কেউ কি দায় স্বীকার করবেন by মাহমুদুর রহমান মান্না

ভারতের ছত্তিশগড়ে মাওবাদীদের সশস্ত্র হামলার দায় স্বীকার করেছেন সে দেশের স্বরাষ্টমন্ত্রী পি চিদাম্বরম এবং তাঁর পদত্যাগপত্র পেশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের কাছে। ক্রমবর্ধমান মাওবাদী ও সন্ত্রাসবাদী তৎপরতার মুখে দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ২০০৮ সালে চিদাম্বরমকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ৮ এপ্রিল মঙ্গলবারের এ হামলা চিদাম্বরের ভাবমূর্তির ওপর দাগ ফেলে দিয়েছিল। সম্ভবত এটাই ছিল মাওবাদীদের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী হামলা, যাতে ৭৬ জন নিরাপত্তাকর্মী নিহত হয়েছেন।
ভারতীয় গণতন্ত্রের এই একটি সুন্দর দিক। ছত্তিশগড়ের যে হামলা, এর জন্য নিশ্চয় পি চিদাম্বরম দায়ী নন। কিন্তু কেন্দ্রীয় রিজার্ভ পুলিশ ফোর্সের (যার ৭৬ জন সদস্য ওই হামলায় মারা গেছেন) এক বার্ষিক অনুষ্ঠানে চিদাম্বরম নির্দ্বিধায় বললেন, ‘দায়টা শেষ পর্যন্ত আমার ডেস্কেই আসে।’ আমার মনে আছে, সত্তরের দশকের প্রথম দিকে ভারতে একটি বড় ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটেছিল, যাতে এক শর বেশি মানুষ মারা গিয়েছিল। তখন রেলমন্ত্রী ছিলেন লাল বাহাদুর শাস্ত্রী। তিনি ট্রেন দুর্ঘটনার সব দায় স্বীকার করে পদত্যাগ করেছিলেন।
এ দুজন মন্ত্রী যে পদত্যাগ করেছেন, তা নেহাতই তাঁদের বিবেকের তাড়নায়। তাঁদের যে বিবেক আছে, তা বোঝা যায় এ ঘটনা থেকে। মন্ত্রী হয়েছি ক্ষমতা উপভোগ করার জন্য, যেমন করে পারি মন্ত্রী হব কিংবা মন্ত্রী থাকব, এ রকম নয়। বরং মন্ত্রী হয়েছি বলেই দায়িত্ব আমার, তা পালন করতে পারলে থাকব, না হলে থাকব কেন? ক্ষমতা যে বড় কথা নয়, অন্তত ভারতের এই মন্ত্রীদের কাছে, পদত্যাগের মধ্য দিয়ে তাঁরা তা-ই প্রমাণ করেছেন। অবশ্য ক্ষমতার প্রশ্নে নির্মোহ থাকার বিষয়ে এর চেয়ে বড় উদাহরণ তৈরি করেছেন সোনিয়া গান্ধী স্বয়ং। কী রকম নির্বিকারভাবে প্রধানমন্ত্রীর পদটি তিনি ফিরিয়ে দিয়েছেন! বাম রাজনীতির কিংবদন্তি প্রয়াত জ্যোতি বসু সম্পর্কেও এ কথা বলা যায়। গণতন্ত্রের বিনির্মাণের, বিশেষ করে, নেতৃত্বের এই নৈতিক ভিত্তি খবুই জরুরি।
ভারতীয় গণতন্ত্রের এই দিকটি সবারই দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সেখানে কী সরকার কী বিরোধী দল, উভয়ই দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে। এই যে চিদাম্বরম পদত্যাগপত্র পেশ করলেন, তা প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং গ্রহণ করেননি। তিনি সঙ্গে সঙ্গে তা প্রত্যাখ্যান করেছেন। মজার ব্যাপার, বিরোধী হিন্দু জাতীয়তাবাদী ভারতীয় জনতা পার্টিও প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে একমত হয়েছে।
