আলোচনা- 'উইকিলিকসে বাংলাদেশ, তারপর?' by মাসুদা ভাট্টি

বিশ্বব্যাপী তোলপাড় তোলা উইকিলিকসের নথিতে বাংলাদেশও এসেছে। খুবই স্বাভাবিক। কারণ বাংলাদেশ আয়তনে ছোট হলেও এ দেশটির গুরুত্ব নানা দিক দিয়ে অপরিসীম। বিশেষ করে পশ্চিমে বাংলাদেশ ও দেশটির রাজনৈতিক চরিত্র নিয়ে নানা ধরনের তত্ত্ব প্রচলিত রয়েছে। নিঃসন্দেহে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের রাজনৈতিক চরিত্র ও গুরুত্ব নিয়ে বরাবরই চিন্তিত। যে কারণে বাংলাদেশের জন্ম থেকে এ পর্যন্ত ঘটে যাওয়া বড় বড় রাজনৈতিক ঘটনায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে।
উইকিলিকসের সাম্প্রতিক আবিষ্কারে যেসব কথা বাংলাদেশকে নিয়ে বলা হয়েছে, তাতে নতুন কিছুই নেই, বরং বাংলাদেশের লেখক-সাংবাদিক, বিশ্লেষকরা বহু আগে থেকেই এসব কথা বলে আসছেন। কিন্তু যেহেতু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গোপন নথিতে আবারও সেসব কথাই এসেছে, তাই মনে হয়, বর্তমান সরকারের উচিত এসব বিষয়ে আরো সতর্ক নজর দেওয়া এবং এসবের সমাধানে তৎপর হওয়া। কালের কণ্ঠের পাঠকের কাছে উইকিলিকসে বাংলাদেশ সম্পর্কিত বিষয়াদি সম্পর্কে নতুন করে বলার কিছু নেই। বরং বাংলাদেশকে নিয়ে আন্তর্জাতিক রাজনীতির খেলাধুলা এবং সামনের দিনগুলোতে কী করা যেতে পারে, সে বিষয়ে কিছু কথা বলা যেতে পারে।
বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার দরিদ্র রাষ্ট্র হলেও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের প্রেস্টিজ-ইস্যু হয়েছিল ১৯৭১ সালে। তারপর থেকে এ দুই রাষ্ট্রই বাংলাদেশের ওপর নজর রেখেছে সক্রিয়ভাবেই। একই সঙ্গে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং ভারতও বাংলাদেশের ভেতর ও বাইরে বরাবরই উপস্থিত ছিল। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন এবং একক সুপারপাওয়ার হিসেবে মার্কিন কর্তৃত্ব বিংশ শতকের শেষ ভাগটা এবং এখনো পর্যন্ত বাংলাদেশে মার্কিন শক্তি বলয়ের কবজায় রেখেছে। এর মাঝে চীনের ভূমিকা ছিল বরাবরই রহস্যময়। বিশেষ করে আমাদের এ কথা ভুললে চলবে না যে চীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হওয়ার পর। তারপর অগণতান্ত্রিক শাসকদের সঙ্গে চীন ও পাকিস্তানের দহরম-মহরম তো এখন আর গোপন কোনো বিষয় নয়। আর এ সময়টাজুড়ে বাংলাদেশ সব সময়ই থেকেছে মার্কিন নজর ও খবরদারিতে।
এরপর বৈশ্বিক বাস্তবতা ক্রমেই পূর্বমুখী হতে শুরু করলে ভারত ও চীনের মনস্তাত্তি্বক ও অর্থনৈতিক লড়াইয়ে বাংলাদেশ এতটাই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে যে বাংলাদেশ কার 'কমার্শিয়াল কলোনি' হবে, তা নিয়ে দ্বন্দ্ব দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে শুরু করে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় একাত্তরে পরাজিত পাকিস্তানের কারসাজি। পাকিস্তান মূলত দুটি কারণে বাংলাদেশকে তার মুঠোবন্দি করতে চায়_এক. একাত্তরে যে শোচনীয় পরাজয় এবং যে নীতি ও নৈতিকতার ভিত্তিতে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তা যেন বাস্তবায়িত না হয়। যেমন_বাঙালি জাতীয়তাবাদ, অসাম্প্রদায়িকতা, ধর্মকে রাষ্ট্রনীতি থেকে দূরে রাখা ইত্যাদি এবং দুই. ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানি তৎপরতার দ্বিতীয় ফ্রন্ট হিসেবে বাংলাদেশের ভূখণ্ডকে ব্যবহার করা। প্রথম ক্ষেত্রে পাকিস্তান মোটামুটি সফল হলেও বাংলাদেশের ভেতরে এখনো একটি ক্ষীয়মাণ ধারা প্রবহমান, যারা বাঙালি জাতীয়তাবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতা ইত্যাদিকে বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠা করার পক্ষে কাজ করে যাচ্ছে এবং তারা বরাবরই পাকিস্তানের এ অপতৎপরতার বিরুদ্ধে সোচ্চার।
অপরদিকে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে ভারতের বিরুদ্ধে দ্বিতীয় ফ্রন্ট খোলার ব্যাপারে পাকিস্তানের সফলতার দিন শুরু হয়েছিল পঁচাত্তরের পর পরই এবং তা আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় শাসনামলে একটু হোঁচট খেলেও জোট আমলে তা রীতিমতো প্রকট হয়ে উঠেছিল এবং বর্তমানে আবার তা একটু ম্রিয়মাণ। তাই বলে এ তৎপরতা একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে_সে কথা মনে করার কোনোই কারণ নেই এবং সম্প্রতি প্রকাশিত উইকিলিকসের দলিল-দস্তাবেজই তার অকাট্য প্রমাণ।
সর্বশেষ বাংলাদেশ নিয়ে খেলাধুলার তালিকায় সৌদি আরব ও মধ্যপ্রাচ্যকে যুক্ত করতেই হচ্ছে, এ-ও উইকিলিকসের নথিতে প্রমাণিত। সৌদি আরবও বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর এবং বাংলাদেশে ধর্মভিত্তিক রাজনীতিকে প্রতিষ্ঠা পাইয়ে দিতে সৌদি পেট্রোডলারের ভূমিকাও অবিসংবাদিত। মোট কথা, সৌদি অর্থ আর পাকিস্তানের গোয়েন্দা তৎপরতায় বাংলাদেশে একটি বিশাল ধর্মবাদী শক্তি উঠে দাঁড়িয়েছে, যাদের নিয়ে চিন্তার যথেষ্ট কারণ রয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন। বিশেষ করে উইকিলিকসে উলি্লখিত লস্কর-ই-তৈয়বাসহ যেসব উগ্র ধর্মবাদী গোষ্ঠী পাকিস্তানকে পুরোপুরি অস্থিতিশীল করে গোটা উপমহাদেশকে কাঁপিয়ে দিয়েছে তাদের জন্য বাংলাদেশের ভূমি ব্যবহারের সুযোগ করে দেওয়ার যে ক্ষেত্র বিগত দিনে প্রস্তুত হয়েছিল, তা পুরোপুরি নষ্ট করা সম্ভব হয়েছে_এ কথা বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই। কারণ রাতারাতি এই বিষবৃক্ষ উপড়ে ফেলার কোনো জাদু-ক্ষমতা বর্তমান সরকারের আছে বলেও বিশ্বাস হয় না।
