বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠায় আন্তধর্মীয় সংলাপ by মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান

ইসলাম শান্তি, সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য, ভ্রাতৃত্ব ও কল্যাণকামিতার ধর্ম। পূর্ণাঙ্গ ও পরিপূর্ণ এ জীবনবিধানের দিশারি বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) শান্তির বার্তা নিয়ে ভূপৃষ্ঠে আগমন করেছেন। তিনি ছিলেন শান্তি, নিরাপত্তা ও কল্যাণের মূর্ত প্রতীক ‘রাহমাতুল্লিল আলামিন’। নবী করিম (সা.) সব মানুষের জন্য প্রেরিত মহাপুরুষ। মক্কা বিজয়ের পর পলায়নরত ভিন্নধর্মাবলম্বী ইহুদি রমণীর বোঝা তিনি নিজের কাঁধে বহন করে তার কষ্ট লাঘব করেছেন। পবিত্র কোরআনে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে শান্তি, মুক্তি, প্রগতি ও সামগ্রিক কল্যাণের জন্য বিশ্ববাসীর রহমত হিসেবে আখ্যায়িত করে বলা হয়েছে, ‘আমি আপনাকে সমগ্র বিশ্বজগতের জন্য রহমতরূপে প্রেরণ করেছি।’ (সূরা আল-আম্বিয়া, আয়াত-১০৭)
সত্য-সুন্দর, প্রগতিশীল, বিজ্ঞানসম্মত ও শান্তির ধর্ম ইসলাম মানবজাতিকে বিভক্ত করতে আসেনি, ঐক্যবদ্ধ করতে এসেছে। খাদ্যের পরই মানুষের প্রধান অন্বেষা শান্তি। ধন-সম্পদ, মান-মর্যাদা যা কিছুই থাক, সৃষ্টিকর্তার কাছে শান্তিই মানুষের চিরকালীন প্রার্থনা। শান্তি ছাড়া ব্যক্তিজীবন ও সমাজজীবন দুটোই মূল্যহীন। মানুষ যা কিছু করে, যা কিছু চায়, সব এ শান্তি লাভের জন্যই। মানবজীবনে শান্তি কত যে মহামূল্যবান, তা উপলব্ধি করা যায় জীবনে শান্তি যখন দুর্লভ হয়ে পড়ে। ক্ষমতা লাভের তীব্র আকাঙ্ক্ষা, অন্যের সম্পদ লুট করে বা বলপ্রয়োগ করে নিজের করে নেওয়ার তীব্র বাসনায় শান্তি ও মানবতা লঙ্ঘিত হচ্ছে। শান্তির জন্য মানবাধিকার অপরিহার্য। শান্তি প্রতিষ্ঠার সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। কাজেই সারা পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য আন্তধর্মীয় সম্প্রীতির স্বার্থে সব ধর্মের অনুসারীদের প্রতি সদ্ভাব পোষণ করা অবশ্যকর্তব্য। তাই বলা হয়েছে, ‘মানব জাতির কল্যাণের জন্য তোমাদের উদ্ভব ঘটেছে।’ (সূরা আলে ইমরান, আয়াত-১১০)
বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে বহুবিধ অন্তরায় বিদ্যমান। পৃথিবীর মানুষ আজ আরও বেশি করে শান্তির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে। জগতে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য মহামানবেরা যে অতুলনীয় ভূমিকা পালন করেছেন, এখনো সেই শান্তির প্রয়াস অব্যাহত রাখতে হবে। মহানবী (সা.)-এর জীবনদর্শন ও উদারতার নীতির প্রতি বিশ্বের মানুষের যে আগ্রহ লক্ষ করা যাচ্ছে, একে বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার পথে অগ্রযাত্রা রূপে অভিহিত করা যায়। আরব বণিক, অলি-আউলিয়া, পীর-দরবেশদের প্রচার ও প্রসারের মাধ্যমে শান্তির ধর্ম ইসলাম এ ভূখণ্ডে এসেছিল। ইসলাম প্রচারকদের সাম্য-ভ্রাতৃত্বের ধর্মের মর্মবাণীতে বিমোহিত এ দেশের শান্তিকামী মানুষ ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে সমবেত হয়েছিল। ইসলাম মানবসেবা ও সমাজকল্যাণের মাধ্যমে দুনিয়াতে শান্তি প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। এখানে কোনো বর্ণবৈষম্য নেই; ধনী-গরিব, উঁচু-নিচুর কোনো ভেদাভেদ নেই। এ ধর্মের শিক্ষায় ক্রীতদাসকেও সম্রাটের আসন দেয়। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজে মুয়াজ্জিনের আজানে সাড়া দিয়ে কোটিপতিরাও আকুল হয়ে মসজিদে ছুটে আসেন। বিত্তবান, বিত্তহীন, কৃষক, শ্রমিক, রাষ্ট্রপ্রধান এক কাতারে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করেন। একসঙ্গে লাখ লাখ মানুষ পবিত্র হজের সময় কাবা শরিফ তাওয়াফ করেন। বিশ্বভ্রাতৃত্বের এর চেয়ে বড় শিক্ষা আর কী হতে পারে!