আমাদের দেশে হলে কী হতো? প্রথম কথা, আমাদের দেশে আজ পর্যন্ত সোহেল তাজের ঘটনা বাদ দিলে নিজের তাগিদে কোনো মন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন, এ রকম উদাহরণ নেই। এখন পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছার বাইরে কোনো মন্ত্রী কিছু করেছেন বা ভেবেছেন, তা দৃশ্যমান নয়। তবু যদি ধরে নিই, সে রকম একটা কিছু হয়েছে, আর প্রধানমন্ত্রী ফিরিয়ে দিয়েছেন, তবে বিরোধী দল হইচই করত এই বলে যে সরকার একটা নাটক করেছে। কিন্তু ভারতে জনতা পার্টি তা করেনি। বিজেপির মুখপাত্র রাজীব প্রতাপ রুডি বলেছেন, ‘আমরা মনে করি না যে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ করা উচিত। আমাদের মাওবাদী তৎপরতা বন্ধ করতে হবে।’ রুডি আরেকটি কথা বলেছেন, যা আমাদের দেশের সরকার ও বিরোধী দল উভয়ের জন্যই শিক্ষণীয়। তিনি বলেছেন, ‘এখন ব্লেম গেমের (পরস্পরকে দোষারোপ) সময় নয়।’
মিসরের প্রয়াত প্রেসিডেন্ট জামাল আবদুল নাসের ১২ থেকে ১৪ বার পদত্যাগ করেছিলেন এবং প্রতিবারই জনতার চাপে তা প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন। অনেকেই এটাকে নাসেরের স্টান্টবাজি মনে করতেন। কিন্তু ভারতের যেসব উদাহরণ আমি দিয়েছি, এর কোনোটাই স্টান্টবাজি নয়। লাল বাহাদুর শাস্ত্রী পদত্যাগের পর আর মন্ত্রী থাকেননি, যদিও তিনি পরবর্তী সময়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছিলেন। প্রসঙ্গক্রমে পশ্চিম জার্মানির একসময়ের অসাধারণ জনপ্রিয় চ্যান্সেলর উইলি ব্রান্ডের নাম বলা যায়। জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকা অবস্থায় যখন তাঁর এক ঘনিষ্ঠ সহযোগী বিদেশি গুপ্তচর হিসেবে ধরা পড়লেন, তখন তিনি পদত্যাগ করেছিলেন। কারণ হিসেবে তিনি বলেছিলেন, ১০ বছর ধরে আমার খুবই কাছে থাকা মানুষকে যখন আমি একেবারেই চিনতে পারিনি, তখন আমার ওপর দেশ পরিচালনার ভার রাখা ঠিক নয়।
দুই
বাংলাদেশে ফিরে আসি। আমাদের দেশে দায় স্বীকার করে এ ধরনের পদত্যাগের ঘটনার নজির নেই। এ কথার মানে কী এই যে ছত্তিশগড়ের মতো বড় কোনো ঘটনা ঘটেনি আমাদের এখানে? কিন্তু তা-ই বা বলি কী করে? বিডিআর বিদ্রোহ এবং এর মর্মান্তিক ঘটনা তো এখনো আমাদের স্মৃতিতে কাটা ঘায়ের মতো।
এত বড় ঘটনার দায় কেউ স্বীকার করেনি। ঘটনার পরপরই জাতীয় সংসদের যে অধিবেশন বসেছে, সেখানে সরকারি দল বিরোধী দলকে প্রকারান্তরে দায়ী করেছে। খোদ প্রধানমন্ত্রী সংসদে অভিযোগ করেছেন, ঘটনার দিন বিরোধী দলের নেতা কালো কাচের গাড়িতে কালো চশমা পরে ক্যান্টনমেন্টের বাসভবন ছেড়ে কোথায় চলে গেছেন, তিন দিন আর বাসায় ফেরেননি। সংসদের ওই অধিবেশনে বিরোধী দল উপস্থিত ছিল না। পরে তাদের উপস্থিতিতে সংসদ নেত্রী ও বিরোধী দলের নেতার মধ্যে যে তীব্র বাগ্যুদ্ধ হয়, সেখানেও তিনি এ অভিযোগ উপস্থাপন করেন। বিরোধী দলের নেতা এ সম্পর্কে আজ পর্যন্ত কোনো কথা বলেননি। তাঁর দল এখন প্রকারান্তরে ওই ঘটনার জন্য সরকারকে দায়ী করার চেষ্টা করছে।
