কালের পুরাণ-কালো আইনের পক্ষে বিএনপির সাফাই! by সোহরাব হাসান

সংবিধান সংশোধনে সর্বদলীয় সংসদীয় কমিটি গঠনের প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছে বিএনপি। এর মাধ্যমে বাংলাদেশে সর্বাধিক সময় ক্ষমতাভোগকারী দলটি নিজেদের রাজনৈতিক দেউলিয়াত্বই প্রকাশ করল। সংবিধান অপরিবর্তনীয় কোনো কেতাব নয়। মানুষের প্রয়োজনে সংবিধান প্রণীত হয়, মানুষের প্রয়োজনেই সংযোজন-বিয়োজন ঘটতে থাকে,


যদিও এ দেশে ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও দলীয় স্বার্থেই বেশির ভাগ সময় সংবিধান কাটাছেঁড়া করা হয়েছে। বৃহত্তর জনগণের স্বার্থ রয়ে গেছে উপেক্ষিত। সেটি যেমন পঞ্চম সংশোধনীর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, তেমনি প্রযোজ্য চতুর্থ, ষষ্ঠ ও সপ্তম সংশোধনীর বেলায়ও। কেবল ব্যক্তির জন্য সংবিধান সংশোধনের নজিরও আছে। ১৯৮১ সালে বিচারপতি আবদুস সাত্তার ছিলেন উপরাষ্ট্রপতি, পদটি লাভজনক। এ পদে আসীন কোনো ব্যক্তি রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচন করতে পারেন না। কিন্তু বিএনপি তাঁর জন্য সংবিধান পরিবর্তন করেছিল।
বলা হয়, বাহাত্তরের সংবিধান অনেক বেশি গণতান্ত্রিক এবং তাতে মুক্তিযুদ্ধের আশা-আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত হয়েছিল। কিন্তু তার ওপর প্রথম কাঁচিকাটা করল কে? আওয়ামী লীগ। সংসদীয় গণতন্ত্র বাতিল করে একদলীয় শাসন কায়েমও করল তারা। অতএব স্বৈরতন্ত্রের দায় কেবল সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের নয়, পাপ আমরা সবাই করেছি—কেউ উর্দি পরে, কেউ সিভিল পোশাকে। না হলে দেশের এত দুর্গতি হবে কেন?
বাহাত্তরের সংবিধানে ফিরে যাওয়ার প্রসঙ্গ এলেই একশ্রেণীর লোক রৈ রৈ করে ওঠেন। যেন তাঁদের মাথায় হিমালয় ভেঙে পড়েছে। এবারও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক উল হক বলেছেন, বাহাত্তরের সংবিধানে ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়। কেন নয়, সেটি নাকি একটি আদর্শিক সংবিধান এবং তা দিয়ে দেশ চালানো সম্ভব নয়। ব্যারিস্টার রফিক উল হকের কথা মেনে নিলে রাষ্ট্র পরিচালনায় আদর্শের কোনো জায়গা নেই। তা হলে বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি টিকে আছে কীভাবে? সংবিধান আদর্শের ভিত্তিতে না হলে রাষ্ট্রও তো আদর্শহীন হয়ে যায়।
সংসদে সরকারি দলের যে সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে, তাতে বিরোধী দলের সঙ্গে আলোচনা না করেও তারা সংবিধান সংশোধন বিলটি সংসদে পেশ করতে পারত। তারা তা না করে বিরোধী দলের সহযোগিতা চেয়েছে। বিষয়টি বিএনপি ইতিবাচক দৃষ্টিতে নিতে পারত। দুর্ভাগ্য ,তারা নেয়নি। কেন নেয়নি? চিঠির ভাষার অস্পষ্টতার জন্য? বিরোধী দলকে একাধিক সদস্য না দেওয়ার জন্য? এর