ইসরায়েলের চরম খেলা by ফারুক ওয়াসিফ

নেতৃত্বহীন হলেও ফিলিস্তিনি তরুণদের বিক্ষোভ ক্রমেই ছড়াচ্ছে
ইসরায়েল মাত্র দুই সময়ে আরব হত্যা করে: শান্তিতে ও যুদ্ধে। গাধা যখন বোঝা বয় তখনো সে গাধা, বোঝা নামিয়ে রাখলেও সে গাধাই থাকে। শান্তি ও যুদ্ধে একই ভাষা ইসরায়েলের: চুক্তিভঙ্গ এবং দখল ও হত্যা। যুদ্ধ ঘোষণা ছাড়াই এই দফায় তারা হত্যা করেছে ৫০ জনেরও বেশি ফিলিস্তিনিকে। হামাসের রকেট দেখা যাচ্ছে না, দেখা যাচ্ছে স্বতঃস্ফূর্ত গণপ্রতিরোধ। তৃতীয় ইন্তিফাদা শুরুর আলামত দেখতে পাচ্ছে বিশ্ব গণমাধ্যম। ইন্তিফাদা মানে সর্বাত্মক গণ-অভ্যুত্থান। প্রথম ইন্তিফাদার অর্জন ছিল স্বায়ত্তশাসিত ফিলিস্তিন, দ্বিতীয়টি নিষ্ফলা। তৃতীয় ইন্তিফাদার ফল যা-ই হোক, ফিলিস্তিনিদের সামলাতে পারছে না ইসরায়েল। পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ কারও হাতে নেই। ফিলিস্তিনিদের পূর্ব জেরুজালেম বেহাত। এরই মধ্যে জনতার জান্তব জেদ আর ইসরায়েলি যুদ্ধমেশিন মুখোমুখি।
ইসরায়েল সুনির্দিষ্ট সীমানাহীন এক চলমান রাষ্ট্র। সুতরাং তার সেনাবাহিনীকেও চলমান থাকতে হবে। আলেকজান্ডার, হিটলার ও ইসরায়েলের ইতিহাসের মিল এখানেই। এই দফায় তারা জেরুজালেমের আল–আকসা মসজিদ চত্বরে ইহুদি সিনেগগ বানানোর লক্ষ্যে ফিলিস্তিনি বিতাড়ন শুরু করেছে। ইসরায়েলের আবাসনমন্ত্রী আল–আকসা চত্বরে সিনেগগ বানানোর ঘোষণা দিয়েছেন (http://bit.ly/1Ad3T9f) । অথচ ঐতিহাসিক কাল থেকেই জেরুজালেম তিন একেশ্বরবাদী আরব ধর্মেরই তীর্থকেন্দ্র। কিন্তু ইসরায়েল এর পুরোটাকেই ইহুদীকরণ করতে চায়। তাই পূর্ব জেরুজালেমের ফিলিস্তিনিরা অবরুদ্ধ ও নির্যাতিত হচ্ছে প্রতিদিন। জেরুজালেমের পূর্ণ দখল উদ্দেশ্য হলেও জায়নবাদীরা ছলাকলায় দুর্দান্ত। তারা চায় ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংঘাতটা ধর্মযুদ্ধের চেহারা নিক। যেন ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাসংগ্রাম ইসরায়েলের মতোই ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক হয়ে পড়ে। আর তা হলে ইসরায়েলের বর্ণবাদী দখলদারি স্বার্থ ও তার মুখটা ইহুদি বনাম মুসলিম ধর্মযুদ্ধের মুখোশে ঢাকা থাকবে। আর আরামসে বাজানো যাবে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের বহুব্যবহৃত দামামা। এতে ইহুদি ও মুসলিম হিংসাবাদীদেরই সুবিধা হবে। এভাবেই ইয়াসির আরাফাতের উদার অসাম্প্রদায়িক ফিলিস্তিনি জাতীয়তাবাদী লড়াইকে মডারেট আর ইসলামিস্ট ভাগে বিভক্ত করা গেছে। মনে রাখা দরকার, ফিলিস্তিনের মুক্তি আরবের মুক্তির প্রথম শর্ত।
কয়েক যুগ ধরে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদ, হত্যা, নির্যাতনের পরও ইসরায়েলের ‘আত্মরক্ষার’ যুদ্ধ আর শেষ হয় না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে গণহত্যার শিকার ইহুদিরা তাদের অস্তিত্ব নিয়ে দারুণ ভীত। ইয়াসির আরাফাত থেকে শুরু করে হামাস নেতৃত্ব পর্যন্ত সবাই আজ জবরদখলি পদ্ধতিতে প্রতিষ্ঠিত ইসরায়েলকে মেনে নিয়েছে। ম্যান্ডেলা যেমন বর্ণবাদী শ্বেতাঙ্গ প্রভুদের ক্ষমা করে তাদের নিয়ে দেশ গড়েছেন। আরাফাতও তেমনি অসলো চুক্তির মাধ্যমে ফিলিস্তিনের বিরাট অংশ দখলকারী ইসরায়েলকে মেনে নিয়ে শান্তি আনতে চেয়েছেন। আরাফাতের এই অহিংসা ও উদারতা বাস্তবতার শিক্ষা যেমন, তেমনি মহান ত্যাগও বটে! তারপরও ম্যান্ডেলা পান ভালোবাসা, অথচ আরাফাত আজও পশ্চিমাদের অনেকের কাছে সন্ত্রাসী মুসলিম!
