জয়ের পরই কাজে ফিরলেন ওবামা-তাঁর প্রশাসনে থাকতে চান রমনি

স্বপ্নের সেই হোয়াইট হাউসে আবার ফিরলেন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। ভোটে জয়ী হওয়ার পরদিনই। বুধবার সন্ধ্যায়। বিমানে সপরিবারে নিজ শহর শিকাগো থেকে উড়াল দিয়ে চলে এলেন ওয়াশিংটনের এই বাড়িতে। দেহে নির্বাচনী ধকলের ছাপ। তবু দ্বিতীয় মেয়াদে জয়ের পরপরই কাজ শুরু করে দিলেন ডেমোক্র্যাট এই প্রেসিডেন্ট। ফোন করলেন বিরোধীপক্ষের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের। যেন এই বিজয় তাঁর দায়িত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে আরো অনেক বেশি।


প্রতিপক্ষ রিপাবলিকান শিবিরের সঙ্গে মিলেমিশে আমেরিকাকে এগিয়ে নিতে চাওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছেন ওবামা। তাঁর এই আহ্বানে রিপাবলিকানরা সাড়া দিতে প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন হাউস অব রিপ্রেজেনটেটিভসের স্পিকার ও রিপাবলিকান নেতা জন বোয়েনার। এ ছাড়া ওবামার সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হেরে যাওয়া রিপাবলিকান প্রার্থী মিট রমনি ওবামা-প্রশাসনে কাজ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন বলে তাঁর এক ঘনিষ্ঠ সহযোগী জানান।
মঙ্গলবার ভোটের দিন নিজ শহর শিকাগোয় ছিলেন ওবামা। জয় নিশ্চিত হওয়ার পর সেখানে রাতেই তাঁর নির্বাচনী সদর দপ্তরে হাজার হাজার সমর্থকের উদ্দেশে প্রথম ভাষণ দেন তিনি। পরে বুধবার সন্ধ্যায় বিশেষ বিমানযোগে ওয়াশিংটন ফেরেন। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী মিশেল ওবামা, দুই মেয়ে শাসা ও মালিয়া।
বার্তা সংস্থা বিবিসি ও রয়টার্স জানিয়েছে, বাজেট ঘাটতি মোকাবিলায় প্রতিপক্ষ রিপাবলিকানদের নিয়ে একসঙ্গে কাজ করার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন ওবামা। প্রেসিডেন্ট পদে রিপাবলিকান প্রার্থী হেরে গেলেও হাউস অব রিপ্রেজেনটেটিভ বা নিম্নকক্ষের প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা রিপাবলিকানদের হাতে। সিনেটে সামান্য এগিয়ে ডেমোক্র্যাটরা। তাই অর্থনীতিসহ অনেক বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে রিপাবলিকানদের বাধার মুখে পড়তে পারেন ওবামা। বিশেষ করে কর বৃদ্ধি ও ব্যয় হ্রাসের বিষয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধিতা স্পষ্ট। এ জন্য এবার প্রেসিডেন্টকে সমঝোতা ও ছাড় দিতে হতে পারে অনেক বিষয়ে।
বুধবার ওয়াশিংটনে স্পিকার বোয়েনার গণমাধ্যমকে জানান, সরকারি রাজস্ব বাড়ানোর পক্ষে তাঁর ও দলের অবস্থান। তবে আয় অনুযায়ী কর কম-বেশি করার নীতির বিরোধী তিনি। তাঁর ভাষ্যমতে, নিজেদের দলীয় নীতি বহাল রেখেই রিপাবলিকানরা ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে কাজ করে এগিয়ে নেবে যুক্তরাষ্ট্রকে। ওবামা তাঁকে ও তাঁর দলের প্রতিনিধিদের ফোন করে একসঙ্গে কাজ করতে আহ্বান জানিয়েছে বলে জানান বোয়েনার।
তিনি বলেন, 'জনাব প্রেসিডেন্ট, এখন আপনার সময়। আমরা আপনাকে সব ধরনের সহায়তা করতে প্রস্তুত। ডেমোক্র্যাট বা রিপাবলিকান হিসেবে নয়, কেবল আমেরিকান হিসেবে একসঙ্গে কাজ করব আমরা। আপনার সফলতা কামনা করি।'
