তারা হলেন বৈড়ইচারা গ্রামের আবদুল মতিন... by বদরুন নাহার

বৈড়ইচারা গ্রামের ১৪ বছরের ছেলে আবদুল মতিন যখন লুঙ্গির নিম্নাংশ উল্টিয়ে মালকোচা করে নামা জমির ক্যাঁতক্যাঁতা কাদার মধ্যে পিচ্ছিল শোল-টাকি মাছ পাঁচ আঙুলের চিপায় কেচকি দিয়ে ধরে, তখন ঢাকা শহরের মনিরা পারভীন তাকে দেখেনি। আবদুল হাশেম অন্যের জমিতে হালচাষ করে বাড়ি ফিরলে সামনে খালুই হাতে মতিনকে পেয়ে রাগে খালুইটা উঠানে ছুড়ে ফেলে দিলে টাকিগুলো শুকনো উঠোনেই সাঁতার কাটে, মতিন দৌড়ে পালায়। রাতে সেই মাছের ঝোল ছেলের প্লেটে তুলে দিতে দিতে মা সাইদা বেগম ভাতমাখা হাতের দিকে তাকিয়ে মিনতিভরা স্বরে বলে, বাজান আর দুইডা ক্লাস পাড়লি কলেজে যাতি।  এই কথায় মতিনের গলায় বিষম লাগে, তবে গলায় কাঁটা ফোটে না। সে বলে, ঝোলে ম্যালা ঝাল। সাইদা বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেলে, পড়াশোনা ফেলে দুই চারটা কই-টাকি মারলে ছেলের কোনো ভবিষ্যৎ হবে নানে। বরং দেখাদেখি পরের দুইটাও স্কুলে ফাঁকি দেওয়া শুরু করবি। আবদুল হাশেম সংসার চালাতে হিমশিম খায়। তার মতে, ডাঙ্গর পোলায় পড়ব না, তাইলি খেতের কামে যাবি। এ কথার পরদিন সকালে আর মতিনকে খুঁজে পাওয়া যায় না। সে মামাবড়ি পালিয়েছে! এমন করে আর কদ্দিন। শেষে মতিনের মামাই একটা ব্যবস্থা করে। ধার-কর্জ করে তার কোরিয়া যাওয়া চূড়ান্ত হয়। তখন সদ্য গোঁফের রেখা ওঠা কিশোর মতিন মায়ের আঁচল ধরে কান্দে, ছোট বোনের গালে গাল লাগিয়ে কান্দে, ছোট ভাইয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে ঢাকা এলে তার দেখা হয় মনিরা পারভীনের সঙ্গে।
গ্রামের কথা মনিরা প্রায় ভুলেই গিয়েছিল। হঠাৎই হাশেম নামের দূরসম্পর্কের ভাই উপস্থিত হলে মনে পড়ে সে কথা। মতিন নতুন কেনা প্যান্ট-শার্ট পরে একপাশে কাঁচুমাচু ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকে। সেদিকে তাকিয়ে মনিরা ভাবে, ঘাড়টা গোঁজা করে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটি নিতান্তই গোবেচারা টাইপের, এমন ভঙ্গির ছেলেপেলেকে সে শেষ কবে দেখেছিল মনে নেই। ছেলেটি এক দিনেই তাকে বেশ ফুফু ফুফু ডেকেটেকে অস্থির, তাতেই কি মনিরার খুব বাবার কথা মনে পড়ে? বাবা-মা মারা গেছে বছর দশ হলো, নিজের ভাইবোন কেউ নেই দেশে। বহুদিন আগেই বড় ভাই অস্ট্রেলিয়ায় স্থায়ী হয়েছে। বড় বোনটা বিয়ের পর থেকে আমেরিকায়। এ বছর নিজের ছেলেটাও কানাডা চলে গেল, মেয়েটাই কেবল কাছে আছে। গ্রাম থেকে বহু বছর কেউ আসে টাসে না। স্কুল পেরোবার পর মনিরার আর গ্রামে যাওয়াই হয়নি। আবদুল মতিন কোরিয়া থেকে ফোন করে। ছেলেটা এত বেশি ফুফু ফুফু করতে থাকে, কদিন বাদেই বিরক্ত লাগতে শুরু করে মনিরা পারভীনের। বিশেষ করে যখন ফোনে দীর্ঘ প্যাঁচাল শুরু করে বলতে থাকে, ফুফু ছোট বোনটারে কলেজে ভর্তি করছি, মাসে আব্বারে এত টাকা দিসি, মায়রে আলাদা খরচা দিই। এসব শোনায় তেমন কোনো আগ্রহ হয় না মনিরা পারভীনের, তবুও ছেলেটা বলে যায় বলে বিরক্ত হলেও কানে ফোন ধরে থাকে সে। প্রায় ফোন কলেরই শেষ বক্তব্য, ভালো হইচ্ছে না ফুফু?
