রানীরবন্দরে মৈত্রীর মিলনমেলা by এম আর আলম

ফ্যাশন হাউস লুই ভুইত্তোঁ-এর সাম্প্রতিক বিজ্ঞাপনটি অনেকেরই নজর কেড়েছে। আমাদের দেশে যাঁরা টাইম ম্যাগাজিন, দ্য ইকোনমিস্ট বা নিউজউইক পড়েন তাঁদের অনেকেই বিজ্ঞাপনটি দেখেছেন। বিজ্ঞাপন হিসেবে ছাপা হওয়ার আগে এ নিয়ে ছবিসহ খবরও হয়েছে পত্রপত্রিকায়। কারণ এটা খবরই, বড় খবর। বিশ্বকাপ ফুটবলের আগে থেকেই সবকিছু আস্তে আস্তে ফুটবলময় হয়ে উঠতে শুরু করে। এই বিজ্ঞাপনটিও বিশ্বকাপকে সামনে রেখে। মডেল তিন ফুটবলার—পেলে, ম্যারাডোনা, জিদান। প্রথম দুজনের কে খেলোয়াড় হিসেবে এক বা দুই নম্বরে আছেন, তা নিয়ে বিতর্কের শেষ নেই। সেদিক থেকে জিদান অনেকটা নিরাপদ। কে মহান? পেলে-ম্যারাডোনা বিতর্ক তাঁদের ব্যক্তিগত সম্পর্ককে খুব প্রীতিকর রাখেনি। কিন্তু লুই ভুইত্তোঁ তাঁদের এক করেছে। মাদ্রিদের একটি ক্যাফেতে এই তিন মহান এক হয়েছেন, সেখানেই বিজ্ঞাপনটির ছবি তোলার কাজ হয়েছে। হাসিমুখে তাঁরা তিনজন টেবিল ফুটবল খেলছেন। ছবির কেন্দ্রে তাঁরা তিনজন। আলোর পরিকল্পনাও সেভাবে করা হয়েছে। নিচে তাঁদের ট্রাভেল ব্যাগ রাখা। লুই ভুইত্তোঁ -এর সুটকেস। এই ট্রাভেল ব্যাগ বা সুটকেসের জন্যই তাঁদের মাদ্রিদ উড়িয়ে আনা। বিজ্ঞাপনের নিচে শুধু লেখা ‘থ্রি একসেপশনাল জার্নি, ওয়ান হিস্টোরিক গেম, ক্যাফে মারাভিয়াস, মাদ্রিদ’।
পেলে, ম্যারাডোনা ও জিদান এই তিনজনকে সময় মিলিয়ে মাদ্রিদে উড়িয়ে আনতে, একসঙ্গে হাসিমুখে বিজ্ঞাপনে পোজ দিতে রাজি করাতে কত সম্মানী দিতে হয়েছে আর সব মিলিয়ে কত খরচ করেছে লুই ভেঁট্ট? আর এখন যে টাইম ম্যাগাজিন বা এ ধরনের পত্রিকায় যে বিজ্ঞাপনটি ছাপা হচ্ছে তার জন্যই বা কত খরচ করছে এই প্রতিষ্ঠানটি? বিশ্বের অন্যতম দামি ফ্যাশন ব্র্যান্ড লুই ভুইত্তোঁ । এ জন্য কত তারা খরচ করেছে সেটা খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়। দামি ব্র্যান্ডের সবচেয়ে দামি কাজটিই করতে হয়। সেটাই তারা করেছে। সবকিছু যখন বিশ্বকাপ ফুটবলময় হয়ে উঠেছে, তখন তাদেরও থাকতে হবে ফুটবল নিয়েই এবং তাক লাগানো কিছু নিয়ে। ফুটবলকে বিষয় করে করা এই বিজ্ঞাপন নিয়ে এখন নানা আলোচনা ও লেখালেখি হচ্ছে। এই বিজ্ঞাপনের পেছনে প্রতিষ্ঠানটির ব্যাখ্যা হচ্ছে, ক্রীড়া বা ফুটবলের ‘সার্বজনীন’ আবেদনের কারণে তাঁরা এই বিজ্ঞাপনটি করেছেন। ফুটবল ফ্যাশনের পসার বাড়াতে পারবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই, কিন্তু বিজ্ঞাপন বা ব্র্যান্ড নিয়ে যাঁরা কাজ করেন বা গবেষণা করেন এমন তাত্ত্বিকদের কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, ফ্যাশন কি ফুটবলের পসার বাড়াতে পারবে? বিজ্ঞাপন-তাত্ত্বিকদের এখনকার তর্ক-বিতর্কের বিষয়েও স্থান করে নিয়েছে ফুটবল। এগুলো সবই মাঠের বাইরের বিষয়। একটি বিজ্ঞাপন নিয়ে এত কথা বলার অর্থ বিশ্বকাপ ফুটবল মাঠে গড়ানোর কত আগে থেকেই ফুটবলময় হয়ে উঠতে শুরু করেছিল দুনিয়া।
