রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে কিছু কথা by সাইফুদ্দীন চৌধুরী

জাতীয় পর্যায়ে উদ্যাপিত গত বছর রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছিলেন, দেশে কবিগুরুর নামে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে।
আর মাত্র কদিন পরই কবির সার্ধশততম জন্মোৎসব উদ্যাপিত হবে। ১৪১৮ বঙ্গাব্দে কবির জন্মদিন উভয় বাংলায় সাড়ম্বরে পালিত হবে—এমন আয়োজন চলছে। কিছু অনুষ্ঠান বাংলাদেশ ও ভারত যৌথভাবে পালন করবে। এ দিন কলকাতা থেকে কবির স্মৃতির প্রতি সম্মান জানিয়ে ‘সংস্কৃতি’ নামে কলকাতা-ঢাকা স্মারক ট্রেন চালু করা হবে। জন্মজয়ন্তী উদ্যাপনের প্রস্তুতিও শেষ পর্যায়ে। কদিন আগেও এ-সংক্রান্ত সভায় যোগ দিতে দিল্লিতে গিয়েছিলেন সরকারের একজন সচিবের নেতৃত্বে দেশের কজন শীর্ষস্থানীয় বুদ্ধিজীবী। এতে স্পষ্ট যে সরকারের পক্ষ থেকে কবির জন্মোৎসব পালনের সব ধরনের আয়োজনই চলছে।
এ মুহূর্তে দেশের রবীন্দ্র-অনুরাগীদের প্রবল কৌতূহলের উদ্রেক করেছে প্রস্তাবিত রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থান নির্ধারণ ও কার্যক্রম শুরুর বিষয় নিয়ে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত ও প্রচারিত জনমত থেকে বোঝা যাচ্ছে, কবিগুরুর নামে প্রস্তাবিত বিশ্ববিদ্যালয় কবির স্মৃতিধন্য শাহজাদপুরেই প্রতিষ্ঠার পক্ষে বেশির ভাগের মত রয়েছে। জানা গেছে, ইতিমধ্যেই শিক্ষা মন্ত্রণালয় শাহজাদপুর থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করে নিয়েছে। কবির অন্যতম জমিদারি এই শাহজাদপুর ওই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উপযোগী জায়গা। চমৎকার এখানকার ভৌগোলিক অবস্থান। পাশ দিয়ে চলে গেছে ঢাকা-বগুড়া মহাসড়ক। উত্তরাঞ্চলের প্রবেশপথ বঙ্গবন্ধু সেতুতে যেতে সময় লাগে আধঘণ্টা। দুই থেকে আড়াই ঘণ্টায় পৌঁছা যায় রাজধানী ঢাকা মহানগরে। শাহজাদপুর থেকে আট কিলোমিটার উত্তরে গেলেই উল্লাপাড়া রেলস্টেশন।
শাহজাদপুর গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসার কেন্দ্র। গত শতাব্দীর প্রথম দিকে প্রখ্যাত ব্রিটিশ সিভিলিয়ান ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টার তাঁর স্ট্যাটিসটিক্যাল অ্যাকাউন্টস অব বেঙ্গল গ্রন্থে উল্লেখ করেছিলেন, সিরাজগঞ্জের পরই হুরা সাগরপারের শাহজাদপুর একটি বড় ব্যবসাস্থল। ব্যবসা-বাণিজ্যের জায়গা হওয়ায় স্বাভাবিকভাবে আর্থিক দিকে অনেকটাই সচ্ছল এখানকার মানুষ। শিক্ষা-দীক্ষায়ও অনেক এগিয়ে। বিস্মিত হতে হয়, এখানকার সাধারণ মানুষেরও রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে প্রবল আগ্রহ দেখে। আলাপ করে জানা যায়, এখানকার লোকেরা সবাই চায় কবির নামে বিশ্ববিদ্যালয় শাহজাদপুরেই প্রতিষ্ঠা করা হোক।
শাহজাদপুরে বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় জমি পাওয়া যাচ্ছে। ৬০০ বিঘা খাসজমি রয়েছে, যার পুরোটাই ছিল জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের। শাহজাদপুরের অদূরে বাঘাবাড়ী নৌবন্দরে ঢাকা-বগুড়া সড়কে স্থাপিত সেতু থেকে সোজা পশ্চিমে তাকালে এক কিলোমিটার দূরেই দেখা যায়, বড়াল ও ধরলা নদীর মধ্যবর্তী জায়গার ওই জমি। এখানে ছিল কবির গো-খামার ও গো-চারণভূমি (বাথান)। এই গো-খামারের জন্য রবীন্দ্রনাথ পাঞ্জাবের