বাংলাদেশের একটি প্রান্তিক অঞ্চল প্রসঙ্গ by মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম

গত ২ অক্টোবর কালের কণ্ঠে প্রকাশিত আমার লেখা কলামের নাম ছিল 'ব্রিটিশ ভারতীয় সাম্রাজ্যের প্রান্তিক অঞ্চল'। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অন্যতম উত্তরাধিকারী পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রের একটি প্রদেশ ছিল পূর্ব পাকিস্তান। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা যে বাংলাদেশ পেয়েছি সেটার ভৌগোলিক অবস্থান পূর্ব পাকিস্তান থেকে উত্তরাধিকার।


আজকের কলামে বাংলাদেশের একটি প্রান্তিক অঞ্চল নিয়ে কথা বলব। দীর্ঘ রাজনৈতিক আন্দোলনের ফসলস্বরূপ ভারত ও পাকিস্তান নামক দুটি রাষ্ট্র সৃষ্টি হয়েছিল। পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবস ১৪ আগস্ট ১৯৪৭ এবং ভারতের স্বাধীনতা দিবস ১৫ আগস্ট ১৯৪৭। ওই তারিখগুলো থেকে দুই বছর ৫২ দিন পর আমার জন্ম। অতএব ভারত এবং পাকিস্তান সৃষ্টির প্রেক্ষাপটের আমি চাক্ষুষ তথা সচেতন বা সমকালীন সাক্ষী নই। একটু বড় হওয়ার পর পূর্ববর্তী প্রজন্মের ব্যক্তি তথা মুরবি্বদের কাছ থেকে জানতে পেরেছি_কেন দুটি দেশ আলাদা হয়েছিল। আরো অনেক পরে জানতে চেষ্টা করেছি পার্বত্য চট্টগ্রাম নামক ভূখণ্ডের জনগোষ্ঠী কেনই বা ভারতের সঙ্গে যেতে চেয়েছিল অথবা কেনই বা বাংলাদেশের সঙ্গে আসায় পরিস্থিতি উন্নততর হয়েছে। বাংলাদেশের মানচিত্রের সঙ্গে যাঁরা পরিচিত, তাঁরা জানবেন যে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত বৃহত্তর চট্টগ্রামের পূর্ব অংশকেই বলা হয় পার্বত্য চট্টগ্রাম। সেখানে এখন তিনটি আলাদা জেলা যথা রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান। চট্টগ্রাম জেলাটি উত্তর থেকে দক্ষিণ প্রায় ৯০ মাইল লম্বা এবং পূর্ব থেকে পশ্চিমে সর্বাধিক ২০ মাইল চওড়া, অর্থাৎ অনেক জায়গায় ১০-১২ মাইল চওড়া মাত্র। যত দিন ধরে পার্বত্য চট্টগ্রামের মাটিতে ক্ষুদ্র নৃতাত্তি্বক জনগোষ্ঠীগুলো বসতি করেছে, তত দিন ধরেই এই জনগোষ্ঠীগুলো চট্টগ্রামের জনগোষ্ঠীর সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্পর্ক তো অবশ্যই করেছে, পারস্পরিক সুআচরণের কারণে তাদের মধ্যে আত্মার সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। পার্বত্য চট্টগ্রামের জনগোষ্ঠীর জন্য বহির্বিশ্বে যাওয়ার একমাত্র রাস্তা ছিল চট্টগ্রামের মাধ্যমে। কারণ সব পাহাড়ি নদী পশ্চিম দিকে প্রবাহিত হয়ে এসে বঙ্গোপসাগরে পড়ে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্ণফুলী নদীর ভাটিতে, মোহনা থেকে মাত্র এক মাইল উজানে। ব্রিটিশ ভারতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শহর কলকাতায় যদি কেউ যেতে চাইত, তাকে চট্টগ্রাম বন্দরে এসে নৌপথে যেতে হতো অথবা চট্টগ্রাম শহর থেকে রেলপথে বহুদূর ঘুরে যেতে হতো। যে কয়েকজন সৌভাগ্যবান উপজাতীয় তরুণ উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেয়েছিলেন, তাঁরা