কর্মঘণ্টার বিধিনিষেধ থেকে অব্যাহতি চান গার্মেন্টস মালিকরা- শ্রমিক নেতাদের মতে ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে by তৌহিদুর রহমান

পোশাক শিল্প মালিকরা আগামী ছয় মাসের জন্য শ্রমিকদের কাজের ঘণ্টার বিধি নিষেধ থেকে অব্যাহতি চেয়েছেন। তারা শ্রমিকদের দৈনিক অতিরিক্ত দুই কর্মঘণ্টার স্থলে চার কর্মঘণ্টা নির্ধারণের আহ্বান জানিয়েছেন। এ লক্ষ্যে প্রচলিত শ্রমআইনের দুটি ধারার বিধি নিষেধ থেকে আরো ছয় মাস অব্যাহতি চেয়েছেন।


অপরদিকে শ্রমিক নেতারা বলছেন, ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের মাধ্যমে শ্রম আইনের এই দুটি ধারা থেকে অব্যাহতি প্রদানের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারিং এক্সপোর্টার্স এ্যাসোসিয়েশন (বিজিএমইএ) থেকে গত মঙ্গলবার শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব মিকাইল শিপারের কাছে ২০০৬ সালের শ্রম আইনের দুটি ধারা থেকে অব্যাহতি প্রদানের জন্য চিঠি দেয়া হয়েছে। বিজিএমইএ মহাসচিব এহসান উল ফাত্তাহ স্বাক্ষরিত এই চিঠিতে শ্রম আইন সংশোধনের মাধ্যমে একটি গেজেট প্রকাশের অনুরোধ করেছেন। চিঠিতে পোশাক শিল্পের বর্তমান অবস্থা বিবেচনা করে শ্রম আইনের ১০০ ও ১০২ ধারা থেকে অব্যাহতি প্রদানসহ ধারা সংশোধনের মাধ্যমে দৈনিক অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা দু’ঘণ্টার স্থলে চার ঘণ্টা নির্ধারণের অনুরোধ করেছেন।
শ্রম আইনের এই দুটি ধারা থেকে অব্যাহতির পেছনে বিজিএমইএর পক্ষ থেকে বিভিন্ন যুক্তি তুলে ধরে শ্রম সচিব বরাবর পাঠানো চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘রফতানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্পের মাধ্যমে দেশের ৭৯ শতাংশ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন হচ্ছে। বর্তমানে ৩৬ লাখ শ্রমিক-কর্মচারী পোশাক শিল্পে কর্মরত। এসব শ্রমিকের প্রায় ৮০ শতাংশই নারী। তবে রাজনৈতিক অস্থিরতা, অকারণে শ্রমিক অসন্তোষ, অপর্যাপ্ত বিদ্যুত ও গ্যাস সরবরাহের কারণে এ শিল্পের মালিকরা বিদেশী ক্রেতাকর্তৃক নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পোশাক রফতানি করতে নানাবিধ সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছেন। এছাড়া যথাসময়ে শিপমেন্ট করার জন্যও ক্রেতারা শর্ত আরোপ করে থাকেন। এ পরিস্থিতিতে যথাসময়ে মাল শিপমেন্ট করার জন্য কারখানা মালিকরা শ্রমিকদের দিয়ে দৈনিক ১০ ঘণ্টার বেশি সময় কাজ করাতে বাধ্য হন। অনেক সময় বাংলাদেশের শ্রমিকরাও অতিরিক্ত মজুরির আশায় অতিরিক্ত কাজ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। কিন্তু শ্রম আইনের ১০০ ও ১০২ ধারা বিধি নিষেধের কারণে মালিকরা ইচ্ছা করলেও দৈনিক ১০ ঘণ্টার বেশি কাজ করাতে পারেন না। এছাড়াও আমদানিকারক ও ব্র্র্যান্ডদের শর্ত পূরণ করে তাদের নিয়োজিত অডিটরদের দিয়ে অডিট না করালে কোন কারখানাই অর্ডার নিতে পারে না। এমনকি চলতি অর্ডারসহ পরবর্তী অর্ডারও বাতিল করে দেন। দৈনিক কর্মঘণ্টার ক্ষেত্রেও ক্রেতাদের এমন উল্লেখযোগ্য শর্ত রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে অর্ডার বাতিল হলে পোশাক শিল্প আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একই সঙ্গে দেশ প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন থেকে বঞ্চিত হবেন।’