বিডিআর বিদ্রোহের বিচার অবশ্য ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। মূল যে বিষয়, সামরিক কর্মকর্তাদের হত্যাকাণ্ডের বিচারও শুরু হবে বলে শোনা যাচ্ছে। কিন্তু তার পরও এত বড় ঘটনায় সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে ন্যূনতম মতৈক্য গড়ে ওঠার কোনো লক্ষণ নেই। বাংলাদেশের এই চার দশকের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে, এ প্রচেষ্টা বা উদ্যোগ কখনো নেওয়া হয়নি। স্বাধীনতার পরপর জাতীয় সরকার গঠনের আহ্বান ছিল। কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। প্রস্তাবটি বিবেচ্য বলেও মনে হয়নি। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড নিয়ে দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য ছিল। তাই এর বিচারে অনেকেই একমত ছিল না। আজও যুদ্ধাপরাধীর বিচার নিয়ে বিভেদের সুর স্পষ্ট আছে।
এ অবস্থায় আমাদের দেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ কী? পাকিস্তানের পরিণতি আমরা দেখেছি। একটা অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত হতে যাচ্ছে পাকিস্তান। বাংলাদেশ সম্পর্কে এতখানি নেতিবাচক ভাবনা কেউ ভাবে না। কিন্তু এ দেশে একটা নেতিবাচক রাজনীতি গড়ে উঠেছে, যা ভাবনার। এখানে এক পক্ষ আরেক পক্ষকে শত্রু বিবেচনা করে। পারলে একেবারে ধ্বংস করে ফেলতে চায়। যত কিছু ভালো তা আমার আমলে হয়েছে; আর তিনি ও তাঁর সরকার গত কয়েক বছরে দেশটাকে রসাতলে নিয়ে গিয়েছিলেন, প্রায় অকার্যকর করে ফেলেছিলেন রাষ্ট্রটাকে—এ ধরনের কথা শুনতে শুনতে মানুষের কানে পচন ধরেছে।
এই নেতিবাচক রাজনীতি বিবেককে বাক্সবন্দী করে। বড় রাজনীতিবিদেরা কেউ সোনিয়া গান্ধী, লাল বাহাদুর শাস্ত্রী, চিদাম্বরম হতে পারেন না। তাঁরা ছাপোষা কেরানি আর বাক-বাকুম পায়রা হয়ে যান। যাঁদের ডাকে একসময় হিমালয় থেকে সুন্দরবন, হঠাৎ বাংলাদেশ জেগে উঠত, তাঁদের কণ্ঠ ম্রিয়মাণ হয়ে যায়। চাকরিজীবী আমলার মতো রাজনীতিবিদেরাও চামচা হয়ে যান। এ অবক্ষয়ের কারণে বাবার কোলে চার বছরের শিশু নওশীন দুর্বৃত্তের গুলিতে মারা যাওয়ার পরও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দুঃখবোধ করেননি, কোনো দায়িত্ব স্বীকার করার প্রশ্ন আসেনি, নির্বিকার বলে ফেলেছেন, ‘আল্লাহর মাল আল্লাহ নিয়ে গেছেন।’

তিন
সাম্প্রতিককালে দেশে এমন কিছু ঘটনা ঘটেছে, যা সুস্থ বিবেককে রীতিমতো ভাবিত করে। ঘটনাগুলো যেমন মর্মান্তিক, তেমনই হূদয়বিদারক। নিষ্ঠুরতায় ও পৈশাচিকতায় তা যেকোনো বিবেকবান মানুষকে ব্যথিত করবে।
১. ময়মনসিংহ আনন্দ মোহন কলেজের এক অনুষ্ঠানে চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের হামলা এবং ছাত্রীদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন। ঢাকঢাক-গুড়গুড় করলেও ঘটনার বিবরণ মানুষের সামনে চলে আসে। কিন্তু আজ পর্যন্ত এ ব্যাপারে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে শোনা যায়নি।