কোনোটি নয়। সরকারের উদ্দেশ্য ও আন্তরিকতা নিয়ে বিএনপি প্রশ্ন তুলতে পারে। কিন্তু তারা গণতন্ত্রের সর্বজনীন রীতি ও পদ্ধতি অগ্রাহ্য করতে পারে না। সংবিধান সংশোধনের ব্যাপারে বিএনপির আপত্তি থাকলে তা কমিটিতে উত্থাপন করাই সমীচীন হতো। এর আগে টিপাইমুখ বাঁধ পরিদর্শনে গঠিত কমিটিতেও তারা নাম দেয়নি। এতে সংসদীয় ব্যবস্থার প্রতি বিএনপির অনাস্থা ও অবজ্ঞাই প্রকাশ পেয়েছে।
প্রশ্ন উঠেছে, কেন আমরা সংবিধান পরিবর্তন করতে চাইছি? ব্যক্তি বা গোষ্ঠীস্বার্থের কারণে? জেদ বজায় রাখতে? জিয়াউর রহমান পঞ্চম সংশোধনীটি করেছিলেন বলে? এখন ভিন্ন শিবিরে থাকা অনেকেই মুক্তিযোদ্ধা জিয়ার মধ্যে প্রগতিশীলতা এবং আওয়ামী-বাকশালকে জাতীয় শত্রু হিসেবে গণ্য করেছিলেন। আজ যে সংবিধানের জন্য তাঁরা কান্নাকাটি করছেন, ১৯৭২ সালে দিল্লি ও মস্কোর আজ্ঞাবহ দাবি করে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। সংবিধান যথেষ্ট প্রগতিশীল নয় বলে তাতে সাংসদ স্বাক্ষর দান থেকেও বিরত ছিলেন।
তার পরও কেন আমরা বাহাত্তরের সংবিধানে ফিরে যেতে চাইছি? চাইছি এ কারণে যে আমরা সামনে এগোতে পারিনি। ক্রমাগত পিছিয়ে গিয়েছি। বাহাত্তরের সংবিধানে অনেক দুর্বলতা ছিল। প্রধানমন্ত্রীর হাতে একনায়কসুলভ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল। ৭০ অনুচ্ছেদ জারি করে সাংসদদের হাত-পা বেঁধে দিয়েছিল। সেটি হলো কাঠামোগত দিক। কিন্তু পরবর্তী শাসকেরা সংবিধান সংশোধনের নামে এমন কিছু করেছেন, যা মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও চেতনার পরিপন্থী। শোষণহীন সমাজের বদলে লুটপাটকে উসকে দিয়েছিল।
কেন আমরা বাহাত্তরের সংবিধানে ফিরে যেতে চাইছি? চাইছি এ কারণে যে আমরা একটি সমতাভিত্তিক রাষ্ট্র গঠন করতে চাই। আওয়ামী লীগ বা মহাজোটের শরিকেরা কি তা করতে ইচ্ছুক? পঞ্চম সংশোধনী নিয়ে এন্তার কথা হচ্ছে, কিন্তু তার চেয়েও প্রতিক্রিয়াশীল সপ্তম সংশোধনী নিয়ে কিছু বলা হচ্ছে না কেন? শরিক দল অসন্তুষ্ট হবে বলে? এ ধরনের স্ববিরোধিতা দেশ ও জনগণের জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে না। বাহাত্তরের সংবিধানে রাষ্ট্রাদর্শ হিসেবে চার মৌলনীতির কথা ছিল—জাতীয়তাবাদ (বাংলাদেশি অর্থে নয়), গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। তার কোনোটাই কি আমরা অক্ষত রেখেছি? জিয়াউর রহমান যদি ধর্মনিরপেক্ষতা উচ্ছেদ করে থাকেন, আওয়ামী লীগ নিজ হাতে গড়া সংসদীয় ব্যবস্থা বিসর্জন দিয়েছিল। ‘সমাজতন্ত্র’ ও ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ শব্দ দুটি এখন কেউ মুখেও আনেন না। বলেন সমতাভিত্তিক অর্থনীতি ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির কথা। পঞ্চম সংশোধনী বাতিল করলে দাঁড়ি-কমাসহই করতে হবে। সামরিক শাসকের অপর্কীতির কিছু রেখে কিছু বাদ দিয়ে জনগণকে ঠকানো যাবে না। সরকার যদি বাহাত্তরের সংবিধানে ফিরে যেতে চায়, সংবিধানে সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে পুনঃস্থাপন করতে হবে। কোনো গোঁজামিল চলবে না।
