বাংলাদেশে আমজনতার রাজনীতি by প্রকৌশলী ম. ইনামুল হক

ভারতের দিলি্ল বিধানসভায় আম আদমি পার্টি বিপুল ভোটে বিজেপি ও কংগ্রেসকে প্রায় নিশ্চিহ্ন করে বিজয়ী হয়েছে। প্রধান দুই দলের প্রতি জনসাধারণের অনাস্থার প্রমাণ এটি। বাংলাদেশেও প্রধান দুই দলের প্রতি অসন্তুষ্ট নাগরিকের সংখ্যা কম নয়। কিন্তু এখানে কি আমজনতার এমন উত্থান সম্ভব?
লক্ষণীয়, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার ৪৪ বছর পর দেশের যে অবস্থা দাঁড়িয়েছে তাতে সারাদেশের মানুষ এখন স্পষ্টতই দুটি শ্রেণীতে ভাগ হয়ে গেছে। সুবিধাভোগী আর সাধারণ মানুষ। সুবিধাভোগীরা বাংলাদেশে ক্ষমতায় আসীন থেকে বা ক্ষমতার সঙ্গে সংযুক্ত থেকে, অথবা সর্বগ্রাসী দুর্নীতির সুবিধা পেয়ে কোটি কোটি টাকার মালিক হচ্ছেন। তারা পক্ষ-বিপক্ষ রাজনৈতিক দলে আছেন, সরকারি কাঠামোর সব শ্রেণীর আমলাদের মধ্যে আছেন, ব্যাংক লুটেরা ব্যবসায়ীদের মধ্যে আছেন, শ্রমিক-ছাত্র নেতাদের মধ্যে আছেন। যারা সাধারণ মানুষ বা আমজনতা তারা মধ্যবিত্ত, অল্পবিত্ত ও গরিব। তারা কারখানা চালায়, ফসল ফলায়, দোকান করে। তারা গরিব ও খেটে খাওয়া মানুষ বটে কিন্তু স্বপ্ন দেখে শোষণহীন সমাজের, দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশের।
স্মরণ রাখতে হবে, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে আমরা 'বাংলাদেশ' নামের স্বাধীন, সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছি। এই বাংলাদেশের হাজার বছরের ইতিহাস-ঐতিহ্য রয়েছে, যার ধারাবাহিকতা এই স্বাধীন রাষ্ট্রের মাটি, প্রকৃতি এবং জনগণ বহন ও লালন করে আসছি। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের লক্ষ্য ছিল ঔপনিবেশিক, সামন্তবাদী, ধনতান্ত্রিক ইত্যাদি সব ধরনের শোষণ থেকে মুক্ত জনগণের একটি দেশ প্রতিষ্ঠা করা। আমাদের লক্ষ্য ছিল জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ ইত্যাদির নামে সমাজে সৃষ্ট বিভেদ, বৈষম্য, অনাচার থেকে মুক্ত একটি আধুনিক দেশ গড়ে তোলা। সবার জন্মগত মৌলিক অধিকার কায়েম করা। কিন্তু গত ৪৪ বছরে বাংলাদেশের ১ শতাংশ লুটপাটকারী রাজনীতিবিদ, দুর্নীতিবাজ আমলা, ঋণখেলাপি শিল্পপতি দেশের সব সম্পদ দখল করে নিয়েছে। বাংলাদেশের মতো অনেক দেশেই গণতন্ত্রের নামে প্রহসন চলছে, দেশের ৯৯ শতাংশ মানুষের ভোটের অধিকার নিয়ে তামাশা চলছে। এর বিরুদ্ধে দিলি্লর আমজনতা জেগে উঠে অভূতপূর্ব নজির সৃষ্টি করেছে।
কথা হচ্ছে, দিলি্লর জনগণ অস্ত্র হাতে বিপ্লব করেনি, তারা ভোটের মাধ্যমে বিপ্লব করেছে। স্বাধীন বাংলাদেশে আমাদেরও লক্ষ্য ছিল সর্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে সব নাগরিকের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের মাধ্যমে সরকার গঠন করে দেশ পরিচালনা করা। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষমতায় যাওয়া রাজনৈতিক দলগুলো রাজাদের দলে পরিণত হয়ে আইন করে নতুন কোনো রাজনীতি বা দলকে নিবন্ধিত করার সুযোগ দিচ্ছে না। স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ১ শতাংশ ভোটারের অগ্রিম স্বাক্ষরের বিধান দিয়ে জোর করে বসিয়ে দিচ্ছে।
বাংলাদেশকে সাধারণ জনগণ তথা আমজনতার রাষ্ট্র করতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোর কেবল 'জননীতি' চর্চাই নয়, বাংলাদেশের সংবিধানের মৌলিক অধিকার অধ্যায়ে নাগরিকদের অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থান ও নিরাপত্তা প্রদানের বিষয়গুলো রাষ্ট্রের দায়িত্ব হিসেবে লিখতে হবে। এ ছাড়া প্রতিটি নাগরিককে কারিগরি শিক্ষাসহ উপার্জনমূলক পেশায় দক্ষ করার জন্য বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তে প্রয়োজনীয় নতুন শিক্ষাক্রম নিতে হবে।
সর্বোপরি নির্বাচন ব্যবস্থায় আনতে হবে আমূল পরিবর্তন। জনপ্রতিনিধি নির্বাচনে প্রার্থীদের প্রচারের জন্য কালো টাকা ব্যয়ের সুযোগ না দিয়ে জামানতের খরচ ছাড়া সব ব্যয় নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে করতে হবে। স্থানীয় সরকারগুলোর কাছে ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সংসদীয় এলাকায় একটি তৃণমূল সংসদ থাকবে। জাতীয় সংসদে উত্থাপিত সব আইন এই তৃণমূল সংসদে আলোচিত হবে।
আমরা অহরহ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা যদি সত্যিই আমাদের মনে কাজ করে তাহলে দেশটা আমজনতার হলো কি-না সেটাই হতে হবে প্রধান বিবেচ্য।
সাবেক মহাপরিচালক, পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থা এবং আহ্বায়ক, আমজনতার দল
aamjanatardal@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.