মাহে রমজানে নামাজের ফজিলত -সিয়াম সাধনার মাস ধর্ম by মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান

‘আশরাফুল মাখলুকাত’ বা সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ যাতে সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য ইবাদত-বন্দেগি করে পরম শান্তি ও চরম সৌভাগ্য লাভ করতে পারে সে জন্য আল্লাহ তাআলা স্বীয় বান্দাদের ওপর নামাজ, রোজা, হজ, জাকাতসহ বিভিন্ন প্রকার ইবাদত বিধিবদ্ধ করেছেন। আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের যেসব পন্থা রয়েছে, তন্মধ্যে নামাজ অন্যতম। ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের দ্বিতীয় স্তম্ভ হচ্ছে নামাজ। ‘নামাজ’ ফারসি শব্দ, আরবিতে নামাজকে ‘সালাত’ বলা হয়। এর আভিধানিক অর্থ সম্পর্ক ও সান্নিধ্য। ইসলামের পরিভাষায় এই সালাত আল্লাহ ও তাঁর বান্দাদের মধ্যে যোগাযোগ ও সান্নিধ্যের এমন এক বিশেষ সম্পর্ক গড়ে তোলে, যা অন্য কোনো ইবাদতের বিনিময়ে অর্জন করা সম্ভব নয়। কালেমা, নামাজ, রোজা, হজ ও জাকাত—ইসলামের এ পাঁচটি মূল স্তম্ভের মধ্যে নামাজের গুরুত্ব সর্বাধিক। মাহে রমজান অফুরন্ত রহমত, বরকত, মাগফিরাত, নাজাত ও ফজিলতপূর্ণ মাস। তাই পবিত্র রমজান মাসে পাঞ্জেগানা নামাজসহ তারাবিহ, তাহাজ্জুদ, সুন্নত ও নফল নামাজ আদায়ের গুরুত্ব আরও অনেক বেশি। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে ৮২ বার প্রত্যক্ষভাবে নামাজ আদায়ের জন্য নির্দেশ প্রদান করে বলেছেন, ‘আর তোমরা নামাজ কায়েম করো বা নামাজকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করো।’ (সূরা আল-মুযযাম্মিল, আয়াত-২০)
ইসলামে নামাজের ধর্মীয়, সামাজিক ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম। নামাজ আদায়ের মাধ্যমেই আল্লাহর প্রতি দাসত্ব ও আনুগত্য প্রকাশ পায় এবং স্রষ্টার সান্নিধ্য লাভ করা যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) মিরাজে গমন করে বেহেশত, দোজখ, আরশ, কুরসি ইত্যাদি পরিভ্রমণ করে আল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন। অতঃপর সৃষ্টিকর্তার কাছ থেকে উম্মতে মুহাম্মদির জন্য পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজস্বরূপ গ্রহণ করে দুনিয়ায় ফিরে সাহাবিদের কাছে আদ্যোপান্ত ঘটনাটি বর্ণনা করলেন। তখন সাহাবায়ে কিরাম আক্ষেপ করে বলেছিলেন যে ‘আমরাও যদি মিরাজ গমন করতাম!’ এ সময় নবী করিম (সা.) ইরশাদ করলেন, ‘নামাজ মুমিনদের জন্য মিরাজস্বরূপ।’ (ইবনে মাজা)
রোজাদার মুমিন ব্যক্তি সঠিক সময় নামাজ আদায় করলে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করে এবং আল্লাহর অতি প্রিয় বান্দারূপে পরিগণিত হয়। আর নামাজের মাধ্যমে আল্লাহকে অত্যধিক স্মরণ করা যায়। আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন, ‘আর আমার স্মরণার্থে তুমি নামাজ সম্পাদন করো।’ (সূরা ত্বাহা, আয়াত-১৪) নামাজ মানুষকে যাবতীয় পাপকাজ থেকে দূরে রাখে। ইরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই নামাজ অশ্লীলতা ও দুষ্কর্ম থেকে (নামাজিকে) বিরত রাখে।’ (সূরা আল-আনকাবুত, আয়াত-৪৫) নামাজ মানুষকে দোজখের আগুন থেকে মুক্তি দেয়। পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে, ‘যে ঈমানদারগণ ভীত মনে মনোনিবেশসহকারে নামাজ আদায় করেছে, তারাই (দোজখ থেকে) মুক্তির অধিকারী হয়েছে।’ (সূরা আল-মুমিন, আয়াত-২১) এ সম্পর্কে হাদিস শরিফে বর্ণিত আছে যে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি নামাজের হিফাজত করে তার জন্য এটা কিয়ামতের দিন জ্যোতি, দলিল ও মুক্তির কারণ হবে।’ (মুসনাদে আহমাদ ও বায়হাকি)