তাঁদের জন্মস্থান পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বের হয়ে চট্টগ্রাম শহর বা ঢাকা শহর বা কলকাতা শহরেই উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন। রাঙামাটিতে অবস্থিত চাকমা সার্কেলের প্রধানের (সাধারণভাবে চাকমা রাজা নামে পরিচিত) পরিবারের ব্যক্তি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন পশ্চিমবঙ্গের সম্ভ্রান্ত পরিবারের সঙ্গে। এসব কথা বলার পেছনে কারণ হচ্ছে, এটা তুলে ধরা যে, ১৯৪৭ সালের আগস্টে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে পার্বত্য চট্টগ্রামকে সনি্নবেশিত করার কাজটি ছিল ইতিহাস ও ভূগোলের স্বাভাবিক পরিণতি। কিন্তু স্নেহ কুমার চাকমা এবং আরো কয়েকজনের হঠকারিতামূলক সিদ্ধান্তের কারণে ১৯৪৭ সালে সমগ্র উপজাতীয় জনগোষ্ঠী ভারতপন্থী রঙে রঞ্জিত হয়, যেটা দুর্ভাগ্যজনক। যা হোক, স্বাধীন পাকিস্তানে তাদের যাত্রা শুরু হয়। তৎকালীন পাকিস্তানের এবং তৎকালীন ভারতের প্রান্তিক অঞ্চলগুলো অবহেলার শিকার ছিল। তৎকালীন ভারতের উত্তর-পশ্চিম প্রান্তিক অঞ্চলগুলোর আলোচনা আমরা এখানে করব না। তৎকালীন পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম প্রান্তিক অঞ্চলগুলোর আলোচনাও আমরা এখানে করব না। আমরা এখানে, তৎকালীন ভারতের উত্তর-পূর্ব ও তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তিক অঞ্চলগুলোর কথা।
প্রান্তিক অঞ্চলগুলোকে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি বা ব্রিটিশ সরকার এক্সক্লুডেড এরিয়া বা পার্শিয়ালি এক্সক্লুডেড এরিয়া হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। এর সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা ২ অক্টোবর প্রকাশিত কলামে (শিরোনাম : ব্রিটিশ ভারতীয় সাম্রাজ্যের প্রান্তিক অঞ্চল) দিতে চেষ্টা করেছি। এক্সক্লুডেড এরিয়া থাকার কারণে বাইরে থেকে লোকজন ওই এলাকাগুলোতে কম যেতে পারত। যোগাযোগের অভাবের কারণে, পারস্পরিক ব্যবসা-বাণিজ্যের মাত্রা নিচের দিকে থাকার কারণে এবং বস্তুগত লোভনীয় কোনো লক্ষ্যবস্তু না থাকায় বাইরের এলাকার লোকজন ওই প্রান্তিক অঞ্চল তথা পার্বত্য চট্টগ্রামে যেতে কম আগ্রহী হতেন। অতএব শিল্প গড়ে ওঠেনি, বিনিয়োগের ভৌত কাঠামো গড়ে ওঠেনি এবং বৃহৎ কোনো বাণিজ্যকেন্দ্রও উন্মোচিত হয়নি। ১৯৪৭-পরবর্তী কয়েক বছরের কথা বলি। তখনকার আমলে পুরো পার্বত্য চট্টগ্রামে মাত্র তিনটি ক্ষুদ্র শহর ছিল যথা কর্ণফুলী নদীর তীরে রাঙামাটি, শঙ্খ নদের তীরে বান্দরবান এবং উত্তর-পশ্চিমে, পাকিস্তান ও ভারতের সীমান্তে ফেনী নদীর তীরে রামগড় শহর। জেলার সদর দপ্তর ছিল রাঙামাটি শহরে। এই পার্বত্য চট্টগ্রামে গুরুত্বপূর্ণ প্রথম শিল্পপ্রতিষ্ঠান হচ্ছে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে কর্ণফুলী নদী দিয়ে উজানে ২১ মাইল উত্তর-পূর্বে কর্ণফুলী নদীর তীরেই অবস্থিত চন্দ্রঘোনা নামক স্থানে স্থাপিত কাগজ কল বা পেপার মিল। ওই শিল্পপ্রতিষ্ঠানটির নাম ছিল