কু-ঝিক-ঝিক রেলগাড়ি বাতাসে উড়ে বন্ধুর শাড়ি... by মোকাম্মেল হোসেন

গোমরা মুখ মন্ত্রীর পছন্দ নয়। তিনি হচ্ছেন ফুর্তিবাজ ধরনের মানুষ। সব সময় হাসি-খুশি থাকতে পছন্দ করেন। সারা দেশের মানুষ যখন তাকে উপলক্ষ করে আনন্দ-উল্লাসের ঝরনায় সিক্ত হচ্ছে, তখন তার মন্ত্রণালয়ের সচিব মুখ গোমরা করে আছে- ভাবা যায়? গম্ভীর কণ্ঠে তিনি বললেন-
: কোনো সমস্যা?
সচিব হাত কচলাতে লাগলেন। এটাও মন্ত্রীর অপছন্দের কাজগুলোর একটি। কাউকে হাত কচলাতে, শরীর মুচড়াতে দেখলে তার মনে হয়, এর মধ্যে দুই নম্বরি আছে। সচিব পদমর্যাদার একজন মানুষ হাত কচলাবে কেন? চলনে-বলনে তার মধ্যে থাকবে সিংহের দৃঢ়তা। ইঁদুরের মতো কুঁইকুঁই করার মানেই হল- নৈতিক মনোবলের ঘাটতি রয়েছে। মানুষ যখন চুরি-ছেঁচড়ামি, অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে, তখন তার নৈতিক মনোবল কমে যায়। চোর কখনোই সিংহের মতো মাথা উঁচু করে চলতে পারে না। মন্ত্রী চোখে প্রশ্নবোধক দৃষ্টি নিয়ে বললেন-
: বলুন!
- বলা ঠিক হবে কিনা, বুঝতে পারছি না।
: তাহলে বলার দরকার নেই।
- স্যার ...
: আবার কী?
- না বললেও শান্তি পাচ্ছি না।
মন্ত্রীর সারল্যমাখা হাসির সুখ্যাতি রয়েছে। তিনি সচিবকে সেই হাসি উপহার দিয়ে বললেন-
: আমি জীবনে কারও অশান্তির কারণ হইনি। আপনারও হব না। বলুন। প্লিজ।
- বৃদ্ধ বয়সে আপনার মধ্যে উঠতি যুবকের ভাবভঙ্গি লক্ষ্য করে অনেকেই হাসাহাসি করছে।
: হাসাহাসি তো খারাপ জিনিস না। মন ভালো করে দেয়।
- এটা স্যার পিওর হাসাহাসি না, ঠেসমারা হাসাহাসি।
মন্ত্রী নাক দিয়ে লম্বা দম টানলেন। তারপর মুখ দিয়ে সেটা ত্যাগ করে বললেন-
: বাঙালির সমস্যা কি জানেন? তারা নিজের পাছায় ছিদ্র রেখে অন্যের শরীরের ছিদ্র অন্বেষণ করে। খোঁজ নিয়ে দেখেন- যারা এমন করছে, তাদের অনেকেই জলের মধ্যে নাক ডুবিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে পানি পান করে। আমি তো লুকিয়ে কিছু করছি না; যা করার প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে করছি।
- একটা সমালোচনাও আমার কানে এসেছে।
: কী?
- কিছু লোক বলাবলি করছে ...
: কী বলাবলি করছে?
: মহররম মাসে আপনার বিবাহ করাটা ঠিক হল কিনা!
মন্ত্রী এবার উচ্চস্বরে হেসে উঠলেন। হাতের ইশারায় সচিবকে বসতে বলে বললেন-
: ইসলামের নামে যারা পটকা ফোটায়, তাদের মুখেই এসব কথা উচ্চারিত হয়। এরা ইসলামের মূল বিষয়গুলো জানে না, জানার চেষ্টাও করে না। চেষ্টা করলে দেখত- মহররম মাসের ১০ তারিখে কারবালার প্রান্তরে ইমাম হোসেন নিজে কাসেম ও সখিনার বিবাহ দিয়েছিলেন। দুঃখের বিষয় হল, এই নবদম্পতির বাসর নসিব হয়নি। আল্লাহপাকের মেহেরবানিতে আমি নির্বিঘ্নভাবে বাসর সম্পন্ন করতে সক্ষম হয়েছি। তফাৎ এটুকুই।
সচিব বিদায় নেয়ার পর কয়েকজন দলীয় কর্মী মন্ত্রীকে শুভেচ্ছা জানাতে এলো। তারা বিশাল একটা ফুলের তোড়া নিয়ে এসেছে। মন্ত্রীর হাতে ফুলের তোড়া দিয়ে নেতাগোছের একজন বলল-