আমরা এ-ও জানি, বর্তমান সরকার যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের যে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে এবং বেশ কয়েকজন চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীকে গ্রেপ্তারের পর আরো কয়েকজনকে গ্রেপ্তারের কথা বলা হচ্ছে। অভিযোগ খুব পুষ্ট যে এ গোষ্ঠীটির সঙ্গে পাকিস্তান ও সৌদি আরবের সখ্য প্রবল। অন্যদিকে ভারতবিরোধী তৎপরতার বাংলাদেশ চ্যাপ্টারে যারা সক্রিয় ছিল তাদের অনেককেই গ্রেপ্তার করা হলেও তারাও হাত গুটিয়ে বসে আছে, তা-ও মেনে নেওয়া যায় না। তাহলে ব্যাপারটি কী দাঁড়াচ্ছে? উইকিলিকসের বাংলাদেশ বিষয়ক নথিপত্র আসলে এ কথাই বলতে চেয়েছে যে বাংলাদেশ একটি রাজনৈতিক স্পর্শকাতর রাষ্ট্র, যেখানে উগ্র ধর্মবাদী দেশি ও আন্তর্জাতিক চক্র কার্যশীল রয়েছে; যে দেশের ভূখণ্ডকে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের ভেতর অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারীদের ব্যবহারের সুযোগ দেওয়া হয়েছে এবং দেশের ভেতরকার প্রগতিশীল শক্তিকে নির্মূল করার জন্য একটি দেশজ ও আন্তর্জাতিক চক্রান্তও ক্রিয়াশীল (ঠিক এ রকমভাবে কথাগুলো বলা না থাকলেও তথ্য বিশ্লেষণে এ রকম সিদ্ধান্তেই আসা যায়)।
আগেই বলেছি, বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক শক্তিবলয়ের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। আসছে দিনগুলোতে এ গুরুত্ব বাড়বে বৈ কমবে না। বর্তমান সরকার এমন একটি সময়ে ক্ষমতায় আসীন যখন আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন ও গুরুত্বপূর্ণ কিছু পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। এখানে একটি শক্তিবলয়ের কথা ইচ্ছা করেই অনুল্লেখ রাখা হয়েছে, তা হলো ইউরোপীয় ইউনিয়ন। কারণ আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এ শক্তিবলয় এখনো মন্দের ভালো হিসেবে চিহ্নিত। কিন্তু তাদেরও সাহায্য-রাজনীতি (ডোনার পলিটিকস) বাংলাদেশে কম সক্রিয় নয়। কিন্তু সব কিছু মিলিয়ে বাংলাদেশের বর্তমান ও সামনের দিনগুলো খুব যে মসৃণ নয়, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। শুরুতেই উল্লেখ করেছি, উইকিলিকসের নথিতে থাকা তথ্যাবলি নিয়ে যথেষ্ট উদ্বেগ গোটা বিশ্বেই ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলাদেশকে এ বিষয়ে একটু বেশিই তৎপর হতে হবে এ কারণে যে বাংলাদেশে যে গণতান্ত্রিক ধারা শুরু হয়েছে, তা কোনোভাবেই ব্যাহত হতে দেওয়া যাবে না। তাহলে এ রাষ্ট্রের মৌলিক চরিত্র বদলে যেতে বাধ্য এবং তা ভবিষ্যতের জন্য মঙ্গলকর নয় মোটেই। আমরা এ কথা বিস্মৃত হলে ভুল করব যে এ দেশে একটি অরাজনৈতিক এবং একটি অগণতান্ত্রিক শক্তি সর্বদাই তৎপর।
