিনি ঢাকার বাইরের সরকারি হাসপাতালগুলোতে বার্ন ইউনিট গঠন করার উদ্যোগ নিয়েছেন। সেই প্রধানমন্ত্রী কেন বার্ন ইউনিট প্রকল্প রাজস্ব খাতে স্থানান্তরের চূড়ান্ত অনুমোদন দিচ্ছে না? এর রহস্য কী?
নিজের নাম-পরিচয় প্রকাশ করে এ বিষয়ে কেউ কিছু বলতে চান না। প্রধানমন্ত্রীর মনের কথা তো কারও পক্ষে জানা সম্ভব নয়। তবে এমন একটা ধারণা ছড়িয়ে পড়েছে যে, বার্ন ইউনিট প্রকল্পের ৫৯টি কারিগরি পদে লোকবল নিয়োগ করা হয়েছিল বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময়, তাঁরা সবাই হয় বিএনপি নয় জামায়াতের সমর্থক। তাঁদের চাকরি রাজস্ব খাতে স্থানান্তর না করে এই পদগুলোতে নতুন করে লোক নিয়োগের জন্য সুপারিশ করেছে সরকারের অর্থ বিভাগ। সেলুকাস, কী বিচিত্র এই দেশ!
জনপ্রশাসনের দলীয়করণ নিয়ে নতুন করে বিস্ময় প্রকাশ করা অন্তত কোনো সংবাদকর্মীর সাজে না। কিন্তু এই বিস্ময়ের যেন সীমা নেই। বার্ন ইউনিটের সেই ৫৯টি কারিগরি পদে এখন আছেন মাত্র ২৪ জন; তাঁদের মধ্যে চিকিৎসকের সংখ্যা সাত। পোড়া রোগীর চিকিৎসা ও সেবা-শুশ্রূষায় দীর্ঘ ১০ বছরে তাঁদের যে অভিজ্ঞতা অর্জিত হয়েছে, সেটা তো অমূল্য। সেখানকার ওটির বয় বা ড্রেসাররাও রোগীর গায়ের গন্ধে বুঝতে পারেন কোন রোগীর অবস্থা কী। বার্ন ইউনিটের ড্রেসার থেকে শুরু করে অধ্যাপক পর্যন্ত প্রত্যেকের অভিজ্ঞতা বিশেষজ্ঞের অভিজ্ঞতা, যা দু-এক বছরে অর্জন করা যায় না। এ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন মানুষেরা ব্যক্তিগতভাবে কে কোন রাজনৈতিক দলের সমর্থক বা তাঁরা আদৌ কোনো দলের সমর্থক কি না, তাতে করদাতা জনগণের কী আসে যায়? সরকারের রাজস্ব খাতে অর্থের জোগান তো ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সিন্দুক থেকে আসে না, আসে করদাতা জনগণের কাছ থেকে।
বার্ন ইউনিটের ২৪ লোকবলের চাকরি রাজস্ব খাতে স্থানান্তর করার পক্ষে প্রধান যুক্তি একটাই: তাঁদের দীর্ঘ দিনের কাজের অভিজ্ঞতা। তাঁদের বাদ দিয়ে নতুন অনভিজ্ঞ লোকবল নিয়োগ করার কুপরামর্শকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কেন গুরুত্ব দিচ্ছেন?
মশিউল আলম: সাংবাদিক।
mashiul.alam@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.