এখন যখন বিশ্বকাপ শুরু হয়ে গেছে, মাঠে ও মাঠের বাইরের সবকিছুই এখন হয়ে উঠেছে ফুটবলময়। আসলে দুনিয়াই এখন ফুটবলময়। খেলাটি তো ‘দ্য গ্লোবাল গেম’। এক মাসের এই ফুটবল উৎসবে খেলা হবে মোট ৬৪টি। মাঠের খেলা আর কতক্ষণ? বাইরের খেলাই তো বেশি। বাংলাদেশ বিশ্বকাপের ধারে-কাছেও নেই। আমাদের কারও জীবদ্দশায় বাংলাদেশ বিশ্বকাপে খেলবে, এমন স্বপ্ন দেখা কারও সঙ্গে নিশ্চয়ই আমাদের কারো দেখা হয়নি। এ দেশের ঘরোয়া ফুটবলও এখন আগের মতো উত্তাপ-উত্তেজনা নিয়ে হাজির নেই। কিন্তু ‘দ্য গ্লোবাল গেম’ ফুটবল নিয়ে উত্তাপ-উত্তেজনায় ঠিকই হাজির বাংলাদেশ। বিশ্বকাপের যে দুনিয়াজোড়া কাঁপুনি তাতে কেঁপে উঠতে চায় আমাদের জনগণ। বিশ্বকাপের মাঠে আমরা নেই, কিন্তু শরিক হয়ে যাই ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার সমর্থক হয়ে। ভিন দেশের পতাকা নিয়ে আমরা কেন মাতামাতি করি, সে প্রশ্ন তোলা যায়, কিন্তু এই উত্তেজনায় শরিক হতে গেলে তো কিছু একটা লাগবে। তাই এবাড়ি ওবাড়ির ছাদের ভিনদেশি পতাকা, রাস্তার এপারে আর্জেন্টিনার পতাকা তো ওপারে ব্রাজিলের পতাকা। উত্তেজনায় শরিক হতে চায় বলেই নব্বইয়ের বিশ্বকাপের সময় মেক্সিকোর রেফারি কোডেসালের কুশপুত্তলিকা দাহ হয়েছে বাংলাদেশে, প্রত্যন্ত গ্রামে। কারণ, এই রেফারির ‘ভুল’ সিদ্ধান্তের বলি হয়েছিল আর্জেন্টিনা। কোডেসালের কানে কি এ খবর গেছে? আমরা জানি না। যদি জানতেন বা জেনে থাকেন তবে এটা হয়তো তাঁর কাছে এক বিস্ময়কর ঘটনা হিসেবেই বিবেচিত হবে। ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার পতাকার সাইজ কত বড় বা কোন মহল্লা বা গ্রামে সংখ্যার দিক দিয়ে কোন দলের সমর্থক বেশি বা মেক্সিকান রেফারি কোডেসালের কুশপুত্তলিকা বানিয়ে তা পোড়ানো, বিশ্বকাপের মাঠে না থেকে বিশ্বকাপের উত্তেজনায় শরিক হওয়ার এর চেয়ে ভালো উপায় আর কী?
টাইম ম্যাগাজিনের ১৪ জুনের বিশ্বকাপ প্রিভিউ সংখ্যার সম্পাদকীয় ও লেখাগুলোতে ফুটবল-বন্দনায় একটি বিষয়ে বাড়তি জোর দেওয়া হয়েছে। বলা হচ্ছে, ফুটবল ‘সবচেয়ে গণতান্ত্রিক খেলা’। যুক্তিটা কী? টাইম ম্যাগাজিন তাদের সম্পাদকীয় কলামে যা লিখেছে তা অনেকটা এ রকম—‘এটা যেকোনো জায়গায় প্রায় যেকোনো বস্তু দিয়ে খেলা সম্ভব। ফুটবল না পাওয়া গেলে একটি টিনের ক্যান, এক টুকরো পাথর বা একজোড়া মোড়ানো মোজা—ফুটবল খেলার জন্য সবই সই। এই খেলা খেলতে কোনো সাজ-সরঞ্জামও লাগে না, কোনো প্যাড বা হেলমেটের দরকার নেই। এমনকি এর জন্য কোনো খেলোয়াড়ের ছয় ফুট আট ইঞ্চি লম্বা হওয়ারও দরকার নেই। আপনাকে শুধু একটু ক্ষিপ্রগতির আর তুখোড় হতে হবে। আর থাকতে হবে প্রচুর প্র্যাকটিস করার ইচ্ছা। দুনিয়ার যেকোনো দেশ, যেকোনো ধর্ম, যেকোনো গোত্র বা যেকোনো অর্থনৈতিক অবস্থা থেকেই উঠে আসুক না কেন ফুটবলে গ্রেট খেলোয়াড় হতে তা কখনো বাধা হয়ে দাঁড়ায় না।’ এর বিপক্ষে যুক্তি দাঁড় করানো কঠিন। আমাদের এক বন্ধুর পরিবার বছর কয়েক আগে দক্ষিণ আফ্রিকা বেড়াতে গিয়েছিলেন। সেখানে তাঁরা তিন দিন কাটিয়েছেন বন্য প্রাণীর এক প্রাইভেট গেম রিজার্ভে। দক্ষিণ আফ্রিকা আর বিশ্বকাপ ফুটবল—এ নিয়েই এই বেড়ানোর গল্প শুরু হয়েছিল। সেই গেম রিজার্ভে বন্ধু দম্পতির দুই ছেলে ফুটবল খেলেছিল এক অদ্ভুত জিনিস দিয়ে। গাইড একদিন দুই ছেলেকে গেম রিজার্ভের একটি খোলা জায়গায় নিয়ে বলল, ‘চলো ফুটবল খেলি, এমন জিনিস দিয়ে খেলব, যা দিয়ে হয়তো আর কোথাও খেলার সুযোগ পাবে না।’ জিনিসটি কী? ‘এলিফ্যান্ট ডাং’ বাংলায় হাতির বিষ্ঠা। সবচেয়ে ‘গণতান্ত্রিক’ খেলা ফুটবল আসলেই সবকিছু দিয়ে খেলা যায়।
ফুটবল সবচেয়ে গণতান্ত্রিক খেলা—এর পক্ষে আরও কিছু যুক্তিও আমরা দাঁড় করাতে পারি। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দেশে আমরা যারা বিশ্বকাপের ধারে-কাছে না গিয়ে মাতামাতিতে মেতে উঠি, তাদের কথা বিবেচনায় নিয়ে। ফুটবল খেলা দেখতে আর বুঝতে জ্ঞানের বা জানা-বোঝার দরকার হয় না, ধনী-দরিদ্র, শিক্ষিত-অশিক্ষিত সবাই রস নিতে পারেন গোল আর উত্তেজনার এই খেলা থেকে। আগে কখনো ফুটবল খেলা দেখেননি এমন কেউ যদি খেলাটি প্রথম দেখতে বসেন তবে সম্ভবত একমাত্র ‘অফসাইড’ বিষয়টি ছাড়া আর কোনো কিছুই খেলাটি বুঝতে বাধা হয়ে দাঁড়াবে না।
এত যুক্তি, এর পরও কি ফুটবলকে সবচেয়ে গণতান্ত্রিক খেলা বলে মেনে নিতে আপত্তি আছে? নিশ্চয়ই আছে। এ নিয়েও তর্ক শুরু হয়ে গেছে। সেই মাঠের বাইরের তর্ক। ‘ফুটবল সবচেয়ে গণতান্ত্রিক খেলা হতেই পারে না’—টাইম ম্যাগাজিনের সম্পাদকীয় আর লেখাগুলোর বিরোধিতা এভাবেই করেছেন ম্যারাথন দৌড়বিদ এমবি ব্রুফুট (Amby Bৎufoot)। ১৯৬৮ সালে বস্টন ম্যারাথনে বিজয়ী হয়েছিলেন তিনি। এখন সাংবাদিকতা আর লেখালেখির সঙ্গে জড়িত। রানার ওয়ার্ল্ড ম্যাগাজিনের শীর্ষ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁর কাছে কোনটি সবচেয়ে গণতান্ত্রিক খেলা? অবশ্যই দৌড়। তাঁর যুক্তিটা কী? ‘দৌড়ানোর জন্য কোনো সাজসরঞ্জাম লাগে না, একাই দৌড়ানো যায়, অন্য কোনো খেলোয়াড়ের দরকার হয় না। আপনি তৈরি হবেন আর দৌড়ানো শুরু করবেন। এমনকি আপনি যদি চান বস্টন, নিউইয়র্ক, শিকাগো, লন্ডন বা অন্য কোনো বড় ম্যারাথনেও বিশ্বসেরাদের সঙ্গে দৌড়াতে পাররেন। আরও কিছু দরকার? আপনার চারপাশে দেখবেন দৌড়াচ্ছে অসংখ্য নারী।’ তাঁর যুক্তিকে উড়িয়ে দেবেন কীভাবে? তিনি তাঁর একটি লেখা শেষ করেছেন এভাবে—‘বিশ্বকাপ অবশ্যই একটি দুনিয়াজোড়া আলোড়ন তোলা ঘটনা, কিন্তু যদি গণতান্ত্রিক আদর্শের প্রশ্ন বিবেচনায় নেওয়া হয় তবে তা দৌড়ের চেয়ে অনেক পিছিয়ে, অন্য সব খেলার ক্ষেত্রেও তাই।’
একসঙ্গে একাধিক খেলা ‘গণতান্ত্রিক’ হতে পারবে না, এমন তো কোনো কথা নেই! তবে বিতর্কটি ‘সবচেয়ে’ বিষয়টি নিয়ে। মাঠের খেলা শেষ হয়ে যাবে, মাঠের বাইরের এই বিতর্ক সামনে নিশ্চয়ই আরও জমে উঠবে।
এ কে এম জাকারিয়া: সাংবাদিক।
akmzakaৎia@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.