মিয়ানমার-ঝুঁকি নিয়েই নতুন পথে হাঁটা by অং সান সু চি

বর্তমানে পরিবর্তন এত কাঙ্ক্ষিত ও অনুপ্রেরণাদায়ক কেন? মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার প্রথম নির্বাচনী প্রচারণাও জমে উঠেছিল পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতিতে। মিয়ানমারেও আজকাল নতুন সরকার দেশে প্রকৃত অর্থেই পরিবর্তন আনতে সক্ষম, নাকি এটি বেসামরিক মোড়কে পুরোনো সামরিক স্বৈরশাসনই বলবৎ রাখতে তৎপর তা নিয়ে তুমুল বিতর্ক চলছে।


প্রায় প্রতিদিনই মানুষ আমার কাছে জানতে চায়, আমি কী ভাবছি? মিয়ানমারে নতুন প্রশাসন সংস্কারের যেসব পদক্ষেপ নিচ্ছে সেগুলো লোকদেখানো ব্যাপার, নাকি সঠিক পথে এগিয়ে যেতে প্রকৃত অর্থেই দেশে সংস্কার সাধিত হচ্ছে বলে আমি মনে করি? স্বৈরশাসকের অধীনে ২৩ বছর কাটানোর পর পরিবর্তনের জন্য এ দেশের মানুষ একেবারে অধৈর্য হয়ে উঠেছে।
আরব অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়ে গেছে, ২০১২ সালে পশ্চিম এশিয়া ও আফ্রিকার আরব দেশগুলোতে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে মৌলিক পরিবর্তন এখন চরম কাঙ্ক্ষিত বিষয়। কিন্তু জনমানুষের এই আকাঙ্ক্ষা পূরণ শুধু পরিবর্তনকামী নেতাদের দেওয়া প্রতিশ্রুতির ওপরও নির্ভর করে না। রাজনীতিতে পরিবর্তনের পেছনে আরও বহু কিছু কাজ করে। আমি মনে করি, রাজনীতিতে প্রতিশ্রুতি হচ্ছে আবেগের একধরনের বহিঃপ্রকাশ। সমাজবিজ্ঞানী ম্যাক্স ওয়েবার অবশ্য মনে করতেন, প্রতিশ্রুতি হচ্ছে আবেগতাড়িত হয়ে দেওয়া ‘নিষ্ফল ঘোষণা’মাত্র।
তিউনিসিয়া, মিসর ও লিবিয়ার মানুষ কী ধরনের আবেগের বশবর্তী হয়ে নিজ নিজ দেশের প্রবল প্রতাপশালী সরকারকে উৎখাত করতে সক্ষম হলো? নাকি এসব আন্দোলন ওয়েবারের মতানুসারে ‘নিষ্ফল উত্তেজনা’ বৈ কিছু নয়? এখন অবশ্য এটা নিশ্চিত, এসব দেশের প্রতিবাদী মানুষের আন্দোলনকে আর নিষ্ফল বলা যায় না।
এটা সবারই জানা, আগুনের স্ফুলিঙ্গকে আগ্নিকাণ্ডে রূপ দিতে বাইরে থেকে আরও কিছু বিষয় অনুঘটকের কাজ করে। রাজনীতিতে ক্ষমতা বা শক্তিই হচ্ছে সেই অনুঘটক। এটি হতে পারে জনগণ, প্রযুক্তি কিংবা বিশ্ব গণতন্ত্রের একতা এমনকি সামরিক শক্তি পর্যন্ত। বাইরে থেকে ধাক্কা দিয়ে গতি সৃষ্টি করা না হলে যেমন প্রকৃতির শক্তি সুপ্তই থেকে যায়, তেমনি আবেগ থেকে ফল পেতেও ক্ষমতা অনুঘটকের কাজ করে।
পরিবর্তনের দাবিতে অহিংস উপায়ে দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকা একজন মানুষ হিসেবে আমি সহকর্মী ও সমর্থকদের মতামত ও প্রতিশ্রুতির মূল্য দিতে শিখেছি। এসব প্রতিশ্রুতি বেশির ভাগ সময়ই বাগাড়ম্বরে পূর্ণ হয়ে থাকে। তার পরও এগুলোই আমাদের এগিয়ে যাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় প্রাণশক্তির প্রকাশ ঘটায়। এই প্রাণশক্তির বিলোপ নেই। এর আরেক নাম আবেগ, যা কখনোই নিষ্ফলা না। আবেগই হূদয় ও মস্তিষ্ক চালনা করে, তৈরি করে ইতিহাস। প্রবল আবেগই একসময় শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। জনগণের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো বিষয়ে যখন এ আবেগের প্রশ্ন আসে তখন তা রাজনীতি ও সামাজ পরিবর্তনের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে ওঠে।
