মিম্বর হোক কল্যাণের আধার by সাইমুম রিদা

ইসলামের শুভ সূচনা মসজিদকে কেন্দ্র করে। রাসূল (সা.) অনন্য ত্যাগের মাধ্যমে যখন মদিনায় একটি কল্যাণ রাষ্ট্র গড়ে তুললেন, তখন এর পরিচালনার জন্য আলাদাভাবে কোনো সচিবালয় কিংবা সংসদ গড়ে ওঠেনি। মসজিদে নববীই ছিল সবকিছুর প্রাণ। খেজুর পাতার ছাউনিতে বসেই ১২ লাখ বর্গমাইলের বিশাল সাম্রাজ্য শাসন করেছেন তিনি। দিকে দিকে ইসলামের বিজয় মশালের শুভযাত্রা শুরু হয় এই মসজিদ থেকেই।


খোলাফায়ে রাশেদার যুগেও মসজিদই ছিল প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু ইসলামী খেলাফত ব্যবস্থা বিলুপ্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মসজিদ নিছক ইবাদতখানা হিসেবেই গণ্য হতে থাকে। মসজিদের ভূমিকাও অন্যান্য ধর্মের উপাসনালয়ের মতো হয়ে যায়। মুসলমানদের সামগ্রিক জীবন পদ্ধতিতে মসজিদের যে বিশেষ ভূমিকা হতে পারে সে কথা অনেকেরই অজানা। অনেক ক্ষেত্রে ইমামরা হীনম্মন্যতার কারণে সত্য কথা বলা কিংবা বাতিলের প্রতিবাদ করতেও কুণ্ঠিত হন। মুসলিম জাতির অধঃপতন, সমাজের অবক্ষয় ও ব্যক্তিত্বের চরম অবনতির এই মুহূর্তে ইমামরা তাদের নিজেদের কোনো দায়িত্ব পালনের উপযোগীই ভাবছেন কিনা তাতে সন্দেহ আছে। অথচ মুসলিম উম্মাহর এই ক্রান্তিলগ্নে ইমামরা রাখতে পারেন বিশেষ ভূমিকা। মসজিদের মিম্বর হতে পারে বিশেষ দিকদর্শক। কেননা বাংলাদেশের এমন কোনো গ্রাম বা শহর পাওয়া যাবে না, যেখানে কোনো মসজিদ নেই। প্রতিটি মসজিদেই রয়েছে কমপক্ষে একজন করে ইমাম। ইসলামের প্রচার-প্রসার, সামাজিক গণসচেতনতা ও জাগরণ সৃষ্টিতে তারা রাখতে পারেন গঠনমূলক ভূমিকা। অন্তত শুক্রবারে অধিকাংশ মুসলমান মসজিদে এসে হাজির হয়। ইমাম সাহেবও তাদের উদ্দেশ করে কিছু কথা বলেন। এ কথাগুলোই যদি হয় গঠনমূলক ও পরিকল্পিত তবে তাতেই আদায় হবে বিশাল দায়িত্ব।
ইমাম সাহেব সাপ্তাহিক জুমাবারের খুতবাতে উপস্থিত শ্রোতা-মুসলি্ল ও তার আওতাধীন সমাজে মুসলমানদের প্রধান ধর্মীয় এবং সামাজিক সমস্যা কী তা চিহ্নিত করে এর সমাধানের জন্য সচেতনতা ও প্রেরণা জোগাতে পারেন। পাশাপাশি ইসলামের সোনালি যুগের ইতিহাস থেকে প্রাসঙ্গিক হৃদয় গলানো ঘটনাবলি উল্লেখপূর্বক শ্রোতা-মুসলি্লর চিন্তাধারাকে শাণিত করার প্রয়াস চালাতে পারেন। সমসাময়িক মুসলিম বিশ্বের সমস্যা ও এর থেকে উত্তরণের পন্থা নির্দেশ করতে পারেন। মুসলমানরা তাদের নিজেদের ইমানি দায়িত্ব আঞ্জাম না দিলে তাদের পরিণতির কথা কোরআন-হাদিসের ভাষ্য উল্লেখপূর্বক তুলে ধরতে পারেন। সমাজে সংঘটিত সব ধরনের অপকর্ম, অনৈতিক আচরণের বিরুদ্ধে মুসলি্লদের সচেতন করে তুলতে পারেন। এর ভয়াবহ পরিণতির কথা তাদের স্মরণ করিয়ে দিতে পারেন। যুব সমাজের মধ্যে ধর্মীয় অনুভূতি জাগ্রতকরণ এবং দেশ ও জাতির স্বার্থে অবদান রাখার জন্য তাদের উদ্বুদ্ধ করতে পারেন। সমাজে প্রচলিত ধর্মীয় গোঁড়ামি, কুসংস্কার, ধর্মের আবরণে ভণ্ডামি এবং সবধরনের শিরক-বিদআতের প্রতি সবাইকে সজাগ ও প্রতিরোধে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানাতে পারেন। ইসলাম ও আধুনিকতার মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ সহাবস্থান তৈরি করে ইসলামের সর্বজনীনতা ও কালজয়ী আদর্শ প্রমাণ করতে পারেন। নবউদ্ভাবিত সমস্যাবলি সমাধানে জরুরি পরামর্শ পেশ করতে পারেন। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, পরিবেশ সচেতনতা ও নৈতিক শিক্ষার প্রতি ব্যাপকভাবে গণজোয়ার সৃষ্টির লক্ষ্যে কাজ করতে পারেন।
মোটকথা, ইসলামী সমাজের হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনতে হলে মসজিদকে সামাজিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু বানাতে হবে এবং মসজিদের ইমাম সাহেবকে যথাযোগ্য মর্যাদা ও ক্ষমতা দিতে হবে। আর এর জন্য ইমামদের প্রতি সাধারণ লোকদের ধারণা যেমন স্বচ্ছ হওয়া জরুরি, তেমনি ইমাম সাহেবকেও এই মানসিকতা তৈরি করতে হবে যে, ইমামতি নিছক কোনো চাকরি নয়, বরং এটা একটি মহান দ্বীনি দায়িত্ব। তাই এ দায়িত্বের যা হক বা দাবি তা পালন করতেই হবে।
saimumrida@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.