বৈড়ইচারায় মোবাইল আছে কিন্তু সব সময় লাইন পাওয়া যায় না, চার্জ দিতে গঞ্জে যেতে হয় বলেই বোধ হয় মতিন তাকে এত ফোন করে, যা এক প্রকার অত্যাচারই মনে হয়। সেদিন সবে টিভিতে সিরিয়াল দেখতে বসেছে, তখনই মতিনের ফোন, কুশল জেনেই প্যাঁচাল শুরু, ফুফু এই মাসে আব্বারে এক লাখ টাকা পাঠাইছি আমাগো হালটের পাশে বতু গো নামা জমিটা কিনবার জন্যি। ওই হানে ডাঁটা আর ঢ্যাঁড়সের চাষ যেমুন ভালো, হেমুন ধানের চারা গজায়। মনিরা পারভীন বুঝতেই পারে না নামা জমি কেমন, মতিনদের হালটটা সে কি জীবনে দেখেছে? এদিকে টিভি সিরিয়ালে তখন চলছে চরম ক্লাইমেক্স। তাই মনিরা বলেন, মতিন, বাসায় তো গেস্ট, এখন রাখি, পরে কথা হবে। ভালো থেকো। কিন্তু এর পরও মতিনের সঙ্গে মনিরা পারভীনের যোগাযোগটা কমে না, বরং বেড়েই যায়। মনিরা যত ব্যস্তই থাকুক, তাড়াতাড়ি ফোন রেখে দিক, মতিনের দূরালাপের লিস্টটা ততটা বড় না হওয়ায়, কিছুদিন পর পর সে ফোন করে। সম্প্রতি ফেসবুকে মতিনের ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পেয়ে মনিরা পারভীন অনেকক্ষণ ভাবে একসেপ্ট করবে কি না? প
রথমত মতিনের সঙ্গে তখনো সে তেমন আন্তরিকতাবোধ করছে না, কিন্তু ভেবে দেখল, ফেসবুকে দেখা হলে মতিনের যখন-তখন ফোন করাটা কমবে, তাই বন্ধু করে নিল তাকে। তিন বছর আগে যে ছেলেটি গোবেচারা চেহারা নিয়ে মনিরা পারভীনের বাড়িতে এসেছিল, সেই গেঁয়ো, হাঁদা আর নেওটা ভঙ্গির মুখশ্রী তার প্রোফাইলেই খুঁজে পাওয়া যায় না—মতিনের গায়ে এঁদো কাদামাটি যেন কোনো কালে ছিলই না। কোরিয়ান সহকর্মীদের সঙ্গে ছুটি কাটাতে সমুদ্রে হাফপ্যান্ট পরা কিংবা বিশাল সুপারশপে ক্রিস্টমাস গাছের আলোর মধ্যে হাস্যোজ্জ্বল এই ছেলেটি কি আসলেই মতিন! কোরিয়ান পুতুল পুতুল মেয়েদের মাঝখানে দাঁড়ানো ছেলেটি! মনিরা আবার ভালো করে ইনফরমেশন দেখে, ছেলেটা বৈড়ইচারা গ্রামের নামটি পর্যন্ত ঠিক লিখেছে! সহসা মনিরার ভালো লাগে। কেন এই ভালোলাগা? বৈড়ইচারা নামের কথা তো সে নিজেই ভুলতে বসেছিল, যদি না মতিন কোরিয়া যাওয়ার সময় তার বাসায় আসত। এমন কি তার মনে হতে থাকে, অস্ট্রেলিয়া থেকে ভাইয়ার ছেলেমেয়ের সঙ্গে কালেভদ্রে কথা হয়। ওরা খুব একটা বাংলা বলতে পারে না। অথচ মতিন কেমন ফুফু ফুফু ডেকে অস্থির করে ফেলে, কোরিয়ায় বসেও হালটের পাশের দোপের জমিতে ঢ্যাঁড়সের স্বপ্ন দেখে! তাতে মনিরার বা কী যায় আসে? সে তো গ্রামের কাদামাটি মেখে বড় হয়নি, সাঁতার কেটে কেটে শালুকের গোল মোটা ঢ্যাপ তুলে আনেনি। তবুও এত দিন বাদে মনিরা পারভীনের খুব মরিয়ম ফুফুর কথা মনে পড়ে।