ডেমোক্র্যাটদলীয় ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন সাংবাদিকদের বলেছেন, 'আমরা সবাইকে নিয়েই কাজ করতে চাই। গুরুত্ব অনুসারে একের পর এক কাজগুলো সম্পন্ন করব। আমি মনে করি, আমরা এটি পারব।' তাঁর মতে, সমঝোতা নির্ভর করবে রিপাবলিকান প্রতিনিধিরা কতটুকু সহযোগিতার হাত বাড়ান তার ওপর।
এদিকে বার্তা সংস্থা টেলিগ্রাফ জানায়, মিট রমনির ঘনিষ্ঠ সহযোগী ও ম্যাসাচুসেটসের মরমন বিশপ গ্রান্ট বেনেট জানিয়েছেন, রমনি আর তাঁর ব্যক্তিগত অফিসে ছোটাছুটি করতে চান না। কিন্তু জনগণের সেবা করতে চান তিনি। তাই তিনি ওবামা-প্রশাসনে কাজের সুযোগ পেতে আগ্রহী।
বেনেট বলেন, 'প্রেসিডেন্ট যদি রমনিকে আমন্ত্রণ জানান, তাহলে রমনি হয়তো বলবেন, 'আমি একজন আমেরিকান। আমি কি কিছু অবদান রাখার সুযোগ পাব?'
জয়ী হওয়ার পর মঙ্গলবার প্রথম ভাষণে ওবামা বলেন, 'ভোট শেষ হয়ে গেছে। এখন কে ডেমোক্র্যাট, কে রিপাবলিকান তা বিবেচনা করার সময় নয়। আমরা সবাই আমেরিকান। আমরা দেশকে ভালবাসি, দেশের জন্য একসঙ্গে কাজ করব।' রমনির সঙ্গে শিগগিরই বসে বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করে একসঙ্গে কাজ করার আশাবাদও ব্যক্ত করেন ওবামা।
এদিকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দ্বিতীয় মেয়াদে ওবামা প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ায় তাঁকে অনেক কঠিন চ্যালেঞ্জ পার হতে হবে। বিশেষ করে অর্থনীতি বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে না পারলে ২০১৩ সালে আবারও যুক্তরাষ্ট্রকে অর্থনৈতিক মন্দার কবলে পড়তে হতে পারে। এ ছাড়া বেকারত্বের বোঝা, অভিবাসন সমস্যা, স্বাস্থ্যসেবা, আফগানিস্তানে যুদ্ধ, ইরানের পরমাণু কর্মসূচি, সিরিয়ায় গণবিক্ষোভ ইত্যাদি বিষয়ও রয়েছে সামনে।
৫০টি অঙ্গরাজ্যসহ ওয়াশিংটন ডিসিতে মঙ্গলবার ভোটাভুটির ফলে প্রতিদ্বন্দ্বী রমনিকে হারিয়ে বিজয়ী হন ওবামা। আগামী বছর অর্থাৎ ২০১৩ সালের ২১ জানুয়ারি দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেবেন তিনি।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক খবরে জানানো হয়, আগামী ১৯ নভেম্বর মিয়ানমার সফর করার কথা রয়েছে ওবামার। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মিয়ানমারের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা এই তথ্য জানান। তবে যুক্তরাষ্ট্র বা মিয়ানমারে যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাস বিষয়টি নিশ্চিত করেনি।
ওবামা সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে হিলারি ক্লিনটন থাকছেন না বলে গণমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র ভিক্টোরিয়া নুল্যান্ডের বরাত দিয়ে গতকাল ট্রিবিউন এক্সপ্রেস এ তথ্য জানিয়েছে। নুল্যান্ড বলেন, 'আপনারা আগেই শুনেছেন, হিলারি উত্তরসূরির কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করে ব্যক্তিগত জীবনে ফিরে যেতে চান। অবসর সময় বইপড়া ও লেখালেখি করে কাটাতে চান।' হিলারির মতো দক্ষ একজন পররাষ্ট্রমন্ত্রী না থাকলে সরকার চালাতে ওবামাকে একটু বেগ পেতে হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

No comments

Powered by Blogger.