ইসরায়েেলর মনস্তত্ত্ব বুঝতে এই গল্পটাই যথেষ্ট: এক ইহুদি তরুণ যুদ্ধে যাচ্ছে। তো তার মা ছেলেকে বোঝাচ্ছে: বাবা, বেশি খাটবি না। একটা করে আরব মারবি আর জিরিয়ে নিবি।
ছেলে: কিন্তু ওরা যদি আমাকে মারে?
মা: তোকে মারবে কেন, তুই তাদের কী ক্ষতি করেছিস?
এই যাদের মানসিকতা, তারা অপরিণামদর্শী হবেই। ইসরায়েলের ভিতে চতুর্দিক থেকে ধস নামছে। ১. ফিলিস্তিন এখন জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং পোপস্বীকৃত বৈধ রাষ্ট্র। সুতরাং আন্তর্জাতিক আইনে ইসরায়েল দখলদার ও যুদ্ধাপরাধী রাষ্ট্র হওয়ার যোগ্য। ওদিকে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র পরমাণু চুক্তি হতে পারাই প্রমাণ করে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতাধর ইসরায়েলি লবির ক্ষমতা কমেছে। পরম বন্ধু সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্র এবং চতুর তুরস্ক ব্যস্ত সিরিয়ায় রাশিয়াকে সামলাতে।
২. ইসরায়েলের বর্ণবাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক জনমত আগের থেকে জোরদার। বেশ কিছু কোম্পানি, দেশ ও বিশ্ববিদ্যালয় ইসরায়েলকে বয়কট করছে। পশ্চিমা লেখক-অধ্যাপক-শিল্পীরা ইসরায়েলকে এড়াচ্ছেন। ইউরোপের রাজধানীগুলোতে ইসরায়েলবিরোধী বিক্ষোভ বাড়ছে। সম্প্রতি বিখ্যাত গায়ক রজার ওয়াটার্স আরেক বিখ্যাত গায়ক বন জোভিকে ইসরায়েলে গান না গাওয়ার অনুরোধ করেছেন। নেদারল্যান্ডসের কোম্পানি পিজিজিএম ইসরায়েলের পাঁচটি বৃহত্তম ব্যাংক থেকে সব ধরনের বিনিয়োগ উঠিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ডেনমার্কের ডান্স্কে ব্যাংকও একই পথ ধরেছে। ঘটনা আরও আছে। ইউরোপ হলো ইসরায়েলি উচ্চ প্রযুক্তিপণ্যের প্রধান বাজার। ইসরায়েলি অর্থমন্ত্রী ইয়াইর লাপিদও স্বীকার করেছেন, ‘ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে মীমাংসা না হলে প্রত্যেক ইসরায়েলির পকেটে টান পড়বে।’ তাঁর হিসাবে ‘সীমিত মাত্রার বয়কটে বছরে ক্ষতি হবে পাঁচ বিলিয়ন ডলার এবং চাকরি হারাবে লাখো ইহুদি।’
৩. ইসরায়েল অনেক ইহুদির চোখেও আর বাইবেলে প্রতিশ্রুত পবিত্র ভূমি থাকছে না। সেখানে ইহুদিদের অভিবাসন কমে গেছে। অন্যদিকে গত দুই দশকে প্রায় ১০ লাখ অর্থাৎ প্রতি সাতজনে একজন ইসরায়েলি দেশ ছেড়েছে। ৬০ শতাংশ ইসরায়েলি বিদেশে পাড়ি দেওয়ার চেষ্টায় জড়িত বা তাতে ইচ্ছুক (ফরেন পলিসি, ২০১১)।
৪. তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক স্লোমো স্যান্ড নিজেকে আর ইহুদি ও ইসরায়েলি ভাবতে নারাজ। তাঁর দ্য ইনভেনশন অব জুয়িশ পিপল বইটি বেশ কয়েক মাস ইসরায়েলে বেস্ট সেলার ছিল। তিনি ইতিহাস, প্রত্নতাত্ত্বিক ও নৃতাত্ত্বিক প্রমাণের জোরে দাবি করেছেন, ৭০ খ্রিষ্টাব্দে ইহুদিদের জেরুজালেম থেকে বিতাড়নের ঘটনা অসত্য। তাঁর দাবি, আদি ইসরায়েলি হিব্রু জাতির বর্তমান বংশধর খোদ ফিলিস্তিনি মুসলিম ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়। মানে দাঁড়াল, ইউরোপীয় ইহুদিদের দিয়ে আরব ভূমিতে ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার কোনো ঐতিহাসিক ও যৌক্তিক ভিত্তি নেই। এটা সম্পূর্ণতই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ বিজেতা পরাশক্তিদের ভূরাজনৈতিক প্রকল্প। ক্রমেই এই চিন্তার জনপ্রিয়তা বাড়ছে।