কর্ণফুলী পেপার মিল। ছোটকালে বইয়ে পড়েছি, যখন স্থাপিত হয় তখন ওই পেপার মিলটি এশিয়ার মধ্যে সর্ববৃহৎ ছিল। কাগজ উৎপাদনের অন্যতম কাঁচামাল হচ্ছে এক ধরনের বাঁশ। এই বাঁশ প্রচুর পরিমাণে পার্বত্য চট্টগ্রামের কয়েকটি এলাকায় স্বাভাবিকভাবেই জন্ম নেয়। অতএব এই কাগজের কল কাঁচামালের অভাব কোনোদিন হয়নি। চন্দ্রঘোনা নামক স্থানটি হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রাম ও চট্টগ্রাম জেলার সীমান্তে অবস্থিত। ১৯৬০-এর দিকে চট্টগ্রাম শহর থেকে সড়কপথে সেখানে যাওয়া যেত, এর আগে একমাত্র পন্থা ছিল কর্ণফুলী নদী দিয়ে যাওয়া। পার্বত্য চট্টগ্রামে কাগজের কলটি স্থাপিত হলেও পার্বত্য চট্টগ্রামের তৎকালীন উপজাতীয় জনগণ কাগজ কলে শ্রমিক হিসেবে যোগ দেননি। যোগ না দেওয়ার কারণটি কোনোমতেই বিদ্রোহ নয়, কারণ হচ্ছে তাঁরা এ ধরনের শ্রম বিনিয়োগের সঙ্গে জীবনে কোনো দিন অভ্যস্ত হননি। তাই কাগজ কলের ৯৯ শতাংশ শ্রমিক হয়েছিলেন সমতল ভূমি তথা চট্টগ্রাম বা নোয়াখালী থেকে যাওয়া সাধারণ মানুষ। কিন্তু গভীর জঙ্গল থেকে বাঁশ কাটা এবং সেই বাঁশকে কাগজ কল পর্যন্ত জলপথে আনার কাজটি উপজাতীয় মানুষ করতেন, কারণ এটা তাঁদের জন্য স্বাভাবিক কাজ ছিল। আমি এ ঘটনাটি উল্লেখ করলাম এ জন্য যে শুধু ২০১২ সালের বাংলাদেশি বাঙালিদের দ্বারা নয়, অথবা শুধু ১৯৭২ সালের বাংলাদেশি বাঙালিদের দ্বারা নয়, বরং সেই ১৯৫২ সালেই উপজাতীয় এবং বাঙালি জনগোষ্ঠীর মধ্যে পারস্পরিক ইন্টারঅ্যাকশনের প্রথম বড় সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল। সেই ১৯৫২ সালে বা এর অব্যবহিত পরের বছরগুলোতে বাঙালি বা উপজাতীয় কারো কাছেই এ ঘটনা অস্বাভাবিক ঠেকেনি, কিন্তু ২০-২৫ বছর পর এর মধ্যে এ ঘটনার অস্বাভাবিকতা, অন্যায়, অবিচার ইত্যাদি তালাশ করার প্রবণতা লক্ষ করা যায়।
বাংলাদেশের মানচিত্র মানেই ৫০-৬০ বছর আগেকার পূর্ব পাকিস্তানের মানচিত্র। উত্তর-পূর্বের সিলেট জেলায় কিছু স্বল্প উচ্চতার টিলা বা পাহাড় তখন যেমন ছিল এখনো আছে। দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত পার্বত্য চট্টগ্রামে স্বল্প উচ্চতার বা মাঝারি উচ্চতার কিছু পাহাড় তখন যেমন ছিল এখনো আছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের কথা আরেকটু বলি। পাহাড় থাকলেই পাহাড়ি নদী থাকবে এবং পাহাড় থাকলেই পাহাড় শ্রেণীর মাঝখানে উপত্যকা থাকবে। দেশের সরকার চাইবে ওই পাহাড় বা পাহাড়ি নদী থেকে কী উপকার গ্রহণ করা যায়? এখন (উদাহরণস্বরূপ ২০০০ সাল বা ২০০৬ সাল বা ২০১২ সাল) যেমন বিদ্যুৎ উৎপাদনের একাধিক মাধ্যম নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, তেমনই অতীতেও এরূপ আলোচনা হতো। এখন আমরা আলোচনা করছি বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য আণবিক উৎস বা কয়লা-উৎস বা তেল-উৎস ইত্যাদি নিয়ে। ৬০-৭০ বছর আগে এত বিকল্প উপায় বা অপশন পরিকল্পনাবিদদের সামনে ছিল না। তখনকার আমলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সরলতম