সাধারণ নির্বাচন: বিজয়ী পাকিস্তান -গতকাল সমকাল by ফারুক চৌধুরী

নওয়াজ শরিফ: তৃতীয়বার ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন
শিরোনামটিতে মৌলিকতার অভাব রয়েছে। আসলে এটি একটি নির্বাচনী স্লোগান থেকে ধার করা। স্লোগানটি হলো—‘জিতেগা ভাই জিতেগা—পাকিস্তান জিতেগা’—
জোর সে বলো ‘জিতেগা’
উমিদ (আশা) সে বলো, ‘জিতেগা’
ইয়াকিন (বিশ্বাস) সে বলো, ‘জিতেগা’
আইস্তা (ধীরে) বলো, ‘জিতেগা’
পেয়ার (ভালোবাসায়) সে বলো ‘জিতেগা’
জিতেগা ভাই ‘জিতেগা’
পাকিস্তান ‘জিতেগা’।

হ্যাঁ, নির্বাচনে অনিয়ম হয়তো ঘটেছে, কারচুপি (সূক্ষ্ম কিংবা স্থূল) না হলেও তার প্রচেষ্টা হয়েছে, নির্বাচনপূর্ব সহিংসতা ঘটেছে, তার সবকিছুকে ছাড়িয়ে সত্য কথাটি হলো যে দেশটির সাড়ে ছয় দশকেরও দীর্ঘতর সময়ের ইতিহাসে এই প্রথমবারের মতো একটি নির্বাচিত সরকার অন্য একটি নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে।
প্রদেশগুলোতেও ক্ষমতা হস্তান্তরিত হবে অনুরূপভাবে। এই নির্বাচনে পাকিস্তানের গণতন্ত্র, হোক না তা কোথাও কোথাও ত্রুটিপূর্ণ, অবশ্যই বিজয়ী হয়েছে। অত্যুক্তি মনে হলেও আমি বিশ্বাস করি, ১১ মে, ২০১৩ সালের এই নির্বাচন একটি নতুন পাকিস্তানের জন্ম দিল।
মনে পড়ে, ২০০২ সালের অক্টোবরে বাংলাদেশ থেকে একটি নির্বাচন পর্যবেক্ষণ দলের নেতৃত্বে আমি পাকিস্তান গিয়েছিলাম। নির্বাচনের নামে এটা ছিল বাকপটু প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফের প্রহসন। ৭ অক্টোবর ২০০২ সালে ইসলামাবাদের প্রেসিডেন্ট ভবনে আমি প্রেসিডেন্ট মোশাররফের কাছে দুটি প্রশ্ন রেখেছিলাম। প্রথমটি ছিল, পার্লামেন্ট ভেঙে দেওয়া আর প্রধানমন্ত্রীকে বরখাস্ত করার ক্ষমতা কি অবাধ গণতান্ত্রিক পদ্ধতির পরিপন্থী নয়? তাঁর উত্তর ছিল অগ্রহণযোগ্য। তিনি বলেছিলেন যে অতীতে প্রধানমন্ত্রী তাঁর এই ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন, যেমন নওয়াজ শরিফ দেশের প্রেসিডেন্ট, প্রধান বিচারপতি এবং সেনাধ্যক্ষ—তিনজনকেই বরখাস্ত করেছিলেন। ক্ষমতায় ভারসাম্য আনতেই ছিল তাঁর সেই ব্যবস্থা।
তাঁকে প্রশ্ন করেছিলাম, রাজনীতিবিদ, সামরিক এবং বেসামরিক ব্যক্তিদের নিয়ে তাঁর ধারণামতো একটি ‘জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ’ গঠন করার কি প্রয়োজন রয়েছে? আমার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে তিনি বলেছিলেন, এমনও তো দেশ রয়েছে, যেখানে প্রধানমন্ত্রী আর বিরোধী দলের প্রধানের মধ্যে সাক্ষাৎই হয় না। জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদে প্রয়োজনমতো তাঁদের দেখা-সাক্ষাতের সম্ভাবনা রইবে। তাঁর কথায় কাঁটা ছিল এবং তা বিঁধেও ছিল। তাই ছিলাম নিরুত্তর। যাই হোক, পারভেজ মোশাররফ তাঁর শত নাটকীয়তা নিয়েও সে দেশের ইতিহাসের আস্তাকুঁড়েই নিক্ষিপ্ত হতে যাচ্ছেন আর লাহোরের মিয়া নওয়াজ শরিফ হতে যাচ্ছেন পাকিস্তানের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী। এবং তাও রেকর্ড-ভাঙা তৃতীয়বারের মতো। অন্যদিকে বর্তমান প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারিকেও এই সেপ্টেম্বরে তাঁর মেয়াদ পূর্ণ হলে দুই বা ‘টেন পার্সেন্ট’ যাই হোক না কেন, তা নিয়েই বিদায় নিতে হবে।