: ভাই, আপনার দাম্পত্য জীবন সুখের সাম্পান হয়ে নবজোয়ারের পানিতে ভাসতে ভাসতে প্রেমের ঘাটে নোঙর করুক।
মন্ত্রী লাজুক ভঙ্গিতে হেসে বললেন-
: আল্লাহ মেহেরবান। বুড়াকালে নওশা হইছি। প্রেমই আমার সম্বল। তোমরা দোয়া কর, আমার এ প্রেম যেন জন্ডিসে আক্রান্ত না হয়।
দলীয় কর্মীরা সমস্বরে বলে উঠল-
: অবশ্যই, অবশ্যই। আপনি আমাদের গর্ব। আপনি আমাদের অহংকার। বাপের ব্যাটা মোখলেস হইয়া আপনি দেখাইয়া দিছেন- হৃদয়ে প্রেম থাকলে বয়স কোনো ব্যাপার না।
এ সময় আবেগতাড়িত গলায় একজন বলে উঠল-
: বড়ভাই, আমরা দোয়া করি- অনাবিল আনন্দের বৃষ্টি আপনাকে সারাক্ষণ ভিজাইয়া রাখুক।
কর্মীর কথা শুনে মন্ত্রী চোখ টিপলেন। বললেন-
: আরে পাগলা, তুই তো আমার হাতে মরার টিকিট ধরাইয়া দিতেছস! আমি হাঁস না। মানুষ। তারমধ্যে আবার মাজুক। সারাক্ষণ বৃষ্টিতে ভিজলে ঠাণ্ডায় জ্বর-জারি, সর্দি-কাশি, এমন কী নিউমোনিয়াও হইতে পারে। তখন তো আনন্দ-ফুর্তির বারোটা বাইজ্যা যাবে রে! টিভি চ্যানেলের মতো আমার টুয়েন্টি ফোর আওয়ার্স সম্প্র্রচার দরকার নাই। পূর্ণ উদ্যমে মাঝেমধ্যে অন-এয়ারে আসতে পারলেই চলবে।
দলের প্রতি একনিষ্ঠ এক কর্মী এ সময় বলল-
: বস, আমি মনে করি- এইটা আমাদের সরকারের সাফল্য।
কর্মীর কথা শুনে মন্ত্রী চোখ ছোট করে ফেললেন। বললেন-
: ধান ভাইন্যা চাল বাইর করলাম আমি। এর মধ্যে আবার সরকার ঢুকল কেমনে?
- আমাদের সরকার পূর্বের ধারাবাহিকতা বজায় রাইখ্যা আবারও প্রমাণ করছে, ৬৭ বছরের বৃদ্ধকেও আমরা তরুণ বানাইতে সক্ষম। এইটা সরকারের একটা বিরাট সাফল্য।
: সব সাফল্য নিজেদের ঝোলায় ভরতে চাইস না ব্যাটা। পরে দেখা যাবে- দেশের মাটিতে সাফল্য রাখার আর কোনো জায়গা নাই। তখন সাফল্য রাখার জন্য টাকা খরচ কইরা বিদেশের মাটিতে জমি ভাড়া নেওন লাগব।
কথাবার্তার এ পর্যায়ে এক ভদ্রলোক সেখানে এলেন। ভদ্রলোককে দেখে মন্ত্রী কিছুটা অপ্রস্তুত হলেন। তিনি দলীয় কর্মীদের বিদায় জানিয়ে ভদ্রলোকের পিঠে হাত রেখে মৃদুগলায় জানতে চাইলেন-
: কেমন আছস?
- ভালাই আছি।
: ছোটবেলা থেইক্যা একসঙ্গে বড় হইছি। কত সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা একসঙ্গে ভাগাভাগি কইরা নিছি। অথচ আমার জীবনের নিবিড় আনন্দঘন মুহূর্তে একজনও আইলি না। তরা আমারে এইভাবে ত্যাগ করতে পারলি?
- আমরা ত্যাগ করলাম কেমনে? তুই নিজেই সাইড মারছস।
: তর ভাবির সঙ্গে দেখা করবি না?
- নাহ।
: ডরাস ক্যা? দেখা করলেই কি তর হাতে মেন্দি লাগাইয়া দিব?
-সবাই মেন্দি কিংবা আতরে গইল্যা যাওয়ার পাত্র না।
: তর হাতে এইটা কী?
- ধিক্কারপত্র।
: ধিক্কারপত্র?
- হ। তুই চিরকুমার সভার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করছস। বিশ্বাসঘাতকতার ফলস্বরূপ এই ধিক্কারপত্র উপহার দেওয়া হইছে।
: এতে কী লেখা হইছে?