তারা যদি এ আন্তর্জাতিক শক্তিবলয়ের কোনো একটির সঙ্গে বাংলাদেশ মিশনে নামে এবং এখানকার পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করে তুলতে চায়, তাহলে তা ঠেকানোর সাধ্য কারো আছে কি? এই মৌলিক প্রশ্ন সামনে রেখেই বর্তমান সরকারের স্ট্র্যাটেজি ঠিক করা উচিত। বিরোধী দলেরও উচিত এসব বিষয় গুরুত্বে এনে রাজনৈতিক কর্মসূচি দেওয়া। কারণ আগামী সময়ে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে ঘিরেই হয়তো আলোচ্য অপশক্তিগুলো নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ খুঁজবে। সরকার কিংবা বিরোধী দল কেউই যাতে এদের ঘুঁটি না হয়, জনগণ সেটাই কামনা করে।
========================
আলোচনা- 'ওয়াংগালাঃ গারোদের জাতীয় উৎসব'  স্মরণ- 'বাঘা যতীনঃ অগ্নিযুগের মহানায়ক'  খবর, কালের কণ্ঠের- আগেই ধ্বংস মহাস্থানগঃ হাইকোর্টের নির্দেশে কাজ বন্ধ  কেয়ার্নের সঙ্গে স্বার্থবিরোধী চুক্তির পেছনেও জ্বালানি উপদেষ্টা  উইকিলিকস জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের আত্মসমর্পণ  সবুজ মাঠ পেরিয়ে  আলোচনা- 'আরো অনুদানের টাকা সরিয়েছিলেন ইউনূস'  আলোচনা- 'একটি 'উজ্জ্বল ভাবমূর্তির' এভারেস্ট থেকে পতন  গল্পালোচনা- 'আসি আসি করে আশিতে আসবে!'  রাষ্ট্র ও রাজনীতিঃ সবুজ মাঠ পেরিয়ে  স্মরণ- 'রবীন্দ্রনাথ—সার্ধশত জন্মবার্ষিকীতে'  স্মরণ- 'জননেতা দেওয়ান ফরিদ গাজী'  আলোচনা- 'প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফর ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের নতুন পর্যায়'  আলোচনা- 'কর্মপরিবেশঃ স্বর্গে তৈরি'  গল্পালোচনা- ‘দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া...’  আন্তর্জাতিক- উইকিলিকসঃ হাটে হাঁড়ি ভাঙা জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ  গল্পসল্প- ওরা ধান কুড়ানির দল  শিক্ষা- আদিবাসী পাহাড়ে বিশ্ববিদ্যালয় চাই  জঙ্গি ও সন্ত্রাসীদের অর্থের মূল উৎস সৌদি আরব  রাজনৈতিক আলোচনা- এমন বন্ধু থাকলে...  শিল্প-অর্থনীতি শেয়ারবাজারের সুন্দরী প্রতিযোগিতা-তত্ত্ব  সাক্ষাৎকার- খাদ্যনিরাপত্তার জন্য বিকল্প উপায় খুঁজতা হবে  খবর, প্রথম আলোর-  দলীয় স্বার্থ বড় করে দেখবেন না  মার্কিন কূটনীতিকদের গোপন তারবার্তাঃ পাকিস্তানে জঙ্গি নির্মূলে ১০-১৫ বছর লাগবে  অধ্যাপক ইউনূসের অর্থ স্থানান্তর : গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যাখ্যা  শিল্প-অর্থনীতি 'সময় এসেছে মাথা তুলে দাঁড়াবার'  প্রকৃতি- 'কিয়োটো প্রটোকল ভেস্তে যাচ্ছে, কানকুনে কী হবে?  আলোচনা- 'মেয়েদের লাঞ্ছনা বন্ধ করতে কঠোর হতে হবে'  যুক্তি তর্ক গল্পালোচনা- 'আগ্নেয়গিরির ওপরে পিকনিক'  আলোচনা- 'হিমালয়ের কোলে এক টুকরো দক্ষিণ এশিয়া'  স্মরণ- 'মানুষের জন্য যিনি জেগে থাকতেন'  রাজনৈতিক আলোচনা- 'আবার আসিব ফিরে!'  আলোচনা- 'রাজকীয় সম্মেলন'  যুক্তি তর্ক গল্পালোচনা- 'অসারের তর্জন-গর্জন'


দৈনিক কালের কণ্ঠ এর সৌজন্যর
লেখকঃ মাসুদা ভাট্টি
সম্পাদক, পাক্ষিক একপক্ষ


এই অলোচনা'টি পড়া হয়েছে...
free counters

No comments

Powered by Blogger.