আন্তধর্মীয় জ্ঞান, সংলাপ ও সমঝোতা ছাড়া মানবজাতির পারস্পরিক সম্প্রীতি একান্তই অকল্পনীয়। সারা পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য আন্তধর্মীয় সংলাপের উদ্দেশ্য একাত্মতা নয়, বরং ঐক্য ও উপলব্ধি, কর্তৃত্ব বা প্রভুত্ব নয়, বরং উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি। সংলাপের মূল লক্ষ্য হলো, সমাজে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে প্রতিটি ধর্মপ্রাণ মানুষের অন্তরে অন্য মানুষের জন্য কিছু সহানুভূতির উন্মেষ ঘটানো। আন্তধর্মীয় সংলাপ বা মতবিনিময় পারস্পরিক সহযোগিতার বিভিন্ন ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের নিয়ামক শক্তি। এ জাতীয় নৈতিক আলোচনা বিভিন্ন ধর্মে বিশ্বাসী এবং বিভিন্ন জাতি-ধর্ম-বর্ণনির্বিশেষে দল-মত ও পথের অনুসারীদের মধ্যে পরস্পর বোঝাপড়ার পরিবেশ সৃষ্টিতে সহায়ক এবং শান্তি ও পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে উৎসাহ প্রদান করে। সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে প্রকৃত কোনো অবদান রাখতে চাইলে প্রতিটি ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে পারস্পরিক সংলাপ এ মুহূর্তে অত্যন্ত জরুরি।
অথচ পৃথিবীব্যাপী এখনো অশান্তি, উত্তেজনা, সহিংসতা ও সংঘর্ষের চিত্রই প্রত্যক্ষ করতে হচ্ছে। মানুষ যে শান্তিপূর্ণ বিশ্বের প্রত্যাশা করেছিল, তা এখনো সুদূর পরাহতই রয়ে গেছে। সর্বত্র যুদ্ধ আর সংগ্রাম, হিংসা-বিদ্বেষ, হানাহানিই এখনো পৃথিবীর বাস্তবতা। তবু শান্তির অন্বেষণে ধর্মপ্রাণ মানুষের পদচারণ অব্যাহত রয়েছে। শান্তিই যেহেতু ইসলামের একমাত্র লক্ষ্য, সে কারণে ব্যক্তি বা সমাজজীবনে শান্তি ভঙ্গ করে এমন কোনো কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখাই ইসলামের সাধনা। শান্তির সপক্ষে কথা বলাই যথেষ্ট নয়, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান করতে হবে। শান্তিতে বিশ্বাস করাই শেষ কথা নয়, শান্তির জন্য সবাইকে কাজ করতে হবে। শান্তিকে প্রধান শর্ত হিসেবে বিবেচনা করে মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার অন্যতম হাতিয়ার ও রাষ্ট্র পরিচালনার মৌলিক নীতি রূপে পরিগণিত করতে হবে। যেকোনো মূল্যে হতদরিদ্র ও উপেক্ষিত মানুষের দুয়ারে উন্নয়নের সুফল পৌঁছাতে হবে। বিশ্বের দরিদ্র, নিপীড়িত দেশ ও জনসাধারণের মধ্যে আন্তধর্মীয় সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য, সহযোগিতা ও সহমর্মিতা সৃষ্টির প্রয়োজনে সব ধরনের ঘৃণা, হিংসা ও বৈষম্য এবং দুর্বৃত্তায়নকে নির্মূল করে শান্তি স্থাপনের লক্ষ্যে সবাইকে সোচ্চার হতে হবে। স্বামী বিবেকানন্দের ন্যায় মানুষকে নতুন করে উদাত্ত আহ্বান জানাতে হবে যে ‘বিভেদ নয়, সহায়তা; বিনাশ নয়, পরস্পরের ভাবগ্রহণ; মতবিরোধ নয়, সমন্বয় ও শান্তির।’
বিভিন্ন ধর্মের অনুসারী অসংখ্য মানুষ যখন শান্তির জন্য অস্থির ও দিশেহারা, তখন অরাজকতা, নৈরাজ্য, অপরাধ গ্রাস করছে সমাজজীবন। এমনই প্রেক্ষাপটে কেবল শান্তির সপক্ষে এক মিনিট নীরবতা পালন করে অথবা মোমবাতি জ্বালিয়ে, শান্তির গান গেয়ে অথবা শান্তির লক্ষ্যে বৃক্ষরোপণ করে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যায় না। প্রয়োজন ব্যাপকভিত্তিক শান্তির জন্য সামাজিক সম্প্রীতি। এ শান্তি আন্দোলন হতে হবে প্রতিটি শিক্ষাঙ্গনে, রাজনৈতিক মঞ্চে, অর্থনৈতিক ফোরামে, সাহিত্য ও সংস্কৃতির অঙ্গনে। সব ধর্মের মানুষের চিন্তা-চেতনায় শান্তির বার্তাকে আন্দোলিত করতে হবে।
ড. মুহাম্মদ আবদুল মুনিম খান: সহকারী অধ্যাপক, ইসলামিক একাডেমি ও বিভাগীয় প্রধান, ইসলামিক স্টাডিজ অ্যান্ড দাওয়াহ, দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়।
dr.munimkhan@yahoo.com

No comments

Powered by Blogger.