এই নির্বাচন পাকিস্তানের রাজনৈতিক মানচিত্রকে বদলে দিল। পাকিস্তানের জাতীয় অ্যাসেমব্লিতে ২৭২ আসনে প্রত্যক্ষ নির্বাচন হয়। তদুপরি নারীদের জন্য ৬০টি আসন আর সংখ্যালঘুদের জন্য রয়েছিল ১০টি আসন। প্রত্যক্ষ নির্বাচনাধীন ২৭২ জাতীয় অ্যাসেমব্লি আসনের মধ্যে রয়েছে পাঞ্জাবে ১৪৮, রাজধানী ইসলামাবাদে ২, সিন্ধু প্রদেশে ৬১, খাইবার পাখতুনখাওয়াতে ৩৫, বেলুচিস্তানে ১৪ এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে (FATA) ১২টি আসন। এই নিবন্ধটি লেখার সময় পর্যন্ত পিএমএল (নওয়াজ শরিফ) জাতীয় অ্যাসেমব্লিতে ১২৬টি, ইমরান খানের তেহরিক-ই-ইনসাফ ৩৪টি, পিপিপি ৩২টি, জামায়াত-ই-ইসলামি ১২টি এবং ২৫টি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন। তা ছাড়া প্রাদেশিক অ্যাসেমব্লির নির্বাচনও একই সঙ্গে অনুষ্ঠিত হয়েছে।
এর অর্থ হচ্ছে, পাঞ্জাবে রয়েছে নওয়াজ শরিফের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা এবং তা ছাড়া অন্যান্য প্রদেশে তাঁর প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। ইমরান খানের তেহরিক-ই-ইনসাফের রাজনৈতিক ‘সুনামি’ খাইবার পাখতুনখাওয়াতেই সীমাবদ্ধ রয়ে গেছে। খাইবার পাখতুনখাওয়া আর কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ইমরান খান প্রাধান্য বিস্তার করতে সক্ষম হয়েছেন। পিপিপি সিন্ধু প্রদেশে সসম্মানে পশ্চাদ্পসরণ করেছে।
অতএব কেন্দ্রে সরকার গঠনের জন্য নওয়াজ শরিফের অন্য কোনো দলের সাহায্যের খুব বেশি প্রয়োজন নেই। তিনি কিছু নিরপেক্ষ সদস্যের সহায়তায় অনায়াসেই কেন্দ্রে সরকার গঠন করতে সক্ষম হবেন। তা ছাড়া পাঞ্জাবে তাঁর দলই প্রাদেশিক মন্ত্রিসভা গঠন করবে। তবে সিন্ধু, পাখতুনখাওয়া আর বেলুচিস্তান প্রদেশে প্রাদেশিক সরকার গঠন করবে যথাক্রমে পিপিপি, এমকিউএম, তেহরিক-ই-ইনসাফ ও বেলুচিস্তানের কিছু ছোট দল। অতএব কেন্দ্রের সঙ্গে এই তিনটি প্রদেশের সম্পর্কের ওপর নওয়াজ শরিফের বিশেষ নজর রাখতে হবে। আরও একটি স্পর্শকাতর বিষয় হলো, সামরিক বাহিনীর সঙ্গে নওয়াজ শরিফের সম্পর্ক। প্রথাগতভাবে পিএমএলের (নওয়াজ শরিফ) সঙ্গে সামরিক বাহিনীর পারস্পরিক সমঝোতা ও শ্রদ্ধাবোধ রয়েছে। নির্বাচনের প্রচারণার সময় যখন ইমরান খানের ক্রিকেট বিজয়ের কথা বলা হতো, তখন নওয়াজ শরিফ দাবি করতেন যে ক্রিকেট তিনিও খেলতেন, তবে পাকিস্তানকে একটি আণবিক শক্তিতে তিনিই পরিণত করেছিলেন। কথাটিতে সত্যতা রয়েছে। নির্বাচনী প্রচারণাকালে নওয়াজ শরিফকে বাঘের সঙ্গে তুলনা করে তাঁর সমর্থকেরা আওয়াজ তুলত, ‘শের আয়া, শের আয়া’। তার উত্তরে ইমরান খানের সমর্থকদের প্রতিধ্বনি ছিল, ‘আয়া শের শিকারি’। কিন্তু এই বাঘশিকারি ইমরান কিন্তু লাহোরে ব্যাঘ্র বধ করতে পারেননি। তিনি বেশ ভালো ব্যবধানেই নওয়াজ শরিফের পিএমএলের একজন প্রার্থীর কাছে পরাজিত হয়েছেন, যদিও পাখতুনখাওয়া প্রদেশ থেকে বিপুল সংখ্যাধিক্যে তিনি জাতীয় অ্যাসেমব্লিতে নির্বাচিত হয়েছেন।