আমরা বুঝতে পারছি না বিএনপি কেন তার জন্মের আগের দায় নিজের কাঁধে নিচ্ছে? বিএনপি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর। তার আগে তিন শাসক সামরিক ফরমানে দেশ চালিয়েছেন। প্রথমে খন্দকার মোশতাক আহমদ, মাঝখানে আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম। সবশেষে জিয়া। জিয়ার কাছে বিএনপির ঋণ থাকতে পারে, মোশতাকের কাছে নয়। তা ছাড়া বিএনপি নিজেকে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রবর্তক বলে দাবি করে। ফলাও প্রচার চালায়, তারাই সংবাদপত্রের স্বাধীনতা দিয়েছে। সেই দলটি কী করে সেনাতন্ত্রের কালো পোশাকটিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে? তা হলে আওয়ামী লীগের অভিযোগই কি সত্য? দলটি বহিরাঙ্গে গণতান্ত্রিক হলেও ভেতরে ভেতরে সেনাতন্ত্র আঁকড়ে আছে। সামরিক স্বৈরশাসনের গর্ভে গড়া দলটি গত ৩২ বছরেও গণতান্ত্রিক হতে পারেনি। বিএনপির গঠনতন্ত্রই তার প্রমাণ।
বিএনপির নেতারা বলছেন, পঞ্চম সংশোধনী বাতিল হলে চতুর্থ সংশোধনী অর্থাৎ বাকশাল বহাল হয়ে যাবে। এটি কুতর্ক ছাড়া কিছু নয়। চতুর্থ সংশোধনী তো আগেই বাতিল হয়ে গেছে। এর আগে যে তিনটি সংশোধনী হয়েছে, তাও পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে। জরুরি অবস্থা জারি কিংবা নিবর্তনমূলক আটকাদেশ বহাল রাখতে যেসব সংশোধনী আনা হয়েছিল, তাও বাতিল করতে হবে। গণতান্ত্রিক দেশে কেন বিশেষ ক্ষমতা আইন বা নিবর্তনমূলক আইন থাকবে?
বিরোধী দলের নেতারা বলেছেন, মানুষ সামনে এগোয়। সরকার পেছনে যাচ্ছে। আসলেই কি আমরা সামনে এগোচ্ছি? তাহলে তো সংবিধান সংশোধনেরও প্রয়োজন হতো না। বাহাত্তরের সংবিধানে যেসব প্রগতিশীল ধারা বহাল ছিল, সেগুলো একে একে আমরা হত্যা করেছি। এ কাজটি যে শুধু বিএনপি করেছে তা-ই নয়; আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টিসহ ক্ষমতাসীন ও ক্ষমতাচ্যুত সবাই এ পাপের অংশীদার।
সংবিধানে যা-ই লেখা থাকুক না কেন, তা রাষ্ট্রের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মৌলিক মানবাধিকার নিশ্চিত করতে পারেনি। এ জন্য সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতার চেয়েও বেশি দায়ী শাসকদের সংকীর্ণ দৃষ্টি ও অসহিষ্ণু আচরণ। তাঁরা সংবিধানকে ব্যবহার করেছেন ক্ষমতায় থাকার ও যাওয়ার হাতিয়ার হিসেবে। যখন যাঁরা ক্ষমতায় ছিলেন তাঁদের স্বার্থে আইন করেছেন। এখন বিএনপি নেতারা বাহাত্তরের সংবিধান নিয়ে ধানাইপানাই কথা বলেন। কিন্তু পঞ্চম সংশোধনীর পক্ষে কোনো যুক্তি দাঁড় করাতে পারেন না। তাঁরা তখন কী বলেছিলেন?