২. জোট সরকারের সময় ফাহিমা, মাহিমার আত্মহননের মতো ঘটনা ঘটেছে। এদের নামের পাশে যুক্ত হয়েছে পিংকি, ইলোরা এবং আরও দু-একটি নাম।
৩. ধর্ষণে সেঞ্চুরি করার মাঠ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে আরেকটি ছাত্রী ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। সুতপা নামের এক গৃহবধূর মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর বেরিয়েছে। মা-বাবা সরকারের কাছে হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করেছেন।
৪. সবচেয়ে জঘন্য অমানবিক ঘটনার খবর বেরিয়েছে ইডেন কলেজকে কেন্দ্র করে। রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে সেখানে ছাত্রীদের ইচ্ছার বাইরে কাজ করতে বাধ্য করা হচ্ছে বলে পত্রপত্রিকায় খবর বেরিয়েছে। স্বয়ং বিরোধী দলের নেতা বেগম খালেদা জিয়া এ নিয়ে কথা বলেছেন। প্রতিবাদ, অস্বীকার করে শক্তিশালী কোনো বক্তব্য দেশবাসীর সামনে আসেনি।
৫. পৈশাচিক দুটি ঘটনা ঘটেছে এরপর। প্রথমে দুই বছরের একটি শিশু এবং পাঁচ দিনের ব্যবধানে চার বছরের একটি শিশু ধর্ষিত হয়েছে। ধর্ষণের পর শিশু দুটির শারীরিক ও মানসিক অবস্থার যে বর্ণনা পত্রিকায় ছাপা হয়েছে, তা পড়ে চোখের পানি সংবরণ করা কষ্টকর।
৬. পত্রিকায় ছাপা হয়েছে, দুই যুবক আলাদাভাবে প্রেমিকার মা-বাবাকে হত্যা করেছে, প্রেমিকাকে মারাত্মকভাবে আহত করে পাইপ বেয়ে নিচে নেমে পালিয়ে গেছে।
এ রকম আরও বেশ কিছু ঘটনা হয়তো আছে, যা দেশবাসীর নজরে আসেনি। কারও কি দায় আছে এসব ঘটনার? দেশজুড়ে যে মাস্তানি ও টেন্ডারবাজি চলছে, তাতে কারও দায় নেই? বিএনপির বন্ধুরা অবশ্য প্রীত বোধ করবেন এই ভেবে যে, যেসব ঘটনার কথা আমি বলছি, তা সবই তো বর্তমান সরকারের সময়কার। তাদের আমলে কি এসব হয়নি? উভয় দলের নেতারাই কী একবার ভালো করে চোখ মেলে দেখেছেন যে ছাত্রদের মিছিলে (তা সেটা ছাত্রলীগ হোক বা ছাত্রদলই হোক) এখন আর বরকত, ছালাম, রফিক, জব্বার, আসাদ ও মতিউর রহমানদের দেখা যায় না?
একটা সন্ধিক্ষণ চলছে এখন। নীতি-নৈতিকতার ভাঙচুর চলছে। নওশীন যে মারা গিয়েছিল, এর দায় কি তৎকালীন সরকারের ছিল না? এই যে দুটি অবুঝ শিশু পাশবিক নির্যাতনের শিকার হলো, এর দায় কি কারও নেই?
অনুজপ্রতিম আসিফ নজরুল লিখেছেন, এই শিশুকে ক্ষতবিক্ষত করেছে মানুষ নামধারী পশু। কিংবা পশুর চেয়েও বর্বর কেউ। উন্মত্ত পশুও ধর্ষণ করে না তাদের গোত্রের বা অন্য কোনো শিশুকে। আমাদের সমাজের একজন করেছে। এই মানুষকে খুঁজে বের করতে পারবে না পুলিশ? তাকে জামিন না দিয়ে মৃত্যুদণ্ড দিতে পারবে না কোনো আদালত? যদি না পারে, তাহলে সেই পশুর কাছে ধর্ষিত আসলে আমরা সবাই।
আমাদের একজন চিদাম্বরমকে দরকার, যিনি দায় স্বীকার করার সাহস রাখেন। দরকার একজন রাজীব প্রতাপ রুডির, যিনি বলতে পারেন, এখন পরস্পরকে দোষারোপ করার সময় নয়।
মাহমুদুর রহমান মান্না: রাজনীতিবিদ ও কলাম লেখক।

No comments

Powered by Blogger.