মিয়ানমারে স্বৈরশাসকের বিরুদ্ধে আন্দোলনকারী আমার দলের কর্মী ও অন্যান্য শক্তিকে বারবারই কারারুদ্ধ হতে হয়েছে। তাদের কণ্ঠ রুদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে। মানুষ এসব আত্মত্যাগী মানুষগুলোর চেহারা পর্যন্ত ভুলে গেছে। তার পরও বারবারই এসব সংগ্রামী মানুষ ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে ফিনিক্স পাখির মতো জেগে উঠেছে, বিশ্বকে তাদের চিৎকারে সচকিত করে তুলেছে। ২০০২ সালে দ্বিতীয় মেয়াদের গৃহবন্দী দশা থেকে মুক্তি পাওয়ার পর আমি দেশ সফরে বের হই। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ আমাদের সমর্থকেরা সে সময় বিশাল বিশাল শোভাযাত্রা নিয়ে আমার পাশে ছিলেন। এসব শোভাযাত্রা সামরিক জান্তার কাছে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় আমাদের আবেগ কতটা দৃঢ় তা স্পষ্ট করে তোলে।
রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারকারী শক্তি বা ক্ষমতাকে অন্য সব শক্তির কাছ থেকে ভিন্ন বা পৃথক বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত ভাবার অবকাশ নেই। দল, অর্থ, প্রচারমাধ্যম, চাপ সৃষ্টিকারী গ্রুপ ইত্যাদি নানা ধরনের শক্তি রাজনৈতিক বিপ্লব বা বিবর্তনে বড় ধরনের প্রভাব বিস্তার করে। তবে শক্তি বা ক্ষমতা যখন শোষণের হাতিয়ার হয়ে ওঠে তখন তা আর আবেগের সমার্থক থাকে না। স্বৈরতান্ত্রিক শক্তি আর গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় ব্যবহূত শক্তি এখানে একেবারেই ভিন্ন।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কখন শক্তি বা ক্ষমতা রাজনৈতিক পরিবর্তনে ক্রিয়াশীল হবে? উত্তর হচ্ছে, যদি সবকিছু ঠিকমতো চলে তবে স্থিতিশীলতা ধরে রাখার কাজে ক্ষমতা প্রয়োগ করবে কর্তৃপক্ষ। কিন্তু যখন সমস্যা দেখা দেয়, তাও আবার সব সময় না, বিশেষ পরিস্থিতিতে শাসকের কাছে পরিবর্তন বিবেচ্য হয়ে উঠতে পারে। বুদ্ধিমান শাসক দ্রুত বুঝতে পারেন কখন পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী। সময়ের চাহিদা অনুযায়ী তিনি পদক্ষেপ নেন। কিন্তু পরিবর্তন প্রয়োজন বুঝেও অনেক শাসকই এর পক্ষে অবস্থান নেন না।
বহুত্ববাদী সমাজব্যবস্থায় সরকারের একার পক্ষে রাজনীতিতে আমূল পরিবর্তন আনা সম্ভব না। এ ক্ষেত্রে প্রতিশ্রুতি, প্রচারণা, ধৈর্য, মানুষের মন ও মস্তিষ্ক জয়ের ক্ষমতা ব্যাপক ভূমিকা রাখে। অন্যভাবে বলতে গেলে, রাজনীতিতে পরিবর্তনের জন্য শক্তি যখন একা যথেষ্ট কার্যকর হয়ে উঠতে পারে না তখনই সেই ঘাটতি পূরণ করে আবেগ।
আবেগ ছাড়া ক্ষমতা স্বয়ংসম্পূর্ণ না। আবেগ ক্ষমতাকে কার্যকর করে তোলে। ক্ষমতাকে গতিময় করতে গিয়ে আবেগ অধিকাংশ সময় নিজেই একটি শক্তি হয়ে ওঠে। অন্যদিকে ক্ষমতার প্রবণতাই হলো কেবল নিজের অবস্থান আরও দৃঢ় করা। ক্ষমতা যখন রাজনৈতিক পরিবর্তনের পথে এগিয়ে যায়, তখন গণ-অভ্যুত্থান বা ভোটের মতো বহিঃশক্তির প্রভাব এড়াতে না পেরেই তা করে।
রাজনৈতিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে ক্ষমতার চেয়ে আবেগ অধিকতর কার্যকর ভূমিকা রাখে। যা-ই হোক, কার্যকর রাজনৈতিক পরিবর্তন দীর্ঘস্থায়ী হওয়া প্রয়োজন। আর এ কারণেই ক্ষমতা ও আবেগকে পরস্পর সহায়ক অংশীদারের মতো কাজ করতে হবে।
মিয়ানমারের মানুষ আজ পরিবর্তনের জন্য মুখিয়ে আছে। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত এই পরিবর্তন আসবে কি না তার নিশ্চয়তা যেমন নেই, তেমনি পরিবর্তন যদি হয়ও, তা কতটুকু আকাঙ্ক্ষা পূরণ করবে তাও অজানা। মিয়ানমারের জন্য এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ, দীর্ঘদিনের আন্দোলন থেকে সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত ফসল ঘরে তুলতে ক্ষমতা ও আবেগের সুন্দর সংমিশ্রণ ঘটানো। আমরা যখন নতুন পথে হাঁটি তখন ঝুঁকি নিয়েই পা বাড়াই। আজ আমরাও মিয়ানমারের জন্য নতুন ইতিহাস রচনায় ঝুঁকি নিচ্ছি।
আউটলুক থেকে সংক্ষেপিত অনুবাদ: ইসরাত জাহান
 অং সান সু চি: মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নেত্রী।

No comments

Powered by Blogger.