উপায় ছিল পানি-উৎস। অনেক উচ্চতা থেকে অনেক নিচের দিকে গভীর বেগে পানি যদি টারবাইনের ওপর ফেলা যায় তাহলে সেই টারবাইনের ঘূর্ণায়নের মাধ্যমেই (বিস্তারিত বলছি না) বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। এটাকে হাইড্রো-ইলেকট্রিসিটি বা জলবিদ্যুৎ বলে। পাকিস্তান সৃষ্টি হওয়ার পর, পূর্ব পাকিস্তান এনার্জি বা জ্বালানি সংকটে ছিল। অতএব পূর্ব পাকিস্তানের জন্য জ্বালানি চাহিদা মেটানো একটি অগ্রাধিকারভিত্তিক প্রচেষ্টা ছিল। তখনকার আমলে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল আমেরিকা। আমেরিকার সাহায্যে পাকিস্তান সিদ্ধান্ত নিয়েছিল যে, পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি অঞ্চল ও পাহাড়ি নদীকে ব্যবহার করে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প গড়ে তুলবে। অতএব একটি পাহাড়ি নদী দরকার এবং ওই নদীতে এমন একটি জায়গায় বাঁধ দিতে হবে যেই বাঁধের পেছনের দিকে তথা উজানে অনেক পানি জমবে। পানি জমলেই বিরাট আকৃতির জলাধার সৃষ্টি হবে। সেই পানি ব্যবহার করে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। ১৯৫০ থেকে ১৯৫২ সালের কথা। সিদ্ধান্ত হয়েছিল তৎকালীন রাঙামাটি শহর কর্ণফুলী নদী দিয়ে পাঁচ মাইল ভাটিতে এবং চট্টগ্রাম বন্দর থেকে কর্ণফুলী নদী দিয়ে ২৫ মাইল উজানে কাপ্তাই নামক স্থানে সেই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। এখন (২০১২ সাল) যেমন এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স বা পরিবেশ বিজ্ঞান নামক বিষয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পড়ানো হয়, এখন যেমন দেশে দেশে পরিবেশ অধিদপ্তর বা পরিবেশ সংস্থা আছে, এখন যেমন পরিবেশ নিয়ে আন্তর্জাতিক সংস্থা আছে, এখন যেমন পরিবেশ নিয়ে মানুষ লেখাপড়া, চিন্তাভাবনা করছে, তেমনভাবে কিন্তু ওই আমলে করা হতো না। আমার এই বক্তব্য শুধু বাংলাদেশের জন্য প্রযোজ্য নয়, গোটা পৃথিবীর জন্য প্রযোজ্য। আজকে আমরা বলছি, উন্নত বিশ্বের উন্নয়নমূলক ও শিল্পায়নমূলক কর্মকাণ্ডের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায়, জলে ও স্থলে পৃথিবীর পরিবেশ ও জলবায়ু দূষিত হয়েছে এবং ওই দূষণের বড় প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশের মতো গরিব দেশগুলোর ওপরে। অর্থাৎ পরিবেশ ও জলবায়ু দূষণের নেতিবাচক প্রভাব বাংলাদেশের ওপর যতটুকু পড়েছে, এর জন্য বাংলাদেশ যতটুকু না দায়ী, সম্ভবত শতগুণ বেশি দায়ী উন্নত বিশ্ব। এ কথাটি বাংলাদেশ বনাম অবশিষ্ট পৃথিবীর প্রসঙ্গে এ জন্য বললাম যে পার্বত্য চট্টগ্রাম বনাম বাংলাদেশ একই মাত্রার উদাহরণ উপস্থাপন করা যায়। উদাহরণটি হচ্ছে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। এই প্রকল্পের ভালোমন্দ নিয়ে আমাদের জানা প্রয়োজন; তবে আজকে নয় আরেক দিন।
লেখক : চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি
www.kallyan-ibrahim.com

No comments

Powered by Blogger.