ছেলেবেলায় দাদাবাড়ি বেড়াতে যাওয়া মানেই বাবার সঙ্গে দল বেঁধে জ্ঞাতিদের বাড়িতে ঘুরে বেড়ানো। তখন সে পঞ্চম না ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ত, নিশ্চিত হতে পারে না। বৈষ্ণবডাঙ্গি দিয়ে যাওয়ার সময় বাবা বলে উঠল, চল মরিয়মবুরে দেখে যাই। যে বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে বলল, সেখানে বিরাট উঠোন, যেমন হয় আরকি, সামনে দুটো টিনের ঘর, খড়ের মাচা, লাউয়ের মাচা, বাচ্চাসহ মুরগির কক কক করে ঘুরে বেড়ানো। কিন্তু উঠোন পেরিয়ে দুই টিনের চৌচালা ঘরের মধ্যে সরু রাস্তা দিয়ে ভেতরের বাড়ির উঠানের প্রান্তে রান্নাঘরের সারির মাঝখানে দোঁচালা মাটির ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে বাবা ডেকেছিল, মরিয়ম বু ও মরিয়ম বু...।
শণের ছাউনিওয়ালা ঘরের দোরটা ছিল পাঠখড়ির। মাথাভর্তি সাদা চুল, কিন্তু বেশ পেটানো শরীরের গঠন—বিবি মরিয়ম শক্ত-সামর্থ্য। সহসা ভাই, ভাইরে...বলে জড়িয়ে ধরেছিল বাবাকে। তাদের আন্তরিকতায় মনেই হয় না তারা কেবল প্রতিবেশী ভাইবোন! সেই বয়সে মনিরা নিজেকে বড় ভাবতে শুরু করেছে, অথচ বিবি মরিয়ম হামলে পড়ে তাকে পাখির ছানার মতো নিল কোলে তুলে। বলল, কী ফুটফুইটা মাইয়া!
তবে মনিরার ভীষণ অবাক লেগেছিল যখন মরিয়ম বিবি তাদের খেতে বসাল। না, সে সময় তার সেই খাওয়ানোর জোরাজোরির চেয়েও সে অবাক হয়েছিল খাবার তালিকা দেখে। রাতের রান্না ভাত আর পাটশাক, যেন মহামূল্যবান সে খাদ্য না খেয়ে গেলে মরিয়ম ফুফুর জীবনে আর ভাত খাওয়া হবে না। বাপের বাড়ি থেকে আসা ভাই-ভাতিজি যদি না খেল, তবে তার খেয়ে কী লাভ।
তখন মনিরাই কি জানত শাক আর ভাত মরিয়ম বিবির কাছে কত স্বাদের খাবার, দিনের পর দিন ফ্যানের মধ্যে নুন বা ভাতের সঙ্গে মরিচ ডলে খেয়ে তার জীবন চলে। স্বামী নেই, সন্তান নেই। শশুরবাড়ির সবচেয়ে খারাপ একটা অংশে তার ঘর, জমি বলতেও ঘরের পাশে নামা একচিলতে মাটি। পরম যত্নে পাটশাকে ভাত মেখে মনিরার মুখে তুলে বিবি মরিয়ম বলেছিল, সোনা আমার আর এক ন্যালা খা। সেদিন সে ভাতের কোনো স্বাদ পায়নি। কিন্তু বহু বছর পর মতিনের সঙ্গে কথা বলতে বলতে তার কাছে আজ পাটশাকে মাখা ভাতের স্বাদ যেন ফিরে এসেছে! মরিয়ম ফুফুর জন্য চোখ ভিজে ওঠে মনিরার।

২.
চার বছর বাদে দেশে ফিরবে আবদুল মতিন। সে ফোনে জিজ্ঞাসা করে, ফুফু আপনার লিগা কি আনমু?