শাহিওয়াল থেকে উন্নত জাতের ষাঁড় গরু এনে স্থানীয় গাই গরুর সঙ্গে ‘ক্রস’ করে ‘পাবনা ব্রিড’ নামের এক নতুন জাতের গো-প্রজাতি উদ্ভাবন করেছিলেন। কবির এই গো-পালন কার্যক্রমে সহায়তা করেছিল নিকটবর্তী রাউতারা গ্রামের ঘোষ পরিবার। এসব তথ্য কবির লেখা থেকেই জানা যায়। পতিসরের ঠাকুর জমিদারির সর্বশেষ ম্যানেজার ধীরেন্দ্রনাথ সর্বাধিকারীর লেখা একটি সূত্র থেকে জানা যায়, ১৯৫১ সালে বিশ্বভারতীর উপাচার্য নিযুক্তির সামান্য কিছুদিন আগেও কবিপুত্র রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর ওই গো-খামার দেখতে গিয়েছিলেন। কবির গো-পালন কার্যক্রম সম্পর্কে আর কোনো তথ্য কোথাও অদ্যাবধি পাওয়া যায়নি। এখানেই মনোরম পরিবেশে শান্তিনিকেতনের আদলে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠতে পারে। ঠাকুর জমিদারির এই গো-পালন কার্যক্রমের খাসজমি একেবারে নিষ্কণ্টক, আবাদি জমিও নয়, বসতভিটাও নয়। এই জমি অধিগ্রহণ করতে সরকারকে কোনো ধরনের চাপের মুখোমুখি হওয়ারও নাকি সম্ভাবনা নেই। কিছুদিন আগে বঙ্গবন্ধুর নামে মুন্সিগঞ্জের অদূরে আড়িয়ল বিলে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে বঙ্গবন্ধুকন্যা বিব্রতকর অবস্থার সম্মুখীন হয়েছিলেন। জানা গেছে, এই জমি অধিগ্রহণ করতে গেলে তেমন কোনো ঘটনা ঘটার আশঙ্কা নেই। অধিকন্তু একটি সূত্র থেকে জানা গেছে, স্থানীয় জনগণই এসব জমি কবির নামে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য সরকারকে দিতে আগ্রহী।
সব দিক বিবেচনা করে সাংস্কৃতিক বিভাগগুলো (ফোকলোর, নাট্যকলা, চারুকলা, সংগীত ইত্যাদিকে) প্রাধান্য দিয়ে পূর্ণাঙ্গ রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য শাহজাদপুরই সবচেয়ে উপযুক্ত স্থান বলে ধরে নেওয়া যায়। প্রসঙ্গত উল্লেখ করতে হয়, পতিসরের নিজস্ব জমিদারিতে যাওয়ার আগে শাহজাদপুরই ছিল কবির প্রিয় জায়গা। ইউসুফ শাহী পরগনার ডিহি শাহজাদপুর অর্ধবঙ্গেশ্বরী রানি ভবানীর কাছ থেকে কিনেছিলেন কবির পিতামহ প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর। সেই ঠাকুর জমিদারি তদারকির জন্য ১২৯৭ থেকে ১৩০৪ বঙ্গাব্দ পর্যন্ত সময়ে রবীন্দ্রনাথ বহুবার এসেছেন এই শাহজাদপুরে। এখানে বসে রচনা করেছেন অসাধারণ কিছু গান, কবিতা, ছোটগল্প, নাটক, প্রবন্ধ এবং স্বজনদের উদ্দেশে তথ্যনিষ্ঠ বেশ কিছু চিঠি; যা তাঁর সৃষ্ট সাহিত্যকে ভিন্ন এক মর্যাদা দান করেছে। রবীন্দ্র-অনুরাগীরা মনে করছেন, প্রধানমন্ত্রী কবিগুরুর সার্ধশততম জন্মোৎসব পালনের মাহেন্দ্রক্ষণে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরুর বিষয়ে তাঁর অভিভাষণে নিশ্চয় উল্লেখ করবেন। দেশে রবীন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়ে বিশেষ ঘোষণা দেবেন।
কবি শাহজাদপুর থেকে শেষযাত্রার সময় ১৩০৪ বঙ্গাব্দের আশ্বিন মাসে ‘বিদায়’ কবিতায় লিখেছিলেন, ‘এবার চলিনু তবে/ সময় হয়েছে নিকট, এখন/ বাঁধন ছিঁড়িতে হবে’। কিন্তু শাহজাদপুরের মানুষ কবির সঙ্গে বাঁধনছেঁড়া নয়, বরং সেই বাঁধন আর দৃঢ়বদ্ধ করতে চায়, তাঁর নামে এখানে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে।
ড. সাইফুদ্দীন চৌধুরী: গবেষক, অধ্যাপক, ফোকলোর বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
pr_saif@yahoo.com

No comments

Powered by Blogger.