নওয়াজ শরিফের সামনে রয়েছে সমস্যার পাহাড়। বিপুল জ্বালানির সংকট, মুদ্রাস্ফীতি, দুর্নীতি, তালেবান সন্ত্রাস ইত্যাদি তাঁর সমস্যার ঝুলিতে রয়েছে। তবে গত পাঁচটি বছর পাঞ্জাবে তিনি তাঁর কনিষ্ঠ ভ্রাতা শাহবাজ শরিফের সহায়তায় সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সক্ষম বলে নিজেকে তুলে ধরতে পেরেছেন। পাঞ্জাবকে তাঁর সুশাসনের ল্যাবরেটরি বলে আখ্যায়িত করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক বহুমাত্রিক এবং স্পর্শকাতর। তবে বিগত বছরগুলোতে এই দুই বিষয়েই নওয়াজ শরিফ ভাবনাচিন্তার যথেষ্ট সময় পেয়েছেন এবং পরিপক্বতার সঙ্গেই সেই ক্ষেত্রে উদ্ভূত সমস্যাবলি মোকাবিলা করতে পারবেন বলে আশা করা যায়।
জামায়াত-ই-ইসলামি তাদের ডজন খানেক আসন নিয়ে নওয়াজ শরিফকে পিছু টানতে পারবে বলে মনে হয় না। গত দুবার প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন তাঁর ভুলভ্রান্তির জন্য রাজনৈতিক খেসারত তিনি দিয়েছেন। তবে এই যাত্রায় যদি ইমরান খান বিরোধী দলনেতা হিসেবে একটি শক্তিশালী ভূমিকায় অবতীর্ণ হন, তাহলে পাকিস্তান পার্লামেন্টে বিতর্কের মাধ্যমে অনেক সমস্যাই জনগণের সামনে উঠে আসবে। দায়িত্বশীল বিরোধী দলনেতা হিসেবে অথবা বিরোধী দলে থেকে ইমরান খান তাঁর দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় একটি ইতিবাচক ভূমিকা পালন করতে পারবেন। তালেবানি সন্ত্রাস সত্ত্বেও ৬০ শতাংশ ভোটার এই নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন।
চার বছর আগে ২০০৯ সালের মে মাসে আমি যখন পাকিস্তানে গিয়েছিলাম, তখন আমার বন্ধু, সাবেক পররাষ্ট্রসচিব ও কলামিস্ট নাজিমুদ্দিন শেখ আশা প্রকাশ করেছিল যে তাঁদের ভ্রান্তি থেকে যেন আমরা শিক্ষা লাভ করি। দেশ হিসেবে আমরা সত্তর-উত্তর পাকিস্তান থেকে কোনো শিক্ষা যে লাভ করেছি সেই দাবি আমি আমার বন্ধুর কাছে করতে অক্ষম। কারণ, এ নিবন্ধটির সমাপ্তি টেনে আমার মূল সমস্যা হবে জামায়াতে ইসলামীর ডাকা হরতালের এই দিনে আমার নিবন্ধটিকে নিরাপদে প্রথম আলো অফিসে পৌঁছে দেওয়া। তবে এটি একটি গৌণ সমস্যা। আমি আশা করব যে আগামী দিনগুলোতে আমাদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে আমরা পাকিস্তান থেকে শিক্ষা নিই। কেবল প্রতিটি দলের অংশগ্রহণেই বাংলাদেশে একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে। নিয়তির পরিহাস যে পাকিস্তান তাদের এবারের গ্রহণযোগ্য নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত করল আমাদের দেশ থেকে লব্ধ ‘কেয়ারটেকার’ পদ্ধতিকে অনুসরণ করে। অতএব পাকিস্তান থেকে নাই বা শিখলাম। আমরা নিজের অভিজ্ঞতার ঝুলিটি নেড়ে কেন প্রত্যাশিত রাজনৈতিক আচরণ করতে পারি না? এ দেশের মানুষ যে তা চায়।
ফারুক চৌধুরী: সাবেক পররাষ্ট্রসচিব। কলাম লেখক।
zaaf@bdmail.net

No comments

Powered by Blogger.