মনিরা পারভীনের কাছে বিদেশি উপহার নতুন কিছু নয়। তিনি বলেন, কিছু লাগবে না, তুমি ভালোভাবে দেশে ফেরো।
তবুও মতিনের বিশাল তিনটা লাগেজের ভেতর থেকে তুলতুলে পশমি শাল বেরিয়ে আসে ফুফুর জন্য, ফুফার জন্য মাফলার। বৈড়ইচারা থেকে মতিনের বাবা আর খালু এসেছে। বিশাল সব বাক্সপেটরা। সঙ্গে লম্বা একটা কাগজের বাক্স। ৪২ ইঞ্চি এলইডি টিভি। মতিন যে বছর বিদেশে যায় সে বছরই বিদ্যুতের খুঁটি বসিয়েছে বৈড়ইচারা গ্রামে, এত দিনেও লাইন যায় নাই। তবুও যাবে বলেই এনেছে। হাশেম বলল, কারেন্ট নাই, খামাখা ইয়া নিলে চোর-ডাকাতের চোখে পড়ব। ওরা গ্রামে যাওয়ার সময় মনিরা পারভীনের বাসায় রেখে গেল টিভিটা। সেটি স্টোররুমের আলমারির মাথার ওপরে তুলে রাখল সে। কবে তাদের গ্রামে বিদ্যুৎ আসবে আল্লাহ জানেন।
কিন্তু দুদিন বাদে মতিন আবার ঢাকায় এসে হাজির। সারা গায়ে লাল চাকা চাকা, খুব বিধ্বস্ত অবস্থা তার। বলল, বিদাশে তো এসির মধ্যে কাম করতাম, বাইরে যা গরম! হাঁসের মাংস আর রুটি পিঠা বানিয়ে মতিনের মা সাইদা বেগমও এসেছে ছেলের সঙ্গে।
ছেলেকে ভালোমতো এক-দুই বেলা খাওয়াতেও পারেনি বলে আফসোস করে মতিনের মা। মনিরার সঙ্গে রান্নাঘরে ঢুকে নিজেই এটা-ওটা করতে যায়। হঠাৎ রাইসকুকার দেখিয়ে বলে, আপা, এমুন একখান জিনিস মতিনে আনছে।
: তাই নাকি?
: হঁ, পোলাডা কেমুন পাগল...বাড়িতে কারেন্ট নাই। পয়সাপাতি খরচা করনের কী দরকার?
: ছেলেটা শখ করে এনেছে, রেখে দাও, বিদ্যুৎ আসলে...।
সাইদা বেগমের চোখ বেশ জ্বল জ্বল করে। খানিকটা লাজুক হেসে বলে, মতিনে নাকি একখান টিপি আনছে...। আপনার বাসায় রাইখা যাইয়া ভালোই করছে...।
রান্নাঘরে হাতের কাজ করতে করতে মনিরা পারভীনের সবটা শোনা হয় না। তবে সে যখন বলে, টিপিটা একটু দেইখতাম, তখন মনিরা বলে, ড্রইংরুমে আছে, মতিনকে বললে ছেড়ে দেবে।
সাইদা বেগম সে কথায় খানিকটা লজ্জা পায়, না, ওইডা না। আমার মতিনে যেইডা আনছে...।
এত কাজের ভিড়ে স্টোর থেকে টিভির প্যাকেটা এনে খুলে দেখানোর ঝক্কি না নিয়ে মনিরা পারভীন সাইদা বেগমকে স্টোরের সামনে নিয়ে বলে, ওই তো।
সাইদার কণ্ঠে বিস্ময়, এমন চিকন আর বড় প্যাকেট!
সাইদা বেগম উঁচু হয়ে প্যাকেটটা ছুঁয়ে দেখার চেষ্টা করে, বলে, চেয়ারম্যানের বাড়িরডা কেমুন বাক্সো নাহাল মোটা! দাঁড়িয়ে পরম মমতায় ছেলের আনা এলইডি টিভি বাক্সে হাত বুলায় সে, যেন ছোট্ট শিশুটিকে আদর করছে।
মনিরা পারভীন তা দেখেও না দেখার ভান করে সরে যায়।
এক মাস ছুটি কাটিয়ে বিদেশে যাওয়ার সময় আবার মনিরা পারভীনের বাসায় ঘুরে গেল মতিন। দুই মাস বাদে কোরিয়া থেকে ফোন করে মনিরাকে সে জানায়, নতুন চাকরি পেয়েছে, আরও বেশি বেতনের। সে সঙ্গে বাড়তি টাকার নতুন নতুন পরিকল্পনার ফিরিস্তি। সবশেষে বলে, ভ্যালা হইবো না, ফুফু? সংক্ষিপ্ত উত্তর দেয় মনিরা, হ্যাঁ, ভালোই হবে।
