উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, সরবরাহ কমেছে, বাড়ছে ডিমের দাম-তিন বছরে ৯৫০টি মুরগির খামার বন্ধ by অরূপ রায়

রাজধানীর অদূরে সাভারে একের পর এক লেয়ার মুরগির খামার বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে ডিমের উৎপাদন কমে গেছে। পাশাপাশি বেড়ে গেছে উৎপাদন খরচ। এ কারণে ডিমের দাম বেড়ে গেছে। সাভার পোলট্রি ফারমার অ্যাসোসিয়েশন ও ডিম ব্যবসায়ী সমিতি সূত্রে জানা গছে, বছর তিনেক আগেও সাভারে লেয়ার মুরগির খামারের সংখ্যা ছিল এক হাজার।


এসব খামারে প্রতিদিন গড়ে ১০ লাখ থেকে ১২ লাখ ডিম উৎপাদিত হতো। সাভারের চাহিদা মিটিয়ে এই ডিমের অর্ধেক সরবরাহ করা হতো রাজধানীসহ চট্টগ্রামে। কিন্তু গত তিন বছরে ৯৫০টি খামারই বন্ধ হয়ে গেছে। একের পর এক লেয়ার মুরগির খামার বন্ধ হওয়ার কারণে সাভারে ডিমের উৎপাদন নেমে এসেছে এক লাখেরও নিচে। এ কারণে সাভারের চাহিদা মেটাতেই এখন ডিম সংগ্রহ করতে হচ্ছে টাঙ্গাইল, পাবনা ও ঠাকুরগাঁও থেকে। এর প্রভাব পড়ছে ডিমের দরের ওপর।
আশুলিয়ার কুটুরিয়ার পদ্মা পোলট্রির মালিক মিনহাজ উদ্দিন জানান, তাঁর খামারে ১৫ হাজার মুরগি ছিল। ওই মুরগি থেকে প্রতিদিন তাঁর ১২ হাজার ডিম উৎপাদন হতো। বার্ড ফ্লুর কারণে গত বছর খামারটি বন্ধ হওয়ার পর তিনি আর চালু করতে পারেননি। মিনহাজ উদ্দিনসহ আরও কয়েকজন খামারি জানান, বার্ড ফ্লুর কারণে গত তিন বছরে কুটুরিয়াসহ পাশের কাঠগড়া ও জিরাব এলাকার ৯৪টি লেয়ার মুরগির খামার বন্ধ হয়ে গেছে। বাচ্চা ও খাদ্যের দামসহ আনুষঙ্গিক খরচ বৃদ্ধি এবং সে তুলনায় ডিমের দাম কম পাওয়ার কারণে খামারিরা আর ওই সব খামার চালু করেননি।
ডিম ব্যবসায়ী আবদুর রশীদ জানান, সাভারের হেমায়েতপুরের ঝাউচর এলাকা থেকে প্রতিদিন এক লাখ ডিম আসত সাভারের পাইকারি ডিমের বাজার শাহজালাল মার্কেটে। কিন্তু ওই এলাকা থেকে এখন আর ডিম আসে না। সেখানকার ৪০টি লেয়ার মুরগির খামারই বন্ধ হয়ে গেছে গত কয়েক বছরে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, সাভারের ডিম বেচাকেনার একমাত্র পাইকারি বাজার সাভার শাহজালাল মার্কেটে ১৫০টি ডিমের দোকান ছিল। এসব দোকানে প্রতিদিন ১০ লাখ থেকে ১২ লাখ ডিম বেচাকেনা হতো। কিন্তু ডিমের অভাবে ওই মার্কেটের ১৩০টি দোকানই বন্ধ হয়ে গেছে।
সাভার পোলট্রি ফারমার অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মো. আরিফুজ্জামান বলেন, বাচ্চা ও খাদ্যের দামসহ আনুষঙ্গিক খরচ বাড়ার কারণে ডিমের উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। তার ওপর বার্ড ফ্লুতে আক্রান্ত হওয়ার পর বন্ধ হয়ে যাওয়া খামারগুলো আর চালু করছেন না খামারিরা। এসব কারণে একদিকে যেমন ডিমের উৎপাদন কমে গেছে, অন্যদিকে বেড়ে গেছে ডিমের দাম।
বেসরকারি এক জরিপের বরাত দিয়ে আরিফুজ্জামান বলেন, গত বছর ১১ মাস ১৪ দিন সাভারে প্রতিটি ডিম বিক্রি হয়েছে পাঁচ টাকা করে। ওই সময়ে প্রতিটি ডিমের উৎপাদন খরচ ছিল পাঁচ টাকা ৮০ পয়সা। এর পরও বাজারে ডিমের পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকায় ক্ষতি দিয়েই খামারিরা ডিম বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন। খাদ্য ও বাচ্চার দাম বাড়ার পাশাপাশি আনুষঙ্গিক খরচ বাড়ায় বর্তমানে ডিমপ্রতি উৎপাদন খরচ দাঁড়িয়েছে ছয় টাকা ৫০ পয়সা। খামারিরা পাচ্ছেন ছয় টাকা ৯০ পয়সা। পাইকারি বাজারে প্রতিটি ডিম বিক্রি হচ্ছে সাত টাকা ৬০ পয়সা থেকে ৭০ পয়সা দরে। আর হাতবদল হয়ে এই ডিমই খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে আট টাকারও বেশি দামে।
বার্ড ফ্লুসহ খাদ্য ও বাচ্চার দাম বাড়ার পাশাপাশি আনুষঙ্গিক খরচ বাড়ার কারণে ডিমের দাম বেড়ে গেছে—খামারি ও ডিম ব্যবসায়ীদের এমন মন্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন সাভার উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ফরহাদুল আলম। ফরহাদুল আলম বলেন, অনেকে ঋণ নিয়ে খামার করেন। মুরগি মারা যাওয়ার পর ঋণ পরিশোধে তাঁদের অনেক সমস্যার মধ্যে পড়তে হয়। এ কারণে তাঁরা মুরগি পালনে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। এসব কারণে সাভারে খামারের সংখ্যা দিন দিন কমছে। বার্ড ফ্লু রোধে যত দিন প্রকৃত সুস্পষ্ট কার্যকর ভ্যাকসিনের ব্যবস্থা করা না যাবে, তত দিন পর্যন্ত এই সমস্যা আরও বাড়তে থাকবে।

No comments

Powered by Blogger.