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ তাঁর বাংলাদেশ: শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনকাল বইয়ে লিখেছেন, ‘বাংলাদেশের সংবিধানে বিনা বিচারে আটকাদেশের বিধান সংযোজিত না করে আওয়ামী লীগ এক সুমহান নজির সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত বেশি দিন তারা সেটা টেকাতে পারেনি।... শেষ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ক্ষমতা সংহতকরণের প্রয়োজনে উপনিবেশবাদী অস্ত্র ধারণে বাধ্য হয়। ১৯৭৩ সালের ২২ সেপ্টেম্বর ৯ মাস অতিক্রান্ত হওয়ার পর সংবিধানের ৩৩ নম্বর অনুচ্ছেদ সংশোধনীর জন্য সংবিধান (দ্বিতীয় সংশোধনী) বিল পাস করা হয় এবং জরুরি আইনের বিধানসংবলিত একটি নতুন অংশ সংযোজিত হয়।’
মওদুদ আহমদ এখন দাবি করছেন, আওয়ামী লীগের পক্ষে বাহাত্তরের সংবিধানে ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়। কেন সম্ভব নয়, সেটি স্পষ্ট করে বলছেন না। বরং মওদুদ আহমদ যদি বলতেন, হ্যাঁ, বাহাত্তরের সংবিধানে ফিরে যেতে হবে কোনো রকম বিচ্যুতি ছাড়াই। পঞ্চম সংশোধনীর কোনো শব্দগুচ্ছ বাদ দিয়ে নতুন শব্দগুচ্ছ যোগ করলেই বাহাত্তরের সংবিধানে ফিরে যাওয়া হয় না। বাহাত্তরের সংবিধানে ফিরে যেতে হলে অষ্টম সংশোধনীও বাতিল করতে হবে। বাতিল করতে হবে বিশেষ ক্ষমতা আইন ও জরুরি অবস্থার বিধানও। গণতন্ত্র ও জরুরি অবস্থা একসঙ্গে চলতে পারে না।
বিএনপি যদি গণতন্ত্রে বিশ্বাস করে, যদি সেনাতন্ত্রের কালো পোশাকটি খুলে ফেলতে চায়, তাহলে তাদের কর্তব্য হবে সংবিধান সংশোধন-প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া। খালেদা জিয়াকে স্থির করতে হবে, তিনি কী চান? জেদ বা একগুঁয়েমিতে গণতন্ত্র রক্ষা পাবে না। চতুর্থ সংশোধনী বাতিল হওয়ায় আওয়ামী লীগ বেঁচে গেছে। বিএনপি কেন তার জন্মের আগে প্রণীত পঞ্চম সংশোধনীর দায় নেবে?
বাহাত্তরের সংবিধানে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে আরেকটি মৌলিক প্রশ্ন তুলতে চাই। এতে বাঙালি ছাড়া অন্য কোনো জনগোষ্ঠীর জাতিগত অধিকার স্বীকার করা হয়নি। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি সবাইকে বাঙালি হয়ে যেতে বলেছিলেন। তাতে সংখ্যাগরিষ্ঠের অহমিকা প্রকাশ পেলেও সবাই বাঙালি হয়ে যায়নি। যাওয়া সম্ভবও নয়। পাহাড়ি নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা সে সময়ে সংসদ দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, ‘আমি বাঙালি নই। আমার বাবা-দাদা চৌদ্দপুরুষ কেউ বাঙালি নন। অতএব সংখ্যায় আমরা যত কমই হই না কেন আমাদেরও জাতিসত্তার স্বীকৃতি দিতে হবে।’ শেখ হাসিনা পার্বত্য চুক্তি করে পিতার ঋণ কিছুটা হলেও শোধ করেছেন, এখন খালেদা জিয়ার উচিত সংবিধান সংশোধন-প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়ে স্বামীর ঋণ শোধ করার সুযোগটি পুরোমাত্রায় গ্রহণ করা। তাতে বিএনপি বেঁচে যায়, জিয়াও ইতিহাসের দায়মুক্ত হন।
বাহাত্তরের সংবিধানে ফিরে গেলে জামায়াতে ইসলামীসহ ধর্মভিত্তিক দলগুলো শঙ্কাবোধ করতে পারে। কেননা, সে সংবিধানে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক তৎপরতার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছিল। কিন্তু বিএনপি তো ধর্মভিত্তিক দল নয়, তারা নিজেদের জাতীয়তাবাদী বলে দাবি করে। সে ক্ষেত্রে তাদের ভয়ের কী আছে?
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrab03@dhaka.net

No comments

Powered by Blogger.