মনিরা পারভীন ইদানীং মানুষকে মতিনের গল্প বলতে শুরু করেছে। সেদিন বড় ভাইয়ের ফোন পেয়ে মতিনের গল্প বলল বেশ উচ্ছ্বসিত হয়ে। শুনে খানিকটা দুঃখভরা গলায় ভাইয়া বলল, শোন মনি, এটা কোনো সুখের কথা নয়। একটা দেশের অর্থনীতি রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভর করে, ভাবলেই আমার গা কাঁটা দিয়ে ওঠে।
ফোনের এপাশ থেকে মনটা খারাপ হয়ে যায় তার। রেমিট্যান্সের ওপর নির্ভরশীল অর্থনীতির কারণে নয়, ভাইয়ের কথার জন্য, ভাইয়া যেন নিজের দেশের কথা বলছে না, ওর মুখে একটা দেশ কত দূরের মনে হলো! আসলেই বাংলাদেশ বহুদিন ওর দেশ নয়! ভাই তবুও কী চমৎকারভাবে ব্যাখ্যা করে বলে চলে, শ্রমশক্তি রপ্তানি করে কোনো দেশের অর্থনীতি স্ট্যাবল হতে পারে? যদি কেউ শ্রমিক না নেয়? মনিরার মনটা কেবল খারাপই হতে থাকল ভাইয়ের কথায়। সে শুধু মতিনের উন্নয়নে ডুবে ছিল, অথচ তা মোটেও উন্নয়ন নয়! মনিরার খুব বাবা-মার কথা মনে পড়ল। তাদের মৃত্যুর সময় কেবল সে-ই ছিল কাছে। ভাইয়া আর আপা এসে শেষকৃত্যের আনুষ্ঠানিকতা করেই চলে গেল। ওদিকে শূন্য বাড়িতে গিয়ে কতবার সে কেঁদেকেটে অস্থির হয়ে উঠত! মতিনের সঙ্গে ফেসবুকে বেশ দেখাটেখা হয় মনিরার। ইনবক্সে মতিন জানাল, ছোট বোনটা ইন্টারমিডিয়েট পাস করেছে, ভাইটা ক্লাস নাইনে, ওকে কমার্স নিতে বলেছে। নানা রকম ব্যবসার চিন্তা আছে, পরে ভাইকেও নিয়ে যাবে, বাবার শরীরটা ভালো না, জেলা হাসপাতালে টেস্ট করার টাকা দিয়েছে, পাইলসের সমস্যা ধরা পড়ছে...ইত্যাদি ইত্যাদি। মনিরা ভাবে, বৈড়ইচারায় হাশেম ভাইকে ফোন করবে। আলসেমিতে আর হয়ে ওঠে না। তা ছাড়া মতিন সব এত সবিস্তারে বলে যে জানা হয়ে যায়।
মনিরার বাসায় সেদিন একটা গেট-টুগেদার পার্টি চলছিল। মতিনের ফোন এল তখনই। বাসায় মেহমান বলে তেমন একটা কথা হয়নি। মনিরা ভেবেছিল, মতিনকে পরে ফোন দেবে। হয়ে ওঠেনি। বরং ফেসবুকের ইনবক্সে লিখেছে, কী খবর মতিন? কেমন আছো? তারপর দু-চার দিন নিজেই ফেসবুকে বসার সময় পেল না, মতিনের খবরও জানা হলো না। সন্ধ্যায় সে টিভি খুলেছে সিরিয়াল দেখবে বলে, কিন্তু গত রাতে আসিফ যে নিউজ চ্যানেল দেখছিল, শুরুতে পর্দায় ভেসে উঠল তার মনোগ্রাম। অনেকটা আনমনেই নিচে দিয়ে যাওয়া স্কলের ব্রেকিং নিউজে চোখ আটকাল মনিরা পারভীনের, সেখানে ভেসে যাচ্ছে—কোরিয়ায় আগুনে পুড়ে পাঁচ বাংলাদেশির মৃত্যু। নামটাম নেই। চ্যানেল ঘোরাতে ঘোরাতে একটা চ্যানেলে এসে যে নামের লিস্ট পাওয়া গেল তাতে লেখা, মৃত ব্যক্তিরা হলেন বৈড়ইচারার আবদুল মতিন...। নামটি জ্বল জ্বল করছে। সহসা ঘুরতে থাকে মনিরার মাথা, নিজেকে সামলে নিয়ে ভাবে গ্রামে কি খবরটা গেছে? সে কি ওদের ফোন করবে? কী বলবে? টিভিতে ইতিমধ্যে ভিডিও ফুটেজও দেখাল, কালো হয়ে পুড়ে যাওয়া লাশ। নানা স্মৃতি মনে পড়ে মনিরা পারভীনের, বৈড়ইচারায় বিদ্যুৎ নাই, মতিনের কেনা এলইডি টিভিটা তার স্টোরে এখনো বাক্সবন্দী। মনিরা পারভীন ভাবে, বিদ্যুৎ পেলেও কি মতিনের বাবা-মার ছেলের আনা টিভিটিতে এমন অন্ধকার ছবি সহ্য হতো!

No comments

Powered by Blogger.