ইসলামের অনুসারী তথা মুসলমানের প্রথম ও প্রধান বিষয় হলো ঈমান। আর ঈমানের বিশেষ পরিচয় হলো নামাজ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘প্রত্যেক বস্তুর একটি চিহ্ন (পরিচয়) আছে এবং ঈমানের বিশেষ পরিচয় হলো নামাজ।’ এ নামাজের মাধ্যমে রোজাদার ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে। কেননা নামাজই হলো জান্নাতের চাবিকাঠি। নামাজ আদায় করলে ধর্ম ঠিক থাকে; আর না করলে ধর্ম থেকে বিচ্যুত হয়। তাই মহানবী (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘নামাজ হলো দীনের (ধর্মের) স্তম্ভ। যে ব্যক্তি নামাজ প্রতিষ্ঠা করে, সে দীনকে (ধর্ম) প্রতিষ্ঠিত রাখে। আর যে ব্যক্তি তা পরিহার করে সে দীনকে (ইসলাম) ধ্বংস করে।’
যখন মুয়াজ্জিন মসজিদে আজান দিতে থাকেন তখন মুসল্লিরা সব কাজকর্ম স্থগিত রেখে নামাজের জন্য মসজিদ অভিমুখে গমন করেন এবং সব মুসল্লি একত্র হয়ে জামাতে নামাজ আদায় করেন। এভাবে রোজাদাররা মসজিদে নামাজ পড়তে এলে তাঁদের পরস্পরের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ গড়ে ওঠে। যখন সব মুসল্লি আল্লাহকে হাজির ও নাজির জেনে বিনীতভাবে জামাতে নামাজ আদায় করেন তখন সবাই একসঙ্গে নিয়ত করেন, একই সঙ্গে রুকু-সিজদা করেন এবং একই সঙ্গে সালাম ফিরিয়ে নামাজ শেষ করেন। কোথাও কোনো বিশৃঙ্খলা বা হইচই শোনা যায় না। এভাবে রোজাদার ব্যক্তি জামাতে ইমামের পেছনে নামাজ আদায়ের মাধ্যমে শৃঙ্খলাবোধ শিক্ষালাভ করে তা সমাজ জীবনে বাস্তবায়ন করে থাকেন।
দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে, সাপ্তাহিক জুমার নামাজে, মাহে রমজানে তারাবি ও কদরের নামাজে এবং দুই ঈদের নামাজে যখন সব মুসল্লি সমবেত হন তখন পারস্পরিক খোঁজখবর নিতে পারেন এবং তাঁদের মধ্যে ভাবের আদান-প্রদান হয়। সে জন্য রোজাদাররা মসজিদে সমবেত হয়ে সামাজিক ভ্রাতৃত্ববোধ, শৃঙ্খলাবোধ, নিয়মানুবর্তিতা, পারস্পরিক হূদ্যতা ও সম্প্রীতি গড়ে তুলতে পারেন। আল্লাহ তাআলা নির্দেশ প্রদান করেছেন, ‘আর তুমি তোমার পরিবার-পরিজনকে নামাজের আদেশ করো এবং ধৈর্যসহকারে নামাজে স্থির থাকো।’ (সূরা ত্বাহা, আয়াত-১৩২) এ মর্মে রাসুলুল্লাহ (সা.) বাণী প্রদান করেছেন, ‘যে ব্যক্তি ঈমান ও ইহতিসাবের সঙ্গে সওয়াব প্রাপ্তির আশায় রোজা রাখেন, তারাবি নামাজ পড়েন এবং কদরের রাতে জাগ্রত থেকে আল্লাহর ইবাদত করেন, তার জীবনের আগের সব গুনাহ মাফ করা হবে।’ (বুখারি ও মুসলিম)
দৈনিক পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের আগে সবাই অজু করে পাক-পবিত্র হন এবং নামাজের মধ্যে ওঠা-বসার মাধ্যমে শারীরিক পরিশ্রম হয়ে থাকে। এতে নামাজিদের দেহ সতেজ ও সবল হয় এবং মন প্রফুল্ল থাকে। মসজিদে বহু লোক একত্রে জামাতে নামাজ আদায় করার ফলে একে অপরের সঙ্গে অভাব-অনটন ও অর্থনৈতিক বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে আলোচনা করতে পারেন। এতে একে অপরের প্রতি সহানুভূতিশীল হন এবং পারস্পরিক সাহায্যের হাত সম্প্রসারিত করতে পারেন। প্রকৃতপক্ষে সঠিক নিয়মে বিশুদ্ধভাবে ও নিয়মিত নামাজ প্রতিষ্ঠায় রোজাদার মানুষ মুত্তাকি বা আল্লাহভীরু হতে পারেন। যে রোজাদার ব্যক্তি যথাযথভাবে নামাজ আদায় করবেন, তা তাঁর জন্য কিয়ামতের দিন আলো, দলিল ও মুক্তির কারণ হবে এবং তিনি জান্নাতে প্রবেশ করবেন। সর্বোপরি মহান আল্লাহ তাঁর প্রতি খুশি হবেন। অতএব, আল্লাহ তাআলা আমাদের পবিত্র মাহে রমজানে সঠিকভাবে নামাজ প্রতিষ্ঠা করার তাওফিক দিন এবং নামাজের পার্থিব ও পারলৌকিক কল্যাণসমূহ প্রদান করুন।
ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: সহকারী অধ্যাপক, ইসলামিক একাডেমি, দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়। পরিচালক, ইনস্টিটিউট অব হজরত মুহাম্মদ (সা.)।
dr.munimkhan@yahoo.com

No comments

Powered by Blogger.