এই চারটি কারণে ইসরায়েল নৈতিকভাবে আক্রান্ত বোধ করছে। অস্থিরতা পেয়ে বসছে এর নেতাদের। ইসরায়েলি শান্তিবাদী লেখক ইউরি আভনেরির ভাষায় ইসরায়েলিরা অস্থির এবং অপরিণামদর্শী আর আরবরা সহনশীল। উট আরবদের প্রিয় প্রাণী। উটের আছে কষ্ট সহ্যের ক্ষমতা এবং আরবদের আছে ধৈর্য এমনকি ভুল করার ব্যাপারেও। ২০১৪ সালের গাজা আগ্রাসন এবং তার আগের লেবাননে হামলার ঘটনাতেই ইসরায়েলি নেতাদের অপরিণামদর্শিতা বোঝা গেছে। গাজায় তারা হারিয়েছে নৈতিক অবস্থান আর লেবাননে পরাজিত হয়েছে সামরিকভাবে।
ইতিহাস বড় লীলাময়। ইহুদি কিশোর ডেভিড ফিলিস্তিনি বীর গোলিয়াথকে হারিয়েছিলেন। আজ ফিলিস্তিনি কিশোর-তরুণেরাই যেন ডেভিডের ভূমিকায়। আর ইসরায়েল নিজেই আধুনিক গোলিয়াথ। ইতিহাসও তাদের বিপক্ষে। খ্রিষ্টধর্মের প্রবক্তা যিশুর জন্ম ফিলিস্তিনের বেথলেহেমে, এবং তিনি যে ভাষায় কথা বলতেন তা সে সময়কার ফিলিস্তিনি ও সিরীয়রাও বলত। এ কারণে ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসসহ অনেকেই যিশুকেও একজন শহীদ ফিলিস্তিনি মনে করেন। গত বছর ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু পোপের সামনে দাবি করে বসেন যে যিশু হিব্রু ভাষায় কথা বলতেন। পোপ ফ্রান্সিস বাধা দিয়ে বলেন, ‘না, তাঁর ভাষা ছিল আর্মাইক’ (সূত্র: রয়টার্স, মে, ২৬, ২০১৪)। আর্মাইক ভাষার সঙ্গে আরবি ভাষার সম্পর্ক ভাইবোনের। নতুন পোপ যিশুর জন্মভূমিতে মানব-হত্যা দেখতে চান না।
মানবতার কান্না সবার আগে কবিই কাঁদেন। চার শ বছর আগে এক মহাকবি লিখেছিলেন, ‘আমি একজন ফিলিস্তিনি। একজন ফিলিস্তিনির কী চোখ নেই? নেই হাত, অঙ্গ, ভাব, অনুভূতি, বোধ ও ভালোবাসা? তুমি-আমি একই খাবার খাই, আহত হই একই আঘাতে। একই অসুখে আমরা ভুগি এবং সেরে উঠি একই ওষুধে। ইহুদিদের মতোই একই শীত ও গ্রীষ্ম আমাদেরও ওম দেয় আর ঠান্ডায় কাঁপায়। তুমি যদি খোঁচাও, আমার কি রক্ত ঝরে না? তুমি যদি কৌতুক করো, আমি কি হাসি না? এবং তুমি যদি অন্যায় করো, আমি কি তার প্রতিশোধ নেব না? সবকিছুতেই যদি আমরা তোমাদের মতোই হই, তাহলে তুমি যা আমার প্রতি করছ; আমিও তা-ই করব। হয়তো তা হবে তোমার থেকেও কঠিন, কারণ আমি তো তোমার কাছ থেকেই শিখছি!’
কথাগুলো আসলে শেক্সপিয়ারের মার্চেন্ট অব ভেনিস নাটকের ইহুদি চরিত্র শাইলকের সংলাপ। এর ‘ইহুদি’ শব্দের জায়গায় ‘ফিলিস্তিনি’ শব্দ বসালেই তা হয়ে ওঠে বিশ্বের সবচেয়ে নিপীড়িত ফিলিস্তিনিদের ফরিয়াদ। ইসরায়েল এক হাতলহীন তলোয়ার, একে নিরস্ত করা সমগ্র মানবতার দায়। মধ্যপ্রাচ্যের শান্তির প্রধান শর্ত আরব-ইসরায়েল মৈত্রী। তার জন্য ওই এলাকায় আরাফাতের মতো, ম্যান্ডেলার মতো নেতা চাই। সেই নেতা আসবেন জনগণের ভেতর থেকে। কেননা, অমানবিকতার বোঝাটা জনগণকেই সবচেয়ে বেশি সইতে হয়।
সিরীয় যুদ্ধ এবং তৃতীয় ইন্তিফাদা ঘনিয়ে ওঠার মুখে মধ্যপ্রাচ্য আবার এসে দাঁড়িয়েছে শূন্য সময়ের শূন্য ডিগ্রিতে।
ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক ও লেখক।
bagharu@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.