- পড়লেই বুঝবি।
মন্ত্রী বিষণ্ন হলেন। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন-
: এইটা সত্য- যে শপথ কইরা আমি চিরকুমার সভার সদস্য হইছিলাম, তা ভঙ্গ হইছে। কিন্তু আমার নতুন জীবনের সন্ধান লাভের বিষয়টাও তো মিথ্যা নয়। অর্থহীন, অসম্পূর্ণ একটা জীবন কাটানোর চাইতে আইনভঙ্গের দোষে দোষী হওয়া অনেক ভালো। তরে আরেকটা কথা বলি। সৃষ্টিকর্তা এই পৃথিবীতে নারী ও পুরুষকে সৃষ্টি করছেন একজনকে অন্যজনের পরিপূরকরূপে। যারা সৃষ্টির এই বিধান অমান্য করে, তারা কি অপরাধী নয়? আমি তোদের চিরকুমার সভার আইনভঙ্গের বিনিময়ে সৃষ্টিকর্তার শাশ্বত আইন রক্ষা করতে পারছি।
বন্ধুকে বিদায় জানিয়ে মন্ত্রী উঠতে যাচ্ছিলেন। এমন সময় এক তরুণ তার সামনে এসে দাঁড়াল। তরুণের নাম রুমন। সে একটা ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট সংস্থার কর্মকর্তা। মন্ত্রীর মুখের দিকে তাকিয়ে রুমন বলল-
: স্যার, আমি কি পরে আসব?
- না। যা বলার, বইল্যা ফেল।
: স্যার, গায়েহলুদ আর বিয়ের অনুষ্ঠান তো সুন্দরভাবেই শেষ হল। সামনে দুটো বৌভাতের অনুষ্ঠান। এরপর হানিমুন। আমি আপনার হানিমুনের ব্যাপারে একটা আইডিয়া নিতে চাচ্ছিলাম। হানিমুন করতে আপনি কোন দেশে যেতে চান, স্যার?
- আমি সারা জীবন দেশের জন্য, দেশের মানুষের জন্য রাজনীতি করছি। এখন হানিমুন করতে বিদেশে যাব- এইটা তুমি ভাবলা কী কইরা?
: স্যরি স্যার। দেশে কোথায় যাবেন? কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি ...
- আরে! অত দূরে কে যাবে?
: তাহলে?
- আমি মধুচন্দ্রিমা উদযাপন করব ট্রেনে।
: ট্রেনে? এটা স্যার কয় সেলুনবিশিষ্ট ট্রেন হবে?
- সেলুন-ফেলুন না, আমি ভাবতেছি একটা মালগাড়িতে উইঠ্যা বসব। মালগাড়ির কিছু ওয়াগন আছে, যেগুলা পাথর বা কয়লা আনা-নেয়ার কাজে ব্যবহার করা হয়। সেইরকম একটা ওয়াগন ধুইয়া-মুইছ্যা পরিষ্কার কইরা উপরে সামিয়ানা আর নিচে পাটি বিছাইয়া বইসা পড়ব। মাঠে-ঘাটে, পথে-প্রান্তরে রাজনীতি করার অভিজ্ঞতা আমি আমার প্রিয়তমা স্ত্রীর সঙ্গে এইভাবে শেয়ার করতে চাই।
: ওকে স্যার। ট্রেন ছাড়ার সময় কোনো সূচনা সংগীতের ব্যবস্থা করব কি?
- কী রকম?
: এই যেমন ধরুন স্যার, ট্রেন ছাড়ার সময় মাইকে বাজিয়ে দিলাম- ড্রাইভার, হুইসেল মাইরা দে; ড্রাইভার, ট্রেন ছাড়িয়া দে। এভাবে সূচনা সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে একটা ধারা বর্ণনা শুরু হবে- যাতে আশপাশের লোকজন বিষয়টা জেনে আপনাদের দোয়া ও শুভকামনা জানাতে পারে।
: গানবাজনা, ধারা বর্ণনার কোনো প্রয়োজন নাই। মধুচন্দ্রিমার বিষয়টা সামনে রাইখ্যা আমি অলরেডি ৬৭ লাইনের একটা কবিতা রচনা কইরা ফেলছি।
- ৬৭ লাইন কেন স্যার!
: আমার বয়স ৬৭ বছর। কবিতার মাধ্যমে আমি আমার জীবনের ৬৭ বছরের ইতিহাস ফোটাইয়া তোলার চেষ্টা করছি। কবিতার প্রথম লাইনটা হইল এইরকম- কু-ঝিক-ঝিক রেলগাড়ি বাতাসে উড়ে বন্ধুর শাড়ি...
এক শীতের সকালে কমলাপুর রেলস্টেশন থেকে যাত্রা শুরু করল মন্ত্রীর হানিমুন এক্সপ্রেস। চলতে চলতে হানিমুন এক্সপ্রেস এসে পৌঁছল ছোট্ট এক স্টেশনে। স্টেশনের নাম সোহাগী। খবর পেয়ে আশপাশের গ্রাম থেকে লোকজন ছুটে এলো। স্টেশনে উপস্থিত মানুষের ভালোবাসা দেখে মন্ত্রী অভিভূত হয়ে গেলেন। মন্ত্রীর মনে হল, মানুষের ভালোবাসার এ ঋণ শোধ করতে হলে তাদের জন্য কাজ করতে হবে। প্রচুর কাজ।
মোকাম্মেল হোসেন : সাংবাদিক
mokammel@live.com

No comments

Powered by Blogger.