বিজিএমইএর দাবি, ৬ মাস সময়ের জন্য শ্রম আইনের ১০০ ও ১০২ ধারা থেকে অব্যাহতি প্রদান করলে তৈরি পোশাক শিল্পে রফতানি বহু বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি প্রচুর পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে সক্ষম হবে। যা দেশের অর্থনৈতিক খাতকে সমৃদ্ধি করবে। একই সঙ্গে পোশাক শিল্পে কর্মরত শ্রমিক-কর্মচারীরা আর্থিক ভাবে উপকৃত হবেন। যে কারণে শ্রম আইনের ১০০ ও ১০২ ধারা অনুযায়ী দৈনিক কাজের ঘণ্টার বিধি নিষেধ থেকে অব্যাহতি দেয়া প্রয়োজন।
অপরদিকে জানা গেছে, ইতোপূর্বে শতভাগ রফতানিমুখী তৈরি পোশাক শিল্পকে শ্রম আইনের এই দুটি ধারার বিধান থেকে অব্যাহতি প্রদান করে ১০ এপ্রিল একটি গেজেট প্রকাশিত হয়। এই গেজেটের মেয়াদ আগামী ২২ সেপ্টেম্বর অর্থাৎ শনিবার শেষ হবে। আগামী শনিবারের মধ্যে প্রচলিত শ্রম আইন রহিত করা না হলে পোশাক শিল্প মালিকরা আইন অনুযায়ী কোনভাবেই শ্রমিকদের দিয়ে দু’ঘণ্টার বেশি অতিরিক্ত কাজ করাতে পারবেন না। বর্তমানে শ্রম আইন অনুযায়ী শ্রমিকরা আট ঘণ্টা কাজ করেন। একই সঙ্গে অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা হিসেবে আরো দুই ঘণ্টা কাজ করতে পারেন। মোট ১০ ঘণ্টা কাজ করতে পারেন। এর বেশি কাজ করতে পারেন না। তবে শ্রম আইনের দুটি ধারা রহিত করার ফলে পোশাক শিল্প শ্রমিকরা গত ১০ এপ্রিল থেকে অতিরিক্ত চার কর্মঘণ্টা কাজ করে আসছিলেন। ফলে শ্রমিকরা মোট ১২ ঘণ্টা কাজ করতে পারতেন। তবে আগামী শনিবার শ্রম মন্ত্রণালয়ের গেজেটের মেয়াদ শেষ হচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে টেক্সটাইল গার্মেন্টস ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সভাপতি শ্রমিক নেতা আবুল হোসাইন জনকণ্ঠ’কে বলেন, শ্রম আইনের ১০০ ও ১০২ ধারা থেকে ইতিপূর্বে দুবার অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। তবে বার বার শ্রম আইনের ধারা থেকে অব্যাহতি দেয়া কোনভাবেই উচিত হবে না। এটা শ্রম আইনেরও সুস্পষ্ট লংঘন। কেননা সরকার-মালিক ও শ্রমিক নেতৃবৃন্দ ত্রিপক্ষীয় মতামত নিয়েই শ্রম আইন করা হয়েছে। এই আইনের কোন ধারা সংশোধন অথবা রহিত করতে হলে ত্রিপক্ষীয় মতামতের ভিত্তিতেই করতে হবে বলে তিনি মনে করেন।
উল্লেখ্য, ২০০৬ সালে প্রণীত শ্রম আইনের ১০০ ধারায় বলা হয়েছে-‘কোন প্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিক কোন প্রতিষ্ঠানে সাধারণত দৈনিক আট ঘণ্টার বেশি সময় কাজ করবেন না বা তাকে দিয়ে কাজ করানো যাবে না।’ অপরদিকে ১০২ ধারায় উল্লেখ রয়েছে, কোন প্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিক ‘কোন প্রতিষ্ঠানে সাধারণত সপ্তাহে আটচল্লিশ ঘণ্টার বেশি সময় কাজ করবেন না বা তাকে দিয়ে কাজ করানো যাবে না। যে কারণে শ্রম আইনের এই দুটি ধারা থেকে অব্যাহতি চেয়েছে পোশাক শিল্প মালিকরা।

No comments

Powered by Blogger.